ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় রাখার ঘোষণা দিয়ে একটি কড়া বিবৃতি জারি করেছেন।
বৃহস্পতিবার(৩০ এপ্রিল) পারস্য উপসাগরীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া এই বিবৃতিতে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান তার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ বোমা হামলায় সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ও জোরালো বক্তব্য।
বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে গত দুই মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন ও 'গুন্ডামি' শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এখন পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি এই আন্তর্জাতিক জলপথ থেকে শত্রুপক্ষের তথাকথিত 'অন্যায় সুবিধা' বন্ধ করার অঙ্গীকার করেন। খামেনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নতুন ধরনের ব্যবস্থাপনা এই অঞ্চলের সব দেশের জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো পর্যন্ত তাকে জনসম্মুখে বা টেলিভিশনে দেখা যায়নি। তার এই বিবৃতিটিও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একজন উপস্থাপক পাঠ করে শোনান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নতুন করে শুল্ক বা ফি আরোপ করার পরিকল্পনা করছে। যদিও ইরান একে 'শুল্ক' না বলে জলপথ রক্ষণাবেক্ষণের সেবা মূল্য হিসেবে অভিহিত করতে চাইছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। গত ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে এক কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে ইরানের তেল শিল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। এর ফলে বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে এখন প্রতি ব্যারেল ১২০ থেকে ১২৬ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এখন দিনে মাত্র তিনটি জাহাজ চলাচল করছে।
এদিকে ইরানের এই কঠোর অবস্থান ও তেলের দাম বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের এই ঊর্ধ্বগতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার এক ভাষণে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, এই সংকট নিরসনের কোনো সহজ বা দ্রুত উপায় তার জানা নেই। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানকে মোকাবিলায় আবারও সামরিক হামলার বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে কাবু করার চেষ্টা ব্যর্থ হবে। তিনি দাবি করেন, ইতিহাস সাক্ষী থাকবে যে পারস্য উপসাগরে ইরান বিশ্বশক্তি আমেরিকাকে পরাজিত করেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের এই নিয়ন্ত্রণকে জলদস্যুতার সঙ্গে তুলনা করেছে। তারা মনে করে, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এখানে কোনো একক দেশের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বা টোল আদায়ের অধিকার নেই। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স