মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠের নিচে প্রাচীন বালুকাময় সৈকতের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছে চীনের ঝুরং রোভার। মঙ্গলের উত্তরের সমতল ভূমিতে একসময় বিশাল সাগর ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ বিলিয়ন বছর আগে বিদ্যমান ছিল।
চীনের ঝুরং রোভার ২০২১ সালের মে থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত মঙ্গল গ্রহে কার্যক্রম পরিচালনার সময় প্রায় ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার এলাকা অতিক্রম করে। এই এলাকায় প্রাচীন উপকূলরেখার অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রোভারের গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার মাটির ৮০ মিটার গভীর পর্যন্ত স্ক্যান করে এবং সেখানে বালুকাময় উপকূলরেখার মতো গঠন দেখতে পায়।
কীভাবে পাওয়া গেল এই প্রমাণ
রাডার চিত্রে ভূগর্ভে ১০ থেকে ৩৫ মিটার পুরু উপাদানের স্তর শনাক্ত করা হয়েছে, যার বৈশিষ্ট্য বালুর মতো এবং একই দিকে ঢালু ছিল। এটি পৃথিবীর সমুদ্রসৈকতের মতো, যেখানে পানির সংস্পর্শে বালু ঢালু হয়ে থাকে। গবেষকরা রোভারের চলার পথের ১ দশমিক ২ কিলোমিটার জুড়ে এই কাঠামোর মানচিত্র তৈরি করেছেন।
চীনের তিয়ানওয়েন-১ মিশনের বিজ্ঞান দলের সদস্য গুয়াংজু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী হাই লিউ বলেন, ‘মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছরে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এই গঠনগুলো দৃশ্যমান ছিল না। তবে গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা প্রথমবারের মতো এমন কিছু উপকূলীয় উপাদান জমা হওয়ার সরাসরি প্রমাণ পেলাম।’
গবেষকরা জানান, পৃথিবীতে এই আকারের সৈকত তৈরি হতে কয়েক মিলিয়ন বছর লাগত। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মঙ্গল গ্রহে একটি বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী জলরাশির উৎস ছিল। যেখানে ঢেউ ক্রিয়াশীল ছিল, যা কাছাকাছি উচ্চভূমি থেকে নদীর মাধ্যমে পলি প্রবাহিত করত।
ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার অন্যতম লেখক লিউ বলেন, ‘পৃথিবীর মতো একই প্রক্রিয়ায় সমুদ্রসৈকতে তৈরি হতো ঢেউ ও জোয়ার। এই ধরনের সমুদ্র মঙ্গল গ্রহের জলবায়ুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করত। এর ভূদৃশ্য তৈরি ও জীবন উদ্ভবের জন্য সম্ভাব্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করত।’ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী মাইকেল মাঙ্গা বলেন ‘উপকূলরেখা জীবনের প্রাচীন প্রমাণ খোঁজার জন্য দুর্দান্ত স্থান। মনে করা হয়, পৃথিবীর প্রথম দিকে জীবনের সূচনা এমন উপকূলবর্তী অঞ্চলে হয়েছিল।’
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের সাগর মঙ্গলের জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করেছিল এবং সেখানে জীবনের উত্থান ও বিকাশের সম্ভাব্য পরিবেশ তৈরি করেছিল। রোভারটি ইউটোপিয়া প্লানিটিয়ার দক্ষিণ অংশে অনুসন্ধান করেছে, যা মঙ্গল গ্রহের উত্তর গোলার্ধের একটি বিশাল সমভূমি।
গবেষকরা অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও বিবেচনা করেছেন, যেমন বায়ুপ্রবাহের ফলে তৈরি হওয়া বালুকা টিলা নিয়ে। তবে গবেষণায় প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো সেই সম্ভাবনাগুলোর সঙ্গে মেলেনি। পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-গবেষক ও সহ-লেখক বেনজামিন কার্ডেনাস বলেন, ‘বালুকা টিলাগুলো সাধারণত গুচ্ছাকারে থাকে এবং তাদের নির্দিষ্ট বিন্যাস থাকে, যা এখানে দেখা যায়নি।’ এ ছাড়া লাভা প্রবাহের কারণেও এমন গঠন হয় না। সৈকতগুলোর বৈশিষ্ট্য কেবল পর্যবেক্ষণগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে মেলে।’
প্রাচীন সমুদ্রের পানি কোথায় গেল?
পৃথিবী, মঙ্গল ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছিল। এর মানে ডিউটেরোনিলাস নামে ওই প্রাচীন সাগর প্রায় ১ বিলিয়ন বছর পর অদৃশ্য হয়ে যায়, যখন মঙ্গলের জলবায়ু নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর কিছু পানি মহাশূন্যে হারিয়ে গেছে, আবার কিছু পানি মঙ্গলের ভূগর্ভে আটকা পড়ে থাকতে পারে। নাসার রোবটিক ইনসাইট ল্যান্ডারে প্রাপ্ত ভূমিকম্পের ডেটার ওপর ভিত্তি করে গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভাঙা আগ্নেয় শিলার মধ্যে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠের গভীরে তরপানির একটি বিশাল জলাধার থাকতে পারে।
দশক ধরে বিজ্ঞানীরা উপকূলরেখার মতো মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্যগুলো খুঁজে বের করতে স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করেছেন। তবে পৃষ্ঠের এই ধরনের কোনো প্রমাণ বিলিয়ন বছরের বায়ু ক্ষয় বা অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুছে বা বিকৃত হতে পারত।
নতুন আবিষ্কৃত কাঠামোটির ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়, যা ধূলিঝড়, উল্কা আঘাত বা আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে জমা হওয়া উপাদানের নিচে চাপা পড়েছিল।কার্ডেনাস বলেন, ‘এগুলো সুন্দরভাবে সংরক্ষিত কারণ এগুলো এখনো মঙ্গল গ্রহের ভূগর্ভে চাপা পড়ে আছে।’
গবেষণাটি মঙ্গলে প্রাচীন সমুদ্র এবং সেখানে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মঙ্গলের উপকূলরেখায় প্রাচীন জীবনের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, যা সৌরজগতের ইতিহাস সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা দেবে।
/ফারজানা ফাহমি