ঢাকা ৮ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
গোল বাতিল ইরানের, গোলশূন্য প্রথমার্ধ বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড পেলের কীর্তিতে ভাগ বসালেন ইয়ামাল জন্মবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান: সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা সৌদিকে উড়িয়ে দিল স্পেন যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় প্রথম দফার বৈঠক শেষ, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান ডোকুর ‘বিশ্বকাপ ছাড়ার’ সিদ্ধান্তে সমালোচনার ঝড় মালয়েশিয়ায় কারাবন্দি বাংলাদেশিদের মুক্তিতে উদ্যোগের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর প্রথমার্ধে সৌদি আরবের জালে ৩ গোল স্পেনের তীব্র গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি প্রথম গোলেই ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেনের দাফন সম্পন্ন সিংগাইরে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু সুরের মূর্ছনায় বিশ্ব সংগীত দিবস: ঢাকার দুই প্রান্তে সুরের বিভা কুড়িগ্রামে এক বাঘা আইড় ৮৫০০০ অজু করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ মাদরাসাছাত্রের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় দণ্ডিত ৫৯ জন: আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ‘অসত্য’ বক্তব্য, উত্তপ্ত সংসদ স্পেনের শুরুর একাদশে ইয়ামাল সুফিয়া কামাল ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের স্মরণে জবিতে দুই দিনব্যাপী সেমিনার শুরু মানিকগঞ্জে ঝোপে মিলল স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ মালয়েশিয়ায় তারেক রহমান, বাণিজ্য–বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা দিনাজপুরে কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণ ফি ৫ টাকা নির্ধারণের দাবিতে মানববন্ধন চট্টগ্রামে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ শরীয়তপুরে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক আটক স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়: ইসি সচিব বোয়ালমারীতে শতবর্ষী কালী মন্দিরে ভাঙচুর চাঁদাবাজির অভিযোগে সোনারগাঁওয়ের এমপি পুত্র সজীব আটক প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন তারেক রহমান

শীত মৌসুমে দর্শনীয় স্থান

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৪, ১১:২১ এএম
আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৪, ০১:৪০ পিএম
শীত মৌসুমে দর্শনীয় স্থান
নিঝুম দ্বীপে হরিণের দেখা মেলে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে সৌন্দর্য একেক ঋতুতে একেক রকম। তবে পর্যটনের জন্য শীতের সময়টা সবচেয়ে উপযোগী। আর সে কারণে এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। শীতে পর্যটনের কিছু জনপ্রিয় জায়গার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন মোহনা জাহ্নবী

সেন্টমার্টিন

কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার একটি ইউনিয়ন। সাগর পাড়ি দিয়ে এই প্রবাল দ্বীপে যাওয়ার পথ শান্ত থাকে বলে শীতের সময় পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যদিও বছরের অন্য সময়ও অনেক পর্যটক এ দ্বীপে ঘুরতে আসেন। এখানে ঘুরতে গেলে অদূরের ছেঁড়া দ্বীপও ঘুরে আসা যায়। সেন্টমার্টিনে অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে, এ ছাড়া একটি সরকারি ডাকবাংলোও আছে। পর্যটকদের জন্য এ দ্বীপ যথেষ্ট নিরাপদ।

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। ছবি: সংগৃহীত

নিঝুম দ্বীপ

এর অবস্থান নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায়। স্থানীয়ভাবে এ চর ইছামতীর চর হিসেবেও পরিচিত। প্রচুর গাছপালা থাকার সুবাদে এ দ্বীপটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এখানে প্রচুর কেওড়া গাছ আছে। এ ছাড়া এ দ্বীপটি হরিণের অভয়ারণ্যের জন্যও সুপরিচিত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে এ দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের খুব আকর্ষণ করে। এখানে পৌঁছানো কিছুটা ঝক্কির ব্যাপার হলেও এর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য সভ ক্লান্তি দূর করে দেয়। ক্যাম্পিং করার জন্য এ দ্বীপ উপযুক্ত একটা স্থান।

মনপুরা

মনপুরা ভোলা জেলার একটি দ্বীপ উপজেলা। জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ দ্বীপের মাধুর্যতা শীত মৌসুমে আরও বেড়ে যায়। দ্বীপে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করাটা বেশ মনোমুগ্ধকর হয় এই মৌসুমে। এখানে আউশ ও আমন ধানের ফলন হয়। প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। ঘন বনাঞ্চল এবং কিছু দিঘির সন্নিবেশ এ দ্বীপটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নয়নাভিরাম মনপুরা দ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

কুয়াকাটা

এটি পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। কুয়াকাটা সমুদ্রকন্যা হিসেবে পরিচিত। এখানের সমুদ্রতীর থেকে সূযোর্দয় এবং সূর্যাস্ত উভয়ই দেখার সুযোগ রয়েছে বলে এটি অধিক জনপ্রিয়। প্রায় সারা বছরই এখানে পর্যটকের আনাগোনা থাকে। শীত মৌসুমে সমুদ্র তুলনামুলক শান্ত থাকে বলে অনেকে সমুদ্র দেখার জন্য এ মৌসুমটাকেই বেছে নেয়। সমুদ্র ছাড়াও এখানে আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

সাগরকন্যা কুয়াকাটা। ছবি: সংগৃহীত

হাওর

মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ আর সিলেট জেলা নিয়ে গঠিত সিলেট বিভাগ। এসব জেলাজুড়ে রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, শনির হাওর প্রভৃতি। শীত মৌসুমে হাওরগুলোতে অনেক অতিথি পাখির আনাগোনা দেখা যায়। সেসব অতিথি পাখি দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা।

শীত মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে অতিথি পাখির দেখা মেলে। ছবি: সংগৃহীত

বিল

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে বাইক্কা বিল রয়েছে। সেই বিলে প্রতি বছর অনেক অতিথি পাখি আসে।  পাখিদের সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য বিলে তিন তলাবিশিষ্ট একটা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও আছে। সারা বছরই বাইক্কা বিলে পাখি দেখা যায়, তবে শীত মৌসুমে তা যেন পাখিদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়। এ বিলের উল্লেখযোগ্য পাখি হচ্ছে, পানকৌড়ি, রাঙ্গাবক, শঙ্খচিল, ধলাবক, দলপিপি ইত্যাদি। শীত মৌসুমে অনেক পর্যটক এই বাইক্কা বিলে অতিথি পাখি দেখতে আসেন।

বাইক্কা বিলে অতিথি পাখি। ছবি: সংগৃহীত

সাভার

সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকালে অতিথি পাখি দেখার জন্য প্রতি বছর সেখানে অনেকেই ঘুরতে যায়। এ ছাড়া সাভারের বিরুলিয়ার গোলাপ গ্রাম খুব বিখ্যাত। সেখানে শীত মৌসুমে অনেক দর্শনার্থী ঘুরতে যান। বিরুলিয়াতে ১০-১৫ ঘর পুরনো আমলের বাড়িও আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখি। ছবি: সংগৃহীত

মানিকগঞ্জ

ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলা। শহরে থেকে হাঁপিয়ে উঠে অনেকে গ্রামের স্বাদ পেতে সেখানে যায়। শীত মৌসুমে সহজে খেজুর রস খেতে এবং গ্রামের শীত উপভোগ করতে সেখানে ছুটে যায় অনেকে। মানিকগঞ্জে বেশ কিছু পুরনো জমিদার বাড়ি রয়েছে।

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

নেত্রকোনা

শীত মৌসুমে সমুদ্র এবং নদী বিধৌত অঞ্চলে শীত তুলনামূলক কম থাকে। তাই পর্যটকরা এ মৌসুমে এসব অঞ্চলে ছুটে যান। নেত্রকোনা জেলায় রয়েছে সোমেশ্বরী নদী, কমলারানীর দিঘি, বিরিসিরি, চিনামাটির পাহাড় প্রভৃতি স্থান। এ ছাড়া এখানে ডিঙ্গাপোতা নামে একটি হাওরও রয়েছে। সারা বছর পর্যটকের আনাগোনা থাকলেও শীতকালে পর্যটকের আনাগোনা আরও বেড়ে যায়।

চিনামাটির পাহাড়। ছবি: সংগৃহীত

শেরপুর

শেরপুরে রয়েছে ঘোরার জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট গজনী অবকাশ কেন্দ্র। প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এ অবকাশকেন্দ্রে গেলে যেকোনো পর্যটকই মুগ্ধ হবে।

গজনী অবকাশ কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর

পায়রাবন্দ, দেবী চৌধুরানীর রাজবাড়ি, তাজহাট জমিদার বাড়ি- রংপুর গেলে এসব স্থান অবশ্যই ঘুরে আসা উচিত। পায়রাবন্দ হচ্ছে মিঠাপুকুর উপজেলার একটি গ্রাম, যেখানে মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার সম্মানার্থে পায়রাবন্দ গ্রামে ৩.১৫ একর জমিতে বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার ভেতর রয়েছে নান্দনিক বাগান, ডরমেটরি ভবন, গবেষণা কক্ষ, লাইব্রেরি, গেস্ট হাউস প্রভৃতি। দেবী চৌধুরানীর রাজবাড়িটি রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলায় অবস্থিত। ৩২০ বছর আগে ২৮ একর জায়গার ওপর খাল, পুকুর এবং ফসলি জমি বেষ্টিত এ জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে এ বাড়িটি খুব সমাদৃত। কেননা, ইতিহাসে দেবী চৌধুরানী এক বহুল সুপরিচিত নাম। রংপুর জেলার কথা ভাবলেই প্রথম যে চিত্র চোখে ভেসে ওঠে, তা তাজহাট জমিদার বাড়ি। শ্বেতশুভ্র এই বিশাল বাড়িটি সদর উপজেলাতেই অবস্থিত। রংপুর ভ্রমণে গেলে অবশ্যই এ জায়গাটি ঘুরে আসা উচিত।

তাজহাট জমিদার বাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

পঞ্চগড়

শীতের প্রারম্ভ পঞ্চগড় ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। অক্টোবর-নভেম্বরে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় বলে এ সময়টায় এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি থাকে। উল্লেখ্য যে, পঞ্চগড়ের ডাকবাংলো থেকে কাঞ্চজঙ্ঘার দৃশ্য সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায়। এ ছাড়া পঞ্চগড়ে আরও আছে কাজী টি এস্টেট, জিরো পয়েন্ট, ভিতরগড় দুর্গনগরী, মহারাজার দিঘি, রকস মিউজিয়াম, আটোয়ারী ইমামবাড়া, জগবন্ধু ঠাকুরবাড়ি, গোলকধাম মন্দির প্রভৃতি স্থান।

পঞ্চগড় থেকে শীত মৌসুমে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে। ছবি: সংগৃহীত

লালমনিরহাট

এ জেলার কিছু দর্শনীয় স্থান হচ্ছে- তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়ি, কাকিনা জমিদার বাড়ি, শালবন, তিন বিঘা করিডোর, তিস্তা ব্যারেজ, বুড়িমারি স্থলবন্দর ও জিরো পয়েন্ট, ভূমি গবেষণা জাদুঘর ইত্যাদি। তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়িটি কালীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। এটি একটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি, যা ৪০০ বছরের পুরনো। কালীগঞ্জ উপজেলারই আরেকটি জমিদার বাড়ি হচ্ছে কাকিনা জমিদার বাড়ি। এটি কাকিনা গ্রামে অবস্থিত এবং এটিও ৪০০ বছরের পুরনো। লালমনিরহাটে রয়েছে অনেক শালবন। অনেক পর্যটক শুধুমাত্র শালবন দেখার জন্যেও লালমনিরহাটে যায়। পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে রয়েছে একটি স্বতন্ত্রভূমি, যা তিন বিঘা করিডোর নামে পরিচিত। এটি ঠিক পর্যটন স্থান না হলেও অনেকে কৌতূহলবশত এখানে ঘুরতে যায়, স্বচক্ষে দেখে আসে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা।

তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রাম

এ জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- উলিপুর মুন্সিবাড়ি, নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি, চান্দামারী মসজিদ, পাঙ্গা জমিদার বাড়ি, ভেতরবন্দ জমিদার বাড়ি, জয়মনিরহাট জমিদার বাড়ি প্রভৃতি। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার উলিপুর মুন্সিবাড়িটির নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ির অবস্থান ফুলবাড়ি উপজেলায়। এ বাড়িটিও বড় পরিসরে নির্মিত। রাজারহাট উপজেলার চান্দামারী মসজিদটি মোগল ও সুলতানী স্থাপত্যকলার আদলে নির্মিত অনন্য এক স্থাপনা।

উলিপুর মুন্সিবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁও

বালিয়া মসজিদ, লোকায়ন জীবন বৈচিত্র জাদুঘর, রাজা টংনাথের বাড়ি এসব হচ্ছে ঠাকুরগাঁও জেলার দর্শনীয় কিছু স্থান। লোকায়ন জীবন বৈচিত্র জাদুঘরটি ঠাকুরগাঁও জেলা সদর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রান্তিক মানুষের জীবনবৈচিত্র ও গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি তুলে ধরা এবং সংরক্ষণ করা হয়েছে এখানে।

লোকায়ন জীবন বৈচিত্র জাদুঘর। ছবি: সংগৃহীত

দিনাজপুর

জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হচ্ছে- দিনাজপুর রাজবাড়ি, রামসাগর, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, স্বপ্নপুরী ইত্যাদি। দিনাজপুর রাজবাড়ির অবস্থান দিনাজপুর সদরেই। জেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামসাগর মানবসৃষ্ট দিঘী। স্বপ্নপুরী দিনাজপুর উপজেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় একটি বিনোদন পার্ক। শীত মৌসুমে এখানে বেশ ভিড় হয়।

দিনাজপুর রাজবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

নীলফামারী

চিনি মসজিদ, ক্যাথলিক গীর্জা, হরিশ্চন্দ্রের পাঠ, ধর্মপালের গড় নীলফামারী জেলার উল্লেখযোগ্য স্থান। কলকাতা থেকে মর্মর পাথর ও চিনামাটি এনে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। হরিশ্চন্দ্রের পাঠ মূলত একটি রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, যা জলঢাকা উপজেলায় অবস্থিত।

চিনি মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী

রাজশাহী হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি শহর। শহরের উল্লেখযোগ্য কিছু দর্শনীয় স্থান হচ্ছে- বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পদ্মা গার্ডেন, মুক্তমঞ্চ, টি বাঁধ, সেন্ট্রাল পার্ক, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি। এছাড়া রাজশাহীর অন্যান্য উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো অনেক দর্শনীয় স্থান। শহরের বিভিন্ন জায়গায় সময় কাটানো এবং দেখার জন্য পর্যাপ্ত স্থান রয়েছে। পুঠিয়া উপজেলায় রয়েছে পুঠিয়া রাজবাড়ি, বাগমারা উপজেলাতে আছে হাজারদুয়ারী জমিদার বাড়ি। বাঘা উপজেলায় আছে ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদ।

পুঠিয়া রাজবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

এই জেলা আমের জন্য বিখ্যাত হলেও বিগত কিছু বছর ধরে আলপনা গ্রামের কারণে নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং পর্যটকদের আনাগোনাও বেড়েছে। এ জেলায় ঘুরতে গেলে দেখে নিতে পারেন- বাবু ডাইং, আলপনা গ্রাম, নাচোল রাজবাড়ি, কোতোয়ালী দরওয়াজা, ছোট সোনা মসজিদ, তোহাখানা কমপ্লেক্স, দারাসবাড়ি মসজিদ প্রভৃতি। এখানকার বেশ কিছু টিলায় আদিবাসীরাও বসবাস করে। অবারিত গাছপালা, পাখপাখালির ডাকাডাকি, আদিবাসীদের জীবনবৈচিত্র দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। আলপনা গ্রামটি নাচোল উপজেলায় অবস্থিত। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি আলপনা দিয়ে সাজানো বলে এটি আলপনা গ্রাম হিসেবে সুপরিচিতি পেয়েছে। এ গ্রামের সৌন্দর্যের টানে সারা দেশ থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা।

আলপনা গ্রাম। ছবি: সংগৃহীত

নাটোর

নাটোরের কিছু দর্শনীয় স্থান হচ্ছে- রানী ভবানীর রাজবাড়ি, উত্তরা গণভবন, চলনবিল ইত্যাদি। রানী ভবানীর রাজবাড়ি নাটোর রাজবাড়ি হিসেবেও পরিচিত। দিঘাপাতিয়া রাজবাড়িটি বর্তমানে উত্তরা গণভবন নামে পরিচিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এটিকে উত্তরা গণভবন নামকরণ করেন। নাটোরের আরো একটি উল্লেখযোগ্য জায়গা হচ্ছে চলনবিল। শীত মৌসুমে চলনবিল জুড়ে আদিগন্ত বিস্তৃত সরিষা ফুল ফুটে থাকে। চলনবিলের এই মোহনীয় রূপের টানে পর্যটকরা এ মৌসুমে চলনবিল দেখতে আসে।

উত্তরা গণভবন। ছবি: সংগৃহীত

বগুড়া

বগুড়া জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হচ্ছে মহাস্থানগড়, খেরুয়া মসজিদ, রানী ভবানীর পৈতৃক নিবাস, ভীমের জাঙ্গাল, ভাসু বিহার, গোকুল মেধ প্রভৃতি। বগুড়া জেলার সবচেয়ে আইকনিক জায়গা হচ্ছে মহাস্থানগড়। করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে মহাস্থানগড়ের অবস্থান। এই মহাস্থানগড়ই ছিলো প্রাচীন বাংলার রাজধানী। এর ভেতর রয়েছে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন বিভিন্ন শাসনকালের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ২০১৬ সালে মহাস্থানগড়কে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

মহাস্থানগড়। ছবি: সংগৃহীত

সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জ জেলায় ঘুরে আসতে পারেন রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি, নবরত্ন মন্দির, বঙ্গবন্ধু যমুনা ইকোপার্ক, যমুনা সেতু ইত্যাদি। উল্লাপাড়া উপজেলায় রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবরত্ন মন্দির।

রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

জয়পুরহাট

জয়পুরহাটে গেলে যেসব স্থান ঘুরে দেখা যেতে পারে, সেগুলো হচ্ছে লাকমা রাজবাড়ি, পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি, নান্দাইল দীঘি ইত্যাদি। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী উপজেলা পাঁচবিবি। সেই উপজেলাতেই লকমা রাজবাড়ির অবস্থান। ৩০০ বছর পূর্বে এই রাজবাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলায় নান্দাইল দীঘির অবস্থান, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১ কিলোমিটার। ১৬১০ সালে এ দিঘিট খনন করা হয়েছিলো।

লাকমা রাজবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

নওগাঁ

নওগাঁ জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বলিহার রাজবাড়ি, দুবলহাটি জমিদারবাড়ি, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, কুসুম্বা মসজিদ, রবি ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, ভবানীপুর জমিদার বাড়ি ইত্যাদি। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নওগাঁ জেলার সবচেয়ে দর্শনীয় একটি স্থান। এটি একটি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, যা সোমপুর বিহার হিসেবেও পরিচিত এবং এর অবস্থান বদলগাছি উপজেলায়। ১৯৮৫ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কো থেকে স্বীকৃতি লাভ করে।

বলিহার রাজবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

যশোর

যশোর রোড, বেনাপোল স্থলবন্দর, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের সমাধিক্ষেত্র, মধুসূদন দত্তের বাড়ি, কালেক্টরেট পার্ক এসব হচ্ছে যশোর জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সম্মানার্থে সেখানে জাদুঘর, লাইব্রেরি এবং পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যা মধুপল্লী নামেও পরিচিত। যশোর রোড ১২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক সড়ক, যা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উভয়ের মধ্যে বিরাজমান। বেনাপোল স্থলবন্দর বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর। এছাড়া শীত মৌসুমে খেজুর রস খাওয়ার জন্য অনেক দর্শনার্থী যশোরে গিয়ে থাকেন। যশোরের খেজুর রস এবং গুড় সারা দেশে বিখ্যাত।

বিখ্যাত যশোর রোড। ছবি: সংগৃহীত

জাহ্নবী

জুহান্নুস: ফিনল্যান্ডের সেই অনন্য উৎসব, যখন পুরো দেশ চলে যায় প্রকৃতির কোলে

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১১:৩০ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১১:৫২ এএম
জুহান্নুস: ফিনল্যান্ডের সেই অনন্য উৎসব, যখন পুরো দেশ চলে যায় প্রকৃতির কোলে
হেলসিংকির কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য।

ফিনল্যান্ডে গ্রীষ্মের সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম জুহান্নুস (Juhannus), যা ইংরেজিতে Midsummer নামে পরিচিত। প্রতিবছর জুন মাসের শেষভাগে পালিত এই উৎসব শুধু একটি ছুটির দিন নয়, বরং এটি ফিনিশ সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও পারিবারিক জীবনের এক অনন্য মিলনমেলা। অনেকের মতে, বড়দিনের পর এটিই ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।

২০২৬ সালে জুহান্নুস ইভ বা Midsummer Eve পালিত হচ্ছে ১৯ জুন শুক্রবার এবং মূল জুহান্নুস দিবস ২০ জুন শনিবার। এই সময়টিকে ফিনল্যান্ডে গ্রীষ্মের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে ধরা হয়।

শহর ফাঁকা, মানুষ প্রকৃতির কাছে
জুহান্নুসের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এই সময়ে দেশের বড় বড় শহরগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। রাজধানী Helsinki-সহ বিভিন্ন শহর থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে যায় গ্রামের বাড়ি, হ্রদের তীর, বনাঞ্চল কিংবা গ্রীষ্মকালীন কটেজে। রাস্তাঘাট, অফিস, এমনকি অনেক দোকানপাটও বন্ধ বা সীমিত সময়ের জন্য খোলা থাকে।

বাংলাদেশে ঈদ বা পহেলা বৈশাখ যেমন জাতীয় আবেগের উৎসব, ফিনল্যান্ডে জুহান্নুসের গুরুত্ব অনেকটা তেমনই।

আগুন, হ্রদ আর মধ্যরাতের সূর্য
জুহান্নুসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঐতিহ্য হলো জুহান্নুস কোক্কো (Juhannuskokko) বা বিশাল অগ্নিকুণ্ড। হ্রদ কিংবা সমুদ্রের তীরে কাঠের স্তূপ জ্বালিয়ে রাতভর উৎসব চলে। পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীরা একত্রিত হয়ে গান, আড্ডা এবং খাবারের মাধ্যমে আনন্দ উদযাপন করেন।

ফিনল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে এ সময় সূর্য প্রায় অস্ত যায় না। রাত ১২টার পরও আকাশে আলো থাকে। এই মিডনাইট সান বা মধ্যরাতের সূর্য দেখতে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড় জমে। দক্ষিণ ফিনল্যান্ডেও রাত পুরোপুরি অন্ধকার হয় না।

সাউনা ছাড়া উৎসব অসম্পূর্ণ
ফিনিশদের কাছে সাউনা শুধু বিনোদন নয়, এটি জীবনযাত্রার অংশ। জুহান্নুসের সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে সাউনায় যান। এরপর ঠান্ডা হ্রদের পানিতে ঝাঁপ দেওয়া কিংবা সাঁতার কাটা যেন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অনেক পরিবার ঐতিহ্যবাহী ফিনিশ খাবার, গ্রিল করা মাছ, সসেজ এবং নতুন আলু দিয়ে উৎসবের ভোজের আয়োজন করে।

শত শত বছরের ঐতিহ্য
জুহান্নুসের ইতিহাস বহু পুরোনো। খ্রিস্টধর্ম আগমনের আগে এটি ছিল গ্রীষ্মকালীন অয়ন বা Summer Solstice উদযাপনের উৎসব। পরে এটি সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্টের স্মরণে "জুহান্নুস" নামে পরিচিতি পায়। তবুও প্রকৃতি, আলো এবং উর্বরতার সঙ্গে সম্পর্কিত বহু প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে।

হেলসিংকিতেও উৎসবের আমেজ
যদিও অধিকাংশ মানুষ শহর ছেড়ে চলে যান, তবুও হেলসিংকির Seurasaari Open-Air Museum এলাকায় ঐতিহ্যবাহী জুহান্নুস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। লোকসংগীত, লোকনৃত্য, ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং বিশাল অগ্নিকুণ্ড দেখতে হাজারো মানুষ সেখানে জড়ো হন। এই অনুষ্ঠান ১৯৫৬ সাল থেকে রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

অন্য দেশেও মিডসামার আছে, তবে ফিনল্যান্ড আলাদা
উত্তর ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে মিডসামার উদযাপিত হলেও ফিনল্যান্ডে এর ব্যাপ্তি এবং আবেগ ভিন্ন মাত্রার। পুরো জাতি যেন একসঙ্গে প্রকৃতির কাছে ফিরে যায়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবন থেকে সাময়িক মুক্তি নিয়ে মানুষ পরিবার, বন্ধু, বন, হ্রদ এবং অসীম আলোর মাঝে কয়েকটি দিন কাটায়।

এই উৎসব তাই শুধু একটি ছুটির দিন নয়, বরং ফিনিশ জাতিসত্তা, প্রকৃতিপ্রেম এবং পারিবারিক বন্ধনের এক জীবন্ত প্রতীক।

জামান সরকার/তামান্না রুপা/

বাওয়াছড়া লেক পাহাড়, বন আর নীল জলের অপূর্ব মিলন

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
পাহাড়, বন আর নীল জলের অপূর্ব মিলন
বাওয়াছড়া লেক মূলত একটি কৃত্রিম জলাধার।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা উঠলেই পাহাড়, ঝর্ণা, সমুদ্র কিংবা হাওরের কথা বেশি শোনা যায়। তবে প্রকৃতির নিভৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বাওয়াছড়া লেক হতে পারে একটি চমৎকার গন্তব্য। পাহাড়ঘেরা শান্ত পরিবেশ, সবুজ বনভূমি এবং নীলাভ জলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই লেক প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও প্রকৃতির সান্নিধ্যে হারিয়ে যেতে চাইলে বাওয়াছড়া লেক হতে পারে আদর্শ ভ্রমণস্থল।

বাওয়াছড়া লেকের ইতিহাস
বাওয়াছড়া লেক মূলত একটি কৃত্রিম জলাধার। স্থানীয় মানুষের সেচ সুবিধা এবং পানি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেকটির চারপাশে গড়ে ওঠে ঘন সবুজ বনভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এটি ধীরে ধীরে পর্যটকদের কাছে পরিচিতি লাভ করে।
বর্তমানে বাওয়াছড়া লেক শুধু একটি জলাধার নয়, বরং মিরসরাই অঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত থাকলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভ্রমণপ্রেমীদের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

 

কোথায় অবস্থিত
বাওয়াছড়া লেক চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত। এটি মূলত বাওয়াছড়া ইকোপার্ক ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত একটি মনোরম জলাধার। চারপাশে পাহাড়, বন আর নীরব পরিবেশ লেকটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে খুব বেশি দূরে নয় বলে এখানে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ। ফলে একদিনের ভ্রমণের জন্যও অনেক পর্যটক এই স্থানটি বেছে নেন।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে যেতে চাইলে প্রথমে চট্টগ্রামমুখী বাসে করে মিরসরাই পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে মিরসরাই যেতে সাধারণত চার থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে, যা যানজটের ওপর নির্ভর করে।
মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বা বারইয়ারহাট এলাকায় নেমে স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে করে বাওয়াছড়া লেকের দিকে যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম শহর থেকেও বাস বা স্থানীয় পরিবহনে মিরসরাই এসে একইভাবে লেকে পৌঁছানো সম্ভব।
নিজস্ব গাড়ি নিয়ে গেলে যাত্রা আরও সুবিধাজনক হয়। তবে শেষ অংশে কিছু কাঁচা ও সরু রাস্তা থাকতে পারে, তাই সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানো প্রয়োজন।

 

ভ্রমণ অভিজ্ঞতা
বাওয়াছড়া লেকে পৌঁছানোর আগেই ভ্রমণপিপাসুদের মন ভালো হয়ে যেতে শুরু করে। মিরসরাইয়ের গ্রামীণ পথ ধরে এগোতে এগোতে চারপাশে চোখে পড়ে সবুজ গাছপালা, ছোট ছোট পাহাড় এবং প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ। শহরের ব্যস্ততা, যানজট আর কোলাহল পেছনে ফেলে যখন লেকের কাছে পৌঁছাবেন, তখনই অনুভব করবেন এক অন্যরকম প্রশান্তি। দূর থেকে নীলাভ জলরাশি আর সবুজ পাহাড়ের মিলন যেন চোখের সামনে একটি জীবন্ত ছবির মতো ধরা দেয়।
লেকের তীরে দাঁড়ালে প্রথমেই মন ভরে যায় নির্মল সৌন্দর্যে। বিশাল জলরাশির ওপর আকাশের নীল রং এবং আশপাশের পাহাড়ের ছায়া পড়ে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। হালকা বাতাস মুখে এসে লাগলে মনে হবে প্রকৃতি যেন আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে। চারদিকে এতটাই নীরব থাকে যে ঝিঁঝিঁর ডাক, বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ কিংবা দূরের কোনো অচেনা পাখির সুরও স্পষ্ট শোনা যায়।
ভোরবেলা বা বিকেলের দিকে লেকের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়। সূর্যের কোমল আলো যখন পানির ওপর পড়ে ঝিলমিল করে, তখন পুরো পরিবেশ আরও মোহময় হয়ে ওঠে। যারা ফটোগ্রাফি করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। লেকের বিভিন্ন কোণ থেকে ছবি তুললে প্রতিটি ছবিই যেন পোস্টকার্ডের মতো সুন্দর দেখায়।

 


বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছু নিরিবিলি সময় কাটানো কিংবা একা বসে প্রকৃতিকে অনুভব করার জন্য বাওয়াছড়া লেক একটি চমৎকার জায়গা। এখানে বসে অনেকেই বই পড়েন, প্রকৃতির ছবি আঁকেন বা শুধু নীরবে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। পাহাড়, বন আর জলরাশির সম্মিলিত দৃশ্য মনকে সতেজ করে তোলে এবং মানসিক ক্লান্তি অনেকটাই দূর করে দেয়।
বিশেষ করে যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে বাওয়াছড়া লেকের ভ্রমণ হবে স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা। দিনের শেষে যখন ফিরে আসবেন, তখনো লেকের শান্ত পরিবেশ, পাহাড়ের সবুজ রং আর জলের সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরে স্মৃতিতে ভাসতে থাকবে।

কখন গেলে সবচেয়ে ভালো
বাওয়াছড়া লেক ভ্রমণের জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ মাস সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল ও আরামদায়ক থাকে। আকাশ পরিষ্কার থাকায় লেক এবং আশপাশের পাহাড়ের সৌন্দর্যও ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। তবে চাইলে বছরের অন্যান্য সময়েও যাওয়া যায়।
বর্ষাকালেও লেকের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। চারপাশের পাহাড় ও বন আরও সবুজ হয়ে ওঠে এবং লেকে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তবে অতিবৃষ্টি হলে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে, তাই বর্ষাকালে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

 

 

কী কী সঙ্গে নেবেন
ভ্রমণে বের হওয়ার সময় পর্যাপ্ত পানীয়, হালকা খাবার, ক্যাপ, সানস্ক্রিন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা ভালো। মোবাইল ফোন ও ক্যামেরার জন্য পাওয়ার ব্যাংকও কাজে আসতে পারে। যদি দীর্ঘ সময় অবস্থান করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে অতিরিক্ত পোশাক ও একটি ছোট ব্যাগ সঙ্গে রাখা সুবিধাজনক হবে।

ভ্রমণের সময় সতর্কতা
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। লেকের গভীর অংশে অযথা নামা উচিত নয়। সঙ্গে শিশু থাকলে তাদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে।
বর্ষাকালে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকতে পারে, তাই ভালো গ্রিপযুক্ত জুতা ব্যবহার করা উচিত। বনের মধ্যে প্রবেশ করলে নির্ধারিত পথ অনুসরণ করা ভালো।
এছাড়া প্লাস্টিক, বোতল কিংবা অন্যান্য আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও পর্যটকদের।

আশপাশের দর্শনীয় স্থান
বাওয়াছড়া লেকে ভ্রমণের পাশাপাশি মিরসরাইয়ের আরও কয়েকটি জনপ্রিয় স্থান ঘুরে দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে বাওয়াছড়া ইকোপার্ক, খৈয়াছড়া ঝর্ণা, নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা এবং মহামায়া লেক। সময় নিয়ে পরিকল্পনা করলে একই সফরে এসব স্থানও উপভোগ করা সম্ভব। বিশেষ করে মহামায়া লেক ও খৈয়াছড়া ঝর্ণা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।

সিনচিয়াংয়ে সংস্কৃতি ও পর্যটন উন্নয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
সিনচিয়াংয়ে সংস্কৃতি ও পর্যটন উন্নয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত
সম্মেলনের মঞ্চ।

উত্তর-পশ্চিম চীনের সিনচিয়াং উইগুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের হোথান শহরে ২০২৬ সিনচিয়াং সংস্কৃতি ও পর্যটন উন্নয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল দেশি-বিদেশি আরও বেশি পর্যটককে সিনচিয়াং অঞ্চলে আকৃষ্ট করা।
সম্মেলনে সিনচিয়াংয়ের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ সহজীকরণে গৃহীত বিভিন্ন নীতি ও সুবিধা উপস্থাপন করা হয়। 

 

আয়োজকরা জানান, এই সম্মেলন সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতবিনিময় ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে পর্যটন পণ্যের উদ্ভাবন, আধুনিকায়ন এবং শিল্পের মানোন্নয়নেও এটি ভূমিকা রাখবে।
সিনচিয়াং আঞ্চলিক সরকার এবং সিনচিয়াং প্রোডাকশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কর্পস যৌথভাবে এ  সম্মেলনের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সিনচিয়াংকে সহায়তাকারী চীনের ১৯টি প্রদেশ ও পৌর এলাকার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সংস্থার প্রতিনিধি এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সিনচিয়াংয়ের সংস্কৃতি ও পর্যটন বিভাগ জানিয়েছে, সম্মেলনের মাধ্যমে অঞ্চলের পর্যটন খাতকে আরও গতিশীল ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করার উদ্যোগ জোরদার করা হবে। সূত্র: সিএমজি

কুইচৌর থোংরেনে শুরু হলো ড্রাগন বোট শোভাযাত্রা

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
কুইচৌর থোংরেনে শুরু হলো ড্রাগন বোট শোভাযাত্রা
ড্রাগন বোট শোভাযাত্রা

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের কুইচৌ প্রদেশের থোংরেন শহরে রবিবার শুরু হয়েছে বর্ণাঢ্য ড্রাগন বোট শোভাযাত্রা। আসন্ন এই নৌকা বাইচ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য উৎসবের আগাম আমেজ নিয়ে এসেছে।
রোববার সকালে একটি স্থানীয় ঘাটে শোভাযাত্রার সূচনা হয়। এ সময় প্রায় ২০০টি নৌকা বিভিন্ন বিন্যাসে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান নেয়। এর মধ্যে ছিল ঐতিহ্যবাহী চীনা প্রমোদতরী, বাঁশের ভেলা, ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন বোট এবং স্থানীয় বিশেষ প্রতিযোগিতা নিউলং-এর নৌকা।
শোভাযাত্রার পথটি সিনচিয়াং নদীর প্রধান মনোরম অঞ্চল অতিক্রম করে, যা থোংরেন শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণকে সংযুক্ত করেছে।

 

প্রমোদতরীগুলোতে শিল্পীরা দর্শকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য পরিবেশন করেন। 
ঘন্টা ও ঢাকের শব্দের মধ্যে নাবিকরা একে অপরের ওপর জল ছিটিয়ে দেন। এই বিশেষ রীতির মাধ্যমে তারা পরস্পরের প্রতি শীতলতা, প্রাণবন্ততা ও আশীর্বাদ পৌঁছে দেন।
ড্রাগন বোট উৎসব যা তুয়ানউ উৎসব নামেও পরিচিত। এটি প্রাচীন চীনের যুদ্ধরত রাজ্যকালের (৪৭৫-২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) কবি ছু ইউয়ান স্মরণে উদযাপিত এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব।
চীনা চন্দ্র পঞ্জিকার পঞ্চম মাসের পঞ্চম দিনে পালিত এ উৎসব যা এ বছরের ১৯ জুন অনুষ্ঠিত হবে।

সূত্র: সিএমজি

চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনের গল্প

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনের গল্প
গ্রেটওয়ালে পর্যটকরা।

প্রথমবার গ্রেট ওয়াল দেখার অভিজ্ঞতা কোনো ভ্রমণ নয় এ যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা। বেইজিং থেকে ট্রেনে করে বাদালিং পৌঁছে যখন প্রথম সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম, পায়ের নিচের প্রতিটি পাথর যেন ফিসফিস করে বলছিল ‘আমি দুই হাজার বছর ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি।’
২০২৪ সালের শীতের সেই সকালে, কুয়াশার চাদর সরতে সরতে যখন প্রাচীরের বাঁকগুলো দৃশ্যমান হলো, মনে হলো যেন এক বিশাল ড্রাগন, পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাংলাদেশের লালবাগ কেল্লা বা মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে ইতিহাসের যে অনুভূতি পেতাম, এখানে তার চেয়েও বেশি কিছু ঘটল মনে হলো। ইতিহাস শুধু পড়ার বিষয় নয়, ইতিহাস ছোঁয়া যায়, ইতিহাসের গায়ে হাত বোলানো যায়। আর ঠিক এই অনুভূতিটাই চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটনের মূল শক্তি। এখানে ভ্রমণ শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা নয়; এ যেন একটি সভ্যতার আত্মার সঙ্গে কথোপকথন।

সংস্কৃতি যেখানে রক্তের মতো প্রবহমান

চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কোনো জাদুঘরের কাঁচের বাক্সে বন্দী করা যায় না, কারণ এই সংস্কৃতি এখনো জীবিত; কখনো রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে, বা সকালের পার্কে তাইচি করতে থাকা বৃদ্ধের হাতের মুদ্রায়, অথবা বসন্ত উৎসবের আগের রাতে আকাশভাঙা আতশবাজিতে। আমি যখন নানজিংয়ে পড়তে আসি, প্রথম কয়েক মাসে আমার মনে হতো এ যেন এক অদ্ভুত সময়যাত্রা। এক পাশে আকাশছোঁয়া কাঁচের দালান, আরেক পাশে কয়েকশ বছরের পুরনো মন্দির, যেখানে প্রতিদিন সকালে ধূপ জ্বলে। চীনের সংস্কৃতি এখানেই অনন্য আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীনত্বের এই মিশেলটাই তার পর্যটনের প্রাণ। 

২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন আরও চারটি স্থানকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে;  বেইজিং সেন্ট্রাল অ্যাক্সিস, জিংমাই পর্বতের প্রাচীন চা বন, শিয়া রাজবংশের সমাধি, এবং প্রাচীন সমুদ্রবাণিজ্য কেন্দ্র ছুয়ানজৌ। এখন পর্যন্ত চীনের ৬০ টি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান আছে, যার প্রতিটিই একেকটি জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী। আর চীন এই ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষণ করছে না, ৬৫টি জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান এবং ২০০টির বেশি সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক পর্যটন রুট তৈরি করেছে। ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সুসংহত তদারকির আওতায় আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, অর্থাৎ সংস্কৃতি এখন শুধু আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ।

যে শহরগুলো প্রাচীন সময়কে মনে করিয়ে দেয়

রাজধানী বেইজিং

বেইজিং যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। ফরবিডেন সিটি সেই প্রকাণ্ড প্রাসাদ, যেখানে পাঁচশো বছর ধরে ২৪ জন সম্রাট রাজত্ব করেছেন । এখানে ঢুকলে মনে হয় সময় থমকে গেছে। ১৮০ একরজুড়ে ছড়ানো এই প্রাসাদ নগরীর প্রতিটি লাল দরজা, প্রতিটি সোনালি ছাদের কারুকার্য যেন একেকটি গল্প বলে। আমি যখন প্রথম বার সেখানে গেলাম, এক চীনা দাদু আমার পাশে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে বললেন, ‘তুমি জানো, এই প্রাসাদের প্রতিটি ইটের নিচে একটা করে গল্প চাপা আছে।’ কথাটা নিছক কাব্যিক নয় এখানকার প্রতিটি কোণে ইতিহাস জমে আছে পলিমাটির মতো।

 

ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্ক।

 


শিয়ান: মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা সৈন্যবাহিনী

টেরাকোটা আর্মি নিয়ে যতই পড়েছি, কিছুই আমাকে প্রস্তুত করতে পারেনি সেই দৃশ্যের জন্য। ১৯৭৪ সালে এক কৃষক কুয়া খুঁড়তে গিয়ে যে আবিষ্কার করেছিলেন, তা আজ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঘটনা। হাজার হাজার মাটির সৈন্য, ঘোড়া, রথ প্রতিটি মুখভঙ্গি আলাদা, প্রতিটি বর্মের নকশা ভিন্ন। সম্রাট ছিন শি হুয়াং (Qin Shi Huang) মৃত্যুর পর নিজের সুরক্ষায় এদের তৈরি করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরও মানুষের জীবন থাকে। তাই পরলোকে তাকে পাহারা দেওয়া এবং সেখানেও নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি এই বিশাল মাটির সেনাবাহিনী তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি যখন প্রদর্শনী কক্ষের ব্যালকনি থেকে নিচে তাকালাম, সেই সারিবদ্ধ সৈন্যদের দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল মনে হলো তারা যেন দুই হাজার বছর ধরে শুধু শত্রুকেই খুঁজছে।


সাংহাই: যেখানে গতকাল আর আগামীকাল একসঙ্গে দাঁড়িয়ে

সাংহাইয়ের বান্ডে দাঁড়িয়ে হুয়াংপু নদীর ওপারে পুডং-এর আকাশছোঁয়া টাওয়ারগুলোর দিকে তাকালে যে ছবিটা চোখে পড়ে, সেটা যেন কল্পবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ পৃথিবী। অথচ পেছনে তাকালে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের পুরনো বাড়িগুলো, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সাংহাইয়ের স্মৃতির নিদর্শন। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই সাংহাইয়ের ম্যাজিক। বন্ধুরা মিলে রাতের বেলা বান্ডে হাঁটতে হাঁটতে আইসক্রিম খাচ্ছিলাম, আর ভাবছিলাম বাংলাদেশের পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোর সঙ্গে এই দ্যুতিময় নগরীর কত অমিল, অথচ দুই জায়গাতেই ইতিহাস আর আধুনিকতা পাশাপাশি বাস করছে।

হাংঝো ও ওয়েস্ট লেক

ওয়েস্ট লেকের সকাল যেন চীনা জলরঙের পেইন্টিং থেকে উঠে আসা কোনো দৃশ্য। কুয়াশার ভেতর দিয়ে উইলো গাছের ঝুলন্ত শাখা, দূরে প্যাগোডার ছায়া, পানিতে রাজহাঁসের ভেসে বেড়ানো; সব মিলিয়ে মনে হয় বাস্তবতা আর কবিতার সীমারেখা মুছে গেছে। হাংঝো শহরটা চীনের সাংস্কৃতিক রোমান্টিকতার প্রতীক। মার্কো পোলো একে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও চমৎকার শহর।’
আমি যখন লেকের পাশে বসে গ্রিন টি-তে চুমুক দিচ্ছিলাম, এক পাশে বাঁশের বাঁশির সুর ভেসে আসছিল মুহূর্তটা এতটাই নিখুঁত ছিল যে ফোনে ছবি তুলতেও ইচ্ছে করছিল না। চোখ দিয়েই ধরে রাখতে চাচ্ছিলাম সবটা।
 
ঝাংজিয়াজিয়ে

ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কে ঢুকে প্রথম যে অনুভূতি হয়, তা হলো ‘এটা কি সত্যি?’ আকাশের দিকে উঠে যাওয়া বিশাল বিশাল বেলেপাথরের স্তম্ভ, যেন কোনো দৈত্য, প্রকৃতির খেলাঘর থেকে এগুলো মাটিতে পুঁতে রেখেছে। জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ সিনেমার ভাসমান পাহাড়গুলো এই স্তম্ভগুলো থেকেই অনুপ্রাণিত। আমি যখন কাঁচের স্কাইওয়াকের ওপর দাঁড়িয়ে হাজার ফুট নিচে বনের দিকে তাকালাম, তখন বাংলাদেশের সিলেটের চা বাগান বা বান্দরবানের পাহাড়ের কথা মনে পড়ল প্রকৃতি যে কত বিচিত্র রূপ নিতে পারে, তা শুধু চীন ঘুরলেই বোঝা যায়।

ভ্রমণের স্বাদ: ট্রেন, খাবার আর উৎসব

চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক ২০২৫ সালে ৪.৬ বিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করেছে, যা পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে এই নেটওয়ার্ক ৬০,০০০ কিলোমিটারে প্রসারিত করার পরিকল্পনা আছে। ভাবুন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে খুলনা যেতে যে সময় লাগে, এখানে তার চেয়ে কম সময়ে বেইজিং থেকে সাংহাই পৌঁছে যাওয়া যায়। ট্রেনের নিঃশব্দ গতি, পরিচ্ছন্নতা, আর নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর সংস্কৃতি প্রতিটি ভ্রমণকে নিখুঁত আরামদায়ক করে তোলে।

আর খাবারের গল্প না বললে চীনের ভ্রমণকথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বেইজিংয়ের রাস্তার ধারে গরম গরম জিয়াওজি (ডাম্পলিং) খেতে খেতে মনে হলো ঢাকার চকবাজারের সিঙাড়া-পুরির কথা। সিচুয়ানের ঝাল খাবার খেয়ে চোখে পানি এলেও স্বাদ এতই অপ্রতিরোধ্য যে থামানো যায় না। সাংহাইয়ের শেংজিয়ানবাও, ভাজা স্টিমড বান যেন বাংলাদেশের ভাপা পিঠার চীনা সংস্করণ। আর চায়ের কথা তো আলাদা করে বলতে হয়, বাংলাদেশ যেমন চায়ের দেশ, চীনও তেমনই চা সংস্কৃতির জননী। লংজিং চায়ের প্রথম চুমুকটিতে যেন হাংঝোয়ের পাহাড়ি সকালটাই গিলে ফেলছিলাম।

উৎসবের সময় চীন হয়ে ওঠে এক ভিন্ন গ্রহ। আমার দেখা প্রথম চীনা নববর্ষ ছিল এক চোখ-ধাঁধানো অভিজ্ঞতা। পুরো শহর লাল লণ্ঠনে সেজে ওঠে। আকাশে আতশবাজির ফুলঝুরি, রাস্তায় ড্রাগন নাচ, বাচ্চাদের হাতে লাল খাম বাংলাদেশের ঈদের আনন্দের সঙ্গে এর কত মিল! দুই সংস্কৃতির উৎসবপ্রিয়তার এই মিলটা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। মনে হয়েছে, উৎসবের ভাষা আসলে সার্বজনীন।

সংরক্ষণ আর আধুনিকতার সেতুবন্ধন

চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ঐতিহ্য সংরক্ষণ আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন একই পথে হাঁটতে পারে। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত চারটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীনের প্রাকৃতিক ও মিশ্র ঐতিহ্য স্থানগুলোর সংরক্ষণের মান বিশ্ব গড়ের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো। ৯০ শতাংশের বেশি ঐতিহ্য স্থানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংরক্ষণ কর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়, অর্থাৎ পর্যটন এখানে স্থানীয় অর্থনীতিরও চালিকাশক্তি।

২০২৫ সালে চীন ৬.৫ বিলিয়ন অভ্যন্তরীণ পর্যটন ট্রিপ এবং ৬৮ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটকের রেকর্ড গড়েছ। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে চীন হবে বিশ্বের এক নম্বর পর্যটন অর্থনীতি। ভিসামুক্ত নীতির আওতায় ২০২৫ সালে ৩০ মিলিয়নের বেশি বিদেশি পর্যটক চীন ভ্রমণ করেছেন যা আগের বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। কিন্তু চীনের পর্যটন এখন শুধু গ্রেট ওয়াল বা ফরবিডেন সিটির মতো বড় গন্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন হাই-স্পিড রেল রুট ছোট শহর আর গ্রামীণ অঞ্চলগুলোকে পর্যটনের মানচিত্রে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের বসন্ত উৎসবের নয় দিনে প্রায় ৫৯৬ মিলিয়ন অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের চেয়ে ৯৫ মিলিয়ন বেশি। জাদুঘর, ঐতিহাসিক পাড়া, লোকজ উৎসব, পারফর্মিং আর্ট সব মিলিয়ে চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটন এখন পরিপূর্ণ এক বাস্তুসংস্থান।

বাংলাদেশ আর চীনের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নতুন নয়। বর্তমানে পদ্মা সেতু থেকে কর্ণফুলী টানেল চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় অংশীদার। কিন্তু সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যে সেতু তৈরি হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে মজবুত। বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে চীনে থেকে আমি প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখছি। চীনাদের কাছে পরিবারের গুরুত্ব, বড়দের প্রতি সম্মান, খাবারের প্রতি ভালোবাসা এগুলো আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে মাঝে মাঝে ভুলেই যাই আমি ভিনদেশে আছি। অথচ পার্থক্যগুলোও সমান আকর্ষণীয় তাদের সময়ানুবর্তিতা, কর্মনিষ্ঠা, আর দলগত কাজের প্রতি নিষ্ঠা আমাদের সমাজের জন্যও বড় শিক্ষা। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন চীনের মতো বাংলাদেশও তার ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে। আমাদের সুন্দরবন, পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁ এসব স্থানের পর্যটন সম্ভাবনা অফুরান। চীনের কাছ থেকে শেখার বিষয় হলো পর্যটন মানেই শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁ নয়, পর্যটন হলো সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন, স্থানীয় অর্থনীতির ইঞ্জিন, আর জাতির আত্মপরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার মাধ্যম।

শেষ কথা

গ্রেট ওয়াল থেকে ফেরার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। পাহাড়ের গায়ে প্রাচীরের শেষ আলোটুকু আঁকাবাঁকা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছিল এই প্রাচীর যেন চীনেরই প্রতিচ্ছবি দীর্ঘ, সহিষ্ণু, স্থিতধী, আর রহস্যে মোড়া। যে পর্যটক শুধু ছবি তুলতে আসে, সে প্রাচীরের পাথর দেখে ফেরে। কিন্তু যে ভ্রমণকারী ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করতে চায়, সে বোঝে এই পাথরগুলো শুধু সীমানা গড়েনি, এগুলো একটা সভ্যতার মেরুদণ্ড। চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটন আমাকে শিখিয়েছে যে ভ্রমণ মানে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয় ভ্রমণ হলো নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা, অন্য সংস্কৃতির আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা। বাংলাদেশি হিসেবে আমি বুঝেছি, আমাদের সংস্কৃতি আর চীনের সংস্কৃতির মধ্যে যে মিলগুলো আছে, সেগুলোই দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রকৃত ভিত্তি। আর পার্থক্যগুলো? সেগুলো শেখার জানালা নতুন করে ভাবতে শেখায়, নতুন চোখে দেখতে শেখায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, নানচিং ইউনিভার্সিটি অফ ইনফরমেশন সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।