চোট লাগলে সাধারণত কেউ খেলা থেকে সরে দাঁড়ায়। কিন্তু ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কিছু সাহসী যোদ্ধা ছিলেন, যারা এক হাতে খেলেই হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি। ভাঙা হাত, স্লিংয়ে ঝোলানো হাত বা আঙুলে ব্যান্ডেজ নিয়েও তারা ব্যাট হাতে নেমেছেন দলের প্রয়োজনে। জয়-পরাজয়ের হিসেব নয়, তাদের এই সাহসিকতাই কোটি কোটি ক্রিকেটভক্তের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে অনেক কাল। তেমনই পাঁচজন ‘এক হাতের যোদ্ধা’কে নিয়ে আজকের এই আয়োজন। যারা নিজেদের যন্ত্রণা ভুলে দেশ ও দলের জন্য হয়ে উঠেছিলেন অনন্য উদাহরণ।
ক্রিস ওকস (ইংল্যান্ড)
স্লিংয়ে ঝুলিয়ে রাখা বাঁ হাত সোয়েটারের ভেতরে ঢেকে রেখেছিলেন ক্রিস ওকস। আরেক হাতে ব্যাট নিয়ে ওভালের মাঠে নামলেন তিনি। ওভালের গ্যালারি ভর্তি দর্শক করতালিতে জানাল অভিবাদন। ভারতের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের এই পেস বোলিং অলরাউন্ডার ম্যাচের প্রথম দিন ফিল্ডিংয়ের সময় বাঁ কাঁধে চোট পান। সে দিনই মাঠ ছাড়তে হয় তাকে।
তবু শেষ দিন দলের প্রয়োজনে এক হাতে ব্যাটিংয়ে নামেন ওকস। তখন ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ১৭ রান, হাতে ১ উইকেট। অপর প্রান্তে ছিলেন গাস অ্যাটকিনসন। আহত ওকসকে স্ট্রাইক না দিয়ে তিনি রান নেওয়ার চেষ্টা করেন। ১৫ মিনিট ক্রিজে থেকে সতীর্থকে সাহায্য করেন ওকস। শেষ পর্যন্ত অ্যাটকিনসন আউট হলে ম্যাচ হারে ইংল্যান্ড। তবে সাহসী ওকস ছিলেন অপরাজিত, শূন্য রানে নট আউট।
তামিম ইকবাল (বাংলাদেশ)
২০১৮ এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল ভীষণ বাজে। মাত্র ১ রানেই ২ উইকেট পড়ে যায়। এ সময় হাতে চোট পেয়ে 'রিটায়ার্ড হার্ট' হয়ে মাঠ ছাড়েন ওপেনার তামিম ইকবাল। অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো তামিম আর খেলতে পারবেন না।
কিন্তু দলের প্রয়োজনে এবং দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধেই মাঠে ফিরলেন তামিম। ব্যাটিংয়ে মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গ দিতে এক হাতে খেলে গেলেন। মুশফিক সেই সময় তুললেন ৩২ রান। বাংলাদেশের স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ২৬১ রানে। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ জয় পায় ১৩৭ রানের ব্যবধানে। তামিম ছিলেন অপরাজিত ২ রানে। ম্যাচসেরা হন ১৪৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা মুশফিক।
গ্রায়েম স্মিথ (দক্ষিণ আফ্রিকা)
২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিডনিতে টেস্ট ম্যাচ বাঁচাতে চোট পাওয়া হাত নিয়েই ব্যাট হাতে নামেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ। ম্যাচে তখন আর মাত্র ৮ ওভার ২ বল বাকি। বাঁ হাতের আঙুল ভেঙে গেলেও দলের বিপর্যয়ে প্যাড পরে মাঠে নামেন তিনি।
মিচেল জনসন ও ডগ বলিঞ্জারের মতো গতিতারকাদের একের পর এক বল ঠেকিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। যখন মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো ম্যাচটি ড্র করেই ফেলবেন, তখন ঠিক ১০ বল বাকি থাকতে জনসনের একটি বল তার ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক দিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। ম্যাচ বাঁচাতে না পারলেও তার সাহসী ইনিংস এখনো ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয়।
ম্যালকম মার্শাল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)
১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেডিংলি টেস্টে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল ভেঙে গিয়েছিল মার্শালের। চিকিৎসকরা বলেছিলেন অন্তত ১০ দিন মাঠের বাইরে থাকতে হবে। কিন্তু দলের প্রয়োজনে তিনি সেই টেস্টেই ব্যাট হাতে নেমে সবাইকে অবাক করেন। তৃতীয় দিনে ৯ উইকেট পড়ে গেলে অপর প্রান্তে থাকা ল্যারি গোমেজের সেঞ্চুরি নিশ্চিত করতে এক হাতে ব্যাটিং করেন মার্শাল। শুধু তাই নয়, একই টেস্টে বোলিং করেও নিয়েছিলেন ৭ উইকেট! তার সাহস আর দৃঢ়তা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই ম্যাচজয়কে আরও গৌরবময় করে তোলে।
সেলিম মালিক (পাকিস্তান)
১৯৮৬ সালে ফয়সালাবাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে সেলিম মালিক এক হাতে ব্যাটিং করে ইতিহাস গড়েন। তার হাত ছিল প্লাস্টারে বাঁধা। তবুও দলের প্রয়োজনে ব্যাট হাতে মাঠে নামেন তিনি। শুরুতে কিছু বল মোকাবিলা করেন বাঁ হাতে, পরে ডান হাতে ব্যাট করেন। তিনি খেলেন মোট ১৪টি বল। সেই ম্যাচে পাকিস্তানের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলআউট হয় মাত্র ৫৩ রানে। দলের হয়ে সাহসিকতার অনন্য নজির স্থাপন করেন সেলিম মালিক।
ক্রিকেট শুধু ব্যাট-বলের খেলা নয়, এটা মনোবলের লড়াইও। একজন খেলোয়াড় কখনো কাঁধে ব্যথা, ভাঙা হাত নিয়েও মাঠে নামেন। তখন সেটা শুধু খেলা নয়, হয়ে ওঠে আত্মত্যাগের প্রতীক। এক হাতে লড়াই করা এই যোদ্ধাদের সাহস ও আত্মনিবেদনই প্রমাণ করে, দেশের জন্য খেলা মানেই হৃদয়ের সবটুকু ঢেলে দেওয়া।
নাঈম/