সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চল মানেই অদ্ভুত এক নীরবতা, সবুজের স্তর আর অচেনা পথে হাঁটার রোমাঞ্চ। ঝরঝরি ঝর্ণা ট্রেইল সেই অভিজ্ঞতাকে আরও একটু রোমাঞ্চকর করে দেয়। এখানে পৌঁছানোর পর মনে হয়, শহরের ব্যস্ততা যেন অনেক দূরের কোনো গল্প।
ট্রেইলের শুরুটা সাধারণ গ্রামীণ পথ। দুই পাশে গাছ, মাঝেমধ্যে ছোট ঘরবাড়ি, খেত আর পাহাড়ের রেখা। একটু ভেতরে ঢুকতেই বদলে যায় দৃশ্য। সরু মাটির পথ ধীরে ধীরে পাথুরে হয়ে ওঠে। কোথাও শুকনো পাতা বিছানো, কোথাও ভেজা মাটি। ওপরে ঘন সবুজ ছায়া, রোদ মাটিতে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে না। বাতাসে এক ধরনের ঠাণ্ডা আর্দ্রতা টের পাওয়া যায়।
হাঁটতে হাঁটতে ছোট ছোট ঝিরি বা পানির ধারা চোখে পড়ে। স্বচ্ছ পানি পাথরের গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে। কোথাও থেমে ছোট জলাধার তৈরি করেছে। চারপাশে লতাগুল্ম, শ্যাওলা ধরা পাথর আর বুনো গাছপালা মিলে একেবারে পাহাড়ি অরণ্যের পরিবেশ তৈরি করেছে।
ঝরঝরি ঝর্ণা খুব উঁচু বা বিশাল নয়, কিন্তু তার সৌন্দর্য আলাদা। সরু সাদা পানির ধারা ওপর থেকে নিচে ঝরে পড়ছে। বর্ষায় পানির পরিমাণ বাড়লে শব্দও বাড়ে, তখন ঝর্ণার নামের মতোই ‘ঝরঝর’ ধ্বনি শোনা যায়। ঝর্ণার নিচে ছোট পাথুরে জায়গা, পাশে বসার মতো সমতল অংশ। পানির স্বচ্ছতা এতটাই যে, নিচের পাথরগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। সূর্যের আলো ঠিকমতো পড়লে পানির ফোঁটায় চিকচিক করে আলো ঝিলমিল করে।
ঝরঝরি ট্রেইলে হাঁটা মানে শুধু একটি গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, পুরো পথটাই আনন্দের অংশ। প্রথমে একটু উত্তেজনা কাজ করে–পথ ঠিক আছে তো, কত দূর বাকি? তারপর ধীরে ধীরে হাঁটার ছন্দ তৈরি হয়। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ, দূরে পাখির ডাক, মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাপটা–সব মিলিয়ে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়।
ঝর্ণার কাছে পৌঁছানোর আগে থেকেই পানির শব্দ কানে আসে। তখন ক্লান্তি থাকলেও মনে নতুন শক্তি আসে। সামনে যখন ঝর্ণা দেখা যায়, মনে হয় ছোট একটা জয় পাওয়া গেছে। পা ডুবিয়ে বসে থাকলে ঠাণ্ডা পানি শরীরজুড়ে শীতলতা ছড়িয়ে দেয়। অনেকে চুপচাপ বসে থাকে, কেউ ছবি তোলে, কেউ আবার শুধু পানির শব্দ শুনে সময় কাটায়।
শহরের কোলাহল, যানজট, মোবাইলের নোটিফিকেশন–সব যেন সাময়িকভাবে ভুলে থাকা যায়। প্রকৃতির এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, শান্তি আসলে খুব সাধারণ জিনিসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। ঝরঝরি ঝর্ণা বড় কোনো বিলাসী ভ্রমণ নয়, এটি সহজ, স্বাভাবিক আর প্রাকৃতিক এক অভিজ্ঞতা।
দিন শেষে ফিরে আসার সময় পায়ে হয়তো সামান্য ক্লান্তি থাকবে, কিন্তু মনে থাকবে প্রশান্তি। পাহাড়ি পথের সেই হাঁটা, ঠাণ্ডা ঝর্ণার পানি আর সবুজে ঘেরা নীরবতা–সব মিলিয়ে সীতাকুণ্ডের ঝরঝরি ঝর্ণা ট্রেইল হয়ে ওঠে স্মরণীয় এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
কীভাবে যাবেন ঝরঝরি ঝর্ণা
ঝরঝরি ঝর্ণা যাওয়ার জন্য আপনাকে প্রথমে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পন্থিছিলা বাজারে আসতে হবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বাসে উঠে মিরসরাইয়ের পর পন্থিছিলা বাজারে নামবেন। এটি সীতাকুণ্ডের আগেই পড়বে। বাসে উঠে সুপারভাইজারকে আগে থেকে বলে রাখবেন আপনাকে যেন পন্থিছিলা নামিয়ে দেয়। ঢাকার প্রায় সব বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামগামী বাস ছাড়ে। তবে আরামবাগ, সায়েদাবাদ বা ফকিরাপুল থেকে বেশি সুবিধাজনক।
চট্টগ্রাম থেকে ঝরঝরি ঝর্ণা আসতে হলে কদমতলী, মাদারবাড়ী, অলংকার ও একে খান মোড় থেকে ফেনী বারৈয়ারহাটের বাস আছে। বাসে পন্থিছিলা পর্যন্ত যেতে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। চট্টগ্রাম থেকে পন্থিছিলার দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটারের মতো।
পন্থিছিলা বাজার থেকে পূর্বদিকে কিছুদূর হেঁটে গেলে রেললাইন পাবেন। রেললাইন ধরে বামদিকে ৫-৭ মিনিট হাঁটলে একটা মাটির রাস্তা দেখবেন ডান দিকে চলে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে ২০ মিনিট গেলে কানি ঝিরির দেখা মেলবে। তারপর হাঁটতে থাকলে কিছুক্ষণ পর একটা পাহাড় ডিঙাতে হবে। ৩০ মিনিট হাঁটলে ঝরঝরি ঝর্ণা আপনার সামনে চলে আসবে। ঝিরি ধরে আরও ২০ মিনিট সামনে গেলে স্বর্গের সিঁড়ি নামক মায়াবী ক্যাসকেড পাবেন। এরপর আরও ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর মানুষের মূর্তি আকৃতির একটা ঝর্ণা পাবেন। যেটি মূর্তি ঝর্ণা নামে পরিচিত। পন্থিছিলা বাজার থেকে ঝরঝরি ঝর্ণা পর্যন্ত যেতে ১ ঘণ্টা সময় লাগে। আর পুরো ট্রেইল শেষ করতে ৫-৬ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
কোথায় খাবেন
ঝরঝরি ঝর্ণার আশপাশে খাবার দোকান নেই। গাইডের সঙ্গে কথা বলে স্থানীয় কোনো বাড়িতে বাজার করে দেওয়ার বিনিময়ে দুপুরের খাবার খেতে পারবেন। এ ছাড়া আরেকটু ভালো খাবার চাইলে সীতাকুণ্ড বাজারে খাওয়া যায়। সীতাকুণ্ড বাজারে হোটেল সৌদিয়া, আল আমিন ও আপন রেস্টুরেন্ট উল্লেখযোগ্য। এখানে আপনি ভাত, মাছ, মাংস, ভর্তা, ডাল, সবজি ইত্যাদি মেন্যু হিসেবে পাবেন। খাবার খরচ পড়বে প্রতিবেলা ১২০ থেকে ২০০ টাকার মতো।
ভ্রমণ টিপস
সীতাকুণ্ডের ঝরঝরি ঝর্ণা ট্রেইলে গেলে পন্থিছিলা বাজার থেকে স্থানীয় কাউকে গাইড হিসেবে সঙ্গে নেওয়াই ভালো। গাইড ফি সাধারণত ৩০০-৪০০ টাকার মধ্যে। এই সামান্য খরচ আপনাকে পথ হারানো বা ঝুঁকিতে পড়া থেকে বাঁচাতে পারে। ঝরঝরি ঝর্ণায় যাওয়ার উপযুক্ত সময় বর্ষার শেষে। কারণ, ভরা বর্ষায় ঝরঝরির পরের ঝর্ণাগুলো বেশ দুর্গম হয়ে যায় এবং নতুন ট্রেকার হলে পুরো ট্রেইল শেষ করাই কঠিন হতে পারে। মনে রাখতে হবে, ঝর্ণার ট্রেইল যত সহজই মনে হোক না কেন, পাহাড়ি পথে এদিক-ওদিক বিপদ ওঁৎ পেতে থাকে–পিচ্ছিল পাথর, হঠাৎ স্রোত, ভাঙা মাটি বা গভীর গর্ত যেকোনো সময় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের কমনসেন্স ব্যবহার করা জরুরি।
তাড়াহুড়া না করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলার চেষ্টা না করাই ভালো। গ্রুপ করে ঘুরতে যাওয়াই নিরাপদ, কারণ দলবদ্ধ থাকলে বিপদে একে অন্যকে সহায়তা করা যায়। সঙ্গে গ্রিপযুক্ত জুতা, পর্যাপ্ত পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী ও মোবাইল পানিরোধী ব্যাগে রাখা উচিত। বৃষ্টি হলে বা স্রোত বেড়ে গেলে সামনে এগোনোর বদলে নিরাপদ জায়গায় অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতিকে উপভোগ করুন, তবে সচেতন থাকুন। কারণ, নিরাপত্তাই একটি সফল ট্রেকের সবচেয়ে বড় শর্ত।
কাছাকাছি অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
পাশাপাশি দুই উপজেলা মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডকে বলা যায় ঝর্ণা উপত্যকা। ঝরঝরির ঝর্ণার আশপাশে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে–বাওয়াছড়া লেক, হরিণমারা হাঁটুভাঙ্গা ট্রেইলসহ আরও অনেক ঝর্ণা। অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে কমলদহ ঝর্ণা, বড়তাকিয়া বাজারের কাছে আছে খৈয়াছড়া ঝর্ণা, নদুয়ারী বাজারের কাছে নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা। আর চট্টগ্রামের দিকে ১০-১২ কিলোমিটার গেলে পড়বে চন্দ্রনাথ পাহাড় কিংবা গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত। মিরসরাইতে আছে এই রেঞ্জের সবচেয়ে অ্যাডভেঞ্চারাস ঝর্ণা সোনাইছড়ি ট্রেইল।


