প্রশিক্ষণ আর দক্ষতা ঠিক এক জিনিস নয়। কোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হলে সে বিষয়ে গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে হয়, তার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়, তার খুঁটিনাটি নিয়ে আগ্রহ থাকতে হয়। মোটকথা, এটি এক ধরনের ‘ইন্টারনাল মোটিভেশন’ দ্বারা পরিচালিত হয়। তাই একজন শিক্ষককে দক্ষ হতে হলে তার নিজ বিষয়ে খুঁটিনাটি জানার জন্য বিষয়টির ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিস করতে হয়। বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক কিছু জানতে হয়। শিক্ষার্থীদের জানানোর বিষয়টিকে এসব উপাদান দিয়ে আগ্রহী করে তুলতে হয়। শিক্ষার্থীরা কীভাবে কতটা গ্রহণ করছে, কেন করছে না, দুর্বলতা কোথায়, কী কী ব্যবস্থা নিলে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যায়- এ নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ও নিরন্তর গবেষণার আগ্রহ থাকতে হয়। এসব বিষয় কিন্তু প্রশিক্ষণে ঘটে না। প্রশিক্ষণে নতুন কিছু তথ্য যা কোনো গবেষক বা শিক্ষাবিদ তার পরীক্ষায় বা গবেষণায় পেয়েছেন তার সঙ্গে থিউরিটিক্যালি পরিচিত হওয়াই হচ্ছে সাধারণত আমাদের শিক্ষক প্রশিক্ষণ। আধুনিক কিছু প্রশিক্ষণে হয়তো ডেমোনেস্ট্রেশন এবং মাইক্রো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। তাও প্রকৃত পরিবেশে নয় অর্থাৎ একজন শিক্ষক যে পরিবেশে এবং যে বারোয়ারি ধরনের শিক্ষার্থী নিয়ে ডিল করেন তার কোনো কিছুই প্রশিক্ষণে থাকে না। শুধু থিউরি! আর এ বিষয়গুলো সবাইকে আগ্রহীও করে তোলে না। তাই, প্রশিক্ষণে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয় অর্থাৎ ‘এক্সটারনাল মোটিভেশন’-এর ব্যবস্থা করা হয়। প্রশিক্ষণে প্রকৃতভাবে কিছু জানতে হলে নিজের পেশাগত কারণে জানার আগ্রহ থাকলে সেখানে এক্সটারনাল মোটিভেশন প্রয়োজন হয় না। প্রশিক্ষণে যখনই এক্সটারনাল মোটিভেশন থাকে, তার মানে হচ্ছে প্রকৃত বিষয় থেকে অনেক দূরে অবস্থান করা। আর তাই আমাদের শিক্ষকরা সারা জীবনই প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন কিন্তু প্রকৃত জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসছে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক জরিপ করে দেখেছে যে, দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন অনেক কিন্তু দক্ষ শিক্ষক নেই বললেই চলে।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যে বিষয়টি ঘটে তা হচ্ছে শিক্ষকরা অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হন কিন্তু সেগুলো বাস্তবে ব্যবহারের এবং বিশেষ করে কার্যকরভাবে ব্যবহারের বিষয়টি ঘটে না। ফলে, এসব প্রশিক্ষণ শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে খুব একটা ভূমিকা রাখছে না। বিষয়টি এমন যে, ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার অনেক দর্শক আছেন যারা জীবনেও হাতে ক্রিকেট ব্যাট কিংবা ফুটবল নিয়ে দেখেননি। কিন্তু তারা নিয়মিত প্রচুর খেলা দেখেন, মাঠে বাইরে বসে কিংবা টিভির পর্দায় খেলা দেখে হাততালি দেন। সারা জীবনই তারা হাততালি দেন কিন্তু জীবনে কোনোদিন বল মেরে দেখেননি আর ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে চার বা ছক্কা মারার কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন না। আমাদের শিক্ষকরা সব সময়ই দর্শকের ভূমিকায় আর হাততালি দেওয়ার ভূমিকায় রয়ে গেছেন। তাদের যে প্রকৃত খেলোয়াড় হতে হবে এ বিষয়টি তারা নিজেরা তো নয়ই, প্রশিক্ষণ কর্তৃপক্ষও কোনোদিন মনে করেনি। শুধু থিউরিক্যাল প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আর প্রশিক্ষণে নিয়ে আসার জন্য টাকার লোভ দেখাচ্ছেন। ফলে, শিক্ষকরা দেখেন কোন প্রশিক্ষণে কত টাকা পাওয়া যাবে। টাকা হলে তার ছুটিসহ যা যা ম্যানেজ করা দরকার তাই করেন। কিন্তু টাকা কম পাওয়া যাবে সেসব প্রশিক্ষণে তারা নেই।
প্রশিক্ষণ এক ধরনের ব্যবসা! শিক্ষার বড় বড় প্রজেক্ট আসে, সেখানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আয়োজন থাকে, বেশ বড়সড় একটা বাজেট থাকে। সেই বাজেট খরচ করতেই হবে। শিক্ষকরা কী শিখলেন বা শ্রেণিকক্ষে কী কাজে লাগালেন, তা নিয়ে কারও কোনো ভাবনা থাকে না। শিক্ষকরাও বেজায় খুশি! একে তো প্রশিক্ষণ শেষে একটি বড় ধরনের অর্থ পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, অনেকদিন ক্লাস পড়াতে হয় না। ‘প্রমোট’ একটি ভালো করেছিল। শিক্ষকরা যখন প্রশিক্ষণে আসতেন তাদের ক্লাস যাতে মিস না যায় সেজন্য বিকল্প শিক্ষক তারা নিয়োগ দিয়ে তার বেতন বহন করত। সেটি যদিও অভিজ্ঞ শিক্ষকের মতো হতো না, তার পরও ক্লাস যাতে মিস না যায় সেরকম একটি ব্যবস্থা রেখেছিল, যা একটি ভালো পদক্ষেপ ছিল।
প্রশিক্ষণকে পুরোপুরি সার্টিফিকেট-নির্ভর করে তোলা হয়েছে! যেমন একটি বিএড সার্টিফিকেট নিয়ে এলে তা যেখান থেকেই আনা হোক একজন প্রার্থী শিক্ষকতার জন্য দরখাস্ত করতে পারেন এবং বিএড, এমএড করা একজন প্রার্থী উচ্চতর স্কেল প্রাপ্ত হন। এটি একদিক ঠিক আছে। রিওয়ার্ড না থাকলে কেউ সেই কোর্সটি করতে আগ্রহী হবে না। ফলে যা হয়েছে কিছু জানুক বা জানুক, দক্ষতার ধারে কাছে না গেলেও একটি সার্টিফিকেট হলেই একজন শিক্ষক সুবিধাগুলো পাচ্ছেন, তাহলে সার্টিফিকেট তো অর্জন করার জন্য যে কেউ যেনতেন উপায়ে চেষ্টা করবেন। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো তো মাননিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা করতে পারে না বিভিন্ন কারণে। যেমন বেসরকারি টিটিসিগুলো অতি সহজে কোনো ধরনের প্র্যাকটিস টিচিং ছাড়াই শিক্ষকদের পাস করচ্ছে, সার্টিফিকেট দিচ্ছে। তখন সরকারিগুলো পুরোটা না হলেও কিছুটা ছাড় দেওয়ার চেষ্টা তো করবেই! আমাকে একজন পদস্থ কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, তিনি ঢাকা টিটিসিতে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন। একপর্যায়ে ওই অনুষ্ঠানে অনেক শিক্ষার্থী প্রবেশ করেছেন তাদের ক্লাস শেষে। সবার হাতে একটি করে গাইড। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিতে এসেছেন কিংবা অনার্স কিংবা মাস্টার্স পড়ছেন অথচ সবাই গাইড অনুসরণ করছেন, তাহলে তারা শ্রেণিকক্ষে কী পড়াবেন? আমাকে বললেন বিষয়টা লক্ষ্য করেছেন? আমি তো বিষয়গুলো সর্বত্রই লক্ষ্য করি কিন্তু আমার বা টিটিসি কর্তৃপক্ষেরই বা করার কী আছে। সর্বত্রই যেমন পচন ধরেছে (যেমনটি সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেন কদিন আগে। ওই জায়গাটি বা বাদ যাবে কেন?
শিক্ষক নিয়োগের আগে যদি সার্টিফিকেটের দিকে না তাকিয়ে তার দক্ষতা, বিষয়জ্ঞান ও শিক্ষার্থী ডিলিংয়ের প্রকৃত দক্ষতা যাচাই করা হয়, তাহলে শিক্ষকরা কিছুটা হলেও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করবেন। যেমনটি বেসরকারি চাকরিতে করা হয়। সার্টিফিকেট যে যাই নিয়ে আসুক, যে প্রতিষ্ঠান থেকেই পাস করুক না কেন। প্রার্থীদের বাজিয়ে দেখা হয়, কারণ তারা প্রার্থীদের মধ্যে দক্ষতা খোঁজেন, সার্টিফিকেটের ওজন নয়। সরকারি পর্যায়ে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ, সবাই সহজে, ব্যক্তিগত বা দলগত লাভের পক্ষে যে বিষয়টি ঘটে সেটি করতে চান। কোনো কিছু কষ্ট করে অর্জন করা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে যখন প্রাতিষ্ঠানিক বা দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে কোনো পদ্ধতি বা নিয়ম চালুর চেষ্টা করা হয় তখনই শুরু হয় আন্দোলন! দক্ষতার বিষয়টি যেদিন থেকে প্রকৃত অর্থে মূল্যায়ন করা হবে, সেদিন শিক্ষকদের তথা পুরো শিক্ষার অবস্থা মঙ্গলের দিকে আগবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাড়লেই কিংবা একজন শিক্ষক সারাজীবন প্রশিক্ষণ নিলেই তিনি একজন দক্ষ শিক্ষক হবে না। আর শিক্ষকরা দক্ষ না হলে শিক্ষা নিয়ে যতই চিন্তাভাবনা করা হোক না কেন, সেটি বাস্তবে রূপ পাবে না।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
[email protected]


