সাহিত্যে নতুন ও ভিন্নধারার লেখকদের সামনে আনা এবং তাদের কাজ নিয়ে গভীর আলোচনা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও ‘খবরের কাগজ’-এর সম্পাদক মোস্তফা কামাল।
তিনি বলেন, ‘পাঠকের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখকের কাজ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে পর্যাপ্ত আলোচনায় আসে না।’
রবিবার (১২ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ঔপন্যাসিক ফয়েজ তৌহিদুল ইসলামের সাম্প্রতিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
চেতনা বিকাশ থিয়েটার এবং আঞ্চলিক ভাষাচর্চা কেন্দ্র যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিচারপতি মাহবুব উল ইসলাম। মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান।
মোস্তফা কামাল বলেন, ‘লেখক তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে। সাংবাদিকতা জীবনের শুরু থেকেই তিনি তাকে চেনেন। ফলে ব্যক্তি ও লেখক হিসেবে তার চিন্তা-দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তিনি অবগত।’
তৌহিদুল ইসলামের লেখার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তার উপন্যাসগুলোর নামেই আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। যেমন- ‘রবির দ্বিতীয় বিয়ে’, ‘ইহকালে এসব হয়’, ‘পিতা’, ‘লোনা জলে বসবাস’, ‘ঠাকুরবাড়ির গোপন ডায়েরি’, ‘মুনিয়া মারা গেছে’, ‘শ্রেষ্ঠ রাধুনি পুরস্কার’ এবং ‘তার নাম রাখি স্বাধীনতা’। উপন্যাসগুলোর নামই পাঠকের কৌতূহল জাগায়। এর মধ্যে কয়েকটি উপন্যাস পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে অনলাইন ও অফলাইনে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।’
মোস্তফা কামালের ভাষ্য, তৌহিদুল ইসলাম শুধু গল্প বলেন না, পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস নির্মাণ করেন। তার লেখায় সময়, দর্শন ও চিন্তার প্রতিফলন থাকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘রবির দ্বিতীয় বিয়ে’ উপন্যাসের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাদম্বরী দেবীকে ঘিরে জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে নতুন এক কল্পজগৎ নির্মাণ করা হয়েছে।’
এ ছাড়া ‘তার নাম রাখি স্বাধীনতা’ উপন্যাসে সমসাময়িক এক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরার কথাও বলেন তিনি।
একটি সাধারণ চরিত্র কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতায় জড়িয়ে পড়ে, তা দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন লেখক এটিকে তিনি উল্লেখ করেন ‘বিস্ময়কর নির্মাণ’ হিসেবে।
তৌহিদুল ইসলামের লেখার বহুমাত্রিকতার কথাও তুলে ধরে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘উপন্যাসের পাশাপাশি গান রচনাতেও তার সাফল্য রয়েছে এবং আধ্যাত্মিক পাঠের প্রভাব তার সাহিত্যকর্মে স্পষ্ট।’
ভাষার দক্ষতা প্রসঙ্গে তিনি হুমায়ূন আহমেদের একটি মন্তব্য উল্লেখ করেন ‘যত বেশি পড়বে, ভাষার ওপর তত বেশি দখল আসবে।’
এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি মনে করেন, তৌহিদুল ইসলামের ভাষাশক্তি তার বিস্তৃত পড়াশোনারই প্রতিফলন।
সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে আক্ষেপ জানিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সময়কে ধারণ করে এমন লেখা এখন তুলনামূলক কম। অনেক লেখায় বর্তমান সমাজ, অর্থনীতি ও বাস্তবতার জটিলতা অনুপস্থিত থাকে।’ পাশাপাশি সাহিত্যসমালোচনার অভাবও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, আগে যেমন কাজী নজরুল ইসলাম কঠোর সমালোচনার মধ্য দিয়ে নিজেকে শাণিত করেছেন, তেমন পরিবেশ এখন আর দেখা যায় না।
তিনি বলেন, ‘পত্রিকাগুলোতেও প্রকৃত সাহিত্যসমালোচনা কমে গেছে; যা হচ্ছে, তা মূলত প্রশংসা।’
নতুন লেখকদের নিয়ে আলোচনা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘তৌহিদুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আরও বিস্তৃত মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। তিনি লিখে যাচ্ছেন এটাই একজন লেখকের কাজ। আর সেই লেখাকে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা আমাদের দায়িত্ব।’
জয়ন্ত সাহা/রিফাত/