অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম কোথাও ঘুরতে যাওয়া দরকার। কিন্তু সেভাবে প্ল্যান করতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত প্ল্যান হলো কাপ্তাই যাব। এরপর আমাদের প্রথম যে বাধার সম্মুখীন হতে হলো, তা হচ্ছে ছুটি নেওয়া। সবাই চাকরিজীবী হওয়ায় অফিস থেকে ছুটি নেওয়া ছিল বড়ই মুশকিল। শেষ পর্যন্ত এর সমাধান হলো। যান্ত্রিক শহরের কোলাহল ছেড়ে কিছুটা স্বস্তির খোঁজে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের দিকে ছুটলাম আমরা সাতজন- ফাহিম, সাহিদ, সাকিব, শুভ, বিজয়, আশরাফুল আর আমি। ব্যাগ গুছিয়ে রাত সাড়ে ১০টার বাসে উঠে পড়লাম। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে চারজন, আর আরামবাগ থেকে বাকি তিনজনকে নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু। মাঝে কুমিল্লায় যাত্রাবিরতি দিয়ে বাস চলতে লাগল পার্বত্য জেলার দিকে।
ভোরে ঘুম ভাঙল শীতল বাতাসে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হিমেল বাতাস আর নতুন জায়গা দেখার রোমাঞ্চ কেড়ে নিয়েছিল আমাদের ঘুম। কুয়াশায় মোড়ানো পাহাড় ও আঁকাবাঁকা সড়কের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম কাপ্তাইয়ে।
কাপ্তাই থেকে আমরা যাব রাঙামাটিতে। নাশতা করে নিলাম। কাপ্তাইয়ে ভোরের নরম রোদে শুরু হয় আমাদের দিনের গল্প। রাঙামাটির জন্য দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ করলাম। শুরুতে সরাসরি রাঙামাটি যাওয়ার প্ল্যান থাকলেও কিছুটা পরিবর্তন আসে বন্ধু বিজয়ের কারণে। তার কথামতো কাপ্তাই থেকে পাহাড়ি সড়ক ধরে আমরা যাচ্ছি রাঙামাটির দিকে। পথে কিছু জায়গায় থামলাম- চা খেলাম, বসে লেকের নীল জলরাশির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকলাম। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়ক, মেঘ, পাহাড় ও লেক যেন আমাদের বরণ করে নিয়েছিল তার অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে। লেক-পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে পৌঁছে গেলাম টেরই পেলাম না। সেই সঙ্গে বিজয়ের কথা অনুযায়ী, কাপ্তাই-রাঙামাটিতে সিএনজি দিয়ে আসার সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল না সেটাও মেনে নিলাম আমরা।
সকাল সাড়ে ১০টায় পৌঁছলাম তবলছড়ি ঘাটে। সেখান থেকে আমাদের গন্তব্য স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্ট। আগে পৌঁছে যাওয়ায় কিছুটা সময় তবলছড়ি বাজার ঘুরে দেখলাম আমরা। এমন সময় মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের ম্যানেজারের নম্বর। তিনি আমাদের নিতে ঘাটে চলে এসেছেন। এরপর অল্প কিছু বাজার করে তার সঙ্গে চললাম স্বপ্নদ্বীপের উদ্দেশে। নীল জলরাশির শান্ত সৌন্দর্যের মাঝে চলতে লাগল আমাদের নৌকা। নৌকার পাশে গাঙচিলের ডানা ঝাপটানো দৃশ্য এক অপার মুগ্ধতা নিয়ে আসে। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম রিসোর্টে, সময় লাগল ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মতো।
রিসোর্টে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নেমে পড়লাম লেকে। অল্প সময় কায়াকিং করলাম। গোসল করে সারলাম দুপুরের খাবার। এরপর শান্ত রিসোর্টে বসে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। পর্যটকবাহী নৌকাগুলো ছুটে চলছে, দূরে মাছ ধরছেন জেলেরা। হাওয়ার টানে ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ে লেকের পাড়ে, যা সৃষ্টি করে শান্ত এক সুর। পাড় ছুঁয়ে ফেরা ঢেউয়ের শব্দই এখানে প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর অভিবাদন। চারপাশের সবুজ পাহাড়, তাদের কোলে নীল জলরাশি প্রশান্তি বয়ে আনে।
বিকেলটা ছিল আরও সুন্দর। কটেজের ব্যালকনিতে বসে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা যেন দিনের সব শব্দকে ধীরে ধীরে স্তব্ধ করে দেয়। সামনে বিস্তৃত লেক আর দূরে সারি সারি পাহাড়ের আড়ালে সূর্যটা ধীরে ধীরে নেমে যেতে থাকে। সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ে জলের বুকে। শেষ বেলায় আকাশ যেন নিজেকে নতুন করে রাঙিয়ে তোলে, লাল আর সোনালি আভায়। এই মুহূর্ত অনেকক্ষণ মনে গেঁথে থাকে। ধীরে ধীরে অন্ধকার হতে থাকে, চারপাশও হতে থাকে শান্ত। সন্ধ্যার নাশতা আর রাতের খাবার খেয়ে আমরা যখন আড্ডায় ব্যস্ত, রাত তখন নতুন গল্পের খাতা খুলে বসেছে। আকাশে তারার মেলা। লেকের স্থিরতা আর আকাশের তারা যেন রাতকে আরও নিখুঁত করে তোলে। খোলা আকাশের নিচে চলতে লাগল আমাদের আড্ডা। কিন্তু পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে যাওয়ার প্ল্যান আমাদের তাড়া দিচ্ছিল। তাই আড্ডার ইতি টানতে হলো। পরদিন সকালের নাশতা করে বেরিয়ে পড়লাম তবলছড়ি ঘাটের উদ্দেশে। রিসোর্টের নৌকায় তবলছড়ি ঘাটে পৌঁছলাম। সেখান থেকে একটি নৌকা রিজার্ভ করে লেক ঘুরে দেখার প্ল্যান আমাদের। নৌকা রিজার্ভ করলাম।
আমাদের যাত্রা শুভলং ঝরনার দিকে। তবে মাঝে কিছু স্পট ঘুরে দেখব। ঝরনায় যাওয়ার পথে প্রথমে আমরা টংঘর রেস্টুরেন্টে নামলাম। সেখানে দুপুরের খাবার খাব, তাই আগেই অর্ডার দিতে হলো। এরপর আবার ঝরনার দিকে যেতে লাগলাম। পথে আমরা গেলাম নির্বাণ নগর বাজারে। পাহাড়ি এ বাজারে রয়েছে অনেক ছোট ছোট দোকান। যেখানে বিক্রি হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের হাতে বোনা শাল, তাঁতের শাড়ি। আমরা পরিবার-পরিজনদের জন্য এখান থেকে শাল-ফতুয়া নিলাম। কেউ নিল প্রিয়জনের জন্য।
এরপর পাহাড়ঘেরা নীল লেকের বুক চিরে এগিয়ে যেতে লাগল নৌকাটি। আমরা পৌঁছে গেলাম শুভলং ঝরনায়। শীতকাল হওয়ায় ধরনায় খুব একটা পানি ছিল না। তাই এখানে বেশি সময় থাকা হলো না।
এদিকে ঘড়ির কাঁটায় বেলা ৩টা। খিদেও লেগেছে সবার। তাই আর সময়ক্ষেপণ না করে চলে গেলাম টংঘর রেস্টুরেন্টে। অর্ডার অনুযায়ী আমাদের খাবার রেডি। কিন্তু বেশি মানুষ থাকায় কিছুটা দেরিতে খাবার টেবিলে বসতে হলো। ভাত, রুই মাছের ভর্তা, চাপিলা ফ্রাই, ব্যাম্বু চিকেন, সালাদ ও ডাল দিয়ে খেলাম আমরা। খাবার শেষে কিছুটা বিশ্রাম নিলাম হেমুক আর দোলনায় বসে। সেই সঙ্গে উপভোগ করলাম কাপ্তাই লেকের পড়ন্ত বিকেল। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে শেষ বিকেলে ছুটলাম রাঙামাটির আইকনিক ঝুলন্ত সেতুর দিকে। ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে আমরা ঝুলন্ত সেতুতে পৌঁছালাম। টিকিট কাটলাম। স্মৃতি হিসেবে সেতুতে দাঁড়িয়ে তুললাম কিছু ছবি। পাহাড়ের মিষ্টি আনারস ও পেঁপে খেলাম। সেখানেও কাপড় ও আচারের দোকান ছিল। কিন্তু আমরা আগেভাগে কেনাকাটা করে ফেলায় সেখান থেকে তেমন কিছু কেনা হয়নি। সন্ধ্যাটা কেটেছে ঝুলন্ত সেতুতে। এবার ফেরার পালা। বিদায়ের সময়টা আসে নীরবে।
সন্ধ্যা ৭টায় ফিরলাম তবলছড়ি ঘাটে। সেখানে খাবার খেয়ে রাত ৮টার বাসে উঠে পড়লাম ঢাকার উদ্দেশে। রাঙামাটির নিস্তব্ধ পাহাড়ি রাত পেছনে ফেলে ভোর ৪টায় ফিরলাম ঢাকায়। শহরের ব্যস্ততায় ফিরলেও সবুজ পাহাড় আর নীল জলের মাঝেই যেন রেখে এলাম আমাদের মনটা। রাঙামাটি শুধু চোখে দেখার জায়গা নয়, এটা হৃদয়ে নিয়ে ফেরার জায়গা।






