দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ- নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না।...
বাংলাদেশের রাজস্বব্যবস্থা সংকটাপন্ন বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। কর-জিডিপি অনুপাত এখন ৬.৬, যা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। আমাদের আশপাশের দেশেও তা ১৫, ১৬, ১৮, উন্নত দেশে ২৫ থেকে ৩০-এর কাছাকাছি। তাহলে সংকটাপন্ন বলাই যায়। মনে প্রশ্ন জাগে–কেন এমন হলো? সাদা চোখে দেখি কারণ, খুব সহজ। তা হলো, এ যাবৎ রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিক ছিল না। পদক্ষেপ সঠিক হলে ফলাফল ভালো হতো। রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রশ্ন এলেই কতকগুলো গৎবাঁধা কথা বলা হয়। সেগুলো হলো, কর অব্যাহতি কমাতে হবে, করের ভিত্তি বাড়াতে হবে, একক ভ্যাট হার চালু করতে হবে, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়াতে হবে ইত্যাদি। সম্প্রতি একটা কথা খুব জোরেশোরে বলা হচ্ছে। তা হলো, কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে। এটা শুধু বলা হচ্ছে তা নয়, বরং এটা করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছে।
আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। সব বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয় না, কখনো জাল ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয়, আবার কখনো চালানপত্র জারি করা হলেও একাধিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয় ইত্যাদি। এরূপ নানাভাবে বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। কোন প্রতিষ্ঠানের সঠিক বিক্রির পরিমাণ কত এ তথ্য এনবিআর তথা সরকারের কাছে নেই। এই হলো রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান সহজ; তা হলো, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করা। এই মূল কাজটাই এ যাবৎ করা হয়নি। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার প্রতিনিধি বা আমাদের দেশের বক্তারা ইনভয়েস অটোমেশন নিয়ে কোনো কথা বলেন না। কর অব্যাহতি কমিয়ে লাভ কী যদি বিক্রির চালানপত্র জারি করা নিশ্চিত করা না যায়। বিক্রির চালানপত্র জারি নিশ্চিত না করে করের ভিত্তি বাড়িয়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। একক ভ্যাট হার চালু করা, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়ানো, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়ানো সব বিষয়ে একই কথা। বিক্রির সঠিক তথ্য পেতে এসব পদক্ষেপ তেমন সহায়তা করে না। বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে কোনো সংস্কার কাজে আসবে না। রাজস্ব ব্যবস্থায় সব সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করা, যেন প্রকৃত টার্নওভারের ওপর করারোপ করা যায়।
কর-নীতি ও বাস্তবায়ন কেন আলাদা করতে হবে?: এবার কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার প্রসঙ্গে আসি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে–এ কথা প্রথম বলেছে দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা। তার পর আমাদের দেশের কিছু অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সিভিল সোসাইটি লিডার, নীতি-নির্ধারক অর্থাৎ যারা পাবলিকলি কথাবার্তা বলেন তারা এ কথা বলে যাচ্ছেন এবং একটা গোলাকার আঁধারে একটা আয়তাকার বস্তু প্রবেশ করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা কোনোদিন সফল হবে না বা ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসেবে এটা জুড়ে দিয়েছে। এখন এটা টক অব দ্য টাউন হয়ে গেছে। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন এভাবে টক অব দ্য টাউন হয় না। কারণ, মনস্তাত্বিকভাবে আমরা বিদেশিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দিই। চিন্তাচেতনায় আমরা নিজেদের দেউলিয়া মনে করি। নিজেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস নেই। কিন্তু আইএমএফে যারা চাকরি করেন, তারাও বিভিন্ন দেশ থেকে আসেন। কখনো স্বল্পমেয়াদে চাকরি নিয়ে আসেন। কখনো অতি স্বল্পমেয়াদে কনসালট্যান্সি নিয়ে আসেন। আইএমএফের কিছু নিজস্ব ভাষা রয়েছে, তারা সেগুলো বলতে থাকেন। সব দেশে গিয়ে তারা একই কথা বলেন। এমন কথার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের ঘর তছনছ করে ফেলছি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার যৌক্তিকতা নিয়ে মূলত দুটি কথা বলা হয়। এক হলো, একই প্রতিষ্ঠান নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কাজ করলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দুই হলো কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা থাকা হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। আজ আমরা আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা নিয়ে আলোচনা করব।
আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, চিরন্তন নয়: আন্তর্জাতিক বলতে আমরা মূলত বুঝি এমন কোনো বিষয় যা একাধিক বা অনেক দেশের মধ্যে বিরাজমান। অর্থাৎ এক জাতির সীমা অতিক্রম করে অনেক জাতির কাছে পৌঁছে যাওয়াকে আন্তর্জাতিক বলা হয়। সাধারণত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে প্রচলিত কোনো বিষয়কে আমরা আন্তর্জাতিক বলে বিবেচনা করে থাকি। উল্লেখ্য, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি সেটা কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক ছিল না। কিছুদিন আগে হয়তো সেটা কোনো জাতীয় বিষয় ছিল। তারও আগে হয়তো কোনো জাতীয় বিষয়ও ছিল না। হয়তো একাডেমিক আলোচনার বিষয় ছিল। আবার, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি কিছুদিন পর সেটা হয়তো আর আন্তর্জাতিক থাকবে না। হয়তো সে বিষয়ের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। তাহলে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয় এবং কোনো শাশ্বত, চিরন্তন ধারণা নয়, যা নির্বিচারে অনুসরণযোগ্য। আজ যদি নতুন কিছু বলা হয় সেটাও কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারে। তাই, আমাদের উচিত হবে আইডিয়ার মেরিট বিবেচনা করা। কোনো কিছু আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা হিসেবে প্রচলিত হয়েছে বলে সেটাকেই গ্রহণ করতে হবে–অন্য কোনো নতুন চিন্তা করা যাবে না, এমনটা উত্তম নয়, কল্যাণকরও নয়। আজ থেকে ৮০ বছর আগে ভ্যাটের অস্তিত্ব ছিল না। হয়তো ৪০ বছর পরে ভ্যাটের অস্তিত্ব থাকবে না। নতুন কোনো করব্যবস্থা আসবে। তাই, নতুন কোনো বিষয়ের আবির্ভাব হলে নিজস্ব পরিবেশে তার মেরিট যাচাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা সুবিবেচনাসম্মত।
আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা উত্তম নয়: উত্তম কথাটাও আপেক্ষিক। এক দেশে যা উত্তম, এমন হতে পারে যে, অন্য দেশে তা পরিত্যাজ্য। আমেরিকা, ইউরোপে হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। কিন্তু আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে এগুলো নিন্দনীয়, পরিত্যাজ্য। তাই, অন্য পরিবেশের যেকোনা ধারণা উত্তম বলে অনুকরণ করা সমীচীন নয়। উত্তম হলো নিজের পরিবেশের জন্য উপযোগী হয় এমন আইডিয়া নিজে উদ্ভাবন করা। অন্যের উদ্ভাবিত আইডিয়া যাচাইবাছাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা। তাহলে দাঁড়ালো এই যে, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, উত্তম নয় এবং শাশ্বত, চিরন্তন বিষয় নয়। নিজস্ব পরিবেশ ও বাস্তবতা অনুধাবন না করে নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুকরণ করা সুবিবেচনাসম্মত নয়, কল্যাণকর নয়।
রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা: আমেরিকা, ইউরোপের রাজস্ব ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা আমাদের দেশের জন্য কোনো উত্তম পদক্ষেপ নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সব পরামর্শ আমাদের জন্য উত্তম নয়–সব পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে তা কাম্য নয়। রাজস্ব ব্যবস্থায় আমেরিকা, ইউরোপের আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে সমাজব্যবস্থায় হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো কেন নিয়ে আসা হচ্ছে না? কারণ, এ দেশের সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওইসব আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা একেবারেই বেমানান। এই পরিবেশে খাপ খাওয়ানো যাবে না। ব্যাপক জনগোষ্ঠী তা মেনে নেবে না। তাই, রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে অবশ্যই স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। এখানেই ভুল হয়েছে। ফলে অনেক ঘটনা, দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে।
আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা যা বলে, অন্যরা সেটাই বলতে থাকেন। আবারও যদি এই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে আরও অনেক দিন এই জাতিকে ভুগতে হতে পারে। তাই, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার নির্বিচার অনুকরণ নয়, রাজস্ব ব্যবস্থায় নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা নয়, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কাজ জোরোশোরে শুরু করুন। রাজস্বব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটে যাবে।
লেখক: সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম এবং ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট
.jpg)
