ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদের আগেই সড়ক-মহাসড়কে দেখা দিয়েছে ডাকাত-ছিনতাইকারী আতঙ্ক। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে দুর্ধর্ষ ডাকাতির সম্মুখীন হচ্ছেন যাত্রী-আরোহী ও ব্যবসায়ীরা। হাইওয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সড়কে দস্যু বা ডাকাত চক্রের তৎপরতার বিরুদ্ধে নানা কথা বললেও বাস্তবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ দেখছেন না ভুক্তভোগীরা।
- পেটের দায়ে গাড়ি চালাতে হয়, কিন্তু আতঙ্ক থাকে সারাক্ষণ: ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি তালকুদার মোহাম্মদ মনির
- সব সড়কে টহল-চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে: হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান
একাধিক ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা বা অঞ্চলে চলাচলের সড়ক-মহাসড়কে মাঝেমধ্যেই ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বেশি ডাকাতির ঘটনা ঘটছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। পুরোপুরি এসব বন্ধ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মহাসড়কগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের ক্যাম্পে, টহল বৃদ্ধিসহ নানা পদক্ষেপের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। নতুন করে বেশ কিছু দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও হত্যা-জখমের ঘটনায় কোরবানির ঈদের আগেই দেশের সড়ক-মহাসড়কে চলতে গিয়ে আতঙ্কে ভুগছেন মানুষ।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৭ মে ভোর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে গরুবাহী একটি ট্রাকে হামলা চালায় ১০ জনের সশস্ত্র ডাকাত দল। এ সময় চালক আকরাম হোসেনকে কুপিয়ে জখম করে তারা ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে ট্রাকটি চৌদ্দগ্রাম-লাকসাম আঞ্চলিক সড়কের ফেলনা মোল্লা বাড়ি এলাকায় নিয়ে চালক ও তার সহকারীকে (হেলপার) গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে এ গাড়ি থেকে ১০টি গরু নামিয়ে নিজেদের পিকআপে তুলে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে। পরে সকালে আশপাশের লোকজন টের পেয়ে আহত চালক ও তার সহকারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন।
অন্যদিকে সরকারি একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ শেষে গত ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় কর্মস্থলসংলগ্ন ভাড়া বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারী বা ডাকাত চক্রের হাতে নির্মমভাবে খুন হন কাস্টমস কর্মকর্তা (সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা) বুলেট বৈরাগী (৩৫)। পরের দিন সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। যাত্রী ও চালকের ছদ্মবেশে ডাকাতরা বুলেট বৈরাগীকে অটোরিকশায় তুলে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ও পরে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে হত্যা করে বলে জানায় র্যাব।
এরও কয়েক দিন আগে তথা মার্চের শেষে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে ১০ থেকে ১২ জন ডাকাত রাস্তায় গাছ ফেলে ব্যবসায়ী (যমুনা ও সেনা এলপি গ্যাসের স্থানীয় ডিলার) জহুরুল হকের প্রাইভেট কার থামাতে বাধ্য করে। পরে ডাকাতরা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে প্রাইভেট কারের গ্লাস ভেঙে ওই ব্যবসায়ী ও তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালক সাইফুল ইসলামকে জিম্মি করে তাদের সঙ্গে থাকা নগদ সোয়া ৯ লাখ টাকা ও চারটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সম্প্রতি ওই ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তে নেমে দুজনকে গ্রেপ্তারসহ ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর মোবাইল ফোন উদ্ধার করে।
এসব ঘটনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির খবরের কাগজকে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের ড্রাইভার ভাইয়েরা সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চালাচ্ছেন। বিশেষ করে পণ্য বা পশুবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক গুণ বেশি দেখা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে যতবার আমরা বসেছি, শুধুই আশ্বাস পেয়েছি, বাস্তবে কিছুই দেখি না। পেটের দায়ে গাড়ি চালাতে হয়, কিন্তু আতঙ্ক থাকে সারাক্ষণ।’
সড়ক ও মহাসড়কের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও ময়নামতি এলাকায় পরপর ঘটা দুটি ডাকাতির ঘটনার পর হাইওয়ে পুলিশকে দায়িত্ব পালনে আরও বেশি সতর্ক করা হয়েছে। ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের তৎপরতা রোধে সড়কগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল ও চেকপোস্ট। এ ছাড়া কোরবানির পশুবাহী ট্রাক বা যানবাহনকে একসঙ্গে ‘এসকর্ট’ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিতেও কাজ শুরু করেছে হাইওয়ে পুলিশ। চালক বা ব্যবসায়ীদের প্রতিও একইভাবে আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে করে পুলিশি নিরাপত্তা-সুরক্ষায় (এসকর্ট) একসঙ্গে কয়েকটি পশুবাহী গাড়ি চলাচল করানো যায়।’