শুধু যাত্রী কেন, অনেক বিশেষজ্ঞও বলেছিলেন টাইটানিক কখনো ডুববে না। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ সত্য, ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল প্রারম্ভিক যাত্রায় টাইটানিক ডুবেছিল। উত্তর আটলানটিক সাগরে টাইটানিক ডোবার সময় এর ক্যাপটেন এডওয়ার্ড স্মিথ জাহাজটির আর্কিটেক্ট থমাস অ্যান্ড্রুসকে ডেকে নেন। তাকে নিয়ে বারবার কাগজপত্র দেখছিলেন আর নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, সত্যিই কোনো নির্মাণ ত্রুটি আছে কি-না, আর হিসাব কষছিলেন ডুবতে কতক্ষণ সময় লাগবে। ক্যাপ্টেন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, টাইটানিক ডুবছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আকাশযুদ্ধে প্রায় অদ্বিতীয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান। এর নির্মাণশৈলী সমরবিশ্বে ফ্রান্সকে দিয়েছে অনন্য উচ্চতা। পাকিস্তানে ভারতের বিমান হামলার সময় রাফাল ভূপাতিতের ঘটনা গত দুই দিন ধরে ব্যাপকভাবে আলোচিত। সমর বিশেষজ্ঞরা ভেবে পাচ্ছেন না, পাকিস্তান কীভাবে এই অত্যাধুনিক বিমানকে ঘায়েল করল। ফ্রান্সের সম্মানে আঘাত লাগা এই ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। তবে এই বিমান ভূপাতিত কি আকাশযুদ্ধে পাকিস্তানের অনন্য পারঙ্গমতার ইংগিত বহন করে?
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, বিশ্বের চতুর্থ বিমানশক্তি ভারত। দেশটির এয়ারক্র্যাফট আছে ২ হাজার ২০০টির বেশি। আছে ৫১৩টি ফাইটার। পাকিস্তানের এয়ারক্র্যাফটের সংখ্যা ১৪০০। দেশটির ফাইটারের সংখ্যা ৩২৮।
মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা। রাফালকে টার্গেট করেই বিমান প্রতিরক্ষা এবং আক্রমণ চালানোর কৌশল বেশ সাফল্যের সঙ্গেই এই যুদ্ধে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে চীন।
ভারতের পাঞ্জাব এলাকায় একটি বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যেটি চীনের উৎপাদিত পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ বলে দাবি করছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। এই ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম দুটি বিমান হলো জে-১০সি ও জেএফ-১৭ ব্লক ৩, যেগুলো বর্তমানে ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয়।
জে-১০সি হচ্ছে চীনের তৈরি চেংডু এয়ারক্রাফটের একটি উন্নত মাল্টিরোল ফাইটার জেট, যা চতুর্থ ও পঞ্চম (চার দশমিক পাঁচ) প্রজন্মের মাঝামাঝি ক্ষমতার বলে বিবেচিত। এটি উন্নত রাডার ও ইঞ্জিন প্রযুক্তিসম্পন্ন। পাকিস্তান ২০২০ সালে ৩৬টি জে-১০সিই এবং ২৫০টি পিএল-১৫ই ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ডার দেয়। ২০২২ সালে ছয়টি বিমান পাকিস্তানে পৌঁছায় এবং বর্তমানে ২০টি জে-১০সি তাদের বিমানবাহিনীতে সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্বের সব দেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় সাধারণ দুই ধরনের ব্যবস্থা থাকে। এর একটি উচ্চগতির বিমান প্রতিরোধ ব্যবস্থা। অন্যটি অপেক্ষাকৃত কম গতির বিমানের প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এর মধ্যে ঠিক কোন ব্যবস্থায় রাফালকে প্রতিরোধ ও ভূপাতিত করা হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে ফরাসি ক্রোটেল এবং সুইডিশ আরবিএস সেভেনটি ব্যবস্থা। গতির বিবেচনায় রাফাল প্রতিরোধে এটি সক্ষম নয় বলেই মন্তব্য করেছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলেছে, চায়নার এইচ কিউ-সিক্সটিন এবং তুরস্কের হাসির সমন্বয়ে স্বতন্ত্র এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছে পাকিস্তান। সেটিই তাদের সাফল্যের মূল।
রাফালের স্টিলথ সিস্টেম (রাডার ফাঁকি দেওয়ার কৌশল) একে করেছে বেশি আকর্ষণীয়। এর এই সত্যকে ধরে নিয়ে চীন ঠিক রাফালকে টার্গেট করেই চায়াংডু জে-টেন সি বিমান নির্মাণ করে।
চীনের বাইরে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ, যারা এই বিমান ব্যবহার করে। এর আগে ২০২৪ সালে ইরানে এক অভিযানে সীমান্ত পেরিয়ে জে-১০সি ব্যবহার করা হলেও তা ছিল যুদ্ধবিমানের আকাশযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়াই।
রাফালকে টার্গেট করে আগেই বক্তব্য দিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি এর আগে ঘোষণা দেন, ২৯ এপ্রিল রাতে ভারতের পক্ষ থেকে কাশ্মীরের লাইন অব কন্ট্রোলে চারটি রাফাল বিমানের মহড়ার আয়োজন করা হয়। তবে সে যাত্রায় রাফালের ‘কাউন্টার মেজর’ (প্রতিরোধ ব্যবস্থাসম্পন্ন) প্রযুক্তি ব্যবহার করে চারটি বিমানকে সীমান্ত থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। পরে ভারতের রাফাল বিমানগুলো কাশ্মীরের শ্রীনগরে অবতরণ করতে বাধ্য হয়। সেদিনই মূলত রাফালের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আত্মবিশ্বাসী হয় পাকিস্তান।
চীনের এই জেট ফাইটার নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মিসর ও উজবেকিস্তান। মিসরের এক সামরিক মহড়ায় এক কর্মকর্তা জে-১০সিতে বসে ছিলেন বলে জানা যায়। অন্যদিকে উজবেকিস্তান পুরোনো সোভিয়েত যুদ্ধবিমান সরিয়ে নতুন মডেল কেনার জন্য রাফাল ও জে-১০সির তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, ভারতের হামলা প্রতিহতে ব্যবহার করা হয়েছে চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান দিয়ে। এ ছাড়া পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার সংসদে জানান, ভূপাতিত হওয়া যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে তিনটি ছিল ফ্রান্সের তৈরি রাফাল। তিনি বলেন, এগুলোকে গুলি করে নামিয়েছে পাকিস্তানের জে-১০সি বিমান।
ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জে-১০সি যুদ্ধবিমান চীনের তৈরি পিএল-১৫ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ফ্রান্সের তৈরি রাফাল বিমানগুলো ভূপাতিত করে।
যদিও ভারতের সরকার এ দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছে এবং এখনো পর্যন্ত এর কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তবে যদি ঘটনা সত্যি হয়, তাহলে এটি হবে রাফাল যুদ্ধবিমানের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষতি এবং চীনের পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণ করার একটি বড় ঘটনা।
এদিকে রাফাল ভূপাতিতের ঘটনাকে একটি মিথ্যা প্রচার বলে অভিহিত করেছে ভারত। বলা হয়েছে, যেসব ছবি বা ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, সেগুলো পুরোনো ঘটনার। তবে একটি ফরাসি গোয়েন্দা সূত্রের মতে, অন্তত একটি রাফাল ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে আরও কোনো বিমান ভূপাতিত হয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। ফ্রান্সের একজন উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেছেন, ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি রাফাল যুদ্ধবিমান পাকিস্তান ভূপাতিত করেছে। আর এটিই হলো যুদ্ধে ফরাসি-নির্মিত রাফাল যুদ্ধবিমান ধ্বংস হওয়ার প্রথম ঘটনা। ফরাসি ওই কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, পাকিস্তান আরও রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে কি না, ফরাসি কর্তৃপক্ষ তা খতিয়ে দেখছে।
রাফাল ও জে-১০সি- দুটিই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। রাফাল হলো ফ্রান্সের তৈরি, দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট একটি মাল্টিরোল বিমান, যেখানে উন্নত রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং মেটর ক্ষেপণাস্ত্র আছে। অন্যদিকে জে-১০সি হলো চীনের তৈরি বিমান, যাতে আছে উন্নত রাডার এবং পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা ২০০-৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
যদি সত্যিই পিএল-১৫ ব্যবহার করে একটি রাফাল ভূপাতিত করা হয়ে থাকে, তাহলে এটি বোঝায় যে এখন যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানও উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে। সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট