আফগানিস্তানে চরম দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের কারণে নিজেদের সন্তান বিক্রি করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক বাবা। জাতিসংঘ জানিয়েছে, দেশটির প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই এখন ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে পারছেন না। বেকারত্ব, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে রয়েছেন। এর মধ্যে আফগানিস্তানের ঘোর প্রদেশের অবস্থা ভয়াবহ। সেখানে কাজের আশায় প্রতিদিন শত শত মানুষ জড়ো হলেও কাজ পান খুবই কম।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘোরের পাহাড়ি এলাকায় বেকারত্বের প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দুই ঘণ্টায় সেখানে মাত্র তিনজন কাজ পান। অনেক পরিবার খাবারের অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। আবদুল রশিদ আজিমি নামের এক ব্যক্তি নিজের সাত বছর বয়সী যমজ মেয়েদের সামনে এনে বলেন, ‘আমি গরিব, ঋণগ্রস্ত ও অসহায়–তাই তাদের বিক্রি করতে প্রস্তুত। এক মেয়েকে বিক্রি করতে পারলে অন্তত চার বছর বাকি সন্তানদের খাওয়াতে পারব। কথা বলতে বলতে তিনি মেয়েকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।’
তার স্ত্রী কায়হান বলেন, ‘আমাদের খাওয়ার জন্য শুধু রুটি আর গরম পানি আছে। আমাদের দুই কিশোর ছেলে শহরে জুতা পালিশের কাজ করে। আরেক ছেলে ময়লা সংগ্রহ করে, যা রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’
সাঈদ আহমদ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘চিকিৎসার খরচের কারণে নিজের পাঁচ বছরের মেয়েকে আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করেছি। মেয়ের অ্যাপেনডিসাইটিস ও লিভারে সিস্ট হয়েছিল। চিকিৎসার টাকা ছিল না। তাই দুই লাখ আফগানিতে বিক্রি করেছি। টাকা থাকলে কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিতাম না। কিন্তু অপারেশন না হলে মেয়ে মারা যেতে পারত।’ রাবানি নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘ফোন করে জানানো হয়েছিল আমার সন্তানরা দুই দিন ধরে কিছু খায়নি। তখন মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করি। পরে ভাবলাম, এতে পরিবারের কী হবে? তাই কাজের খোঁজে বের হয়েছি।’
খাজা আহমদ নামের আরেক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমরা না খেয়ে আছি। আমার বড় সন্তানরা মারা গেছে। এখন পরিবারকে বাঁচাতে কাজ করতে চাই, কিন্তু বয়স বেশি হওয়ায় কেউ কাজ দিতে চায় না।’ স্থানীয় একটি বেকারিতে পুরোনো রুটি বিতরণ করা হলে মুহূর্তেই মানুষ তা ছিনিয়ে নিতে ভিড় করেন। আবার একজন মোটরসাইকেলে এসে একজন শ্রমিক খুঁজতেই ডজনখানেক মানুষ তার দিকে ছুটে যান।
এদিকে ঘোর প্রদেশের হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। নবজাতক ইউনিটের প্রতিটি শয্যাই পূর্ণ। অনেক বিছানায় আবার দুজন করে শিশু রাখা হচ্ছে। স্থানীয় এক বয়োজ্যেষ্ঠ বলেন, ‘প্রধানত অপুষ্টির কারণে গত দুই বছরে শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে গেছে। তবে মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক নথি নেই। শিশুমৃত্যুর এই আকস্মিক বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায় স্থানীয় কবরস্থানে। তাই আমরা ছোটদের এবং বড়দের কবরগুলো গণনা করলাম। যেখানে দেখা গেল ছোটদের কবরের সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ, যা থেকে বোঝা যায় যে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মৃত্যুর হার দ্বিগুণ ছিল।’
হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটের প্রধান ডা. মুহাম্মদ মুসা ওলদাত বলেন, ‘দারিদ্র্যের কারণে রোগীর চাপ প্রতিদিন বাড়ছে। কিন্তু শিশুদের সঠিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ আমাদের নেই। অনেক পরিবার হাসপাতালের খরচ ও ওষুধ কিনতে না পেরে শিশুদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে।’
চাঘচারণ প্রদেশে একটি হাসপাতালে জন্মের আগেই অপুষ্টিতে আক্রান্ত যমজ দুই শিশুর একজন মারা যায়। অন্য শিশুটি এখনো চিকিৎসাধীন। নার্স ফাতিমা হুসাইনি বলেন, ‘শুরুর দিকে শিশুদের মৃত্যু দেখা খুব কঠিন ছিল। এখন এটি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে।’
তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বিবিসিকে বলেন, ‘২০ বছরের আগ্রাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের প্রবাহে একটি কৃত্রিম অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল। আগ্রাসন শেষ হওয়ার পর আমরা দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নানা সংকটের মুখে পড়েছি। মানবিক সহায়তাকে রাজনীতিকরণ করা উচিত নয়।’
নিজেদের এমন অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণে তালেবান সরকার বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানান হামদুল্লাহ ফিতরাত। বড় বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দরিদ্রতা হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে এ প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদির কারণে জরুরি সহায়তা ছাড়া লাখ লাখ মানুষকে বাঁচানো যাবে না বলে জানান তিনি।
দুই বছর আগেও দেশটিতে অনেক পরিবার খাদ্য সহায়তা পেত। ময়দা, তেল, ডাল ও শিশুদের পুষ্টি সহায়তা দেওয়া হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নারীদের ওপর তালেবান সরকারের বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে আন্তর্জাতিক দাতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।
একসময় আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় দাতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর দেশটি প্রায় সব সহায়তা বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশও সহায়তা কমিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে আফগানিস্তান যে সহায়তা পেয়েছে, তা ২০২৫ সালের তুলনায় ৭০ শতাংশ কম। সূত্র: বিবিসি