ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসী হওয়ার বিপদসংকুল পথে মৃত্যু খুব কাছে। তার পরও ঝুঁকিপূর্ণ এই পথে মানবস্রোত থেমে নেই। অভিবাসীপ্রত্যাশীদের স্বপ্নকে পুঁজি করে মানব পাচার চক্রটি জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মানব পাচার চক্রের অপতৎপরতায় রাশ টানতে পারছে না।
সর্বশেষ গত শুক্রবারও লিবিয়া থেকে রাবারের নৌকায় ইউরোপে প্রবেশের সময় গ্রিস উপকূল থেকে চার বাংলাদেশির লাশ ও ২১ বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সে যাত্রায় মারা গেছেন ১৮ বাংলাদেশি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় এভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের প্রতি মাসেই ফেরত আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ও আইওএমের সহায়তায় গত ১৫ বছরে ইউরোপ যাওয়ার পথে আটক ও উদ্ধার হওয়া ৪৮ হাজার ৫৪৮ জন বাংলাদেশিকে ফেরত এনেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক আরও ২৩৯ জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাদেরও ফেরত আনা হবে।
তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত পাঁচ বছরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসী হওয়ার চেষ্টায় মারা যাওয়া ১৮৭ বাংলাদেশির লাশ সরকারি খরচে দেশে এনেছে।
এনজিও সংস্থা ব্র্যাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই প্রতিবছর অন্তত ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের দিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানব পাচারের শিকার হন বাংলাদেশিরা।
গত বছরের প্রথম ৬ মাসে সমুদ্রপথে ৯ হাজার ৭৩৫ জন পাচার হয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে ৪ হাজার ৩৪৮ জন পাচার হয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ইরিত্রিয়া এবং ৩ হাজার ৫৫৬ জন পাচার হয়ে তালিকার তৃতীয় অবস্থানে আছে মিসর।
এ ছাড়া চতুর্থ অবস্থানে পাকিস্তান ২ হাজার ৬২৫ জন, পঞ্চম অবস্থানে আছে ইথিওপিয়া ১ হাজার ৪৩০ জন, ষষ্ঠ অবস্থানে সিরিয়া ১ হাজার ৮৬ জন, সপ্তম অবস্থানে আছে সুদান ১ হাজার ২০ জন, অষ্টম অবস্থানে আছে সোমালিয়া ৯৬৭ জন, নবম অবস্থানে গিনি ৭২৪ জন এবং দশম অবস্থানে আছে আলজেরিয়া ৫৬১ জন।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের এ মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে শুধু ভূমধ্যসাগর হয়ে রাবারের নৌকায় চেপে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছে ৩ হাজার ৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী। এসব অভিবাসীর বেশির ভাগ বাংলাদেশ, সোমালিয়া ও পাকিস্তানের নাগরিক।
ফ্রন্টেক্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্য অবৈধ পথেও প্রায় ১২ হাজার অবৈধ অভিবাসী এই দুই মাসে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ কম হলেও সমুদ্রপথের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় মৃত্যুর হার আগের তুলনায় বেড়েছে। এই দুই মাসেই ভূমধ্যসাগরে প্রায় ৬৬০ জন অভিবাসী মারা গেছেন। খারাপ আবহাওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান ব্যবহারের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় পথ দিয়েই সবচেয়ে বেশি মানুষ ইতালি ও গ্রিসে প্রবেশ করেন, যা মোট অবৈধ অভিবাসীর প্রায় ৩০ শতাংশ।
এদিকে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে বিশেষ করে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকার লোকজনকে প্রলোভন দিয়ে এভাবে ইউরোপ নেওয়ার স্বপ্ন দেখায় দালাল চক্র। কিন্তু বছরের পর বছর এসব দালাল ও মানব পাচার চক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যেন কোনো কাজেই আসছে না। ফলে চক্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং একধরনের নির্বিঘ্নে তাদের অপকর্ম করে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সরকার এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের মানব পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গ্রিসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সর্বশেষ নৌকাডুবিতে নিহত ও জীবিতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এই মানব পাচার চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মানব পাচারকারীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র লিবিয়া ও বাংলাদেশ–উভয় দেশেই সক্রিয় রয়েছে। তারা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাঠায়। এ ঘটনায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা থাকলেও বাংলাদেশিদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, গ্রিস উপকূলে গত শুক্রবার নৌকাডুবিতে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বাকিদের একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তাদের পরিচয় শনাক্ত ও বর্তমান অবস্থা জানার জন্য দূতাবাস সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়মকানুন মেনে তথ্য সংগ্রহ ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে কিছুটা সময় লাগবে।