পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের একটি দ্বন্দ্ব এবার প্রকাশ্যে এসেছে, যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিএসএস ১৭তম ব্যাচের বিভিন্ন ক্যাডারে সবার পদোন্নতি হলেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পররাষ্ট্র ক্যাডারের একই ব্যাচের কূটনীতিকদের কারও পদোন্নতি হয়নি। কারণ এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও তালিকা পাঠানো হয়নি।
পদোন্নতিবঞ্চিতদের দাবি, বিসিএস একই ব্যাচের মধ্যে অন্য যেকোনো ক্যাডারের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পদোন্নতিতে এগিয়ে থাকতেন পদ ও সুযোগের বিবেচনায়। এবারই এর ব্যতিক্রম হলো। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদের এক কূটনীতিক খবরের কাগজকে জানান, তাদের এই দাবি অযৌক্তিক। তিনি বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সব সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগে পদোন্নতি পান। পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের মূল্যায়ন ও তালিকা নির্বাচনের আগেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং শিগগিরই পদোন্নতিও হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচ ও ১৫তম ব্যাচের কূটনীতিকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এখন চরমে। যদিও এই দ্বন্দ্ব শুরু হয় তাদের চাকরিজীবনের শুরুর দিক থেকে। সাভারে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (বিপিএটিসি) পররাষ্ট্র ক্যাডারের এই দুই ব্যাচের কর্মকর্তারা একই ব্যাচে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তখন থেকেই দ্বন্দ্বের শুরু। তবে পরে এই দুই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে কখনো আসেনি। এবারই প্রথম এই দুই ব্যাচের দ্বন্দ্বে পদোন্নতিবঞ্চিত হলেন পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কূটনীতিকদের মধ্যে কয়েকজন বাদে এখন সবাই সচিব পদমর্যাদার ‘এ’ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সচিব পদেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই ব্যাচের তিনজন কূটনীতিক। এখন পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেলে তারাও সচিব পদমর্যাদার ‘এ’ গ্রেডে উন্নীত হতেন। ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারাও অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতেন। সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষদিকে পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সেটা সময়মতো পৌঁছায়নি। অথচ একই ব্যাচের অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তালিকা এপিডিতে পাঠায় নিজ নিজ মন্ত্রণালয়। এসব তালিকা থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মিটিংয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে অন্য ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একই ব্যাচের কূটনীতিকরা পদোন্নতিবঞ্চিত হন। কারণ তাদের মূল্যায়ন তালিকা এসএসবিতে পাঠায়নি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে থাকা ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের অনিচ্ছায় ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন তালিকা এসএসবি মিটিংয়ে পাঠানো হয়নি। পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য তালিকা তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের দপ্তর থেকে প্রস্তুত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুপিরিয়র এসএসবির মিটিংয়ে পাঠানোর জন্য বলা হয়। পরপর দুবার এই নির্দেশ দেন তৌহিদ হোসেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সেই তালিকা প্রায় দেড় মাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই আটকে রাখা হয়। পরে যখন সেই তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, ততদিনে এসএসবি বোর্ডের মিটিং শেষ হয়ে গেছে। এর কিছুদিন পর অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করে। এতে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের পদোন্নতি ও বদলি স্থগিত হয়ে যায়। সূত্র জানায়, এই সময়ের অপেক্ষায় ১৭তম ব্যাচের তালিকা পাঠাতে বিলম্ব করা হয়, যাতে ১৭তম ব্যাচ থেকে কেউ পদোন্নতি পেয়ে নেতৃত্বে আসতে না পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নেতৃত্বে আসতে হলে ‘এ’ গ্রেডে পদোন্নতি পেতে হবে। এটি না হলে বর্তমান নির্বাচিত সরকার চাইলেও ১৭তম ব্যাচ থেকে পছন্দের কাউকে সচিব পদমর্যাদায় বসাতে পারবে না। যদিও বিশেষ বিবেচনায় পদোন্নতি দিয়ে এ সুযোগ আছে। ১৭তম ব্যাচের পদোন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ১৫তম ব্যাচ থেকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরের নেতৃত্বে মনোনয়ন দিতে হবে। এই ব্যাচের ১৫ জন কূটনীতিকের মধ্যে একজন অবসরে গেছেন এবং বাকি ১৪ জন এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে রয়েছেন।
এদিকে পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কূটনীতিকদের পদোন্নতি না হওয়ায় ১৫তম ব্যাচের নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তাদের অভিযোগ, নিজেদের স্বার্থে এই পদোন্নতি আটকে রাখা ঠিক হয়নি। বর্তমানে পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কূটনীতিকদের মধ্যে দু-একজন বাদে সবাই বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ মিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত। এসব সুযোগেই এসএসবি বোর্ডে তালিকা পাঠাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিলম্ব করা হয়। ১৭তম ব্যাচের ১৯ জন কূটনীতিকের মধ্যে প্রায় সবাই বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পদে কর্মরত আছেন।