বিগত সময়ে অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষার প্রসার হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। শনিবার (৫ অক্টোবর) রাজধানী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ভৌত অবকাঠামো তৈরি করেছি আমরা। আমরা এত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছি, গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছি কিন্তু তার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরি করতে পারিনি। এটা সত্যিকারের সমস্যা। এটি চরম আকার ধারণ করেছে।’
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, শিক্ষায় যদি সমতার বিষয় কথা বলি, সব শিশুর মানসম্মত মৌলিক শিক্ষার যে অধিকার সেখানে যদি বৈষম্য থাকে, তাহলে সেটা বংশানুক্রমিকভাবে এটা চলতে থাকে। শিক্ষার বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূল কারণ আমরা গবেষণায় দেখেছি। পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচিত সরকার কাজ করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আজকাল ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে অনেক বিতর্ক হচ্ছে। একটা সমস্যা হল এখনকার প্রজন্ম ছাত্র রাজনীতির নামে চরম অপরাজনীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং দখলদারি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ বিশ্বমানের উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা। সেই সঙ্গে মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তার স্বাধীনতা। যেকোন বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটা আচরণবিধি নির্ধারিত থাকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি আশা করব ছাত্র-শিক্ষক তাদের প্রজ্ঞা দিয়ে এবং পরিস্থিতির বিবেচনায় তাদের নিজস্ব আচরণবিধি তৈরি করতে পারবেন।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি স্কুল, কলেজের পরিচালনা বোর্ডে অপরাজনীতির ফলে সেখানে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের কথা শোনা হতো। শুনেছি সর্বস্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়োগ বাণিজ্যে চলে গেছে। কিন্তু তার বিকল্প হিসেবে বেসরকারি শিক্ষকদের কেন্দ্রীয়ভাবে যোগ্যতা নির্ধারণ এবং পদায়নের যে পদ্ধতি এখন চালু আছে, সেখানে শিক্ষকদের নিজ এলাকা ও পরিবার ছেড়ে দূর-দুরান্তে ছুটে গিয়ে স্কুলে গিয়ে দুদর্শার দিনযাপন করতে হয়, তা এক কথায় মর্মান্তিক। সেটাও আমি প্রতিদিন, শুনছি। একবারে সম্ভব না হলেও অন্তত আংশিক সমাধানের চিন্তা করা যায়।
সব পেশায় নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষকরা বঞ্চিত ঠিক, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে সব পেশার মতো শিক্ষকদেরও জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধের বিষয় আছে। জবাবদিহিতা হল, প্রশাসনিক বিষয়, নজরদারির বিষয়। ঠিক সময়ে স্কুলে আসছে কি না, যতক্ষণ থাকার কথা ততক্ষণ থাকছে কি না। কতটা আগ্রহ, কত দরদ নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে শিক্ষাদান করছেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের বড় বড় দাবিতেও বিরক্ত হন না জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের বড় সমস্যা সরকারি রাজস্ব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিম্ন পর্যায়ে। যেকারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারিভাবে ব্যয় কম। তারপরেও আমি মনে করি, সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও দুর্নীতি কমানো গেলে এসব খাতে ব্যয় বাড়ানো সম্ভব। উন্নত মানবসম্পদ ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশ উন্নত হতে পারেনি।
অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ড. এসএম এ ফয়েজ, ইউনেস্কোর ঢাকা অফিসের ড. সুজান ভাইজ্ বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১১জনকে সম্মাননা জানানো হয়।
কবির/এমএ/