জাতীয় ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যকরের পরও আগামী ৯০ দিন কোনো অবৈধ বা ক্লোন করা মোবাইল হ্যান্ডসেট বন্ধ করা হবে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ বিষয়ে গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিটিআরসি জানিয়েছে, মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে প্রায় তিন বিলিয়নের বেশি ডেটাসেট সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে হিস্টোরিক ডেটাসহ সব তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মাইগ্রেশনের তারিখ বর্তমান হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে অনেক এনআইডির বিপরীতে সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে। বিষয়টি নিরসনে বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে কাজ করছে। ধীরে ধীরে ব্যাকগ্রাউন্ডে হিস্টোরিক ডেটা আর্কাইভ করে শুধুমাত্র বর্তমানে সচল হ্যান্ডসেটের তথ্য দেখানো হবে। এ জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে।
আমদানি শুল্ক ৬০ শতাংশ কমল, স্টক-লট বৈধকরণ
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোবাইল ফোন আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে– যা প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদকদের ক্ষেত্রে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিটিআরসির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানি করা ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা মোবাইল ফোনগুলোকে কোনো অতিরিক্ত শুল্ক ছাড়াই স্টক-লট হিসেবে জাতীয় ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার সিস্টেমে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হলেও বৈধ আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত হবে এবং বাজারে মোবাইল ফোনের দাম সহনীয় পর্যায়ে আসবে।
টেকনিক্যাল জটিলতা ও নিরাপত্তা জোরদার
এনইআইআর চালুর প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু টেকনিক্যাল জটিলতা দেখা দেবে– এ কথা স্বীকার করে বিটিআরসি জানিয়েছে, এসব সমস্যা ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে। এরই মধ্যে নতুন করে ভিএপিটি (কোনো সিস্টেম, সফটওয়্যার বা নেটওয়ার্কে কোথায় কোথায় নিরাপত্তার দুর্বলতা আছে– তা খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া) করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিটিআরসি বলছে, এনইআইআর কোনো নতুন সিস্টেম নয়; ২০২১ সালে প্রথম চালুর চেষ্টা হয়েছিল। বর্তমানে কিছু ফাংশনাল ফিচার যুক্ত করে এটি সক্রিয় করা হয়েছে। ডেটাবেজ সুরক্ষায় নিরাপদ ডিজিটাল টোকেন, রেট লিমিটিংসহ একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এনআইডির বিপরীতে আইএমইআই রেসপন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর যুক্ত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সিম ব্যবহারে সীমা ও নাগরিক অধিকার
এর আগে একজন ব্যক্তির এনআইডির বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০টি, পরে ১৫টি সিম ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও বর্তমানে তা কমিয়ে ১০টি করা হচ্ছে। ফলে হিস্টোরিক ডেটায় এনআইডির বিপরীতে বেশি হ্যান্ডসেট দেখানো স্বাভাবিক বলে জানানো হয়েছে। বিটিআরসি মনে করছে, এনইআইআর চালুর মাধ্যমে মানুষ জানতে পারবেন– তার এনআইডির বিপরীতে কত সিম ও কত ডিভাইস ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেগুলো কোনো আর্থিক অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না। এটি নাগরিকের অধিকার বলেও উল্লেখ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রবাসীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত
শহিদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির ১৭টি সক্রিয় সিম পাওয়া যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জাতীয় ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার বাস্তবায়ন ও জনপ্রতি সিম সংখ্যা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে।
প্রবাসীদের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছে– দেশে ফেরার পর তাদের ব্যবহৃত ফোন তিন মাস বন্ধ করা হবে না। তিন মাসের কম সময় অবস্থান করলে রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন নেই; বেশি হলে পরে নিবন্ধন করতে হবে। সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও আগামী তিন মাস ফোন ব্লক করা হবে না।
হামলা-ভাঙচুরে কঠোর হুঁশিয়ারি
সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শুল্ক কমানো ও বৈধকরণের সব যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার পরও যারা বিটিআরসি ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে, তারা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে অবৈধ মোবাইল আমদানি ও বিক্রয় রোধে দেশের স্থল ও বিমানবন্দরের কাস্টম হাউস এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন পাইকারি বাজারে অভিযান চালিয়ে অবৈধ সেট জব্দ করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
সরকার বলছে, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এনইআইআর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশে সিম, ডেটাবেজ ও এনইআইআর- এর অপব্যবহার রোধে কঠোর সুরক্ষা ধারা যুক্ত করা হয়েছে এবং যেকোনো অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এক আইএমইআইতেই ৪ কোটি ডিভাইস
এদিকে দেশে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর পর মোবাইল হ্যান্ডসেট নিয়ে এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র বেরিয়ে এসেছে। দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোতে বর্তমানে লাখ লাখ নকল, ক্লোন ও ভুয়া আইএমইআই (মোবাইল হ্যান্ডসেটটি বৈধ নাকি অবৈধ/নকল, সেটি যাচাই করার প্রক্রিয়া) নম্বরসংবলিত হ্যান্ডসেট সচল রয়েছে। সাধারণ মানুষকে ‘আন-অফিশিয়াল’ ফোনের নামে এসব নিম্নমানের ও অনিরাপদ ফোন গছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত শনিবার রাতে ফেসবুক পোস্টে এসব তথ্য জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
এক নম্বরেই কোটি কোটি ফোন
বিটিআরসির তথ্য বিশ্লেষণে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, গত ১০ বছরে শুধুমাত্র ‘99999999999999’ এই একটি আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে ৩ কোটি ৯১ লাখেরও বেশি ডিভাইস। এ ছাড়া ‘0000000000000’ বা ‘1111111111111’-এর মতো অদ্ভুত সব প্যাটার্নের আইএমইআই নম্বরেও লাখ লাখ ফোন চলছে।
শীর্ষ কিছু জালিয়াতি করা আইএমইআই নম্বরের তালিকা দেখলে চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট আইএমইআই নম্বরে (440015202000) সচল আছে প্রায় সাড়ে ১৯ লাখ ফোন অন্য একটি নম্বরে সচল আছে সাড়ে ১৭ লাখের বেশি ডিভাইস। এমনকি শুধুমাত্র ‘০’ (শূন্য) আইএমইআই নম্বরেও ৫ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি ফোন চলছে। অনিবন্ধিত ও নকল এসব ফোন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে এসব অনিবন্ধিত ডিভাইসের মাধ্যমে। এ ছাড়া ই-কেওয়াইসি (e-KYC) জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই ঘটে অবৈধ বা রি-প্রোগ্রাম করা ফোনে। ২০২৩ সালে চুরি হওয়া ১.৮ লাখ ফোনের বেশির ভাগই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এই আইএমইআই জটিলতার কারণে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তা শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ক্লোন ফোন কোনো ধরনের মান নিয়ন্ত্রণ বা রেডিয়েশন টেস্ট (যেমন- SAR Testing) ছাড়াই বাজারে ছাড়া হয়েছে। ফলে এগুলো থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়া মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। স্মার্টফোনের পাশাপাশি সিসিটিভি বা বিভিন্ন আইওটি (IOT) ডিভাইসেও এমন ভুয়া নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে।
এখনই বন্ধ হচ্ছে না এসব ফোন
সাধারণ ব্যবহারকারীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে সরকার এখনই এসব ফোন ব্লক বা বন্ধ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। তবে এসব ফোনকে ‘গ্রে’ (Grey) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বর্তমানে বিটিআরসি বৈধভাবে আমদানিকৃত আইওটি ডিভাইসগুলোকে আলাদাভাবে ট্যাগ করার কাজ শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, বছরের পর বছর ধরে সাধারণ নাগরিকদের সাথে ‘আন-অফিশিয়াল’ ফোনের নামে যে প্রতারণা করা হয়েছে, তা নজিরবিহীন। এই অসাধু চক্রের লাগাম টানতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।