এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব কেন? কেন এখানে শূন্যতার পরিবর্তে গ্রহ, নক্ষত্র আর ছায়াপথের বিশাল সমাহার? বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যের সমাধানে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনের মূল কারণ পদার্থ (matter) এবং প্রতিপদার্থ (antimatter)-এর মধ্যকার এক সূক্ষ্ম অসমতা। এই সামান্য ভিন্নতার জন্যই আমাদের অস্তিত্ব।
বিজ্ঞানীদের মতে, পদার্থ ও প্রতিপদার্থ একে অপরের বিপরীত। পরমাণুর মধ্যে থাকা ইলেকট্রন, প্রোটন বা নিউট্রনের মতো কণিকাগুলো হলো পদার্থ। অন্যদিকে প্রতিপদার্থ কণাগুলোর বৈশিষ্ট্য একই থাকলেও তাদের বৈদ্যুতিক চার্জ থাকে বিপরীত। ইলেকট্রনের প্রতিপদার্থ হলো পজিট্রন, যার চার্জ ধনাত্মক।
তবে পদার্থ ও প্রতিপদার্থ একসঙ্গে থাকতে পারে না। একে অপরের সংস্পর্শে এলে তারা উভয়েই ধ্বংস হয়ে যায়। এতে গামা রশ্মির তীব্র ঝলকানি তৈরি হয়। মহাবিশ্বের শুরুতে এই দুটি কণা প্রায় সমান পরিমাণে তৈরি হয়েছিল। তবে আজ মহাবিশ্বে প্রতিপদার্থের পরিমাণ নেই বললেই চলে। এটি বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিরাট রহস্য।
প্রায় ১০০ বছর আগে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে যুগান্তকারী কাজের সময় ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাক প্রথম প্রতিপদার্থের ধারণা দেন। ১৯৩০-এর দশক থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এর অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের মতো শক্তিশালী কণা ত্বরণযন্ত্রে বিজ্ঞানীরা প্রতিপদার্থ তৈরি করতে পারছেন।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটন-এর পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক পাসকুয়ালে দি বারি জানিয়েছেন, ডিরাকের তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিস্ফোরণের (বিগ ব্যাং) পর পদার্থ ও প্রতিপদার্থ সমান পরিমাণে তৈরি হওয়ার কথা ছিল। যদি তাই হতো, তাহলে একে অপরকে বিলীন করে দেওয়ার পর মহাবিশ্বে কিছুই অবশিষ্ট থাকত না।
লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কণা পদার্থবিদ তারা শিয়ার্স বলেন, ‘আমরা মনে করি, মহাবিস্ফোরণের শুরুতে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের পরিমাণ ৫০-৫০ ছিল। তবে এর পরপর কোনো এক কারণে পদার্থের পরিমাণ প্রতিপদার্থের চেয়ে সামান্য বেড়ে যায়। এই সামান্য পার্থক্য বা অপ্রতিসাম্য কেন তৈরি হয়েছিল, তা এখনো আমাদের অজানা। এই রহস্যের সমাধান এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।’
মজার বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনটিকে ‘পদার্থ’ আর কোনটিকে ‘প্রতিপদার্থ’ বলা হবে, তা অনেকটা ঐচ্ছিক। যদি প্রতিপদার্থ কণার পরিমাণ বেশি থাকত, তাহলে হয়তো মহাবিশ্ব অ্যান্টি-অ্যাটম বা অ্যান্টি-মলিকিউল দিয়ে তৈরি হতো এবং আমরা তাকে ‘পদার্থ’ বলতাম।
আমরা কি মহাজাগতিক ধ্বংসাবশেষ?
অধ্যাপক দি বারির মতে, মহাবিস্ফোরণের ঠিক পরপর হয়তো এখনকার চেয়ে কয়েক শ কোটি গুণ বেশি পদার্থ ও প্রতিপদার্থ কণা ছিল। তাদের মধ্যে অধিকাংশ একে অপরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আজ যা কিছু দেখছি, তা সেই মহাধ্বংসের পর টিকে যাওয়া সামান্য কিছু ‘অবশিষ্ট’ বস্তুকণা দিয়ে তৈরি।
১৯৬৭ সালে এই অসমতার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সোভিয়েত পদার্থবিদ আন্দ্রেই সাখারভ। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক কণা পদার্থবিদ রেমন্ড ভলকাস জানিয়েছেন, সাখারভের তত্ত্ব অনুযায়ী, পদার্থ ও প্রতিপদার্থ কণা কিছু মৌলিক শক্তির অধীনে হুবহু বিপরীত আচরণ করে না। এই ঘটনাকে ‘সি অ্যান্ড সিপি ভায়োলেশন’ বলা হয়।
এর মূলনীতি জানা গেলেও নির্দিষ্ট কারণ এখনো অজানা। বিজ্ঞানীরা কণা ত্বরণযন্ত্রের পরীক্ষা, মহাজাগতিক বর্ণালি এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই মহাজাগতিক রহস্যের গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। এই অসমতার কারণ জানতে পারলেই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে।


