শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় করা মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বিচারিক আদালত। অধস্তন আদালতের রায় ঘোষণার পর এই রায় কার্যকর হবে কীভাবে–এই আলোচনা সামনে এসেছে।
নিয়ম অনুযায়ী অধস্তন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) নিতে হয়। এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত শুনানির জন্য আগামী রবিবার (১৪ জুন) থেকে হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রামিসাকে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায় ঘোষণার পর এ তথ্য জানান তিনি। এ-সংক্রান্ত মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল হাইকোর্টে দ্রুত শুনানির জন্য গতকাল আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। এরপর প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানান। সেই সঙ্গে আগামী রবিবার থেকে ওই বেঞ্চের বিচারিক কার্যক্রম শুরুর কথাও জানান প্রধান বিচারপতি। আদালত থেকে বের হওয়ার পর সাংবাদিকদের এসব কথা জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
অন্যদিকে রামিসা হত্যার ঘটনায় করা মামলাসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমনসংক্রান্ত মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের একটি প্যানেল গঠন করা হয়েছে বলেও জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
গতকাল মামলার রায় ঘোষণার পর সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে কথা বলেন আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। আমরা আইনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ৬ কার্যদিবসে বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পেরেছি। এ রায়ে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আশা করি, উচ্চ আদালতে গেলেও এ রায় কার্যকর থাকবে।’
আইনমন্ত্রী মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়া-সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সাত দিনের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স কনফার্মেশনের জন্য হাইকোর্ট ডিভিশনে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। তিনি বলেন, ‘এসব মামলায় পেপারবুক প্রস্তুত করতে হয়। পেপারবুক সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্ট সিরিয়ালি মৃত্যুদণ্ডগুলোর মামলা নিষ্পত্তি করেন। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন সব ডেথ রেফারেন্স খুব দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আরও বেশি ফোকাসড সিদ্ধান্ত নেবেন।’
আইনমন্ত্রী বলেন, এই হত্যা মামলাসহ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা এ ধরনের অন্য মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘আমি লেগে থাকব; যাতে করে রামিসাসহ এমন সব ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা যায়। আমরা আদালতের কাছে নিবেদন করব সব দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য।’
এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, বিচারিক আদালত ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর পর তারা দ্রুততম সময়ে মামলার শুনানির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে পেপারবুক করতে হতে পারে। এ জন্য প্রধান বিচারপতির বিশেষ নির্দেশনার প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে আপিল নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করব। সেটা দ্রুততম সময়ে করব।’
এদিকে রায় ঘোষণার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই হত্যা মামলায় জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে ডিএনএ টেস্ট ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সংগ্রহ করে দ্রুত চার্জশিট দিয়ে বিচারে তারা সহযোগিতা করেছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সহযোগিতা করেছি। আদালত ন্যায়বিচার করেছেন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটা মাইলফলক। আমরা সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনব ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে বলব যাতে এই হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স একটু এগিয়ে আনা যায়। তাহলে আর রায় বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে না।’
এদিকে আইনজীবীরা বলছেন, অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকলেও রায় কার্যকরে আছে আরও আইনি প্রক্রিয়া। তারা জানান, আইন অনুযায়ী অধস্তন আদালতের রায় অনুমোদনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও আপিল করার সুযোগ পাবেন।
হাইকোর্টে যে পক্ষ হেরে যাবে, সেই পক্ষ আপিল বিভাগে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারবে। আবার আপিল বিভাগে যে পক্ষ হেরে যাবে ওই পক্ষ রিভিউ আবেদন করতে পারবে। সর্বশেষ রায়ে কারও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি ওই আবেদন নামঞ্জুর করলে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করা হয় বলে জানান আইনজীবীরা।