ইরানে যদি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং তেহরানের সরকার ভেঙে পড়ে, সে ক্ষেত্রে সীমান্তের ইরান অংশে একটি ‘বাফার জোন’ (নিরাপত্তা বলয়) প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে তুরস্ক। এটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য হবে শরণার্থীর ঢল ঠেকানো। মিডল ইস্ট আই (এমইই)–এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা পার্লামেন্টে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আইনপ্রণেতাদের ইরান পরিস্থিতি নিয়ে সম্ভাব্য বিভিন্ন দৃশ্যপট সম্পর্কে অবহিত করেন। বৈঠকে উপস্থিত দুই ব্যক্তি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন জানান, তুর্কি কর্মকর্তারা সরাসরি ‘বাফার জোন’ শব্দটি ব্যবহার করে বলেন, নতুন করে যাতে কোনো শরণার্থী ঢল তুরস্কে প্রবেশ না করে, সে জন্য আঙ্কারা সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
তবে আরেক অংশগ্রহণকারী জানান, কর্মকর্তারা সরাসরি ‘বাফার জোন’ শব্দটি ব্যবহার না করলেও, প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।
তার ভাষায়, মূলত তারা বলেছেন, যদি অভিবাসনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে যারা আসতে পারে, তাদের যেন ইরান অংশেই আটকে রাখা যায়, সে জন্য সবকিছু করা উচিত বলে তারা মনে করেন।
ইরান সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার
চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানের সঙ্গে ৫৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। এর আওতায় প্রযুক্তিনির্ভর শক্তিশালী শারীরিক বাধা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে—
২০৩টি ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল টাওয়ার,
৪৩টি লিফট-সংবলিত নজরদারি টাওয়ার,
৩৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মডুলার কংক্রিট দেয়াল,
এবং ৫৫৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষামূলক পরিখা ।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সীমান্ত অঞ্চলগুলো ড্রোন ও বিমানসহ গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে চব্বিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
ইরানে বিক্ষোভে সহিংসতা, ব্যাপক হতাহতের দাবি
তুর্কি গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই বৈঠকে কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের জানান, চলতি মাসের শুরুতে ইরানে সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভে প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিহত এবং ২০ হাজার আহত হয়েছেন।
দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং ইরানের মুদ্রার মূল্য তীব্রভাবে কমে যাওয়ার জেরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কিছু বিক্ষোভকারীর সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে, তবে বিভিন্ন তদন্ত ও ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিক্ষোভ দমনে তেহরান অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। পাশাপাশি সরকার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়।
মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি ও আঙ্কারার অবস্থান
গত শুক্রবার টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ইরানে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী তুরস্ক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক পথে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে সহিংস দমন-পীড়নের সময় তেহরানকে হুমকি দিলেও পরে জানান, তিনি ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মকর্তা এমইই-কে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে এমন কিছু ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারের ওপর নির্ভুল হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে, যাদের বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর জন্য দায়ী মনে করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করার বিকল্প তৈরি হয়েছে।
এই সামরিক প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গতকাল সোমবার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছেছে।
অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক তুরস্ক
সরকার পরিবর্তন ও যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে তুরস্ক অত্যন্ত সচেতন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণ এবং ২০১১–২০২৪ সালের সিরিয়া গৃহযুদ্ধের অস্থিতিশীল প্রভাব দেশটি সরাসরি ভোগ করেছে।
এই সংঘাতগুলোর ফলে লক্ষাধিক শরণার্থী তুরস্কে প্রবেশ করেছে, যা দেশটির জ্বালানি ও বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
তুর্কি সমাজ এখনো শরণার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিশেষ করে ২৭ লাখ সিরীয় শরণার্থী ইস্যুতে। আসাদের সরকারের পতনের পর তাদের অনেকেই এখন সিরিয়ায় ফিরতে শুরু করেছেন।
এমইই জুন মাসে জানিয়েছিল, তুর্কি কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে ১০ লাখ পর্যন্ত ইরানি শরণার্থী তুরস্ক সীমান্তের দিকে এগোতে পারে।
সে সময় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছাড়া তুরস্ক কোনো শরণার্থী গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়।
আরও বলা হয়, ভবিষ্যতে শরণার্থী ঢল নামলে তুরস্ক কোনো প্রতিবেশী দেশের ক্ষেত্রেই আর ‘ওপেন-ডোর’ নীতি অনুসরণ করবে না। বর্তমানে ইরানিরা ভিসা ছাড়াই তুরস্কে প্রবেশ করতে পারেন।
আজারবাইজানি তুর্কিদের জটিলতা
তবে এই পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলছে ইরানে বসবাসরত আজারবাইজানি তুর্কিদের উপস্থিতি। তাদের সংখ্যা কমপক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ বলে ধারণা করা হয়।
এই জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ যদি একযোগে সীমান্তে হাজির হয়, তাহলে তুরস্ক কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে তাদের তুরস্কে ঢুকতে দেওয়ার জন্য দেশীয় রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মাহফুজ/