মধ্যপ্রাচ্যে চার সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
সোমবার (৪ মে) দুই পক্ষই একে অপরের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
কালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, ইরান এখনও পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ শুরুই করেনি।
এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন সামরিক বাহিনী সোমবার একটি বড় অভিযান চালায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' নামে একটি বিশেষ কর্মসূচি শুরু করেছেন। এর মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। এই অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনী ইরানের ছয়টি ছোট নৌযান ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া বেশ কিছু ইরানি ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
আমিরাতের বন্দরে ইরানের হামলা, হরমুজের নতুন মানচিত্র প্রকাশ
সংঘাতের প্রভাব এখন প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে ইরানি মিসাইল হামলায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল বন্দর যা দিয়ে আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানি করে। ইরান দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালীর বাইরেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের বিশাল অংশ এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তারা একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে যেখানে আমিরাতের খোরফাক্কান বন্দরকেও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় দেখানো হয়েছে। এর জবাবে আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট পদপ্রদান উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, ইরান এখানে সুস্পষ্টভাবে আক্রমণকারীর ভূমিকা পালন করছে। আবুধাবি এই হামলার প্রতিবাদে মিত্র দেশগুলোর সমর্থন পেয়েছে এবং তারা এর উপযুক্ত জবাব দেওয়ার অধিকার রাখে।
প্রণালির ভেতরে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখন চরম আতঙ্কে রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজ 'এইচএমএম নামু'র ইঞ্জিন রুমে রহস্যজনক বিস্ফোরণ ও আগুনের খবর পাওয়া গেছে। যদিও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে এটি কোনো হামলার ফল কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, আমিরাত উপকূলে দুটি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। আমিরাতের জাতীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনক নিশ্চিত করেছে তাদের একটি খালি ট্যাঙ্কার ইরানি ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সংঘর্ষের মাঝেও মার্কিন পতাকাবাহী 'অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স' জাহাজটি সফলভাবে প্রণালি পার হয়েছে বলে জানিয়েছে শিপিং জায়ান্ট মেয়ার্স্ক।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা তুঙ্গে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। পাকিস্তান বর্তমানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। ইরান একটি ১৪ দফার প্রস্তাব দিয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রস্তাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং এটি প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ধ্বংস করা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অবশ্য বলছে, এত সংঘাতের পরেও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার খুব একটা ক্ষতি করা যায়নি।