‘ওয়ান ইলেভেন’ তথা এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব হিসেবে অত্যন্ত আলোচিত ব্যক্তি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘মাইনাস টু ফর্মুলার’ অন্যতম হোতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় তাকে। তৎকালীন আলোচিত রাজনীতিক ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে নির্যাতন, দুর্নীতির মামলাসহ নানা ক্ষেত্রে মাসুদ উদ্দিনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
এতকিছুর পরও একের পর এক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বীরদর্পে আয়েশ করে গেছেন সাবেক তিন তারকা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। বিশেষ করে এক-এগারো-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মাসুদ উদ্দিনকে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার করে রাখে। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির (আদম ব্যবসা) সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের সুযোগও করে দেয় সেই সরকার। আদম ব্যবসার আড়ালে মানব পাচার, বিপুল অর্থ পাচার এবং জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়ার সুযোগও পান মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
অবশেষে গত সোমবার দিনগত গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, যার মধ্যে কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।
বিভিন্ন অভিযোগ, তবু পান নানা সুযোগ-সুবিধা
রাজনৈতিক মহলে এক-এগারোর সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ ও প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমেদের পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। কথিত আছে, ওই সময়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তথা এএফডির প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। এই নিয়ে একপর্যায়ে তার সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল মঈনের মতবিরোধ হলে ২০০৮ সালের ২ জুন তাকে এএফডি থেকে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে এবং তার ছয় দিনের মাথায় আবার ৮ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। সে বছরই ২ সেপ্টেম্বর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। পরে ৪ নভেম্বর তিনি সে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১১ সালের ২৯ জুন তার চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও আওয়ামী লীগ সরকার পরবর্তীকালে একাধিকবার তার চাকরির মেয়াদ বাড়ায়। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালনের পর অবসর নেন।
অবসরের পরই জেনারেল মাসুদ জনশক্তি রপ্তানি (আদম ব্যবসা) ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে তার নাম আলোচনায় রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানির নামে শ্রমবাজারে কারসাজি ও প্রতারণার অভিযোগে গত বছরের ২৫ আগস্ট মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার অর্থ পাচারের মামলা করে সিআইডি। এমনকি তার বিরুদ্ধে ‘আদম ব্যবসার’ আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এমন অবস্থায় ২০১৮ সালে এবং ২০২৪ সালে জাতীয় পার্টি থেকে নিজ এলাকা ফেনী-৩ আসন (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন, যেখানে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক এমপি নিজাম হাজারীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেনারেল মাসুদের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের সুলাখালী। তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় খুব বেশি আলোচনায় ছিলেন না। তার ছোট ভাই কলেজশিক্ষক সাইফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী হারুন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। পাশাপাশি ফেনীর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম হাজারী নিজ জেলায় একক প্রভাব ধরে রাখতে জেনারেল মাসুদকে নানা কৌশলে পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে জেনারেল মাসুদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ভাই সাঈদ ইস্কান্দারের সম্পর্কে ভায়রা ভাই। এই সম্পর্কের জেরে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মাসুদের পদোন্নতি ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
‘ওয়ান ইলেভেন’ ও মাসুদ উদ্দিনের ভূমিকা
২০০৬ সালের শেষ ভাগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর রাজনৈতিক মতানৈক্যের মধ্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। এতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে এবং জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। সারা দেশে সহিংসতা-হানাহানি ছড়িয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং একসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন। বাতিল করা হয় পূর্বঘোষিত ২২ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। আলোচিত সেই ঘটনাপ্রবাহের শুরুর দিনটি পরিচিতি পায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা এক-এগারো নামে।
আর ওই সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের (সাভার এরিয়া) জিওসির দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, যিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের বিশ্বস্ত বা ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পরই সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাসুদ উদ্দিন পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল বা তিন তারকা জেনারেল হন। ওই সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেনারেল মাসুদকে। জেনারেল মাসুদই মূলত যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনাসহ সবকিছুই পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়তেন বলে আলোচনা রয়েছে। এই কমিটির মাধ্যমে যৌথ বাহিনী পরিচালিত অভিযানে দেশের শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুর্নীতির মামলায় জড়ানোর প্রক্রিয়া চালানো হতো।
‘মাইনাস টু ফর্মুলা’য় মাসুদ উদ্দিনের মুখ্য ভূমিকা
এক-এগারো-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’। যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তৎকালীন সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নামকরণ করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কিছু কেন্দ্রীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় গোয়েন্দা হেফাজতে নিয়ে তারেক রহমানের ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ এখনো রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচিত, যেখানে জেনারেল মাসুদের বড় ধরনের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রক্ষী বাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭৫ সালে রক্ষী বাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ’৭৫-এর পটপরিবর্তন হলে রক্ষী বাহিনী থেকে অন্যদের সঙ্গে মাসুদকে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল হয়েছিলেন তিনি। ২০০৭ সালের ‘এক-এগারো’র সময়ে মাসুদ নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন, যা তাকে পটপরিবর্তিত সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।