দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সমালোচিত থাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী এখন নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলটি নতুন সমর্থন পাচ্ছে। এই উত্থান মধ্যপন্থি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গতকাল বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে হওয়া এক গণ-অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। ওই ঘটনার পর থেকেই জামায়াত নিজেদের সংগঠন ও কৌশলে বড় পরিবর্তন আনে। শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। জামায়াত সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে।
দলটি দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি, সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্যকে সামনে এনে নির্বাচনে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল অর্জনের আশা করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বর মাসের এক জরিপে জামায়াত দেশের সবচেয়ে ‘পছন্দের’ রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখানো হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটি বিএনপির সঙ্গে শীর্ষ অবস্থানের জন্য হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি করি না। আমরা কল্যাণমূলক রাজনীতি শুরু করেছি।’ তিনি জানান, দলটি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করেছে, বন্যাকবলিত মানুষকে সহায়তা দিয়েছে এবং আন্দোলনে নিহতদের পরিবারকে সাহায্য করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারান।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা এখন যে গঠনমূলক রাজনীতি করছে, তাতে মানুষ আস্থা ও বিশ্বাস রাখবে।’ তার মতে, জনগণ এই রাজনীতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে ব্রিটিশ ভারতের প্রেক্ষাপটে। দলটি ইসলামি নীতির ভিত্তিতে সমাজ ও
রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটির অনেক শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন এবং কারাগারে পাঠানো হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেছিল।
২০১৩ সালে বাংলাদেশের একটি আদালত জামায়াতের গঠনতন্ত্রকে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে। এরপর দলটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা গত বছর তুলে নেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয় পায়। তারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টিকেও (এনসিপি) পরাজিত করে।
এরপর জামায়াত ওই এনসিপির সঙ্গে জোট গঠন করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট জামায়াতের ভাবমূর্তি কিছুটা নরম করতে সাহায্য করেছে। ঢাকার এক ব্যস্ত বাজারে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে ডাব বিক্রি করা ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ জালাল বলেন, ‘মানুষ নতুন কিছু চায়। তার ভাষায়, নতুন অপশন হলো জামায়াত। তাদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার। তারা দেশের জন্য কাজ করে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ধর্মতাত্ত্বিক শাফি মোস্তাফা বলেন, একসময় বিতর্কিত ও সীমিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত জামায়াত এখন বাস্তববাদী ও কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী দলে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে। সেই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে জামায়াত আবার ‘ইসলামই সমাধান’ স্লোগান তুলে ধরছে এবং নিজেকে নৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে।
এই প্রথম জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলটি সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া হামলার
বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে কথা বলেছে। দলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তারা ইসলামি মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়।
দলটির নেতারা নারীদের সমান অধিকারের আশ্বাস দিলেও, ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন পায়নি। শফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের পর সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মাধ্যমে নারীরা প্রতিনিধিত্ব পাবে।’ তবে নারী অধিকার সংগঠন নারীপক্ষের নেতা শিরীন হক বলেন, ‘এই আশ্বাস কেবল একটি নির্বাচনি কৌশল। তার মতে, ক্ষমতায় গেলে দলটি আবার তাদের পুরোনো মতাদর্শে ফিরে যাবে, যেখানে নারীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।’
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা ২৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী উমামা ফাতেমা বলেন, ‘জামায়াতের বক্তব্যে দ্বিচারিতা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এক দিন তারা নারী ক্ষমতায়নের কথা বলে। পরের দিন নারীদের পাঁচ ঘণ্টা কাজ করার প্রস্তাব দেয়, যাতে তারা পরিবার দেখাশোনা করতে পারে।’ তিনি জামায়াত প্রধানের এমন বক্তব্যের কথাই উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো আরও সাহসী হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও সুফি মাজারে হামলা হয়েছে। ধর্মীয়ভাবে ‘অইসলামিক’ বলা অনুষ্ঠান, যেমন লোকসংগীত পরিবেশনা ও নারীদের ফুটবল ম্যাচেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে শূন্য সহনশীলতা নীতি প্রয়োগের কথা বলেছে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশে হিন্দুরা সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু। তারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। এরপর বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সংখ্যালঘুরা কোনো সরকারের আমলেই প্রকৃত সুরক্ষা পায়নি। তবে বর্তমানে যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন কোনো জোট ক্ষমতায় আসে, তাহলে বাংলাদেশ একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ তার ভাষায়, আজ তিনি নিজের জীবনের জন্য ভয় পাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা থাকবে কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বিগ্ন।
জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘জামায়াত কখনো ধর্মের নামে সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতা সমর্থন করেনি এবং কখনো এতে জড়িতও ছিল না।’ তিনি এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামী আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের শরিক ছিল। বর্তমানে দলটি দেশের প্রায় সব ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠন করেছে। এর মধ্যে কিছু দল আরও রক্ষণশীল। জামায়াত গত বছরের শুরুতেই প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করে এবং ভোটারদের মনোভাব বুঝতে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়।
জামায়াত নেতা মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, ‘জামায়াত তাকে গত বছরের এপ্রিল মাসে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তার বাবা একজন জামায়াত নেতা ছিলেন এবং শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হয়।’ মীর আহমদ জানান, জামায়াত তাদের কাছে তথ্য উপস্থাপন করে দেখায় যে, মানুষ পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিরক্ত এবং পরিবর্তন চায়। তিনি বলেন, ‘দলটি মনে করেছিল বাস্তব সুযোগ আছে। সে কারণেই তিনি জামায়াতে যোগ দেন।’
কিছু বিশ্লেষকের মতে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে পারে। এতে শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। তবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াত কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না।’ তিনি বলেন, ‘দলটি সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায় এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।’