মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে যেমন বার্ধক্য আসে, তেমনি এর প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কেও। তবে সাম্প্রতিক এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ ও নারীর মস্তিষ্ক একই গতিতে বুড়িয়ে যায় না। বরং পুরুষের মস্তিষ্ক নারীর তুলনায় দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো ব্যাধি নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রচলিত কিছু ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী ১৭ থেকে ৯৫ বছর বয়সী ৪ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্কের মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণ করেছেন। দীর্ঘ তিন বছর ধরে পরিচালিত এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অন্তত দুবার এমআরআই স্ক্যান করা হয়, যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মস্তিষ্কের পরিবর্তনগুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
পুরুষের মস্তিষ্কের দ্রুত ক্ষয়
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, পুরুষদের মস্তিষ্কের আয়তন হ্রাস পাওয়ার গতি ও বিভিন্ন অঞ্চলের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার হার নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে মস্তিষ্কের ‘পোস্ট-সেন্ট্রাল কর্টেক্স’ অঞ্চলে এই পার্থক্য সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এই অংশটি শরীরের স্পর্শ, তাপমাত্রা, ব্যথা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান বোঝার মতো অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই অঞ্চলে পুরুষদের মস্তিষ্কের বার্ষিক ক্ষয়ের হার গড়ে ২ শতাংশ, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১.২ শতাংশ।
এ ছাড়া দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও শারীরিক নড়াচড়ার সঙ্গে জড়িত মস্তিষ্কের অন্য অংশগুলোতেও পুরুষদের ক্ষেত্রে দ্রুত ক্ষয় ও পাতলা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্নায়বিক সক্ষমতা নারীদের তুলনায় দ্রুত হ্রাস পায়।
নারীদের ক্ষেত্রে আলঝেইমারের ঝুঁকি কেন বেশি?
বিশ্বজুড়ে আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দীর্ঘকাল ধরে অনেক বিজ্ঞানী মনে করতেন, হয়তো নারীদের মস্তিষ্ক দ্রুত বুড়িয়ে যায় বলে তারা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। তবে বর্তমান গবেষণা সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। যদি পুরুষের মস্তিষ্ক দ্রুত বুড়িয়ে যায়, তবে কেন নারীরা আলঝেইমারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন? এই রহস্য নতুন করে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক চার্লস মার্শাল বলেন, ‘এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে কেবল বয়স বৃদ্ধি আলঝেইমারের একমাত্র কারণ নয়। বার্ধক্য ও আলঝেইমার সরাসরি একটি অন্যটির কারণ নয়।’ তার মতে, মস্তিষ্কে যখন ‘অ্যামাইলয়েড’ ও ‘টাউ’ নামক প্রোটিন জমা হতে থাকে, তখন আলঝেইমার শুরু হয়। সুস্থ ও তরুণ মস্তিষ্ক এই প্রোটিনের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিরোধ করতে পারলেও বুড়িয়ে যাওয়া মস্তিষ্কের জন্য তা কঠিন হয়ে পড়ে।
জিন ও হরমোনের ভূমিকা
কেন নারীরা বেশি ঝুঁকিতে আছেন, তা বুঝতে বিজ্ঞানীরা বিকল্প কারণ খুঁজছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় ‘Kdm6a’ নামের একটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন। এই জিনটি এক্স ক্রোমোসোমে থাকে। যেহেতু নারীদের দুটি এক্স ক্রোমোসোম থাকে, তাই তারা এই জিনের দ্বিগুণ প্রভাবের শিকার হতে পারেন।
গবেষক অধ্যাপক রোন্ডা ভোসকুলের মতে, এই জিনটি মস্তিষ্কের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী কোষগুলোতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। কম বয়সে এই প্রদাহ শরীরকে ইনফেকশন থেকে রক্ষা করলেও মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর তা ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। সাধারণত নারীদের শরীরে থাকা ইস্ট্রোজেন হরমোন মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয়। তবে মেনোপজের পর যখন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়, তখন ওই জিনের প্রভাবে মস্তিষ্কের প্রদাহ বেড়ে যায় এবং আলঝেইমারের ঝুঁকি তৈরি হয়। গালওয়ে ইউনিভার্সিটি ও বোস্টন ইউনিভার্সিটির আরেকটি গবেষণাও নিশ্চিত করেছে যে, অল্প বয়সে মেনোপজ হওয়া নারীদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
যদিও এই গবেষণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আলঝেইমার রিসার্চ ইউকে-এর গবেষণা-প্রধান ড. জ্যাকি হ্যানলি জানিয়েছেন, এই গবেষণার সব অংশগ্রহণকারী সুস্থ ছিলেন। মাত্র তিন বছরের তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আলঝেইমার বিকশিত হতে কয়েক দশক সময় নিতে পারে। তাই পুরুষ ও নারীর মস্তিষ্কের এই পার্থক্যের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে আরও কয়েক বছর বা যুগের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
তবে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ও জিনের প্রভাব কমানোর মাধ্যমে নারীদের আলঝেইমারের ঝুঁকি কমানোর বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। পুরুষের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া ও নারীদের জিনগত ঝুঁকির এই অমীমাংসিত সমীকরণ হতে পারে আগামী দিনের চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় মাইলফলক।


