যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো কার্যত স্থবির রয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানিসংকটের সমাধান হবে এমন আশা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর জাহাজ যতটা চলাচল শুরু করেছিল, তার চেয়ে সংখ্যা এখন কমেছে।
জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও এরপর খুব অল্পসংখ্যক জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়ে পার হয়েছে। বাজার বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের তথ্যানুসারে, গত বুধবার মাত্র পাঁচটি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা আগের দিনের ১১টি থেকে কম। গত বৃহস্পতিবার এই সংখ্যা ছিল সাতটি। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রণালিতে বাধার কারণে উপসাগরে ৬০০টির বেশি জাহাজ, যার মধ্যে ৩২৫টি তেলবাহী ট্যাংকার এখনো আটকে রয়েছে। বিশ্লেষণে কেপলারের ঝুঁকি বিশ্লেষক আনা সুবাসিচ বলেন, কিছু জাহাজ চলাচল শুরু হলেও তা খুবই সীমিত। যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারে, তাও সতর্কতার কারণে সীমিত থাকবে। এই জলপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)র প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এখানে চলাচল করত।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, চুক্তিতে প্রণালি দিয়ে ‘নিরাপদে চলাচলের’ প্রতিশ্রুতি ছিল। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরান খুব খারাপভাবে কাজ করছে… প্রণালি দিয়ে তেল চলাচল করতে দিচ্ছে না। এটা আমাদের চুক্তি নয়।’
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা অথবা তার মিত্রের মাধ্যমে ‘যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া’–এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে। ইসরায়েলের লেবাননে চলমান হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
ভারতীয় নৌবাহিনীতে দীর্ঘদিন কাজ করা সামুদ্রিক বিশ্লেষক সি উদয় ভাস্কর বলেন, প্রণালির পরিস্থিতি এখন ‘অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগে’ ভরা। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও খুব কমসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। কারণ শিপিং কোম্পানিগুলো এখনো ভীত। বিশেষ করে ইরান সমুদ্রে মাইন পেতে রেখেছে এমন সতর্কবার্তার কারণে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তেলের দাম কমলেও এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। কারণ বাজার বুঝতে পারছে যে বাস্তবে সমুদ্রপথে চলাচল এখনো প্রায় বন্ধই রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি এডিএনওসির প্রধান সুলতান আহমেদ আল জাবের বলেন, ‘এই মুহূর্তে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে যে হরমুজ প্রণালি খোলা নয়।’ তিনি আরও বলেন, এখানে প্রবেশ এখন সীমিত, নিয়ন্ত্রিত এবং শর্তসাপেক্ষ। এটি মুক্ত নৌচলাচল নয়, বরং চাপ সৃষ্টি করার একটি উপায়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গতকাল শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৩৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বুধবার ৯৫ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশা থেকে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো গতকাল শুক্রবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। জাপানের নিককেই ২২৫ সূচক প্রাথমিক লেনদেনে ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি প্রায় ২ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা