বাগেরহাট জেলার সদর থানার কররী মৌজার এক শতাংশ কৃষিজমির দর ৫৫ হাজার ১৫৪ টাকা। এই জমির বর্তমান বিক্রি দর ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। এই থানার বাসিন্দা হাবিব শেখ পৈতৃকসূত্রে ৬শ শতাংশের বেশি কৃষিজমি পেয়েছেন। এতদিন তাকে শুধু খাজনা দিতে হয়েছে। আগামী অর্থবছর সম্পদ-কর আরোপ হলে এই জমির মৌজা দরের ভিত্তিতে হিসাব কষে কর দিতে হবে।
হাবিব শেখ খবরের কাগজকে বলেন, কৃষি কাজ করে কিছু আয় করি। এই জমি বিক্রি করলেও মৌজা দরের চেয়ে কম দাম হবে। এখন নতুন করে সম্পদ-কর দিতে হলে বিপাকে পড়ে যাব।
• ফ্ল্যাট ও প্লটের দাম বাড়বে
• সম্পদ-কর আরোপের চিন্তা করছে সরকার
• খাজনা ও হোল্ডিং করের পাশাপাশি সম্পদ-কর থাকবে
• আবাসন খাতের ওপর দুই শর বেশি শিল্প নির্ভরশীল
• নির্ভরশীল খাতের আমদানি-উৎপাদনে রাজস্ব ছাড় নেই
• অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা
অন্যদিকে রাজধানীর বনানীতে উত্তরাধিকার সূত্রে দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট পেয়েছেন শামিমা সুলতানা। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে তিনি সেখানে থাকেন। আয় বলতে এফডিআরের মুনাফা। এ এলাকায় মৌজা দরের কয়েকগুণ বেশি ফ্ল্যাটটির দাম।
শামিমা সুলতানা খবরের কাগজকে বলেন, সংবাদপত্রে দেখছি আগামী অর্থবছরের বাজেটে সম্পদ-কর নামে নতুন ধরনের কর চালু হচ্ছে। আর এতে আমাকে প্রচলিত বাজার মূল্যে শুধু এই ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার কারণে বড় অঙ্কের কর দিতে হবে। এই কর আমার জন্য অনেক বড় চাপ হয়ে যাবে। আমার অন্য কোনো আয় নেই।
সম্পদ-কর নিয়ে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিকরা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতে ‘সম্পদ-কর’ আরোপের চিন্তা করছে সরকার। তবে কোন এলাকার জন্য মৌজা মূল্যে আর কোন এলাকার জন্য বাজার দরে সম্পদ-কর আরোপ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
রাজস্ব খাতের বিশ্লেষকরা বলেছেন, সম্পদ-কর আরোপের অনেক ধরনের জটিলতা আছে। সরকারকে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এ কর আরোপ করতে হবে। সম্পদ-কর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, গত কয়েক বছর থেকে আবাসন খাতে ধস নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্পদ-কর চালু করা হলে শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ও প্লটের দাম বাড়বে।
শুধু তাই না, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে আবাসন খাতের কাঁচামাল রড, সিমেন্ট, পেইন্টসহ প্রায় সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। আবাসন খাতের সঙ্গে দুই শর বেশি শিল্প খাত নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা আগামী বাজেটে এসব খাতের আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে রাজস্ব ছাড় দেওয়ার দাবি জানালেও তা আমলে আনা হচ্ছে না।
আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ সহজশর্তে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে এখনো নেতিবাচক অবস্থানে আছে সরকার।
যা বলছে রিহ্যাব
আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি আরমা রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক উদাহরণ দিয়ে খবরের কাগজকে বলেন, সাধারণ কৃষি জমির বিক্রি দরের চেয়ে মৌজা দর অনেক বেশি। অন্যদিকে শহরে প্লট ও ফ্ল্যাটের মৌজা দরের চেয়ে বাজার দর কয়েকগুণ বেশি। এখানে সরকার কীভাবে বাজার দর নির্ধারণ করবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। আবার সম্পদ কর মৌজার ওপর, না বাজারের দরের ভিত্তিতে হবে তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে। দেখা যাবে, প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিক এক দাম বলেবে, রাজস্ব বোর্ড আরেক দাম বলবে। এভাবে দরকষাকষি করে অনেক অসাধু এনবিআর কর্মকর্তার অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সমঝোতায় আসার পথ তৈরি হবে। এছাড়া শুধু প্লট ও জমির মালিক হলেই কর দিতে হলে বিক্রি দাম অনেক বেড়ে যাবে। আবাসন খাতে তথা সমগ্র অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আবাসন খাতের আরেক ব্যবসায়ী রিহ্যাবের প্রথম সহসভাপতি আকতার বিশ্বাস খবরের কাগজকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আবাসন খাতের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে রাজস্ব আরোপ করা হলে আবাসন খাতে ধস নামবে।
এরই মধ্যে আবাসন ব্যবসায়ীরা অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন জানিয়ে সম্পদ-কর আরোপ থেকে সরকারকে সরে আসার দাবি জানিয়েছেন।
যে জটিলতার কথা বললেন এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তারা
এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, ১৯৯৯ সালের দিকে সম্পদ-কর চালু ছিল। বিভিন্ন জটিলতার কারণে এই কর বাতিল করে সারচার্জ আরোপ করা হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এই কর আরোপ করা হলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হবে। গ্রামে কৃষি জমিতে মৌজা দর বিক্রি দর থেকে বেশি। কিন্তু শহরে মৌজার দরের চেয়ে বাজার দর অনেক বেশি। সম্পদ-কর আরোপ হলে খাজনা, হোল্ডিং করের পাশাপাশি এই কর দিতে হবে। উন্নত দেশে ভ্যালুয়েশন ইউনিট নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। তারা প্রতি বছর বাজার দর ঠিক করে সম্পদ-কর আদায় করে। বাংলাদেশে অনুমানের ভিত্তিতে কোনো এলাকার জন্য বাজার দরের ভিত্তিতে, আবার কোনো এলাকার জন্য মৌজার দরের ভিত্তিতে সম্পদ-কর আদায় করা ঠিক হবে না। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়বে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, সম্পদ-কর আরোপ হলে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা, চট্টগ্রামের খুলশী ও আগ্রাবাদের মতো অভিজাত এলাকার উচ্চমূল্যের জমির ওপর কর আদায় বাড়বে। তবে বিপাকে পড়বেন ওইসব করদাতারা, যারা বেশি দামের সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে বা উপহার হিসেবে পাচ্ছেন কিন্তু হাতে নগদ অর্থ নেই। সম্পদ থাকলেই তা থেকে সব সময় আয় হয় না।
এনবিআরের প্রতিবেদন
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পদ-কর আরোপ করা হলে ২০৩৫ অর্থবছরের মধ্যে মোট রাজস্ব আয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান।
বর্তমানে ফ্ল্যাট ও প্লট লেনদেনে একাধিক কর ও ফি প্রযোজ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১.৫ শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটি, ১ শতাংশ নিবন্ধন ফি, ২ শতাংশ পৌরসভা বা ভূমি উন্নয়ন কর, ১ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং বিক্রেতার ওপর মূলধনী মুনাফা কর রয়েছে।
এনবিআরের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সরকারি (মৌজা) মূল্য ও বাস্তব বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। উপহার, উত্তরাধিকার বা ট্রাস্টের মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কর নেই। বর্তমান সারচার্জ আরোপ করা আছে। সম্পদ-কর আরোপ করা হলে সারচার্জ বাতিল করা হবে। করদাতা যত টাকা নিয়মিত কর দেবেন, সেই করের ওপর সারচার্জ আদায় করা হয়। উপহার ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর এবং নিজের কেনা সম্পদের ওপর ‘সম্পদ-কর’ আরোপ হবে। মৌজা দরের বা বাজার দরের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের ওপর সরাসরি সম্পদ-কর আদায় করা যাবে।
আগামী অর্থবছরের জন্য সম্পদ-কর নিয়ে প্রণীত প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী- ৪ থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদে ০.৫০ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটিতে ১ শতাংশ, ২০ থেকে ৫০ কোটিতে ১.৫০ শতাংশ এবং ৫০ কোটির বেশি সম্পদে ২ শতাংশ হারে ‘সম্পদ-কর’ ধার্য করা হবে।
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৯৬ কোটি টাকা সারচার্জ আদায় করেছে এনবিআর। এর আগের দুই অর্থবছরের তথ্য এনবিআর সংরক্ষণ করেনি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৫৩ জন করদাতা ৬৯৫ কোটি ৯৩ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৮৫৪ জন করদাতা ৬২৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯১৯ জন করদাতা ৫৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা সারচার্জ দিয়েছেন। চলতি অর্থবছরে সারচার্জের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
যা বললেন এনবিআর চেয়ারম্যান
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, সারচার্জ খাতে এনবিআরের আদায় সন্তোষজনক না। আইনি মারপ্যাঁচে অনেকের কাছ থেকে সারচার্জ কম আদায় হচ্ছে। সম্পদ-কর আরোপ হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে। আশা করি সম্পদ-কর আরোপ হলে এক অর্থবছরে এনবিআরের আদায় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে।