ফসলি জমির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে অন্তত ১৫ ফুট উঁচু একটি বেড়িবাঁধ। বাঁধটি এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিস্তৃত। জমির মালিকদের বলা হয়েছিল, এখানে মাছ চাষ করা হবে। এ কথা বলে তাদের কাছ থেকে জমি ইজারা নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১০০ একর জমি বাঁধ দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে।
- সাতকানিয়ায় ১০০ একর ফসলি জমি ঘিরে গভীরভাবে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।
- স্থানীয়রা আওয়ামী লীগ নেতা বাবর আহমদ বাবুর বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও অবৈধ মাটি কাটার অভিযোগ করেছেন।
- হাইকোর্টের নির্দেশের পরও মাটি কাটা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
কয়েক বছর ধরে সেখানে দেদার চলছে উর্বর জমির মাটি কাটার উৎসব। কোনো কোনো জমি ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত গভীর করে কেটে নেওয়া হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলার মৌলভীর দোকান থেকে সাতকানিয়া বাজার পর্যন্ত এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।
এটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পশ্চিম পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। এভাবে প্রতিনিয়ত পরিবেশ ধ্বংস করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ চুপ রয়েছে। স্থানীয়রাও এই বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে সন্ধ্যা নামলেই সেখান থেকে সারিবদ্ধভাবে ডাম্প ট্রাক বের হতে দেখা যায়। কেঁওচিয়াসহ আশপাশের ফসলি জমি থেকে এই ট্রাকগুলো আসে। ট্রাকের হেডলাইটের আলোয় পুরো বিল আলোকিত হয়ে যায়। প্রতিটি ট্রাকে করে ফসলি জমির উর্বর মাটি নিয়ে যাওয়া হয় ইটভাটায়।
সরেজমিন পরিদর্শন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাতকানিয়া উপজেলায় মহাসড়কের দুই পাশে অসংখ্য ইটভাটা রয়েছে। মাত্র এক বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যেই অন্তত ৮ থেকে ১০টি ইটভাটা দেখা যায়। এর ফলে আশপাশের টিলা ও উঁচু জমির মাটি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এমনকি মাটিখেকোরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের পাশের মাটিও কেটে বিক্রি করে দিয়েছে। তাদের সর্বশেষ লক্ষ্য এখন ফসলি জমি।
২০১৬ সালে মহাসড়কের পাশে কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ১০০ একর জমির ওপর হঠাৎ একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধটি নির্মাণ করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির সদস্য বাবর আহমদ বাবু। তিনি মৎস্য চাষের কথা বলে কিছু জমির মালিকের কাছ থেকে জমি ইজারা নেন। প্রথম এক-দুই বছর তিনি ইজারার টাকা দিয়েছিলেন। এরপর আর কাউকে কোনো টাকা দেননি। আবার যারা তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হননি, তাদের অনেকের জমিও এই বাঁধের ভেতরে পড়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাবর আহমদ বাবু প্রথমে এলাকায় ইটভাটার মালিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইটভাটায় মাটির ব্যাপক চাহিদা দেখে তিনি মাটির ব্যবসায় নামেন। প্রথমে ছোট পরিসরে কাজ শুরু করলেও পরে তার কার্যক্রম বিশাল আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে সেখানকার সম্পূর্ণ মাটির ব্যবসা তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ইটভাটার মালিকরা তার কাছ থেকে মাটি কিনতে বাধ্য হতেন। এভাবে তিনি ওই অঞ্চলের মাটির রাজা হয়ে ওঠেন।
মাটি কাটার কৌশল
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে তার মাটি কাটার কৌশল জানা গেছে। সাধারণ কৃষকরা তাদের ফসলি জমির মাটি বিক্রি করতে চান না। এই পরিস্থিতিতে বাবু পাশের একটি জমি চড়া দামে কিনে নেন। তারপর সেই জমিতে বিরাট গর্ত তৈরি করেন। ওই গর্তের কারণে আশপাশের জমির পানি সরে যায় এবং জমি শুকিয়ে যায়। বর্ষাকালে সেসব জমিতে ভাঙন শুরু হয়। এর ফলে কৃষকদের পক্ষে চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত কৃষকরা বাধ্য হয়ে বাবুর কাছে মাটি বিক্রি করেন। কারণ জমি নিচু না করলে সেখানে আর চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না।
তার দ্বিতীয় কৌশলটি আরও বেশি ভয়াবহ। তিনি রাতের আঁধারে মানুষের জমির মাটি কেটে নিয়ে যান। পরদিন জমির মালিক অভিযোগ করতে গেলে বলা হয়, শ্রমিকরা ভুল করে মাটি কেটে ফেলেছেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে বলে মাটির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। এভাবেই একের পর এক ফসলি জমি ধ্বংস করা হয়েছে।
মাটি লুটের কারণে রসুলাবাদ এলাকার একসময়ের তিন ফসলি কৃষিজমিগুলো এখন বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে বাবু ও তার সহযোগীরা একটি বড় অপরাধ করেন। তারা রাতের আঁধারে সরওয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তির ৪০ শতক জমির মাটি লুট করে নিয়ে যান। ওই জমিতে প্রায় ৪৫ ফুট গভীর করে মাটি কাটা হয়।
এ ঘটনার পর সাতকানিয়া পৌরসভার বাসিন্দা সরওয়ার হোসেন অভিযোগ করলে তাকে ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে সরওয়ার হোসেন জানান, তারা তাকে টাকা দেননি। উল্টো তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে এবং তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনজুরুল হক মামলা নেননি।
পরে তিনি ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং মাটি লুটের বিষয়টি তদন্ত করতে চট্টগ্রামের ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
এই অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রামের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান জানান, অভিযোগটি এখনো তার কাছে পৌঁছায়নি। অভিযোগ পেলে তিনি অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। মাটি কেটে পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়টিও তিনি খতিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন।
বাবুর বিরুদ্ধে আগে থেকেই বহু মামলা ও অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারেও ছিলেন। কৃষিজমির মাটি লুট ও বিভিন্ন ইটভাটা থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় ডজন অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা হয়েছে। এসব অভিযোগ থানা, আদালত, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি), পরিবেশ অধিদপ্তর ও পুলিশের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দপ্তরে জমা দেওয়া হয়।
ইটভাটা সমিতি ও এলাকাবাসীর অভিযোগ
সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতিও বাবুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তারা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেয়।
ওই অভিযোগে বলা হয়, বাবু নতুন ইটভাটা স্থাপন ও মাটি কাটার জন্য কৃষকদের অনুমতি ছাড়া ১০০ একর জমিতে জোর করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছেন। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই কৃষিজমি উদ্ধারের দাবি জানায় সমিতি।
এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দা রহিম, মো. ডালিম ও মোক্তার হোসেন নামের আরও তিন ব্যক্তি বাবুর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন। এনবিএম-৪ ব্রিকস নামের একটি ইটভাটার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাকিব নিবিল একটি ঘটনার বিবরণ দেন।
তিনি জানান, বাবুসহ বেশ কয়েকজন মিলে তাদের ইটভাটায় গিয়েছিলেন। সেখানে মালিককে না পেয়ে তারা ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এর পরদিন রাতে তারা আবার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইটভাটায় হামলা চালান। এ সময় তাদের নৈশপ্রহরী মাহাবুবুল আলম বাধা দিলে তাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। হামলায় সাকিব নিবিল নিজেও আহত হন। এই বিষয়ে প্রতিকার পেতে তারা সাতকানিয়া থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু ওসি মামলা নেননি। পরে বাধ্য হয়ে তিনি আদালতে মামলা করেন।
হাইকোর্টের আদেশ
এ বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট ও আদেশও হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মুনাফ কৃষিজমির মাটি কাটা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। ওই রিট আবেদনে বাবর আহমদ বাবুকে ৭ নম্বর বিবাদী করা হয়েছিল। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে বাবুর মালিকানাধীন বিডিআর ব্রিকস নামক ইটভাটার কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন।
আদালতের আদেশের পরও ওই এলাকায় কৃষিজমির মাটি কাটা বন্ধ হয়নি। বিষয়টি আবারও আদালতের নজরে আনা হলে আদালত কঠোর অবস্থান নেন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), সাতকানিয়ার ইউএনও এবং ওসির ওপর আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে তাদের ভার্চুয়ালি আদালতে যুক্ত হওয়ার জন্য তলব করা হয়। এরপর হাইকোর্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। মাটি কেটে যারা কৃষিজমি ধ্বংস করেছে, তাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে বাইরে থেকে পলিমাটি এনে খননকৃত জমিগুলো ভরাট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুরো বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
ঘটনার পর বাবু নিজেও কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিলেন। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিভিন্ন মহলের সঙ্গে নতুন করে সখ্য গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে বাবু আবার তার পুরোনো রূপে ফিরে এসেছেন এবং কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাবর আহমদ বাবু দাবি করেন, তিনি কোনো মাটির ব্যবসা করেন না। কেউ যদি এই কথা বলে থাকে, তবে তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বলেছে। মোবাইলে তিনি এই বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে চাননি।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, তারা দুই মাস আগে ওই বাঁধটি কেটে দিয়েছেন। তবে বাবু নামের কোনো ব্যক্তি বেড়িবাঁধ দিয়ে মাটি কাটছে কি না, তা তার জানা নেই। এরপর কারা মাটি কাটছেন–এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো জবাব না দিয়ে ফোন রেখে দেন।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুরুল হক বলেন, বাবু একসময় মাটির ব্যবসা করতেন। তখন পুলিশ তার এক্সকাভেটর জব্দ করেছিল এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। কিছুদিন আগে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে থানায় এসেছিলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি ওসির সঙ্গে দেখা করেননি। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মামলা রুজু না করার বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি আরও জানান, বাবু এখন কী করেন তা তার জানা নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক মোজাহিদুর রহমান আইনি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ফসলি জমি থেকে কেউ মাটি কাটলে সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তারা কেবল পাহাড় কর্তনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। ফসলি জমি বা সমতল ভূমি থেকে মাটি কাটার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষে অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনারের (ভূমি)। আইনে বিষয়টি এভাবেই নির্ধারণ করা আছে।