সমাজের কথাতেই বারবার ফিরে ফিরে আসতে হয়। আমাদের সমাজ যে আজ আর কারও মিত্র নয়, এই সত্য বোধ করি কেউই অস্বীকার করবেন না। এই সমাজ অধিকাংশ মানুষের হাত বেঁধে দিয়েছে শোষণে, পা বেঁধে দিয়েছে বঞ্চনায়। বেশির ভাগ মানুষ আজ আর স্বাভাবিক জীবনের মতো করে বাঁচতে পারছে না। অল্প কিছু মানুষ যারা সুবিধাভোগী তাদেরও বিবেক নেই। তারা জানুক-না জানুক তাদের অন্তর্গত মনুষ্যত্বও হরণ করে নিয়েছে এই বিকৃত সমাজ। চেহারায় মানুষ হলেও ভেতরে মানবেতর।
এই সমাজের আসল ব্যাধিটা কোথায়? ব্যাধি নিয়ে অনেক কথা অনেকভাবে বলা যাবে। কিন্তু সত্য বোধ করি এটাই যে, মূল ব্যাধিটা দারিদ্র্য নয়, মূল ব্যাধি বৈষম্য। বৈষম্য থেকেই দারিদ্র্য এসেছে। বেশির ভাগ মানুষকে আটক করেছে নিকৃষ্টতম দারিদ্র্যের নিগড়ে।
সামাজিক সুখের অনুষ্ঠানগুলো তো চিৎকার করে বলবেই যে ধনী আরও ধনী হচ্ছে, দরিদ্র আরও দরিদ্র- এসব অনুষ্ঠানের কাজই এটা; কিন্তু যখন জাতীয় দুর্যোগ দেখা দেয় তখনো একই ব্যাপার ঘটে। তাই দেখা যায় যে, যখন বন্যা আসে তখন বেশির ভাগ মানুষ পানিতে ভাসে, ভাসতে ভাসতে ডোবে, নয়তো ডুবতে ডুবতে ভাসে। আর অল্পকিছু মানুষ সেই সুযোগে জমি নেয় হাতিয়ে, রিলিফের মাল দেয় লোপাট করে, সুখ পায় টেলিভিশনে বন্যার ছবি দেখে, নয়তো-বা খুশি হয় ত্রাণ কার্যের নাম করে ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে কিংবা অশ্রুপাতের। ২০ কোটি টাকা প্রারম্ভিক ব্যয়ে যে রঙিন টেলিভিশন সাড়ম্বরে চালু হয়েছিল দেশে সেও তো ওই বৈষম্যেরই জয়ধ্বনি। যে শ্রেণি দেশের সব রং লুণ্ঠন করে নিয়ে নিজেদের বাড়ি-গাড়ি রাঙিয়েছে, রাঙিয়েছে বউ-ঝিদের সেই একই শ্রেণি নিজেদের ছবিগুলোকেও রাঙিয়ে নিল। প্রাইভেট ভিসিআরে সন্তুষ্ট নয়, পাবলিক কালারড স্মার্ট টিভি চাই। ঢাকা শহরে এই যে ট্রাফিক আয়ল্যান্ডগুলো ভাঙা হচ্ছে ডামাডোল করে তা কী অবলুপ্ত করতে পারবে এই অমোঘ সত্যকে যে বাংলাদেশের গ্রামে তো বটেই এই ঢাকা শহরেই এমন এলাকা আছে আয়ল্যান্ডের মতোই বিচ্ছিন্ন? কাগজের দাম বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। ’৭০ সালে যে কাগজ বিক্রি হতো রিমপ্রতি ৬০ টাকা দরে সেই একই কাগজ এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকা দরে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো হট্টগোল নেই, কেননা এর ভুক্তভোগী নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। বড়লোকরা এসবে ডরায় না, তাদের ধান্ধা অন্যবিধ।
এ কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, বিশেষ বিশেষ প্রশ্নে জাতি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, নয়তো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। এখন তো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষের জয়জয়কার। রুশপন্থি, নয়তো মার্কিনপন্থি। সরকারি নয়তো সরকারবিরোধী। এসব বিভাজন অসত্য নয়। কিন্তু এই ভাগাভাগি, ভাঙাভাঙি ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়ারই শামিল। নইলে আজ যে এ পক্ষের শক্ত খুঁটি কাল সে অপরপক্ষের অতি দুর্ধর্ষ গোলন্দাজে পরিণত হচ্ছে কোন বিশেষ যোগ্যতায়, কোন ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে? দল ভাঙাভাঙি, ক্ষমতা ভাগাভাগির অতিরিক্ত কিছু তো নয়। তবে হ্যাঁ, বিভাজন অবশ্যই আছে। জাতি সত্যি সত্যি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, একদিকে অল্পকিছু ধনী, অন্যদিকে অসংখ্য দরিদ্র। দুয়ের মধ্যে দূরত্বটা বাড়ছেই। আর যতই বাড়ছে দূরত্ব তত জোরেই বলা হচ্ছে ঐক্য ও সম্প্রীতির কথা। পাকিস্তানি আমলের আঞ্চলিক বৈষম্য যত সহজে চোখে পড়ত বাংলাদেশি আমলে শ্রেণিতে শ্রেণিতে বৈষম্য তত সহজে চোখে পড়ছে না। অথবা বলা যায়, আমরা দিচ্ছি না চোখে পড়তে। পড়লে আমাদের অসুবিধা আছে।
তবে অবস্থাটা কী তা বলি-না বলি অবস্থার যে পরিবর্তন দরকার তা বলছি বটে। চোরের মায়ের বড় গলা নিতান্ত কথার কথা নয়। পরিবর্তন যদি চাই-ই, তবু পরিবর্তন কেন হয় না? প্রথম কথা কারা করবে এই পরিবর্তন? আশা করি বোধহয় যে ধনীরাই করবে তা। যে ডালে চড়ে আছে সেই ডালেই গোড়া কাটবে এমন বুদ্ধিমান হলে ধনীরা ধনী হতো না। না, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তদের কাছে সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব দেওয়া আর শেয়ালের কাছে মুরগি জিম্মা রাখা মূলত একই কাজ।
রাজনৈতিক দলগুলো পরিবর্তনের কথা বলে। কেউ বলে গণতন্ত্র চাই, কেউ বলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব। কিন্তু ধনবৈষম্যপূর্ণ সমাজে গণতন্ত্র কেমন করে আসবে সে কথা বলে না। ধনবৈষম্যের গভীর ও ক্রমবর্ধমান খাদের দুই পাশে দুই পা রেখে দণ্ডায়মান বেচারা গণতন্ত্রের করুণ হাল তারা দেখেও দেখে না। সমাজতন্ত্রের কথা যারা বলে তাদের অনেকেই যে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না সেটা টের পাওয়া যায় মৌলিক পরিবর্তনের কথা উঠলেই। ভূমির সিলিং আরও নিচু করার প্রশ্ন এলে অনেক সমাজতন্ত্রীই দেখা যায় দৌড় দিচ্ছেন। তবু সমাজতন্ত্রের কথা বলতে হয়, বিপ্লবের ধ্বনিও তুলতে হয়। নইলে বঞ্চিত মানুষের সমর্থন পাওয়া যায় না। সমর্থন না পাওয়া গেলে ক্ষমতা পাওয়া যায় না বা টিকে থাকা যায় না পাওয়া ক্ষমতায়। না, বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো মৌলিক সমাজ পরিবর্তন আনবে না। চাইবে না, চাইলেও মুখে মুখে চাইবে, কাজে-কর্মে নয়। দলগুলো নিজেরা জানে এ খবর। সাধারণ মানুষেরও তা অজানা নয়। তাই তারা তাদের ডাকে সাড়া দেয় না, নিতান্ত বাধ্য না হলে। ডাকাডাকিতে বরঞ্চ তারা ভয় পেয়ে যায় অনেক সময়।
এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশে ভয় জিনিসটা অত্যন্ত পুরোনো। বহুবার ঘা খেয়েছে মানুষ। প্রতারিত হয়েছে বারবার। সন্ত্রস্ত মানুষের মনে হতাশা বাড়ছে। দরিদ্র যে বহুকাল ধরেই সে দরিদ্র; তার দারিদ্র্য বাড়ছেই, সে আশা রাখে কোন ভরসায়?
সন্ত্রাস ও হতাশ মানুষের বাসা বেঁধে আছে কুসংস্কার। যাদের নাম আল-বদর ও রাজাকার এই ফাঁকে, এই অন্ধকারে, তারা উঠেছে তৎপর হয়ে। নতুন কেউ নয় এরা, পুরোনো শক্তি। তৎপর ছিল বহুকাল ধরে। মানুষের ইহজাগতিক ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে হত্যা করার কাজে লিপ্ত ছিল আগাগোড়া। একাত্তরে মানুষ-হত্যা এই গোপন হত্যাকাণ্ডেরই এক চরম প্রকাশ মাত্র। আজ আবার তারা তৎপর হয়েছে পূর্ণোদ্যমে। পুষ্ট করছে তারা সেসব কুসংস্কার, অভ্যাস ও পশ্চাৎমুখীনতাকে যাদের অবলুপ্তি ঘটার কথা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে; কিন্তু অবলুপ্তি যে ঘটেনি সেটাই হচ্ছে একটা বড় প্রমাণ এই বড় সত্যের যে, সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসেনি, বদল হয়েছে শুধু শাসকেরই। ভূগোল বদলালো, সমাজ বদলালো না। নিশান চলে গেল, নিশানা গেল না।
বামপন্থি রাজনীতিকদেরই দায়িত্ব ছিল সমাজ বদলানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার। তারা পারেননি। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্তরে তারা শ্রেণিসংগ্রামের লাইন নিয়েছেন, আবার শ্রেণিসংগ্রামের কথা যখন বলা আবশ্যক তখন তারা জাতীয়তাবাদী লাইন ধরেন। ভুল সিদ্ধান্তের মারাত্মক ফল হয়েছে এই যে তারা মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। শত্রুকে মিত্র এবং মিত্রকে শত্রু করে তুলেছেন। লক্ষ্যভ্রষ্ট ও হতাশ হয়ে আক্রমণ করেছেন পরস্পরকে। তাদের দল ভাঙাভাঙি এটাই প্রমাণ করে যে তারাও বুর্জোয়াদের মতোই ক্ষমতা থেকে যত দূরেই হোন সংকীর্ণ গোষ্ঠীপ্রীতি, আত্মঅহমিকা, নেতৃত্ব আঁকড়ে ধরে থাকার আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা তাদের মধ্যেও পুরো মাত্রাতেই আছে।
তাছাড়া সবাই জানেন বামপন্থিরা ভালো মানুষই। অথচ যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারা লড়ছেন সেই ব্যবস্থা যেমন পুরোনো, তেমনি চতুর ও নৃশংস। তাই তারা এগোতে পারেন না, পদে পদে লাঞ্ছিত হন। বামপন্থিরা ক্রুদ্ধ হয়ে কখনো কখনো সন্ত্রাসবাদী হয়েছেন, কিন্তু সেই ক্ষেপে যাওয়া কর্মক্রিয়ার স্থায়ী কোনো লাভ হয়নি। বস্তুত প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্পের সন্ধান দিতে না পারলে বামপন্থি আন্দোলন যে এগোবে না এবং দেশের সমষ্টিগত মানুষের মুক্তি আসবে না। এটা দিবালোকের মতোই স্পষ্ট।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


