চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) সাত মাস পার হলেও উন্নয়নকাজে গতি নেই। ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে তেমন প্রকল্প আসছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যস্ততাও কমে গেছে। গত জুলাই থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র সাতটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় ৫৭টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনার সরকার গত ২ জুলাই ১১টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র ছয়টি সভায় ৪৬টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে ১৬২টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী ৩৫টি প্রকল্পের অনুমোদন দেন। গত বছর মোট ১৯৭টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। বছরের ব্যবধানে অনুমোদন কমেছে ৭১ শতাংশ।
গত সাত মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নও পাঁচ বছরে সর্বনিম্নে নেমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ধাক্কা লেগেছে চলমান প্রক্রিয়ায়, অর্থায়নের সমস্যা হয়েছে।
এ ব্যাপারে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নকাজে ধাক্কা লেগেছে। অনেক কিছু পাল্টে গেছে। তাই এই সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সতর্কভাবে প্রকল্প প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। আগে রাজনৈতিকভাবে অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে এসব যাচাই-বাছাই করে কিছু বাদ দিয়েছে। এখন অর্থায়নেও সমস্যা আছে। এসব বিবেচনায় প্রকল্প কম অনুমোদন হয়েছে। সেই দিক থেকে ঠিক আছে বলা যায়।’ অপর এক প্রশ্নের উত্তরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বছরের প্রথমে তেমন এডিপি বাস্তবায়ন হয় না। এটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। তা কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হলে খরচ বেড়ে যাবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নজরদারি বাড়াতে হবে।’
অন্য বছরের মতো চলতি অর্থবছরের উন্নয়নকাজের জন্য শেখ হাসিনার সরকার ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অনুমোদন দেয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার সরকার কাজ শুরু করে। পরে ২ জুলাই প্রথম একনেক সভায় ১১টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন হয়। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর এই সরকারের প্রথম ও চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক) অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। যেখানে আগের বছরের একই মাসে অনুষ্ঠিত দুটি একনেক সভায় ৩৮টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রীও সে সময় ৫০ কোটি টাকার নিচে ১৪টি প্রকল্পের অনুমোদন দেন।
২৫ নভেম্বর একনেকের তৃতীয় সভায় পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দেওয়া হয়। ৭ অক্টোবর চতুর্থ সভায় চারটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে খরচ ধরা হয় ২৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর একটির রেল কাম রোড সেতু নির্মাণে নতুন প্রকল্পে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ ধরা হয়েছে। জাপানি ঋণে এটি করা হবে। এই সরকার এখন পর্যন্ত ছয়টি সভা করেছে। সভায় মোট ৪৬টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। তাতে খরচ ধরা হয় ৭৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া সাবেক সরকারের আমলে চলতি অর্থবছরের প্রথম সভায় ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দেওয়া হয়। এভাবে সাতটি একনেক সভায় গত সাত মাসে মাত্র ৭৪ হাজার ৭০১ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আইএমইডির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত সাত মাসে অর্থ কম খরচ হয়েছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খরচ করেছে ৫৯ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে খরচ হয়েছিল ৭৪ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নকাজে ধাক্কা লেগেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব পালিয়ে গেছেন। তাদের অনুসরণ করে অনেক ঠিকাদারও আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে কাজ। সরকারের কড়াকড়ির ফলে অনেক প্রকল্পে অর্থায়নও বন্ধ হয়ে আছে। কোনো কোনো প্রকল্প রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে বাতিলও করা হয়েছে। ফলে অগ্রগতি কমে গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি মাসে পরিকল্পনার এক শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২ শতাংশের নিচে রয়েছে এনবিআর। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগসহ ৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগও কাজ করেছে ১০ শতাংশের নিচে। এভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উন্নয়নকাজে ধীরগতি দেখা গেছে। গত সাত মাসে মাত্র ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। এই অগ্রগতি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন।
চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ১ হাজার ৩৫৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ স্থানীয় সরকার বিভাগে। এখানে ২৩১টি প্রকল্পে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়। এরপর বিদ্যুৎ বিভাগের ৫৭টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ রাখা হয় ৩৩ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ৩০ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। এভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


