ফ্ল্যাট সংস্কৃতি বা ফ্ল্যাটে বসবাসের অভিজ্ঞতা আমাদের আগে কখনো ছিল না। ফ্ল্যাটে বসবাসের বিষয়ে সর্বপ্রথম জেনেছিলাম যুক্তরাজ্য প্রত্যাগত আমার নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে। সেটা পাকিস্তানি আমলে। শুনে অবাক ও বিস্মিত হয়েছিলাম। সেখানে কেউ বাড়ি কেনে না। ছাদ কিনে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে। কিংবা তৈরি করা ফ্ল্যাট কেনে। উঠোন-আঙিনা বলে কিছু নেই। চার দেয়ালে ঘেরা দু-তিনটি থাকার ঘরসহ বসবাসের সব উপকরণ ফ্ল্যাটে মজুত থাকে। বিশাল উঁচু বিল্ডিংয়ের প্রতি ফ্লোরে (তলায়) চার-ছয়টা পৃথক-পৃথক ফ্ল্যাটে পৃথক-পৃথক পরিবার বসবাস করে। আন্ডারগ্রাউন্ডে গাড়ির গ্যারেজ। এভাবে বন্দি খাঁচায় মানুষ কীভাবে বসবাস করে? এই ভাবনার কূল-কিনারা তখন খুঁজে পাইনি। চার দেয়ালে ঘেরা পরিসরের ফ্ল্যাটে মানুষের বসবাসের বিষয়ে অবাক হয়েছিলাম।
অথচ গত পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরে বাংলাদেশেও ফ্ল্যাট সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ক্রমেই এর ব্যাপ্তি-বিস্তার কেবল শহরে নয়, শহরতলিতে পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। এতে তাৎক্ষণিক যেসব চরম অসুবিধা দেখা দিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম পয়োনিষ্কাশন, পানির অপর্যাপ্ততা, বিদ্যুতের ঘাটতি, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং সড়কে যানজট। পাঁচ কাঠার একটি বাড়িতে যে পরিমাণ মানুষ বসবাস করত, এখন তার ২০ গুণ মানুষ ওই একই স্থানের অনেক ফ্ল্যাটে বসবাস করে। এতে সড়ক এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, পানিসহ নানা ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফ্ল্যাটে বসবাসকারী প্রায় সবারই ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। এতে প্রচণ্ড যানজটের সৃষ্টি হয়। শহরের আবাসন সমস্যার অজুহাতে নানা স্থানে ফ্ল্যাট নির্মিত হচ্ছে। খাল, বিল, জলাশয়, নদী, নালা ভরাট করে নানা পন্থায় আবাসন বাণিজ্যে পরিবেশ-প্রকৃতি বিনাশ হয়েছে। পরিবেশের ওপর সর্বনাশা অপতৎপরতায় শহরগুলো মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আকাশ এবং আলো-বাতাস রুখে দিচ্ছে বিশাল কাঠামোর সুউচ্চ ফ্ল্যাটগুলো। প্রাকৃতিক সুবিধাবঞ্চিত হয়েছে নগরবাসী। পরিবেশের ওপর অনাচারের মাশুল গুনছে সাধারণরা। নদী-নালা ভরাটের কারণে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা মারাত্মক পর্যায়ে জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
মুনাফার গন্ধ পেলেই পুঁজিবাদী তৎপরতা দ্রুত হাজির হয়। মুনাফার জন্য হেন কোনো অপকীর্তি নেই; যা পুঁজিবাদী মুনাফাবাজেরা গ্রহণে বিলম্ব করে না। কিছু মানুষের সুযোগ-সুবিধার করতলে সংখ্যাগরিষ্ঠের নাকাল অবস্থা এই ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে জাজ্বল্যমান। সরকারি খাস জমি, দুর্বল গরিবের জমি দখলের নানা ঘটনা আবাসন প্রকল্প ও ফ্ল্যাট বাণিজ্যে সক্রিয়। বলাবাহুল্য আবাসন ব্যবসায়ী মাত্রই অত্যন্ত শক্তিধর; সেটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই। সাধারণের বাড়ি নির্মাণে রাষ্ট্রীয় গৃহনির্মাণ সংস্থার নানা বিড়ম্বনাপূর্ণ শর্ত পূরণে বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন পেতে নাকাল হতে হয়। অথচ আবাসন ব্যবসায়ীদের বহুতল ফ্ল্যাট নির্মাণ কত সহজে সমাধা হয়ে যায়। আবাসন ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রীয় সব সংস্থাসমূহকে করতলগত করে নিয়েছে। রাষ্ট্র ও সরকার এদের ঘাঁটানোর ধৃষ্টতা রাখে না। এরা লাগামহীন-বেপরোয়া। পুঁজিবাদের আগ্রাসী তৎপরতা মুনাফা লোভীদের ভয়ংকর রূপ ধারণ করে সমষ্টিকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরিবেশ এবং প্রকৃতি ধ্বংসের নানা বিরূপ প্রভাবের শিকারও ওই সাধারণ মানুষ। পুরো বিষয়টি অনিবার্যরূপে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত, মুনাফাই যার একমাত্র লক্ষ্য। পুঁজিবাদী ধারার উন্নতি কী পরিমাণে বৈষম্যপূর্ণ তার নজির মোটাদাগে দৃশ্যমান। যে উন্নতি সমষ্টিকে স্পর্শ করে না। বরং সমষ্টিকে নানা সমস্যার আবর্তে নিক্ষেপ করে।
বাংলাদেশ জনসংখ্যার তুলনায় নিশ্চয় ছোট দেশ। গ্রামের মানুষ গ্রামে থাকতে পারছে না। গ্রাম তাদের শহরমুখে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রামে কর্মসংস্থান নেই। শহরে রয়েছে। গ্রাম এবং শহরের সুযোগ-সুবিধা আকাশপাতাল ব্যবধানসম। সে কারণে মানুষ শহরমুখী হতে বাধ্য হয়েছে। যৌক্তিক কারণে শহরে মানুষের চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। বিকেন্দ্রিয়করণের বিপরীতে সবকিছুই এককেন্দ্রিক অর্থাৎ শহরকেন্দ্রিক। তাই গ্রামের মানুষ শহরে ছুটে আসতে বাধ্য হচ্ছে। শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বল্প আয়ের মানুষ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগে ফ্ল্যাট কেনার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। তারা থাকে বস্তিতে, ঘিঞ্জি এলাকায় ঠাসাঠাসি করে। আমাদের অর্থনীতি অস্থিতিশীল এবং প্রচণ্ডরূপে রাজনীতি-নির্ভর। রাজনীতি সম্পূর্ণরূপে এখন পেশায় পরিণত। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় বিশেষ করে ক্ষমতার রাজনীতি প্রতিনিয়ত আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির সুযোগ করে দিচ্ছে দলীয় নেতা-কর্মীসহ শাসক শ্রেণিভুক্তদের। দেশে ঘুষ-দুর্নীতিসহ নানা অসাধু উপায়ে অর্থের লেনদেনে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদের একাংশের কাছে এসেছে অঢেল অর্থ। তারাই মূলত ফ্ল্যাটের ক্রেতা। অপ্রদর্শিত অর্থে ফ্ল্যাট ক্রয়ের বৈধতায় ফ্ল্যাট নির্মাণের আগেই ফ্ল্যাট নিঃশেষ হয়ে যায়। শহরে যাদের জমি-বাড়ি রয়েছে তারা নগদ মোটা অর্থ এবং বিনে পুঁজিতে ফ্ল্যাটের ৫০ শতাংশের মালিক হওয়ার মোক্ষম সুযোগটি লুফে নিচ্ছে। ফ্ল্যাট নির্মাণে মান প্রসঙ্গে নানা অভিযোগের কথাও শোনা যায়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারসহ আবাসন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের পরও মানুষ বুভুক্ষুর মতো ফ্ল্যাট ক্রয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি অবসরপ্রাপ্তরা পর্যন্ত ব্যাংকের চড়া সুদে অর্থ গ্রহণ করে ফ্ল্যাট কিনছে। গত ২৫-৩০ বছরে দেশে জায়গা-জমির মূল্য প্রায় ২০ গুণ বৃদ্ধিতে মানুষ ফ্ল্যাট ক্রয়ের পিছু ছুটতে বাধ্য হচ্ছে। শহরতলির ফসলি জমি আবাদের জন্য আগামীতে আর পাওয়া যাবে না। ফসলি জমিতে পাকা বাড়ি নির্মাণের হিড়িক যত্রতত্র প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই আমরা আমদানি-নির্ভর দেশ। আগামীতে খাদ্যশস্যসহ তরিতরকারি আমদানি করা আবশ্যক হলে অবাক-বিস্ময়ের কারণ হবে না। ফসলি জমি যেভাবে লুপ্ত হয়ে চলেছে, তাতে সে আশঙ্কা অমূলক বলার উপায় নেই।
আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে ফ্ল্যাট সংস্কৃতি নানা বিপদের বার্তা বয়ে এনেছে। আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জগৎটি এতে লুপ্ত হওয়ার পথে। বিচ্ছিন্নতাকে প্রকট এবং অনিবার্য করে তুলেছে। অতীতে প্রায় বাড়িতে অতিথিদের জন্য পৃথক ঘর বরাদ্দ থাকত। এখন তা কল্পনাও করা যাবে না। ফ্ল্যাটে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে তো কল্পনারও অতীত। আত্মীয়-পরিজনরা ইচ্ছে করলেই কারও ফ্ল্যাটে যেতে পারে না। নানা প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে ইন্টারকমে অনুমতি লাভের পরই আত্মীয়ের ফ্ল্যাটে যেতে পারে। সেটা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে ফ্ল্যাটে বসবাসরত আত্মীয়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। একই ভবনের নানা ফ্ল্যাটে বসবাসকারীদের মধ্যে রয়েছে চরম বিচ্ছিন্নতা। সেখানে কেউ কারও নয়। সুখে-দুঃখেও কেউ কারও পাশে এগিয়ে আসার সংস্কৃতি নেই। ফ্ল্যাটবাসীরা অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক। যার যার-তার তার। সামষ্টিক ধ্যান-ধারণা বিবর্জিত। সামাজিকতার ধার ধারে না। চার দেয়ালে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা ও বিচ্ছিন্নতা ফ্ল্যাটবাসীদের ক্ষেত্রে চরম সত্য রূপে দৃশ্যমান। ঘটনাগুলো মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সংলগ্ন। বিচ্ছিন্নতা এবং বৈষম্য পুঁজিবাদের সৃষ্ট। দুটির মূলেই পুঁজিবাদ। ফ্ল্যাট সংস্কৃতির যে উন্নতির চেহারা আমরা দেখছি, এই উন্নতির চরিত্রটি সম্পূর্ণরূপে পুঁজিবাদী। পুঁজিবাদ মানুষকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। অপর দিকে সৃষ্টি করে বৈষম্য। বিশাল-বিশাল ফ্ল্যাট নির্মাণের যে নজরকাড়া উন্নতি আমরা চারপাশে দেখছি। এতে সামাজিকতা বিপন্ন ও বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সামাজিকতা মানুষের ক্ষেত্রে অতি আবশ্যিক তো বটেই। মানুষ মোটেও মানুষ নয়- যদি সে সামাজিক না হয়। তাহলে সে পরিণত হয় যন্ত্রে নয়তো পশুতে। এর কোনোটি মানুষের মনুষ্যত্বের সংরক্ষক হতে পারে না। এবং বাস্তবে হচ্ছেও না। সামাজিকতা অতি আবশ্যিক এবং জরুরিও বটে। ব্যক্তিগত কিংবা কেবল পরিবারকেন্দ্রিক নয়। সম্পূর্ণরূপে হতে হবে সামাজিক। আমাদের সমাজ জীবনের প্রতিবন্ধকটি অর্থনৈতিক। যাকে অনায়াসে পুঁজিবাদী আদর্শিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। রাজনীতিই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক। ক্ষমতার রাজনীতি কী পরিমাণে সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখে আসছি। রাষ্ট্র ক্ষমতাই নিয়ামক রূপে অনড় অবস্থানে এবং শাসকশ্রেণির করতলে। জনগণের নাগালে নেই। সে কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রাষ্ট্রের প্রজা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। শাসক শ্রেণি ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে কর্তৃত্ব করছে এবং বিচ্ছিন্নতা-বৈষম্য সৃষ্টিতে নিয়োজিত রয়েছে। ফ্ল্যাট সংস্কৃতি বৈষম্য এবং বিচ্ছিন্নতার অন্যতম কেন্দ্র বিশেষে পরিণত। সমাজ থেকে বৈষম্য-বিচ্ছিন্নতা নিরসন না হওয়া অবধি সামাজিক জীবনাচার আশা করা যাবে না।
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি যেহেতু মুনাফার ক্ষেত্রে পরিণত। সে কারণে পুঁজিবাদী মতাদর্শ এতে দৃশ্যমান। পুঁজিবাদ মানুষের ঐক্য-সংহতিবিরোধী। পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করাই তার উদ্দেশ্য। পুঁজিবাদ ব্যক্তির উন্নতি চায় এবং করেও না। এতে সমষ্টিকে ঠেলে দেয় পশ্চাৎমুখী। সমষ্টিগত মানুষের মুক্তির প্রশ্নে সর্বাগ্রে জরুরি পুঁজিবাদ বিরোধিতা। কেবল বিরোধিতা নয়- প্রবল আন্দোলনের। একই শহরে বসবাস করা সংখ্যালঘু অংশের ভোগ-বিলাসিতা, অর্থ-বিত্ত এবং বৈভবে পরিপূর্ণ। অপর দিকে সমষ্টির ত্রাহি অবস্থা। তাই পুঁজিবাদের আগ্রাসনবিরোধী ঐক্য এবং প্রবল প্রতিরোধ কেবল জরুরিই নয়। অপরিহার্যও বটে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

