ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কেমন গেল বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড ১৯ জুন ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি স্কটিশদের হিসাব মেলানোর রাত পুলিসিচকে ঘিরে উদ্বেগ লাল কার্ডের পর বসনিয়ার জালে সুইজারল্যান্ডের গোল উৎসব অসুস্থ মেসির বাবা, গুজব ছড়ানোয় ক্ষুব্ধ পরিবার গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে সুইজারল্যান্ড-বসনিয়া অবশেষে কাটল ভিসা জটিলতা, কানাডায় খেলতে পারবেন ওয়াহি বিশ্বকাপে সহজ ম্যাচ বলে কিছু নেই: ডগলাস সান্তোস বিশ্বকাপে সৌদি আরবের জন্য ভিন্ন নিয়ম পেনাল্টি গোলে চেক প্রজাতন্ত্রকে রুখে দিল দক্ষিণ আফ্রিকা অপ্সরার আন্তর্জাতিক অভিষেক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গিয়ে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা বাদশা গণপিটুনির শিকার তিন ডিবি সদস্য, উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি মেনে নাও, মেসি সেরা: রোনালদো নাজারিও কেইনের প্রেরণা এমবাপ্পে-হালান্ড কুমিল্লায় ধর্ষণকাণ্ড: গ্রেপ্তার শিবির নেতার পক্ষে দাঁড়ানো দুই এপিপির নিয়োগ বাতিল টাঙ্গাইলে প্রতিমন্ত্রী টুকুর নামে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ১ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমার্ধে এগিয়ে চেক প্রজাতন্ত্র টাকার অভাবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত, সহায়তার আবেদন রাজবাড়ীতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ নেইমার ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ সাবেক মন্ত্রী হারুণ অর রশীদ অর নেই কুমিল্লায় মাদক মামলায় কারাবন্দি যুবদলকর্মীর মৃত্যু চুয়াডাঙ্গায় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু হাইতির বিপক্ষে নামার আগে ব্রাজিলকে সুখবর দিল ফিফা ওয়ালটন পিসিবিএ'র রপ্তানি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হলো গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ কনফারেন্স ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, গণপিটুনির শিকার তিন পুলিশ বিশ্বকাপে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার

দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ইসলামী ব্যাংক-সংক্রান্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এস. আলম গ্রুপকে জড়িয়ে উপস্থাপিত বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতিবাদে এস. আলম গ্রুপের বক্তব্য

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১১:০৬ এএম
আপডেট: ১৭ মে ২০২৬, ১১:২৪ এএম
দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ইসলামী ব্যাংক-সংক্রান্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এস. আলম গ্রুপকে জড়িয়ে উপস্থাপিত বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতিবাদে এস. আলম গ্রুপের বক্তব্য
এস. আলম গ্রুপ

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ১১ ও ১২ মে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)-সংক্রান্ত বিষয়ে এস. আলম গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, ইঙ্গিত, বর্ণনা ও সিদ্ধান্তের অবতারণা করা হয়েছে, সেগুলো অনুমাননির্ভর, একপক্ষীয় ও অজ্ঞাত সূত্রনির্ভর।

প্রতিবেদনসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে তথ্য, ব্যক্তিগত অভিমত, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, শ্রুতকথানির্ভর অভিযোগ এবং বহু বছর পর প্রদত্ত কাল্পনিক স্মৃতিনির্ভর বক্তব্যকে একই কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করে একটি পূর্বনির্ধারিত ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ এত গুরুতর অভিযোগ উপস্থাপনের পরও প্রতিবেদনে কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায়, নিরপেক্ষ বিচারিক অনুসন্ধান, নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত ফরেনসিক অডিট রিপোর্ট কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত অনুপস্থিত।

‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘প্রযোজিত বোর্ডসভা’, ‘জোরপূর্বক পদত্যাগ’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘অর্থ পাচার’ ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুতর ও পক্ষপাতমূলক শব্দ ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ­– উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকসহ কোনো আদালত-স্বীকৃত সিদ্ধান্ত, প্রামাণিক নথি বা আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হয়নি। ‘একাধিক সূত্র’, ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা’, ‘ওয়াকিবহাল মহল’ বা অতীতের ঘটনা-সম্পর্কিত ব্যক্তিগত বক্তব্যের নামে বর্ণিত কল্পকাহিনির ওপর ভিত্তি করে ‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘জোরপূর্বক’, ‘অর্থ পাচার’ ইত্যাদি গুরুতর শব্দ ব্যবহার সাংবাদিকতার ন্যূনতম ভারসাম্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কার্যকলাপগুলোর উদ্দেশ্য হতে পারে একটি বিশেষ আবহ তৈরি করা–যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে।

ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন ও তথাকথিত ‘ব্যাংক দখল’ প্রসঙ্গে
দৈনিক প্রথম আলো ইসলামী ব্যাংকের ২০১৭ সালের বোর্ড পুনর্গঠনকে ‘ব্যাংক দখল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও পক্ষপাতদুষ্ট। বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও তদারকি ছাড়া সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ নেই।

যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো ‘অবৈধ দখল’ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে– গত প্রায় এক দশকে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কি সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে? প্রতিবেদনে এর কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই।

প্রতিবেদনে এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে যেন ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক ইচ্ছায় সংঘটিত হয়েছিল। অথচ বাস্তবে সে সময়কার নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কমপ্ল্যায়ান্স-প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের মাধ্যমেই এসব পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রমাণিত।

প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনায় পূর্বে ব্যবহৃত ভাষা ও পরিভাষার তুলনায় বর্তমান উপস্থাপনায় একটি ভিন্ন ব্যাখ্যামূলক অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সে সময় যেসব পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে ‘শান্তিপূর্ণ’ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, পরবর্তীতে একই ঘটনাক্রমকে ভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যাখ্যামূলক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বর্ণনাগত অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। ফলে অতীতের ঘটনাকে বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে পুনর্ব্যাখ্যা করে ভিন্ন অর্থ আরোপ করার এই প্রবণতা প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতা, নিরপেক্ষতা ও উপস্থাপনার ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থা সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনজুড়ে বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা সংস্থা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ‘ডিজিএফআই-প্রযোজিত সভা’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘চাপ প্রয়োগ’ ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করা হলেও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো দালিলিক সংযোগ, লিখিত প্রমাণ, আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন নেই।

কোন সভায় কে উপস্থিত ছিলেন, কে কাকে চিনতেন অথবা কে কোথায় গিয়েছিলেন– এসব পরিস্থিতিভিত্তিক বর্ণনা থেকে অবৈধ ষড়যন্ত্র বা জবরদস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা অগ্রহণযোগ্য এবং পেশাগতভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কথিত আচরণ এবং কোনো বেসরকারি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আইনগত দায় একেবারেই ভিন্ন বিষয়। এই দুই স্বতন্ত্র বিষয়কে একত্রে উপস্থাপন করা নিছক বিভ্রান্তিকর সংমিশ্রণ ছাড়া কিছু নয়।

আরাস্তু খান ও অন্য সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রসঙ্গে
সাবেক চেয়ারম্যান আরাস্তু খানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল– এমন দাবি প্রতিবেদনে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হলেও এর পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ, অডিও, ভিডিও, লিখিত নির্দেশনা বা আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট সময়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল ভিন্নধর্মী।

এ ছাড়া যে ধরনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেমন– জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম ব্যক্তিগতভাবে আরাস্তু খানের বাসায় গিয়ে তাকে ‘স্টেপ ডাউন’ করতে বলেছেন– এ ধরনের আচরণ বা ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের চাপ প্রয়োগের চরিত্র এস. আলম গ্রুপের সম্মানিত চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলমের পরিচিত ব্যক্তিত্ব, করপোরেট আচরণ এবং ব্যবসায়িক কার্যপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যারা তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত, তারা জানেন যে, তিনি এ ধরনের সরাসরি ব্যক্তিগত চাপ প্রয়োগ, কারও ব্যক্তিগত পরিসরে যাওয়া বা করপোরেট শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করার মতো আচরণে সম্পৃক্ত নন।

করপোরেট বাস্তবতায় চেয়ারম্যান, পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পরিবর্তন, মতবিনিময় কিংবা নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। বহু বছর পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা স্পষ্টতই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, পরবর্তী সময়ে দেওয়া বক্তব্যসমূহ যদি পরিস্থিতিগত সুবিধা গ্রহণ বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়ে থাকে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ববর্তী ঘটনাকে প্রমাণিত সত্যে পরিণত করে না। কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য, সমসাময়িক ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ থাকা আবশ্যক, যা আলোচ্য প্রতিবেদনে নেই।

একইভাবে প্রতিবেদনে বিভিন্ন সাবেক কর্মকর্তা বা পরিচালকের ব্যক্তিগত অভিমতকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন সেগুলো আদালত-স্বীকৃত প্রকৃত সত্য নিরূপণ। অথচ এসব বক্তব্যের কোনো স্বাধীন, নথিভিত্তিক বা বিচারিক যাচাই প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।

শেয়ার অধিগ্রহণ ও তথাকথিত ‘গোপন নিয়ন্ত্রণ’ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে আত্মীয়তা, ব্যবসায়িক পরিচিতি বা পূর্বপরিচয়ের ভিত্তিতে ‘একক গোপন নিয়ন্ত্রণ’-এর ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে, অথচ বাংলাদেশের কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিটি নিবন্ধিত কোম্পানি একটি স্বতন্ত্র সত্তা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামাজিক, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক পরিচয় থাকা মানেই সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ একই উৎস থেকে পরিচালিত– এমন উপসংহার আইনসম্মত নয়।

প্রতিবেদনে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো আইনগতভাবে নিবন্ধিত পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা। শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় ও করপোরেট অংশীদারত্ব বিদ্যমান আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হয়েছে।

‘বেনামি’, ‘প্রক্সি’, ‘গোপন নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘একক প্রভাব’-জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হলেও এ বিষয়ে কোনো আদালতের রায়, উপকারভোগী মালিকানা নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে নেই।

বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারকে শুধু চাপ, ভয়ভীতি বা পরিকল্পিত প্রভাবের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; অথচ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত সাধারণত বাজার পরিস্থিতি, মুনাফা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের মতো বহুবিধ বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতে শেয়ার অধিগ্রহণ, পরিচালক মনোনয়ন বা করপোরেট অংশীদারত্বের প্রতিটি ধাপই প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই, নথি দাখিল ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের আওতাভুক্ত। এতসব আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন কার্যক্রমকে পরবর্তীকালে ‘গোপন দখল’ হিসেবে বর্ণনা করা বাস্তবতার অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছু নয়।

একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এস. আলম গ্রুপের ‘নিয়ন্ত্রণে’ ছিল। অথচ তালিকাভুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো, স্পন্সর অনুমোদন, পরিচালক নিয়োগ এবং মালিকানা বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়।

বেনামে শেয়ার ধারণ, গোপন নিয়ন্ত্রণ বা প্রক্সি মালিকানা-সংক্রান্ত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, যা বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন বা কোম্পানি ও সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী এসব বিষয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো ও নিয়ন্ত্রক তদারকির বাইরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা অনুমাননির্ভরভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

প্রতিবেদনে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, ব্যাংকের অডিট কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোসহ সমগ্র নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। বাস্তবে এটি দেশের ব্যাংকিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে অবমূল্যায়নের শামিল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা সম্পর্কেও অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে।

ঋণসুবিধা ও ব্যাংকিং এক্সপোজার প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ঋণসুবিধাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ঋণের পরিমাণই অপরাধের প্রমাণ। অথচ শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, স্টিল, ভোগ্যপণ্য ও বৃহৎ আমদানিনির্ভর ব্যবসায় স্বাভাবিকভাবেই বড় অঙ্কের অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের ঋণ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে অনুমোদিত হয়ে থাকে।

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, পুনঃতফসিল, বিনিয়োগ বা এক্সপোজার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই, অভ্যন্তরীণ কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হয়। এই বহু পদক্ষেপভিত্তিক ও নিয়ন্ত্রিত-প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে একটিমাত্র ব্যবসায়িক গ্রুপকে সমগ্র সিদ্ধান্ত কাঠামোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাবিবর্জিত।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– এসব ঋণ সব সময় নিয়মিত ছিল, যথাযথ ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদিত ছিল এবং জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত গ্রুপটির কোনো ঋণ খেলাপি ছিল না। এই মৌলিক বাস্তবতা প্রতিবেদনে সচেতনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

২.২৫ লাখ কোটি টাকার তথাকথিত ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণ’-সংক্রান্ত উপস্থাপনাও বিভ্রান্তিকর। আমরা আগেও বলেছি যে, গ্রুপের সব ঋণ স্বচ্ছভাবে অডিটেড ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে প্রতিফলিত এবং অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেই গৃহীত। এস. আলম গ্রুপের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী (যেখানে নিরীক্ষকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি কনফার্মেশনের দ্বারা প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত সমর্থন হিসেবে বিদ্যমান), ব্যাংকিং ডকুমেন্টেশন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দাখিলকৃত তথ্যের সঙ্গে উপস্থাপিত এই অতিরঞ্জিত ঋণের পরিমাণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান।

আমরা আরও লক্ষ্য করেছি যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে পরস্পরবিরোধী ঋণের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং তথাকথিত এক্সপোজার উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে যেসব ঋণ বা প্রতিষ্ঠানের নাম এস. আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর সঙ্গে গ্রুপটির প্রত্যক্ষ বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। এ ধরনের যাচাইবিহীন সংখ্যা ও তথ্য উপস্থাপন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর প্রভাব বিস্তারের ভিত্তিহীন অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণ বা বিশেষ অনুমোদন আদায়ের অভিযোগও সম্পূর্ণরূপে উপাখ্যানমূলক। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও বহু পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রকব্যবস্থা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রতিনিধি নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই যোগাযোগকে বেআইনি প্রভাব হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন, যা প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।

বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নির্ধারিত আইন, নীতিমালা, তদারকি ব্যবস্থা, পরিদর্শন কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ ধরনের বহুস্তরীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে কোনো একক ব্যক্তি, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একতরফা প্রভাবাধীন হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতা ও বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যপ্রণালির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

আন্তব্যাংক ডিপোজিট ও তারল্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের অন্যান্য ব্যাংকে ডিপোজিট-সংক্রান্ত বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এসব সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়ম বা পক্ষপাতের প্রমাণ। ব্যাংকিং খাতে লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট এবং স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে আন্তব্যাংক আমানত একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত প্রথা। পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে অতীতের প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বা ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা মূলত মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা ছাড়া কিছু নয়।

বাজার পরিস্থিতি, তারল্য সহায়তা, ইসলামী ব্যাংকিং কাঠামোর ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা এবং স্বল্পমেয়াদি তহবিল বিনিয়োগ/ব্যবহারের নীতিমালার ভিত্তিতে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে সংশ্লিষ্ট সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব প্লেসমেন্টকে অবৈধ বা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছিল কি না।

ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নীতিগত পরিবর্তনের মতো বহুমাত্রিক কারণসমূহ উপেক্ষা করে এককভাবে একটি শিল্পগোষ্ঠীকে ব্যাংক খাতের সব সমস্যার উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

নিয়োগ, পদোন্নতি ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ, পদোন্নতি বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনকে ‘নিজেদের লোক বসানো’ হিসেবে উপস্থাপন করাও বিভ্রান্তিকর। নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা, বিশেষ করে খাতুনগঞ্জ শাখা বা চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিকে নেতিবাচক ইঙ্গিতসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ দেশের বৃহৎ ব্যাংকগুলোতে সম্প্রসারণ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং পরিচালনাগত পুনঃসমন্বয়ের অংশ হিসেবে ব্যাপক নিয়োগ ও দ্রুত পদোন্নতি অস্বাভাবিক নয়।

নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল বা জেলার ব্যক্তিদের নিয়োগকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কেবল অনুমাননির্ভর নয়, বরং বৈষম্যমূলক ইঙ্গিতও বহন করে। কোন কর্মকর্তা বিশেষ অঞ্চল, জেলা বা সামাজিক পটভূমি থেকে এসেছেন– এটি অনিয়ম বা বেআইনি নিয়োগের প্রমাণ হতে পারে না। আঞ্চলিক পরিচয়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা যোগ্যতা ও দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করে।

বাংলাদেশে ব্যাংকসমূহের নিয়োগ কার্যক্রম কঠোর আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার আওতায় পরিচালিত হয় এবং এটি সব ব্যাংকের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। ইসলামী ব্যাংকেও সব সময় প্রবেশনারি অফিসার, সিনিয়র অফিসার বা সমমানের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন যাচাই, লিখিত পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার এবং বোর্ড/কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মতো স্বচ্ছ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য নিম্ন ও উচ্চপদেও ব্যাংকিং আইন, নীতিমালা ও নির্ধারিত কমিটির সুপারিশ অনুসারেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। কোনো বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষে তফসিলি ব্যাংকের নিয়োগ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বা এখতিয়ার নেই।

‘অর্থ পাচার’, ‘টু বিলিয়ন ডলার ম্যান’ ও অন্যান্য অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ‘অর্থ পাচার’, ‘বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার’, ‘টু বিলিয়ন ডলার ম্যান’ ইত্যাদি চাঞ্চল্যকর শব্দ ব্যবহার করা হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো আদালতের দণ্ডাদেশ, তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। সংবাদমাধ্যম কোনো আদালত নয়, এবং চাঞ্চল্যকর শব্দ কোনো অভিযোগকে বিচারিক সত্যে পরিণত করে না।

প্রতিবেদনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থ পাচারের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এস. আলম গ্রুপের প্রতিটি বৈদেশিক লেনদেন এবং ঋণপত্র (LC) দেশের প্রচলিত আইন, বিধিবিধান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের AML ডিউ ডিলিজেন্স-প্রক্রিয়ার আওতায় সম্পন্ন হয়েছে। এস. আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ পাচারের অভিযোগ কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিতও নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সুস্পষ্ট ব্যাংকিং কমপ্লায়েন্স এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়।

এর আগেও বিভিন্ন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল– তার পরিপ্রেক্ষিতে যখন বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে প্রমাণাদি তলব করে, তখন তারা বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থাগুলোর সহায়তা লাভের জন্য বারবার প্রচেষ্টা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত তা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। সেই পর্যায়েই এটি প্রমাণিত হয়ে যায় যে, এই প্রচারণার পেছনে কোনো অসৎ বা দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য নিহিত ছিল।

ইসলামী ব্যাংকের নিট মুনাফা-সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের তুলনামূলক নিট মুনাফার যে পার্থক্য বা পরিবর্তনের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে, তা প্রসঙ্গচ্যুত ও বিভ্রান্তিকর। মুনাফা তুলনার ক্ষেত্রে এককালীন প্রভিশনিং, হিসাবনীতি পরিবর্তন, IFRS সমন্বয়, ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন, জোরপূর্বক ঋণ শ্রেণিবদ্ধকরণ এবং পুনর্গঠিত ব্যালেন্সশিটের প্রভাবকে বিবেচনায় না নিয়ে সরলভাবে তুলনা করা বাস্তব অর্থনৈতিক চিত্রকে বিকৃত করে। তা ছাড়া যেমনটি আমরা আগেই উল্লেখ করেছি– বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের কতিপয় অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকর্তার সহায়তায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে; তারা চাপের মুখে অধিকাংশ বিনিয়োগ বা ঋণকে নন-পারফর্মিং লোন’ (NPL)-এ পরিণত করেছে, যার ফলে দেশের অন্যতম শক্তিশালী এই ব্যাংকটি এমন শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

এ ধরনের উপস্থাপনা পাঠকের মধ্যে কৃত্রিম নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, যা আর্থিক বিশ্লেষণের ন্যূনতম পদ্ধতিগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)-সংক্রান্ত ঘটনাবলি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন কোনো বেআইনি, জোরপূর্বক বা রাষ্ট্রীয় প্রভাবনির্ভর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল। বিশেষত ‘ডিজিএফআই কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া’, ‘পদত্যাগে বাধ্য করা’, ‘চাপ প্রয়োগ’, ‘সরাসরি উপস্থিতি’ ইত্যাদি অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলক। এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য দলিলভিত্তিক প্রমাণ বা ঘটনাকালীন নথিপত্র, আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়নি।

বরং পুরো বিবরণটি মূলত ‘একাধিক সূত্র’, ‘সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা’, ‘ওয়াকিবহাল ব্যক্তি’ কিংবা বহু বছর পর প্রদত্ত ধারা বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। কোনো প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের শ্রুতনির্ভর অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার মৌলিক যাচাই মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মালিকানা বা পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন বা পরিচালক পরিবর্তন প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এবং অন্যান্য বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার আওতায় সম্পন্ন হয়। যদি বাস্তবিকভাবে কোনো বেআইনি অধিগ্রহণ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে সে বিষয়ে কোনো আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ও নির্ধারিত সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না– প্রতিবেদনে তার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।

ব্যাংক খাতের সংকট ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে এমন ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে, যেন দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক সংকটের প্রধান বা একমাত্র কারণ একটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠী। বাস্তবে ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট, ডলারসংকট, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের অস্থিরতা, আমদানি-চাপ, নীতিগত কঠোরতা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জসহ বহুমাত্রিক কারণসমূহ দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান।

খেলাপি ঋণ, মুনাফা হ্রাস বা তারল্যসংকট– এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে একক কোনো গোষ্ঠীর ওপর দায় চাপানো বাস্তবতাবর্জিত এবং বিভ্রান্তিকর।

রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ও পূর্বনির্ধারিত আখ্যান
প্রতিবেদনজুড়ে ‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা’ ইত্যাদি রাজনৈতিক অভিঘাতসম্পন্ন শব্দের পুনরাবৃত্ত ব্যবহার স্পষ্টভাবে ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর ইঙ্গিত বহন করে। কোনো ব্যক্তি বা শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ছবি থাকা কিংবা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকা বেআইনি সম্পর্কের প্রমাণ নয়।

এস. আলম গ্রুপ ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, ভোগ্যপণ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান খাতে অবদান রেখে আসছে এবং বিগত সব রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এই ব্যবসা পরিচালনা করেছে। এসব বাস্তব অবদান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শুধু নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত করে ধারাবাহিক ন্যারেটিভ তৈরি করা বাস্তবতার বিকৃতি।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আলোচ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে অভিযোগ, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, অজ্ঞাত সূত্রনির্ভর বয়ান এবং পরবর্তীকালের ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে তথ্যের নির্ভুলতা, যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতার বাধ্যবাধকতাও সমানভাবে প্রযোজ্য।

এস. আলম গ্রুপ সব সময় দেশের আইন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং প্রক্রিয়াগত কমপ্ল্যায়ান্সের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এস. আলম গ্রুপ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে দেশের ব্যাংকিং খাত-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগের বিচার হবে আদালত, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে– বেনামি সূত্রনির্ভর মিডিয়া বয়ানের মাধ্যমে নয়। সংবাদপত্রের দায়িত্ব হলো বস্তুনিষ্ঠ, যাচাইযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা; কোনো পক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যানের বাহক হওয়া, পর্দার আড়ালের অযাচাইকৃত বর্ণনাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা অভিযোগকে বিচারিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আলোচ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে একই সঙ্গে অভিযোগকারী, বিশ্লেষক, সাক্ষী ও সিদ্ধান্ত প্রদানকারীর ভূমিকা সংবাদমাধ্যম নিজেই গ্রহণ করেছে। অথচ কোনো বিষয়ে তদন্তাধীন তথ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যক্তিগত অভিযোগ ও অসমর্থিত ধারণাকে একত্রে উপস্থাপন করে সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে কার্যত ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ প্রদান সংবাদমাধ্যমের স্বাভাবিক সীমারেখা অতিক্রম করে।

আমরা আশা করি, দৈনিক প্রথম আলো এস. আলম গ্রুপ বা এর চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম-সম্পর্কিত অসত্য, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর অংশসমূহ অবিলম্বে সংশোধন বা প্রত্যাহার করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ, যাচাইযোগ্য ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা নিশ্চিত করবে।

অন্যথায় এস. আলম গ্রুপ তার আইনগত অধিকার সংরক্ষণপূর্বক প্রযোজ্য আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। –এস. আলম গ্রুপ

পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের
রাজশাহীর কসাই রিপন আলীর সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার শিং ও মাথার খুলি দিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। ছবি: সংগৃহীত

পেশায় তিনি কসাই। প্রতিদিন পশু জবাই ও মাংস বিক্রিই তার কাজ। কিন্তু এই পেশার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক ভিন্ন জগতের সন্ধান। অন্যরা যেখানে পশুর মাথা ও শিংকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেন, সেখানে রাজশাহীর রিপন আলী সেগুলোকে রূপ দিচ্ছেন দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্মে। গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার পরিত্যক্ত মাথা সংগ্রহ করে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তৈরি করছেন ব্যতিক্রমী শোপিস, যা এখন দর্শনার্থীদের কৌতূহল ও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

৪০ বছর বয়সী রিপন আলী রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকার বাসিন্দা। গত এক দশক ধরে তিনি এই ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তার সংগ্রহে শতাধিক নান্দনিক শোপিস জমা হয়েছে। বাড়ির একটি কক্ষজুড়ে সাজিয়ে রেখেছেন এসব শিল্পকর্ম। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ তার এই সংগ্রহ দেখতে ভিড় করছেন।

রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রথমে কৌতূহল থেকে দেখতে এসেছিলাম। এখানে এসে আমি সত্যিই মুগ্ধ। সাধারণত যেসব জিনিস আমরা বর্জ্য হিসেবে দেখি, সেগুলোকে এত সুন্দর ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা কল্পনাও করিনি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংগ্রহের ছবি দেখে এখানে এসেছি। কাছ থেকে দেখে আরও ভালো লাগছে। প্রতিটি শোপিসের পেছনে যে শ্রম, ধৈর্য ও মেধা রয়েছে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। একজন কসাইয়ের হাতে এমন ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’

জানা গেছে, রিপনের এই শিল্পযাত্রার শুরুটা হয়েছিল একেবারেই সাধারণ একটি ঘটনা থেকে। কসাইপট্টিতে কাজ করার সময় একটি বড় মহিষের শিং তার নজর কাড়ে। শিংটির সৌন্দর্য দেখে তিনি ভাবেন- এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান।

প্রথমদিকে কাজটি সহজ ছিল না। পশুর মাথা সংরক্ষণ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখার কোনো কার্যকর পদ্ধতি তার জানা ছিল না। এ বিষয়ে জানতে তিনি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি। এরপর নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। বছরের পর বছর চেষ্টা, ব্যর্থতার পর তিনি একটি কৌশল বের করেন। এই কৌশলের ফলে পশুর মাথা ও শিং দীর্ঘদিন পচনমুক্ত রেখে শৈল্পিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।

রিপন জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে এই কাজ শুরু করেন। তবে সব ধরনের পশুর মাথা তিনি সংগ্রহ করেন না। যেসব পশুর শিং বা মাথার গঠন দেখতে আকর্ষণীয় ও নান্দনিক, সেগুলোই বেছে নেন। পরে সেগুলো পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও শৈল্পিক উপস্থাপনের মাধ্যমে শোপিসে রূপ দেন।

এই কাজে তাকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। পশুর হাড় ও মাথা সংগ্রহ করে বাড়িতে রাখার কারণে একসময় পরিবার ও প্রতিবেশীদের সমালোচনা শুনতে হয়। দুর্গন্ধ ও অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেকে তাকে নিরুৎসাহিতও করেছিলেন। বর্তমানে পরিস্থিতি  বদলে গেছে। একসময় যারা তার এই কাজকে অদ্ভুত ভাবতেন, তারাই এখন প্রশংসা করছেন। এই শিল্পকর্মের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও অনেকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

রিপন আলী বলেন, আমি শুধু বাজার থেকে সংগ্রহ করা গৃহপালিত পশুর মাথা ও শিং ব্যবহার করি। কোনো সংরক্ষিত বা বন্যপ্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করি না। আমার বিশ্বাস, গৃহপালিত পশুর হাড় ও শিং দিয়ে তৈরি নান্দনিক শোপিস জনপ্রিয় হলে বন্যপ্রাণীর অঙ্গ দিয়ে ঘর সাজানোর প্রবণতা কমবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উদ্যোগ একদিন ক্ষুদ্র শিল্পে পরিণত হবে।

ছড়িয়ে পড়ছে এইডস: আক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
ছড়িয়ে পড়ছে এইডস: আক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইডস রোগী, বাড়ছে মৃত্যু। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একসময়ে এইচআইভি সংক্রমণ নগর ও শহরকেন্দ্রিক ছিল। এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে জেলা পর্যায়েও। এইডসে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন নতুন করে এইচআইভি সংক্রমণ কমছে, এইডসে মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। তবে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চলতি বছর জেলা পর্যায়ে সমকামী তরুণদের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নজরে আসে সংশ্লিষ্টদের। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ (এসটিডি) কন্ট্রোল প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ১ হাজার ৪৩৮ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৯১ জনে, যা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ২০২৫ সালে এইডসে ২৫৪ জন মারা যান। অন্যদিকে চলতি বছরও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সময়েই আক্রান্তের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। সংক্রমিতদের বড় অংশের বসবাস ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের হার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে নতুন শনাক্তদের মধ্যে অবিবাহিতদের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই শ্রেণিতে সংক্রমণের হার ১০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এই হার চলতি বছরে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্ক, পর্যাপ্ত পরীক্ষা সুবিধার সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। অনেক মানুষ এখনো স্বেচ্ছায় এইচআইভি পরীক্ষা করাতে চান না। অন্যদিকে বিদেশগামী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, যা সংক্রমণ শনাক্তকরণকে আরও কঠিন করে তুলছে। খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যেও দেখা গেছে এইডস সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র। 

প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইডস সংক্রমণ। চলতি বছরের সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি এইডস এইচটিসি (এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং)/ এআরটি (অ্যান্ট্রি রিট্রোভাইরাল থেরাপি) সেন্টার। আর গত মে মাসে এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে জেলায় ৩৮৫ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গত মাসের শেষ দিকে জেলার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে তিন হাজারের বেশি মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে ২০ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ জনই উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। 

এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর জসিম উদ্দিন জানান, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই এইচএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বয়স ১৭ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বরিশালে এসে তারা পড়াশোনা বা বসবাস করছেন।

সিলেট ব্যুরোপ্রধান জানান, জেলায় চলতি বছর ২২ জন এইডস আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, সিলেটে ২০২৪ সালে ৩১ জন, ২০২৫ সালে ৬৬ জন এবং ২০২৬ সালের মে মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত ২২ জন এইডস আক্রান্ত হয়েছেন। এটা সেনসেটিভ বিষয় তাই কারণ বলা যাবে না। সিলেটে রোগীদের অ্যান্টিভাইরাল ট্রিটমেট দেওয়া হয়। এইডস আক্রান্ত কেউ হাসপাতালে ভর্তি নেই।

যশোরের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ জন এইচআইভি সংক্রমিত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী। এর মধ্যে ৯ জন তরুণ শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে সংক্রমিত ও আক্রান্ত হওয়া ৪৫ জনের মধ্যে ২৫ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো–আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ জনই শিক্ষার্থী। যেখানে ২০২৪ সালে মোট আক্রান্ত ২৫ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিলেন ১২ জন।

রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান জানান, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (সিএস) ডা. বায়েজীদ-উল ইসলাম বলেন, জেলায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১ হাজার ২১৯ জনের স্ক্রিনিং করে ৩৪ জন এইচআইভি পজিটিভ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ ও ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের। এর মধ্যে পুরুষ ৩১ জনের মধ্যে ৬ জন বিবাহিত ও বাকি ২৫ জন অবিবাহিত। বয়সের হিসাবে ৯ জন ২৫ বছরের নিচে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস (এইচটিসি) সেন্টার থেকে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২৪৮ জন এইচআইভি সংক্রমিতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৪৩ জন, ২০২৫ সালে ৩৮ জন ও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১৮ জনের শরীরে এইচআইভি ধরা পড়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। বাকিরা নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরসহ আশপাশের জেলার বাসিন্দা। 

ময়মনসিংহ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. আবদুল আল মামুন বলেন, এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সমকামী পুরুষ। তাদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, যাদের বেশির ভাগই মেসে থেকে পড়াশোনা করেন। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এইচআইভি সংক্রমণের বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে অরক্ষিত যৌন মিলনের কারণে। এইচআইভিতে আক্রান্ত পুরুষের মাধ্যমে স্ত্রীও আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমিত বাচ্চারও জন্ম হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এইডসে প্রথম মারা যান ২০০০ সালে। বর্তমানে দেশে অনুমিত এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন, তবে এখনো ২৬ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের চিত্রও উদ্বেগজনক। শনাক্ত সংক্রমিতদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী, ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং ৬ শতাংশ শিরায় মাদক গ্রহণকারী। নারী যৌনকর্মী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ১ শতাংশ করে। বাকি ২২ শতাংশ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের সবচেয়ে বড় অংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। মোট আক্রান্তের ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের হার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের উপস্থিতি রয়েছে। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এদিকে এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন (এএইচএফ) জানিয়েছে, দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি পরীক্ষা চালানো যাচ্ছে না। ফলে দেশের বড় একটি অংশ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আবার শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ চিকিৎসা গ্রহণ করছেন না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এইচআইভি এমন একটি ভাইরাস, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ে অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম (এইডস) দেখা দেয়। বর্তমানে এই রোগের কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই। তবে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) ব্যবহারের মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমনের পর তাদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের বিস্তৃতি দেখা গেছে। তারা যেহেতু আমাদের দেশে রয়েছে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও অসামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণ বিস্তারের ঘটনা ঘটে।’

তিনি বলেন, আগে দেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার সামাজিক লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্যের ভয়ে অনেকেই পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী থাকেন। ফলে সংক্রমণ অজান্তেই আরও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

একসময়ে এইচআইভি সংক্রমণ প্রধানত বড় শহরকেন্দ্রিক থাকলেও এখন তা জেলা ও প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কেবল চিকিৎসা নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই বিশেষজ্ঞ।

নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়
নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি কেটে জলাশয়ে পরিণত করেছেন ঠিকাদারের লোকজন। ছবি: খবরের কাগজ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পদ্মা সেতুর রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলারের নিচে থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছেন ঠিকাদার। পিলারের নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লক তুলে ফেলা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে মাটি কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মাটি কাটায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত পদ্মা রেলসেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোর। প্রকল্পটির প্রধান নির্মাতা চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। তবে বাংলাদেশের সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে রিংটেক লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান আলীগঞ্জ ভায়াডাক্ট (উড়াল সেতু) নির্মাণে যুক্ত ছিল। দুটি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো তারা প্রকল্পের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে যাচ্ছে। এমনকি বিক্রি থেকে বাদ যায়নি মাটিও।

গতকাল মঙ্গলবার আলীগঞ্জ উড়াল সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কাটার কারণে রেললাইনের সংযোগ সেতুর পাঁচটি পিলারের নিচের দুই পাশে মাটি নেই। রেললাইনের ৮৫ নম্বর পিলার থেকে শুরু করে ৮৯ নম্বর পিলার পর্যন্ত পিলারের প্রায় ১৭৫ মিটার এলাকাজুড়ে গভীর করে মাটি কাটায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকগুলো তুলে ওপরে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে পদ্মা সেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুর পিলারের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রতিবাদ জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে স্থানীয় একটি ইটভাটার মালিক পরিচয়ে পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে ট্রাকভর্তি করে দাপা এলাকায় নিয়ে গেছে। এলাকাবাসী বাধা দিলে ইটভাটার মালিক কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার এবং ফতুল্লা শ্রমিক লীগ নেতা আবু বক্কর তা মানেননি, বরং রেলসেতুর পিলারের পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকও তুলে ফেলা হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে চলাচলের রাস্তাও। মেম্বার এলাকাবাসীকে জানিয়েছেন, ঠিকাদারের কাছ থেকে তার ভাটার জন্য তিনি মাটি কিনেছেন। পরে মাটি কাটার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের লোকজন মাটি কাটা বন্ধ করে দেন। তবে মাটি ফেরত এনে খনন করা গর্ত ভরাট করা না হলে রেল চলাচলের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। 

ভিডিও দেখে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওইখানে রেলওয়ের লোকজনসহ ঠিকাদারদের মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলার রক্ষার পরবর্তী কাজ করবে রেল কর্তৃপক্ষ।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাটি কাটার কোন বৈধ অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রায়হান কবির। তিনি খবরের কাগজে বলেন, মাটি কাটার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে নথিপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তাদের মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন তাই মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি গর্ত ভরাটে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

মুঠোফোনে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, রেলওয়ে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মাটি কাটার অনুমতি দেয় না। যারা মাটি কেটেছে তাদের মাটি নেওয়ার চুক্তিও নেই। তাদেরকে মাটি অপসারণের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদনহীন মাটি কাটার বিষয়ে ইতোমধ্যে রেলওয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত কমিটিই পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি
ছবি: সংগৃীহত

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ছে ব্রহ্মপুত্র নদ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ মেয়াদে এই নদে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অববাহিকা এলাকায় খরার তীব্রতা যেমন বাড়বে, তেমনি হুমকির মুখে পড়বে নদীর পরিবেশগত প্রবাহ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) একদল গবেষক এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জে চলতি বছর তাদের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জারিন তাসনিম ও এ কে এম সাইফুল ইসলাম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন ইন্দ্রনীল সরকার, মো. সাইদুজ্জামান, খন্দকার এম অনিক রহমান, মোহাম্মদ আসাদ হোসেন এবং মো. সাদমান সাকিব। গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের অর্থায়নে ‘ইনহ্যান্সিং কোস্টাল রেজিলিয়েন্স থ্রু নেচার-বেজড সলিউশনস’ প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দূরপাল্লার পূর্বাভাস
গবেষণায় সিএমআইপি-৬ ক্লাইমেট প্রজেকশন (গ্লোবাল ক্লাইমেট মডেল) এবং সয়েল অ্যান্ড ওয়াটার অ্যাসেসমেন্ট টুল–‘স্যাট’ নামক হাইড্রোলজিক্যাল মডেল ব্যবহার করে ব্রহ্মপুত্র নদের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, ২০৪০ থেকে ২০৬৯ সময়কালে নদে পানির প্রবাহ সামান্য বাড়তে পারে। তবে ২০৭০ সাল থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সময়ে পানির প্রবাহ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

স্টান্ডার্ডাইজড ডিসচার্জ ইনডেক্স বিশ্লেষণ বলছে, ভবিষ্যতে এই অববাহিকায় শুষ্ক ও আর্দ্র চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ বাড়বে। বিশেষ করে দূর ভবিষ্যতে খরার তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা অনেক বেশি হবে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

নদীর স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরি ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’ নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি মডেল এসএসপি৩-৭.০ অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতেই নদীর প্রবাহ প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানির প্রবাহের এই নিম্নমুখী প্রবণতা জলজ প্রাণীর প্রজনন ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা জানান, ব্রহ্মপুত্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তসীমান্ত নদ, যা বাংলাদেশসহ চারটি দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় গবেষকদের পরামর্শ হলো অবিলম্বে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কংক্রিটের জঙ্গলে জলবায়ু ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের মরণফাঁদে থাকা বাংলাদেশের শহরগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় কেবল কংক্রিটের স্থাপনা আর যথেষ্ট নয়। এর বদলে শহর গড়ার পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণে ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান’ গ্রহণের বিকল্প নেই বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) এক নতুন প্রতিবেদনে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘কম্পেনডিয়াম অন নেচার-বেজড সলিউশনস ফর আরবান রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রথাগত উন্নয়নের চেয়ে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে নেওয়া অবকাঠামোই ভবিষ্যতে শহরগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে যেমন তীব্র তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে পানিসংকটের মতো সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত ‘ধূসর’ বা কৃত্রিম অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে খরা
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ খরা এখন কেবল স্থানীয় সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা কর্মসূচি-ক্লেয়ার প্রোগ্রামের অধীনে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ও অভিযোজনমূলক কার্যক্রম নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আজ ১৭ জুন ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এশিয়া ও আফ্রিকার খরাপ্রবণ অঞ্চলের পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্ব এমন সব খরার মুখোমুখি হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ভারত, নেপাল, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়াসহ আফ্রিকার ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলের দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। এই খরা কেবল ফসলের ক্ষতিই করছে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংকট, জনবসতির স্থানচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক সংঘাত খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলছে।

এই প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, খরা মোকাবিলায় কেবল প্রযুক্তি বা অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পানির ন্যায্য বণ্টন। খরাপ্রবণ দেশগুলোকে জলবায়ু বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ সংকুলান রাখার পরামর্শও দিয়েছে ক্লেয়ার

শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি
ছবি: সংগৃহীত

খেলার মাঠের হইহুল্লোড় কিংবা বইয়ের পাতার ঘ্রাণ–শৈশবের এই চিরচেনা অনুষঙ্গগুলো এখন অনেকটাই ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের শৈশব এখন বন্দি হয়ে পড়েছে স্মার্টফোনের নীল আলোর স্ক্রিনে। ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল জৌলুশে বুঁদ হয়ে থাকা এই প্রজন্ম কেবল শারীরিক সক্ষমতাই হারাচ্ছে না, বরং জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা ভয়াবহ অপরাধ ও মানসিক অস্থিরতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই লাগামহীন ব্যবহার কোমলমতি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে ডেকে আনছে এক মারাত্মক বিপর্যয়। 

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে এখন নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন ও চীনের মতো দেশগুলোও নিয়েছে একই পথ। বিশ্বের প্রায় ৭৯টি দেশে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। 

স্ক্রিনে বন্দি শৈশব ও মানসিক অবক্ষয়
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম শিশুদের মধ্যে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তিবোধের এমন এক আসক্তি তৈরি করছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাস্তব জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়া এই শিশুরা ক্রমেই সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানির শিকার। অথচ প্রযুক্তির এই অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা রূপ নিচ্ছে সামাজিক ব্যাধিতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের সাইকোলজিক্যাল ও সাইকো-সোশ্যাল সমস্যা হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে।’

নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে শিশুদের বিপথগামী হওয়ার বিভিন্ন উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অল্প বয়সে বিয়ের মতো ঘটনা বাড়ছে, যা পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচয় হওয়ার সূত্র ধরেই এমন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

কিশোর গ্যাং: স্মার্টফোনের অন্ধকার অধ্যায়
প্রযুক্তির আশীর্বাদের আড়ালে ডালপালা মেলছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। অপরাধের নীল নকশা তৈরি, সদস্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া–সবকিছুর মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। র‌্যাবের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে প্রায় ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টিকটক ব্যবহার করেই তারা অপরাধের যাবতীয় সমন্বয় করত। টিকটক বা ফেসবুকে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা অনেক মেধাবী কিশোরকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অপরাধের পথে।

বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আইন, বিপিডিএ বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আলোকে আমরা সাইবার বুলিং মোকাবিলায় গুরুত্ব দিচ্ছি। যদি সরকার ভবিষ্যতে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজনীয়তা মনে করে, তবে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন নীতিমালা তৈরির সুযোগ রয়েছে। আইসিটি বিভাগ এবং ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএ) তখন সে অনুযায়ী কাজ করবে।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে (আইসিটি বিভাগ) এখনো এ বিষয়ে কোনো কিছুই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। হয়তো এই বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে।’

ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং ও আইনি সুরক্ষা
অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্ল্যাকমেইলিং ও যৌন হয়রানির ঘটনা এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সরকার ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি ও রিভেঞ্জ পর্নো ছড়ানোর মতো অপরাধের শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করেছে।

তবে আইনি প্রতিকারের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম মনে করেন, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় রেস্ট্রিকশন আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।

একক নয়, সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ
ইউনিসেফ এবং সরকারের যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনলাইন সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্সের আওতায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শিশুকে সনদ প্রদান করা হয়েছে। তবে পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ইউনিটে গত ৬ বছরে ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সাইবার সহিংসতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। শিশুদের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক বন্ধনের যথাযথ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সম্প্রতি শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার সময় এমন মতামত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুদের অপরাধ প্রবণতার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কোনো একটি কারণকে কেন্দ্র করে এর সমাধান সম্ভব নয়। এটি অনেক উপাদানের একটি অংশ মাত্র।’

অধ্যাপক মাহবুবা সুলতানা মনে করেন, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। এ দেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রেই যৌথ পরিবারব্যবস্থা বিদ্যমান এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বেশ সক্রিয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো পিয়ার গ্রুপ এবং আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এই সামাজিক কাঠামো ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে যেকোনো প্রযুক্তি বা মাধ্যমকে পজিটিভলি কাজে লাগানো সম্ভব। এসব কারণেই অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট অনেকটাই মিনিমাইজ করা সম্ভব হয়।’

তবে এ বিষয়ে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অন্য দেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট হুবহু মিলবে না। এ জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে সময় সাপেক্ষে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কনটেক্সট ভিন্ন হওয়ায় শিশুদের এই সংকট মোকাবিলায় কোনো একমুখী চিন্তার সুযোগ নেই বলেও মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট 
শিশু ও কিশোরদের ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ফেসবুক, টিকটকসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং এসব প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করতে যাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরী। আগামী রবিবার লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের পক্ষে তিনি এই রিট আবেদন করবেন। এতে বিবাদী করা হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি)।