ছেলেবেলা থেকেই ইলা মিত্রের নাম শুনে আসছিলাম। ‘নাচোলের রানি মা’ নামে খ্যাত ইলা মিত্রের সংগ্রামের ইতিহাস এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি ইতিহাস পড়ে জেনেছিলাম। ১৯৯১ সালে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশন-এআইএসএফের সম্মেলনে ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে কলকাতায় কমরেড ইলা মিত্রের বাসায় যাই। সেখানেই প্রথম কমরেড ইলা মিত্র এবং তার জীবনসঙ্গী কমরেড রমেন মিত্রের সঙ্গে দেখা হয়। উনাদের আন্তরিকতা এবং কমরেডসুলভ আচরণ আমাকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। কমরেড রণেশ দাশগুপ্তও সেখানে এসেছিলেন। কমরেড রমেন মিত্রের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ অতীত লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হয়। কমরেড ইলা মিত্র ও তৎকালীন সময়ে পার্টির ভূমিকা, তেভাগা আন্দোলন নিয়ে কথা বললেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে তেভাগা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে কমরেড ইলা মিত্রসহ ভারতের বেশ কয়েকজন কৃষক নেতা বাংলাদেশে এসেছিলেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেখানে তেভাগা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, সেখানে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। তেভাগার ৫০ বছর উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে আমাকে এবং জাতীয় কৃষক সমিতির নেতা কমরেড নাসিরকে কমরেড ইলা মিত্রসহ কৃষক নেতৃবৃন্দকে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। সাত দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে কমরেড ইলা মিত্রের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়। বিস্তারিত আলোচনা হয় তেভাগা আন্দোলন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ঘটনাবলি নিয়ে। কীভাবে তিনি গরিব কৃষক-সাঁওতালদের রানি মা হয়ে উঠলেন। কথা হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতন, ক্ষুদ্র কৃষক, সাঁওতালসহ আদিবাসীদের কীভাবে হত্যা করা হয়- নানা বিষয়ে। তার স্মরণশক্তি খুব তীক্ষ্ণ ছিল। কৃষক আন্দোলনে বিশেষভাবে নাচোলে যারা আন্দোলনে নেতৃত্বে ছিলেন তাদের সবার নামই তিনি বলতে পেরেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। যে এলাকাগুলোতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছিল, আমাকে সেখানে নিয়ে যান। কমরেড ইলা মিত্রের সঙ্গে ঘুরে তার কথা শুনে আমি দারুণভাবে উজ্জীবিত হয়েছিলাম।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে কমরেড রণেশ দাশগুপ্তের লাশ যখন কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয় তখন কমরেড ইলা মিত্রও বাংলাদেশে এসেছিলেন। ২০০১ সালে সারা ভারত কৃষক সভার সম্মেলন হয় ভারতের হায়দরাবাদের খাম্মাম শহরে। কলকাতা থেকে প্রায় দুই দিনের যাত্রা। তিনি ট্রেনের কামরায় ছিলেন কিছুক্ষণ পরপর আমাদের খোঁজ-খবর নিতেন। যাত্রায় কোনো সমস্যা হয়েছে কি না কিংবা খাওয়া হয়েছে কি না। কৃষক আন্দোলনের কিংবদন্তি কমরেড ইলা মিত্র শুধু আন্দোলনের নেতাই ছিলেন না, মানুষ হিসেবে তার মানবিক গুণাবলি, কমরেডদের সঙ্গে উনার আচরণে যে কেউই অনুপ্রাণিত হতেন।
ইলা মিত্র বেথুন কলেজে বাংলা সাহিত্যে বিএ সম্মানের ছাত্রী। তখন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। নারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনীতিতে প্রবেশ। সময়টা ছিল ১৯৪৩। ইলা মিত্র কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হলেন। হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে এ বছরই মহিলা সমিতি আন্দোলন শুরু করে। সমিতির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রচার সংগঠিত করেন। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি নামক সংগঠনের মাধ্যমে নারী আন্দোলনের এই কাজ করতে তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে ইলা মিত্রের বিয়ে হয় কমিউনিস্ট কর্মী রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে। বিয়ের পর কলকাতা ছেড়ে চলে এলেন শ্বশুরবাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুর হাটে। কমরেড রমেন মিত্র শুরু থেকেই চাষিদের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে। স্বামীর কাছে চাষিদের ওপর জমিদারদের শোষণ-নিপীড়ন বঞ্চনার কাহিনি শুনে ইলা মিত্রের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা জেগে উঠে। কমরেড ইলা মিত্র ছাত্রজীবনেই কমিউনিস্ট আদর্শের সংস্পর্শে আসছিলেন। তাই স্বামীর আদর্শ ও পথচলার সঙ্গে নিজেকে সহজেই যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন কমরেড ইলা মিত্র।
১৯৪৬-৪৭ সালে ফসলের দুই তৃতীয়াংশের ওপর কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাংলার ১৯টি জেলায় গড়ে ওঠা তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৯-৫০ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। তেভাগার দাবিতে রাজশাহী জেলার বিশেষভাবে নাচোলে কৃষকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কমরেড ইলা মিত্র অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। আদিবাসী কৃষকদের মধ্যে তার এতটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল- তারা শুধু তাকে বিশ্বাসই করতেন না সে সঙ্গে নিজেদের একজন বলে ভাবতেন। ইলা মিত্র ক্রমশ হয়ে ওঠেন সাঁওতাল ও অন্য কৃষকদের ‘রানি মা’। সাঁওতাল মেয়েদের ভেতরে রাজনৈতিক চেতনার বিস্তার এবং তাদের সংগঠনে টেনে অগ্রসর করার ক্ষেত্রে ইলা মিত্র সবিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। বরেন্দ্র এলাকায় প্রচলিত ব্যবস্থায় বিশ আড়ি (কাঠা/বিঘা) ধান কাটা ও মাড়ানোর জন্য জমিতে চাষাবাদ করেছেন যে কৃষক বা ওই উদ্দেশ্যে নিযুক্ত মজুর পেতেন তিন আড়ি ধান। এ ধানের পরিমাণ বাড়িয়ে শত আড়ি করা এবং ফসলের তেভাগা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তার ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, তা জায়গা করে নিয়েছে স্থানীয় লোকগীতিতে। তিনি তার কর্মকাণ্ডের দ্বারা জনমনে স্থায়ী আসন করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস একটু জানা থাকা প্রয়োজন। সে সময়ের ভূমিব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। বাংলার গ্রামীণ সমাজে ব্রিটিশ শাসনের আগ পর্যন্ত ভূমির মালিক ছিলেন চাষিরা। ব্রিটিশ শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রচলনের ফলে চাষিদের জমির মালিকানা চলে যায় জমিদারদের হাতে। জমিদাররা জমির পরিমাণ ও উর্বরতা অনুযায়ী ব্রিটিশদের খাজনা দিতেন। জমিদারদের সঙ্গে ফসল উৎপাদনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এ সময় জমিদার ও কৃষকদের মাঝখানে জোতদার নামে মধ্যস্বত্বভোগী এক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এরা জমিদারদের কাছ থেকে জমি পত্তন বা ইজারা নিত।
এই জোতদার শ্রেণি কৃষকের জমি চাষ তদারকি ও খাজনা আদায়ের কাজ করত। ফসল উৎপাদনের সম্পূর্ণ খরচ কৃষকরা করলেও যেহেতু তারা জমির মালিক নন, সে অপরাধে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক তুলে দিতে হতো জোতদারদের হাতে। এ ব্যবস্থাকে বলা হতো আধিয়ারী। জোতদারি ও জমিদারি প্রথা ক্ষুদ্র কৃষকদের শোষণের সুযোগ করে দেয়। খাজনা আদায়ের জন্য জোতদাররা তাদের সঙ্গে দাসের মতো ব্যবহার করত। উৎপন্ন ফসলের পরিবর্তে একসময় কৃষককে বাধ্য করা হয় অর্থ দিয়ে খাজনা পরিশোধ করতে। ফলে কৃষকরা গ্রামীণ মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। সর্বস্বান্ত হয়ে এক সময়ে সমৃদ্ধ বাংলার কৃষকরা পরিণত হন আধিয়ার আর খেতমজুরে। জমিদার-জোতদারদের এই শোষণ কৃষকের মনে বিক্ষোভের জন্ম দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৩৬ সালে গঠন করা সারা ভারত কৃষক সভা। ১৯৪০ সালে ফজলুল হক মন্ত্রিসভার উদ্যোগে বাংলার ভূমিব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দেয় ‘ফ্লাউড কমিশন’। এই কমিশনের সুপারিশ ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে চাষিদের সরাসরি সরকারের প্রজা করা এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ মালিকানা প্রদান করা। এই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে যাবে। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ বাংলা ১৩৫০ সালে সমগ্র বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ যা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষের সময় কৃষকের ওপর শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ সময়কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে মরিয়া হয়ে উঠেন শোষিত কৃষকরা।
তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল কৃষকের- এই দাবি নিয়ে বেগবান হয় তেভাগা আন্দোলন। বাংলার ১৯টি জেলায় কৃষক সভার নেতৃত্বে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার ক্ষুদ্র কৃষক, আদিবাসী ও সাঁওতালরা এই আন্দোলনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং শত শত মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সভা প্রান্তিক চাষিদের সংগঠিত করে আন্দোলন জোরদার করতে থাকে। পার্টি থেকে কমরেড ইলা মিত্রকে গ্রামের কৃষক সমাজের মধ্যে কাজ করার দায়িত্ব দিয়ে কলকাতা থেকে নিজ গ্রাম রামচন্দ্রপুর হাটে পাঠানো হয় স্বামী সঙ্গে। ইলা মিত্র সরাসরি মাঠপর্যায়ে কৃষক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হন।
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হলে রমেন মিত্র ও ইলা মিত্রের পরিবার পূর্ব বাংলায় থেকে যান এবং তেভাগা আন্দোলনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে এই আন্দোলনকে জোরদার করেন। তবে নাচোলের তেভাগা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কৃষকদের সঙ্গে সংঘর্ষে দারোগাসহ চার পুলিশ নিহত হওয়ার সূত্রে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আদিবাসীদের ওপর প্রচণ্ড নিপীড়ন চালাতে শুরু করলে নাচোলের প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ইলা মিত্র গ্রেপ্তার হন এবং জেলখানায় চরম লাঞ্ছনার শিকার হন। তা ছাড়া তাকে ১ নম্বর আসামি করে অনিমেষ লাহিড়ী, বৃন্দাবন সাহা, শেখ আজহার হোসেনসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয় এবং বিচারে কমরেড ইলা মিত্রসহ ২৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তবে তার মুক্তির দাবিতে মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন মহল সোচ্চার হয়। নাচোলে সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের বিষয়টি পূর্ব বাংলা সংসদে উত্থাপনের চেষ্টা মুসলিম লীগ সরকার প্রতিহত করে। তবে পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভায় কমরেড হীরেন মুখার্জী ইলা মিত্রের বিষয়াদি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন হলে চিকিৎসার প্রয়োজনে প্যারোলে কমরেড ইলা মিত্র মুক্তি পেয়ে কলকাতায় চলে যান। কমরেড ইলা মিত্র সারা জীবন কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন। নির্মম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কখনো মাথা নত করেননি। মাথা উঁচু করে লড়াই করেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তাই কমরেড ইলা মিত্র লড়াই-সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবেন।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)


