রংপুর নগরের উত্তর প্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে চিকলি বিল। এটি এক সময় অনাদরে, অবহেলায় পড়ে ছিল। বিলটি ঘিরে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয় রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক)। এর একপাশে নিজেরাই গড়ে তোলে সিটি পার্ক। অন্যপাশ বরাদ্দ দেয় বেসরকারি কোম্পানিকে। সে পাশে গড়ে তোলা হয়েছে আলো ঝলমল ওয়াটার পার্ক।
রংপুর নগরের হনুমানতলা এলাকায় প্রায় ১০০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ওই বিনোদনকেন্দ্র। এর সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত অংশের নাম চিকলি সিটি পার্ক। আর বেসরকারি কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত অংশের নাম চিকলি ওয়াটার পার্ক। ২০১৫ সালে বিনোদনকেন্দ্রটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয় সিটি করপোরেশন।
চিকলি সিটি পার্কে প্রবেশ ফি ২০ টাকা। সম্প্রতি এই অংশ দিয়ে ঢুকে দেখা যায়, ভেতরে কংক্রিটে ঢালাই করা পাড়। বিলে চলা স্পিডবোটের ঢেউ আছড়ে পড়ে যেন চুমু খাচ্ছে কিনারে। পাড়ে নানা জীবজন্তুর ভাস্কর্য। জিরাফের একটি ভাস্কর্যের ওপর উঠে খেলা করছে এক শিশু। শিশুটির বাবা-মা বললেন, বিকেলে ঘোরার জন্য জায়গাটি মন্দ নয়। শিশুরাও মজা পায়। বিলের পাড় ধরে পূর্ব দিকে গেলে দেখা যায়, হাতের বাম পাশে সুন্দর ছাউনিঘেরা বসার বেঞ্চ। মাঝে মধ্যে দোকানঘর। সেসব দোকানে মেলে চায়ের সঙ্গে টাও।
এক দোকানি বললেন, ছাউনিঘেরা বেঞ্চগুলো ভালো। তবে কিছু তরুণ-তরুণী এগুলোর অপব্যবহার করেন। এতে পরিবার নিয়ে যারা আসেন, তারা বিব্রত হতে পারেন। এদিকে করপোরেশনের নজর দেওয়া দরকার।
পাড় ধরে আরও পুবে গেলে দেখা মিলবে বটপাকুড়ের ছায়ার- যেন বাংলার যেকোনো চিরচেনা বিল। এর ডানপাশে হয়তো দেখা যাবে, টাগ-জাল ফেলে মাছ ধরছে জেলে। তারা স্থানীয় বাসিন্দা।
একজন জেলে জানালেন, আগে বিলে মাছ বেশি পাওয়া যেত। আস্তেধীরে মাছ কমছে।
বিলের এপার থেকেই দেখা যায়, উত্তর পারে আলো ঝলমল পরিবেশ। সেখান থেকে ভেসে আসছে সুর-ছন্দও। ওই পারে গিয়ে দেখা মেলে আরেকটি প্রবেশপথের। টিকিটও কিনতে হয় আরেকটি। হ্যাঁ, এটিই চিকলি ওয়াটার পার্ক।
এই পার্কে ঢুকে দেখা যাবে, মনোরম পরিবেশ। মৃদুমন্দ ছন্দে কোথাও গান বাজছে। হাতের বামে স্পিডবোটে ওঠার ঘাট। এসব বোটের ঢেউই আছড়ে পড়ে বিলের পাড়ে।
ঘাট থেকে বের হয়ে সামনে গেলে হাতের ডানপাশে পড়বে কৃত্রিম পাহাড়। সেই পাহাড় চিড়ে ঝরছে ঝরনাও। কোথাও দেখা যাবে, গলা-উঁচু সাদা বক, যেন এখনই দেবে উড়াল। কিন্তু উড়তে পারবে না, এগুলো কৃত্রিম। এখানে ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি বললেন, পাহাড়ে ওঠা নিষেধ। পিছলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাহাড়-ঝরনা পেরিয়ে সাদা কাশফুলের সমারোহ। সেই সমরোহ পেরিয়ে সামনে গেলে দেখা যাবে ইয়া বড় নাগরদোলার, শিশুদের অন্যতম আকর্ষণ। রয়েছে শিশুদের উপযোগী আরও নানা রাইড।
এক শিশুর মন্তব্য, এখানে এলেই তার মন ভালো হয়ে যায়।
এই পাড়ের পথজুড়ে বিলের ধারঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে বসে থাকার বেঞ্চ ও মাচাংঘর। এসব বেঞ্চ ও ঘরে বসে উপভোগ করা যায় বিলের সৌন্দর্য। শেষ বিকেলের রোদ, গোধূলির লালচে আভা আর রাতে রংবেরঙের কৃত্রিম আলোয় বিলের পানি যেন ঝিলমিল করে ওঠে।
এমনি একটি মাচাংঘরের পাশে দেখা হয় শাহীন আলম নামের এক দর্শনার্থীর সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। এসেছেন কুমিল্লা থেকে। শাহীন বললেন, রংপুরে এত সুন্দর একটি বেড়ানোর জায়গা আছে, না দেখলে বিশ্বাসই হতো না। রাতেই ঢাকায় ফিরব। ট্রেনের টিকিট কাটা আছে, হাতে সময়ও আছে। তাই এখানে বেড়াতে এসেছি। এসে দারুণ লাগল!
এই পর্যটকের ভাষ্য, রংপুরের বাইরের অনেকে বিলটি সম্পর্কে তেমন জানেন না। তাই বিলটি ঘিরে প্রচার বাড়ালে এখানে পর্যটকের আনাগোনা আরও বাড়বে।
জানা যায়, চিকলি নিয়ে আরও বড় পরিকল্পনা আছে কর্তৃপক্ষের। পার্ক আরও বড় করা হবে। তখন দর্শনার্থীরা আরও বিনোদন পাবেন। আর তেমন কোনো প্রচার না করলেও চিকলি ওয়াটার পার্কে ভিড় লেগেই থাকে। ভালো জিনিস হলে তার নাম এমনিতেই ছড়িয়ে পড়ে।
চিকলির বিলের অবস্থান
শত বছরের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিলটি রংপুর বিভাগীয় শহরের হনুমনতলা এলাকায় অবস্থিত। হালের বিখ্যাত বিলের স্থানটি এককালে সি-প্লেনের ল্যান্ডিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বেসরকারি উদ্যোগে ২০১৮ সালে চিকলি ওয়াটার পার্কের নির্মাণকাজ শুরু হয়।
যা যা দেখবেন
বিল পাড়ে বসে থেকে মনোরম পরিবেশ উপভোগ করার জন্য দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে সুব্যবস্থা। শিশু ও সব বয়সী দর্শনার্থীর বিনোদনের জন্য স্থাপিত হয়েছে মিনি রেলগাড়ি, জেট স্কি, আর্টিফিশিয়াল ওয়াটার ফলস, টয় ট্রেন, বিশালাকার চরকিসহ আরও অনেক মজার মজার রাইড। চরকিতে চড়লেই রংপুর শহরের বার্ডস আই ভিউ পাওয়া যাবে। প্রিয় শহরকে আবিষ্কার করা যাবে নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে। এখানে কয়েকটি ক্যানেল আছে। সেখানে রাখা হয়েছে দেশি-বিদেশি রঙিন মাছ। পড়ন্ত বিকেলে মাছের খেলা দেখতে কার না ভালো লাগে বলুন! মন চাইলে স্পিডবোটেও ঘুরতে পারবেন এই পার্কে।
মূলত বিলের মূল আকর্ষণ হলো কৃত্রিম ঝরনা। দিনে তো বটে, সন্ধ্যার পর এই ঝরনা দেখতে বেশি আরাম লাগে। নানা রঙের আলোর ঝলকানিতে চোখ যেমন ভরে, তেমনি মনও। এ ছাড়া প্রাণ খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়ার জন্য চেয়ার বা বেঞ্চ তো রয়েছেই।
খাবারের ব্যবস্থা
পার্কের ভেতর আলাদা করে পাঁচটি সিটিং এরিয়ার রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া বাইরে আছে মুখরোচক খাবারের ব্যবস্থাও। চটপটি, ফুচকা থেকে শুরু করে আরও খেতে পারবেন নানা স্বাদের খাবার।
কেনাকাটা
যারা কেনাকাটা করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য আছে সুখবর। পার্কে ঘুরতে এসে করতে পারবেন কেনাকাটাও। কারণ এর ভেতরে আছে আধুনিক পোশাকের দোকান। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সীর জন্য রয়েছে নানা রঙের, নানা ঢঙের পোশাক। ছোটদের বাহারি ডিজাইনের পোশাক, নারীর সালোয়ার-কামিজ, লেহেঙ্গাসহ পাবেন শাড়ি। আছে পুরুষের টি-শার্ট, পাঞ্জাবিও।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে যেতে পারেন রংপুর। ঢাকা থেকে রংপুর এসি ও নন-এসি বাসের ভাড়া হতে পারে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। ট্রেন ও লোকাল বাসে করেও যাওয়া যাবে। এতে ভাড়া তুলনামূলক কম পড়বে।
রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রেই হনুমানতলা অবস্থিত। শহর থেকে দুটি পথে এই বিলে আসা যায়। একটি পথে, বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের পাশ থেকে সাগরপাড়া হয়ে আসতে হয়। এই পথে এলে সিটি চিকলি পার্কে আসা যাবে আগে।
অন্যদিকে, শহরের পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে দিয়ে হনুমানতলা বাজার পার হয়ে একটু সামনেই হাতের বামে পড়বে চিকলি ওয়াটার পার্কে ঢোকার প্রবেশ পথ। শহর থেকে রিকশা কিংবা অটো দিয়ে বিলে সহজেই ঘুরে আসা যায়। ভাড়া জনপ্রতি পড়বে ১০ টাকা। পার্কে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের জায়গাও রয়েছে। তাই প্রাইভেট কিংবা ভাড়া করা গাড়িও নিয়ে আসতে পারবেন।






