বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই রাজধানীজুড়ে বাড়ছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুজ্বরের আতঙ্ক। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ঢাকার বিভিন্ন খাল, নালা ও ড্রেনে পানি জমে থাকায় মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খাল-নালা এখন আবর্জনায় ভরা। কোথাও কোথাও জমে থাকা পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এসব ময়লা ও স্থির পানিতেই দ্রুত বিস্তার ঘটছে এডিস মশার।
- সতর্কতা জারির মধ্যেও আবর্জনায় ভরা খাল-নালা
- ময়লাপানিতেই বাড়ছে মশার বিস্তার
- বিকল্প প্রস্তুতি নিচ্ছে সিটি করপোরেশন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আশঙ্কা প্রকাশ করছে, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। সময় থাকতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলেছে অধিদপ্তর। একইসঙ্গে জনসচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তবে তদারকির ঘাটতির কারণে রাজধানীর অনেক খাল-নালায় এখনো মশার বিস্তার দেখা যাচ্ছে।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগী
এদিকে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। বর্ষা পুরোপুরি শুরু হলে রোগীর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। এ জন্য হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, স্যালাইন, রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার তাগিদ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তার বয়স ৫৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ২ হাজার ৬৮৮ জন ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসের এ পর্যন্ত ২০৫ জন ভর্তি হয়েছে। যদিও বেসরকারি হিসেবে এর সংখ্যা দ্বিগুণ।
বিগত বছরগুলোতেও মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কম ছিল না। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। এদের মধ্যে মারা যায় ৪১৩ জন। ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যায় ৫৭৫ জন। চলতি বছরও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মসূচি
গত দুই দিনে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে। এসব কর্মসূচিতে দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ‘প্রাক-বর্ষা এডিস মশার লার্ভা জরিপ’ শুরু করেছে। এ জরিপে ডিএসসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়িকে নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। ১২ দিনব্যাপী এ জরিপে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নিয়েছেন। তথ্য সংগ্রহে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক ‘কোবো টুলবক্স’ প্রযুক্তি।
জরিপ শেষে ব্রেটো ইনডেক্স, হাউস ইনডেক্স, কন্টেইনার ইনডেক্স ও পিউপা ইনডেক্সের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি পাওয়া যাবে, সেগুলোকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
জরিপ কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ডেঙ্গু এখন জনজীবনের জন্য বড় হুমকি। রোগের উৎপত্তিস্থল সঠিকভাবে শনাক্ত করা গেলে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তিনি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সতর্ক করে বলেন, দায়িত্বে অবহেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
অন্যদিকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়াতে ‘সুরে সুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধ’ ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচি শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। বাউল সংগীতের মাধ্যমে এ প্রচার ২০ দিন চলবে। ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডের ১০০টি স্থানে সচেতনতামূলক বাউল গান পরিবেশন করা হবে। বাউল গানের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়, মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা বিষয়ে সাধারণ মানুষকে জানানো হচ্ছে।
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রচলিত প্রচারের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক উপায়ে মানুষকে সচেতন করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি নাগরিকদের নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখলেও বাস্তবে মশকনিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, খিলগাঁও ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ নালা-খালে পানি জমে রয়েছে। প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও গৃহস্থালির বর্জ্যে অনেক ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে দীর্ঘসময় স্থির পানি জমে থাকছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব স্থির পানিতেই মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব এতই বেড়ে যায় যে, অনেক এলাকায় স্বাভাবিকভাবে বসে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। একইসঙ্গে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না। এতে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ ও পরিকল্পনাবিদদের মত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থায়ী উদ্যোগের অভাবই মূল সমস্যা। দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতাও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
পরিকল্পনাবিদদের মতে, খাল-নালা ও ড্রেন পরিষ্কারের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিয়মিত খাল-নালা পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রকোপে শিশুমৃত্যু হচ্ছে। হামের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তা ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার মতো উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপও আগেভাগেই দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার অভাবে এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞর মতে, একদিকে হামের প্রকোপ, অন্যদিকে ডেঙ্গুসহ অন্য মশাবাহিত রোগের বিস্তার জনজীবনে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা এবং সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতির দাবির পরও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে খাল-নালা পরিষ্কার না থাকা এবং মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়া পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। শুধু কাগজে-কলমে প্রস্তুতি নয়, দ্রুত লার্ভিসাইডিং (মশার লার্ভা ধ্বংস) এবং ফগিং (ওষুধ ছিটানো) কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে খাল-নালায় জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা অপসারণ না করলে এডিস মশা বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ পাবে। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের সরাসরি তদারকি জরুরি।
তিনি বলেন, একইসঙ্গে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে।বাড়ির আশপাশে টব, ডাবের খোসা, বা জমে থাকা পানিতে যেন মশা ডিম পাড়তে না পারে তা নিশ্চিত করতে কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু ঝুঁকি কমাতে সিটি করপোরেশনের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি প্রয়োজন।