যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনায় ফিরেছে। আপাতত উভয় পক্ষের সামরিক অভিযান স্থগিত রয়েছে। তবে যুদ্ধের প্রভাব এখনো কাটেনি। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরেও এর প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও বাড়ছে চাপ।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে। অন্যদিকে কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক নৌপথে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এদিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে দ্বিতীয় দফায় মার্কিন নৌ অবরোধের মুখে পড়েছে ইরান। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর বিষয়ও বিবেচনা করছে দেশটির সরকার। এমন সিদ্ধান্তে জন-অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে দেশটি ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের অপরিশোধিত তেল বিক্রি করেছে। এ ছাড়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যকর থাকার সময় আরও ৬৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি হয়েছে।
১৭ জুন স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতার পর হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নৌ অবরোধও শিথিল করে। এতে বৈশ্বিক তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে।এর আগে ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া প্রথম নৌ অবরোধ দুই মাসের কিছু বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। সে সময় ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যে নেমে আসে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ চললে রপ্তানি আয় আরও কমবে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
তেল রপ্তানিতে বাধা ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, কাঠামোগত সমস্যা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটির অর্থনীতি আগেই চাপে ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের অবকাঠামোরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। সংঘাত বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ইরানের সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২৩ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। পার্স স্পেশাল ইকোনোমিক এনার্জি জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেখাভাত আসাদি বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রতিদিন অন্তত ১০ কোটি ঘনমিটার উৎপাদন পুনরুদ্ধারের আশা করছে ইরান।
দেশটিতে প্রতিদিন ২ কোটি লিটারের বেশি পেট্রলের ঘাটতি রয়েছে। আমদানি, মজুত ব্যবহার এবং নাগরিকদের কম জ্বালানি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। সরকার ব্যক্তিগত মাসিক পেট্রল কোটাব্যবস্থার তৃতীয় ধাপের পেট্রলের দাম দ্বিগুণ করার কথা বিবেচনা করছে। অতীতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।
তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এতে পানি সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ‘কর্মসংস্থান রক্ষায় সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় চীনের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। যুদ্ধের কারণে তারা তেল আমদানি কমিয়েছে। রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিলসংশ্লিষ্ট সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর আগে যেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল ৩০ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ, এখন সেই হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
লোহিত সাগর ও কাস্পিয়ানেও যুদ্ধের প্রভাব
যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ নেই। গত সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবগামী জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করে। তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি তেল স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর জবাবে ইয়েমেনে বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
অন্যদিকে কাস্পিয়ান সাগরে একটি জাহাজে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইউক্রেন। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি, জাহাজটি ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক মালামাল বহন করছিল।ঘটনার পর তেহরানে ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। দেশটি সতর্ক করেছে, এই হামলার জবাব দেওয়া হবে।
যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাবের মধ্যে ইরানের রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থি বিশ্লেষকরা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।সূত্র: আল-জাজিরা