প্রায় বিশ বছর আগে ভারতের রাজনীতিতে নতুন একটি আইডিয়ার প্রবেশ ঘটে, ভোটকৌশলী। অর্থাৎ পেশাদারদের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। যে পেশাদাররা এ কাজটি করেন, তারা সরাসরি রাজনীতির লোক নন, এরা ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার পেশাদার। এ ধরনের প্রথম কোম্পানি (আইপ্যাক) খুলেছিলেন বিহারের ভূমিপুত্র প্রশান্ত কিশোর। আইপ্যাক নামে এ সংস্থাটি কাজ শুরু করেছিল গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচন দিয়ে। তাদের ‘হায়ার’ করেছিলেন গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে নির্বাচনে মোদিকে জিতিয়েছিল এই আইপ্যাক। এর পরে দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলকে ভোটে সহায়তা করে চলেছে প্রশান্ত কিশোরের আইপ্যাক। এ ছাড়া একাধিক রাজনৈতিক দলের নির্বাচন-ম্যানেজমেন্ট চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রশান্ত কিশোরের। বিনিময়ে ফিস হিসেবে নিয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। এ হেন প্রশান্ত কিশোর, ওরফে পিকে এবার নিজেই রাজনৈতিক দল তৈরি করে বিহারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আর নিজে ভোটে লড়তে এসে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন, বাইরে থেকে পেশাদারদের দিয়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়া আর দলের নেতা হিসেবে সরাসরি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া, এ দুইয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। বিহারের আসন্ন নির্বাচনে পিকের পারফরমেন্স কেমন হয়, তা নিয়ে অপার কৌতূহল তৈরি হয়েছে জনমানসে।
এদিকে নানা টালবাহানার পর মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেছে বিহারের ইন্ডিয়া জোট। চলতি গত বৃহস্পতিবার পটনায় এক যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবই হবেন জোটের মুখ্যমন্ত্রী মুখ। পাশাপাশি, ভোটে জয়ী হলে বিকাশশীল ইনসান পার্টির (ভিআইপি) প্রধান মুকেশ সাহানি উপমুখ্যমন্ত্রীর পদে দায়িত্ব নেবেন। এর আগেই কংগ্রেসের বিহার নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত সাক্ষাৎ করেন আরজেডি-প্রধান তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের সঙ্গে। সেই বৈঠকের পরই যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাটনার ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অশোক গেহলত, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রাজেশ কুমার রাম, কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা, সিপিআই (এমএল)-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সিপিআই (এম)-এর নেতা লালন চৌধুরীসহ অন্য নেতারা। জোটের ভেতর আসন বণ্টন নিয়ে অস্বচ্ছতা ও মনোমালিন্যের অভিযোগ তুলেছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ শিবির। কিন্তু ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সে অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, সবকিছু ঐকমত্যের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হচ্ছে।
অশোক গেহলত সাংবাদিক বৈঠকে বলেছেন, ‘কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সাংসদ ও বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং উপস্থিত সবার মত নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি: এ নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসেবে তেজস্বী যাদবকেই সমর্থন করছি। তিনি তরুণ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা রাখেন।’ নিজের প্রতিক্রিয়ায় রাজ্যের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদব তীব্র কটাক্ষ করেছেন এনডিএকে। তার কথায়, ‘আমরা যৌথভাবে সাংবাদিক বৈঠক করেছি, কিন্তু এনডিএ এখনো নীতীশ কুমারকে সামনে রেখে কোনো ঘোষণা পর্যন্ত করতে পারেনি। বিজেপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নীতীশ কুমারকে আর মুখ্যমন্ত্রী হতে দেওয়া হবে না, সেটি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সিদ্ধান্ত।’ তেজস্বী আরও বলেছেন, ‘আমরা একসঙ্গে কাজ করব। ডাবল ইঞ্জিন সরকারকে উৎখাত করব। এক ইঞ্জিন দুর্নীতির, অন্যটি অপরাধের। মানুষ বিকল্প চায় এবং সেই বিকল্প আজ ইন্ডিয়া জোট।’ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে তেজস্বী তার বক্তব্যে ধন্যবাদ জানান লালু প্রসাদ যাদব, রাবড়ি দেবী, রাহুল গান্ধী এবং সোনিয়া গান্ধীকে। ‘জোটের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও সমর্থন আমাদের শক্তি জোগাচ্ছে,’ বলেন তিনি।
বিহার বিধানসভা ভোটের মুখে রাজ্য-রাজনীতিতে কার্যত উত্তাপ বাড়িয়েছেন তেজস্বী যাদব। ইন্ডিয়া জোটের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এনডিএকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, ‘আমাদের পক্ষে সব পরিষ্কার, কিন্তু এনডিএ এখনো মুখ্যমন্ত্রী মুখ ঘোষণা করতে পারেনি।’ তার অভিযোগ, ‘ওদের কোনো দিশা নেই, কোনো কর্মসূচি নেই, কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও নেই।’ তেজস্বীর এ মন্তব্যের জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং বলেন, ‘‘এতে আর আশ্চর্যের কিছু নেই। লালু যাদব নিজের ছেলেকেই মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী করেছেন। এটা কোনো ‘গঠবন্ধন’ নয়, ‘ঠগবন্ধন’। এনডিএর মুখ্যমন্ত্রী মুখ নীতীশ কুমারই।’’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও রাবড়ি-লালুর শিবিরকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। বিহারের নির্বাচনি সভায় তার কটাক্ষ- ‘‘এ জোট কোনো ‘গঠবন্ধন’ নয়, বরং ‘লাঠবন্ধন’। অর্থাৎ দুষ্কৃতদের জোট। দিল্লি থেকে পাটনা, সব নেতাই জামিনে মুক্ত।’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘বিহারের মানুষ ‘জঙ্গল রাজ’-এর দিনগুলো ১০০ বছরেও ভুলবে না। যতই আড়াল করার চেষ্টা হোক, মানুষ ক্ষমা করবে না।’’ মোদির আহ্বান, ‘‘বিহারের তরুণরা প্রত্যেক বুথে গিয়ে প্রবীণদের সঙ্গে বসে ‘জঙ্গল রাজ’-এর স্মৃতি শুনুক। বুঝুক, বিহারকে কোথা থেকে কোথায় আনা হয়েছে।’’
উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্যর অভিযোগ, ‘‘তেজস্বী যাদবের ঘোষণা কেবল ফাঁকা বুলি।
বিহার ভোটের আগে মাসের পর মাস টানাপোড়েন চলেছিল আসন বণ্টন নিয়ে। কখনো দরজা বন্ধ, কখনো দরজার ফাঁক দিয়ে ‘সমঝোতা’র ইঙ্গিত। অবশেষে, মাত্র ১৫টি আসন পেতে চলা ক্ষুদ্র দল বিকাশশীল ইনসান পার্টির (ভিআইপি) প্রধান মুকেশ সাহানিকে জোটের উপমুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেছে মহাগঠবন্ধন। ফলে কার্যত জোটের মধ্যে তিনিই এখন প্রকৃত ‘ভিআইপি’। যদিও পাশে রয়েছেন অনেক বড় খেলোয়াড়, যেমন আরজেডি, কংগ্রেস ও সিপিআই (এম-এল)। প্রশ্ন উঠছে, কী এমন আছে মুকেশ সাহানির মধ্যে, যা তাকে ছোট দলের নেতা হয়েও জোটের এত বড় প্রতীক করে তুলল?
১৯৮১ সালে দরভাঙ্গার এক জেলে পরিবারে জন্ম মুকেশের। নিজের পরিচয়ে গর্ব করে নামের পাশে জুড়েছিলেন উপাধি- সন অব মল্লাহ। সমাজের নৌকোচালক ও মৎস্যজীবী শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ১৯ বছর বয়সে পাড়ি দেন মুম্বাইয়ে। সেখানেই শুরু বিক্রেতা হিসেবে, পরে বলিউডে সেট ডিজাইনার। ‘দেবদাস’, ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর মতো ছবিতে কাজ করেছেন। নিজস্ব প্রোডাকশন সংস্থা ‘মুকেশ সিনে ওয়ার্ড প্রাইভেট লিমিটেড’ খোলেন মুম্বাইয়ে।
২০১৮-তে রাজনীতির ময়দানে আত্মপ্রকাশ। নিশাদ-মল্লাহ সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় গঠন করেন বিকাশশীল ইনসান পার্টি। এ দুই গোষ্ঠী মিলে বিহারের ভোটের প্রায় ১২ শতাংশ। ২০২০ সালে মাত্র চারটি আসনে জয় পায় তার দল, পরে সব বিধায়কই ভেসে যায় বিজেপির দিকে। তবু সাহানির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, জাতিগত প্রভাব ও বিজেপিবিরোধী অবস্থান তাকে উত্তর বিহারের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে। এক সময় এনডিএর সঙ্গেও ছিলেন তিনি। কিন্তু বিজেপির প্রভাব ও ‘পোচিং রাজনীতি’ নিয়ে মতভেদের জেরে ছিন্ন করেন সম্পর্ক। বিহারের জটিল জাতিভিত্তিক ভোট সমীকরণে সাহানিই মহাগঠবন্ধনের ‘গোপন অস্ত্র’। ২০২০ সালে এনডিএর দিকে চলে গিয়েছিল ইবিসি (অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া শ্রেণি)-এর বড় অংশ: বিশেষ করে নিশাদ-মল্লাহ সম্প্রদায়। এবার সেই ভোটব্যাংক পুনরুদ্ধারের দায় নিয়েছেন সাহানি। তাকে উপমুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসেবে ঘোষণা করে মহাগঠবন্ধন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। আরজেডির মূল মুসলিম-যাদব সমর্থন ছাড়িয়ে এবার তারা অন্তর্ভুক্তির রাজনীতি চায়। বিজেপি-নীতীশ শিবিরের ইবিসি প্রভাবের জবাবে এ পদক্ষেপ প্রতীকী হলেও তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাহানির উপস্থিতি মহাগঠবন্ধনের ভোটে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ইবিসি ভোট স্থানান্তর ঘটাতে পারে। যা ২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বহু আসনে নির্ণায়ক হতে পারে। সাহানি প্রথমে দাবি তুলেছিলেন ৪০-৫০ আসনের, যা ভিআইপির রাজনৈতিক বাস্তবতার তুলনায় অনেকটাই বেশি। ফলে অচলাবস্থা তৈরি হয়। রাহুল গান্ধী-ঘনিষ্ঠ অশোক গেহলত নিজে পাটনা এসে আলোচনায় হস্তক্ষেপ না করলে জোট ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল ছিল। শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয় ১৫ আসন ও উপমুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থিতা।
এ সিদ্ধান্ত, বাস্তবে এক ঢিলে দুই পাখি। একদিকে, জোটের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রশমিত হলো। অন্যদিকে, তেজস্বী যাদবের যুব ও চাকরিকেন্দ্রিক প্রচারের পাশে রাখা গেল ইবিসি প্রতিনিধি হিসেবে সাহানিকে। যা জোটের ‘অন্তর্ভুক্তি’র প্রমাণও দেয়। নীতীশ কুমার এখনো এনডিএর মুখ্যমন্ত্রী মুখ এবং ইবিসি ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা অটুট। সেই প্রভাব কাটাতেই মহাগঠবন্ধনের এ কৌশল। সাহানি এখন প্রতীক- একদিকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির প্রতিনিধি, অন্যদিকে জোটের ঐক্যের আঠা।
অর্থাৎ, ছোট দল হলেও তার ভূমিকা কেবল প্রতীকী নয়, কৌশলগত। ভোটের অঙ্কে তার দল যতটুকু আনে, তার চয়ে অনেক বেশি তিনি এনে দিচ্ছেন সমীকরণে ভারসাম্য। নভেম্বরের ভোটে বিহারের মাটিতে লড়াই এবার শুধু তেজস্বী বনাম নীতীশ নয়; তার মাঝে উঠে এসেছে এক নতুন নাম- মুকেশ সাহানি। ছোট দল, বড় প্রতীক। হয়তো, জাটের স্থিতি ও ফলাফলের চাবিকাঠিও লুকিয়ে আছে এই ‘সন অব মল্লাহ’র হাতে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক
.jpg)
