চলতি বছরের ২৫ জুন বাড়ি গিয়েছিলাম। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় আমার বাড়ি। পরের দিন সকালে কলেজ রোড ধরে হাঁটছিলাম। মোকামিয়াকান্দা এলাকার এক বাড়ির পুকুরের পাশে পেয়ে গেলাম নিসিন্দার দেখা। গাছটি বাতাসে খুব দুলছিল। এর মধ্যেই ছবি তুলে ফেললাম।
কবি আহসান হাবীবের ‘আমি কোনো আগন্তুক নই’ কবিতায় এ নিসিন্দার কথা এসেছে-
‘কার্তিকের ধানের মঞ্জরী সাক্ষী
সাক্ষী তার চিরোল পাতার
টলমল শিশির, সাক্ষী জ্যোৎস্নার চাদরে ঢাকা
নিসিন্দার ছায়া’
নিসিন্দা বড় আকারের গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ। এটি ১-৫ মিটারের মতো উঁচু হয়। ঘনসন্নিবিষ্ট শাখা ও পাতায় এটি খুব ছায়াঘন। নিসিন্দার কাণ্ড এবড়োখেবড়ো, পাক খাওয়া। এর উপশাখাসমূহ গাঢ় সাদা ও চতুষ্কোণাকার। পাতা যৌগিক, দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার লম্বা হয়। পাতা বর্শা বা ফলক আকৃতির এবং লোম দিয়ে আবৃত। পাতায় পত্রকের সংখ্যা তিনটি। তার মধ্যে দুটি জোড় এবং একটি বেজোড়। পাতার স্বাদ তেতো। বাকল পাতলা ও ধূসর বর্ণের।
নিসিন্দার বৈজ্ঞানিক নাম Vitex negundo। এটি Lamiaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদ ইংরেজিতে Chinese chaste tree, five-leaved chaste tree, horseshoe vitex নামে পরিচিত। নিসিন্দার আদি নিবাস দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকা এবং এশিয়া।
দেশের পতিত ভিটা, জঙ্গলে নিসিন্দা উদ্ভিদ দেখতে পাওয়া যায়। বাগান, নলকূপের পাশে ও খেতে বেড়া দেওয়ার জন্য এই গাছ খুব উপযোগী।
নিসিন্দার ফুল ছোট, নীলাভ বেগুনি বর্ণের এবং সুগন্ধযুক্ত। পুষ্পমঞ্জরি প্যানিকল। পুষ্পঞ্জরির দৈর্ঘ্য ১০-২০ সেন্টিমিটার। ফল ড্রুপ, গোলাকার, পাকলে কালো বর্ণের হয়। প্রায় সারা বছর ফুল ও ফল হয়।
পুরো গাছ গন্ধযুক্ত। কীটপতঙ্গ এই গন্ধ সহ্য করতে পারে না। তাই খাদ্যশস্য সংরক্ষণে স্থানীয়ভাবে এর শুকনো পাতা ও ডাল ব্যবহৃত হয়।
নিসিন্দার অনেক ভেষজ গুণ রয়েছে। এর পাতার রস হাঁপানি ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে বিশেষ কার্যকরী। হৃৎপিণ্ডের জন্যও উপকারী। পাতার রস স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, গেঁটের ব্যথা কমায় এবং অরুচি দূর করে। বারবার প্রস্রাব হলে পাতা গুঁড়ো করে পানিতে মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। পা মচকে বা ফুলে গেলে নিসিন্দার পাতা গরম করে আক্রান্ত স্থানে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলে উপকার পাওয়া যায়। রান্নাঘরে পোকার উপদ্রব থাকলে নিসিন্দাগাছের ডাল ও পাতা রেখে দিলে পোকার আনাগোনা কমে যায়। সন্ধ্যাবেলায় ২-৩টি পাতা পোড়ালে মশা থাকে না।
বীজ ও কাটিংয়ের মাধ্যমে নিসিন্দার বংশ বৃদ্ধি হয়। নিসিন্দার কাঠ ধূসর, সাদা ও শক্ত। নির্মাণকাজে ও জ্বালানি হিসেবে এই কাঠ ব্যবহৃত হয়। এর ছাই থেকে রং তৈরি হয়।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ