ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্রযুক্তিদক্ষ তরুণরাই গড়বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী সোনারগাঁওয়ে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক হবে: শিক্ষামন্ত্রী জলবায়ু-সহনশীল ও পরিবেশ-বান্ধব পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ বিআইপির আলোচিত সিনেমার সিক্যুয়েল নিয়ে জয়া টেইলর সুইফটের নতুন রেকর্ড পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি? সাংবাদিকতায় দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন: মোস্তফা কামাল আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনের তারিখ ঘোষণা নিজেকে সমকামী বলে কটাক্ষের জবাব দিলেন মৌনী ফ্যাশনে বিশ্বকাপ মাদক কারবারে হাজার কোটিপতির উত্থান, দাবি ভূমিমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা: পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরে প্রশংসিত সঞ্জয় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ১ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র এআই উদ্ভাবনে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির কৃতিত্ব, ফাইনালে ‘কগনিভার্স’ ‘সবুজ সাথী’ সম্মাননায় ভূষিত সিলেট সিটি করপোরেশন ঈশ্বরগঞ্জে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের ঝটিকা মিছিল ঘরেই মিলবে কৃত্রিম দিনের আলো চকরিয়া থেকে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির যাত্রা শুরু রাজশাহীতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন ভূমিমন্ত্রী বিদেশি ঋণনির্ভর ও লুটপাটের বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে না: গোলাম পরওয়ার শহিদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত ও পরিবারকে সহায়তা প্রধানমন্ত্রীর রংপুরে অভিনব উপায়ে দল পরিবর্তন করলেন ব্রাজিল সমর্থক সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে তারেক রহমান আইভিএফে যমজ সন্তানের জন্ম, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল না বাবা-মায়ের পরিচয় ১০ জেলা হাসপাতালে আইসিইউ চালু হচ্ছে রবিবার মানুষকে রোগ সম্পর্কে সচেতন করছে তথ্যপ্রযুক্তি তারেক রহমানের ভিশন বাস্তবায়নে যুবদল অগ্রণী ভূমিকা রাখবে: মির্জা ফখরুল গ্রামীণ কাঁচা সড়ক পাকাকরণ জরুরি‎ আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার
Nagad desktop

সহনশীলতা মানবতার টিকে থাকার মূল চাবি

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:০৮ পিএম
আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:১২ পিএম
সহনশীলতা মানবতার টিকে থাকার মূল চাবি
ড. আলা উদ্দিন

আজকের বিশ্বে যখন ঘৃণা, বৈষম্য এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ক্রমশ বেড়েই চলেছে, তখন সহনশীল বা Tolerance শুধু নৈতিক গুণ নয়, বরং একটি বাঁচার কৌশলও হয়ে উঠেছে। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো (জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা) যে সহনশীলতার নীতিমালা বা Declaration of Principles on Tolerance গ্রহণ করেছিল, তা ছিল মানবতার প্রতি এক গভীর আহ্বান। এই ঘোষণার মূল বক্তব্য ছিল, মানুষকে তার ভিন্নতা, বিশ্বাস, ভাষা, সংস্কৃতি বা জীবনধারার কারণে বিচ্ছিন্ন বা ছোট করা উচিত নয়, বরং তাকে সম্মান এবং মূল্যায়ন করতে হবে। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৬ নভেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, বরং মানবসমাজে সহনশীলতার চর্চাকে উৎসাহিত করার প্রতীক।

সহনশীলতা মানে শুধুই অন্যকে ক্ষমা বা অগোচরে থাকা নয়। এটি একটি ইতিবাচক মনোভাব; যেখানে অন্যের অধিকার, মতামত এবং জীবনযাত্রার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা হয়। ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়েছে, সহনশীলতা কখনো উদারতা বা উদাসীনতার সমতুল্য নয়, বরং এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যম। সহনশীলতা ছাড়া মিশ্র সমাজ, বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায় বা বহুসংস্কৃতিক সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এই দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দেশটি ইতিহাসে নানা জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনের জায়গা। প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতা, হিন্দু রাজ্য, মুসলিম সুলতানাত, ঔপনিবেশিক শাসন- সব মিলিয়ে একটি বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পটভূমি তৈরি করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির মূল সুর হলো মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সহনশীলতা। লালন ফকিরের কাব্যিক ভাবধারায় দেখা যায়, ‘মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় ধর্ম’। এই দর্শন আজও আমাদের সামাজিক চেতনায় বিরাজমান, তবে বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই এর সঙ্গে মিল পাই না।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের নীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা (ধর্মীয় স্বাধীনতা), গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই নীতির মূল ভিত্তি ছিল সহনশীলতা। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক বিভাজন, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সামাজিক বৈষম্য এই চেতনা ক্ষয় করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং ঘৃণা ছড়ানো- এসব সহনশীলতার অভাবের প্রতিফলন।

সহনশীলতা মানে কারও সঙ্গে অন্ধভাবে একমত হওয়া নয়। বরং এটি অন্যের মতামত, বিশ্বাস বা অবস্থানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। এটি গণতন্ত্রের প্রাণ। যখন মানুষ অন্যকে শত্রু হিসেবে না দেখে তার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, তখনই সত্যিকারের সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। আজকের বাংলাদেশে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সামাজিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘Tolerance recognizes the universal human rights and fundamental freedoms of others।’ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়- সহনশীলতা মানে হলো অন্যের সর্বজনীন মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া। অন্য কথায়, যখন আমরা অন্যের অধিকারকে গ্রহণ করি, তখন সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা হয়। সহনশীলতা ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।
বিশ্বের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায়, সহনশীলতার অভাবে কত ভয়ংকর ফল হতে পারে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিপীড়ন, মায়ানমারের সামরিক শাসনের অধীনে হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ মানবিকতার ভিত্তিতে শরণার্থী গ্রহণ করেছে। এটি সহনশীলতার এক বাস্তব উদাহরণ, যেখানে মানুষকে তার ভিন্নতা সত্ত্বেও আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ও সামাজিক মিলনের জন্য শুধু আশ্রয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, শিক্ষা এবং সামাজিক সংহতি।

শিক্ষার ভূমিকা সহনশীলতা বিকাশে অপরিসীম। শিশুরা যখন ছোটবেলা থেকেই ভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে, তখন ভবিষ্যতের সমাজে ঘৃণার জায়গা কমে আসে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো এই লক্ষ্য অর্জনে কিছুটা পিছিয়ে আছে। নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ব, মানবাধিকার এবং বহু সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত। বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমতকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিখবে- বিতর্ক মানেই শত্রুতা নয়, বরং এটি শেখার এবং বোঝার একটি মাধ্যম।

ডিজিটাল যুগে সহনশীলতার চর্চা আরও জটিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ করা সহজ হলেও, ঘৃণা ছড়ানোও সমানভাবে সহজ। অন্যের ধর্ম, ভাষা বা রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য, গুজব বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা সমাজকে বিভক্ত করছে। অনলাইনে সহনশীলতা মানে সেন্সরশিপ নয়, বরং অন্যের মর্যাদা রক্ষা করে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করা। এজন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা, নৈতিক দায়িত্ব এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

সহনশীলতা আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক ন্যায্যতা। যখন সমাজে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বেশি থাকে, তখন অসহিষ্ণুতা বেড়ে যায়। মানুষ তার ক্ষোভ ও হতাশাকে অন্য গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণায় প্রকাশ করে। তাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে প্রত্যেকে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পায়। বাংলাদেশে দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, বরং সহনশীলতা বৃদ্ধিরও বিষয়।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহনশীলতা প্রতিষ্ঠায় অন্যতম মুখ্য ভূমিকা রাখে। ইতিহাসে যেসব নেতা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তারা সমাজে স্থিতিশীলতা ও মানবিক সহাবস্থানের পথ সুগম করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানীর মতো নেতাদের রাজনীতি ছিল মানবিক সংহতি ও মিলনের রাজনীতি। তাদের ভাষণগুলো ঘৃণার পরিবর্তে মিলনের আহ্বান জাগিয়েছে। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে বাঙালি, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবাই সমান মর্যাদায় বাঁচবে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সেই চেতনা কিছুটা দুর্বল হলেও, পুনরুদ্ধার জরুরি, নাহলে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রক্ষা কঠিন হবে।
সহনশীলতা শুধু রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কৃতি। এটি পরিবার থেকে শুরু হয়। শিশুদের মধ্যে ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জাগানো, পরিবারে এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার মাধ্যমে এই চেতনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিনের জীবনে আমরা যদি সহনশীল আচরণ করি- পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় বা অনলাইনে- বৃহত্তর সমাজে শান্তি, মিলন এবং মানবিকতার চেতনা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। সামাজিক সহনশীলতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হবে না। বৈচিত্র্যময় সমাজে টিকে থাকতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে, সহনশীলতা দুর্বলতা নয়, বরং এটি শক্তি। এটি এমন এক নৈতিক সাহস, যা অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং আমাদের মানবিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

ইউনেস্কোর ১৯৯৫ সালের ঘোষণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের বৈচিত্র্যই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারার মানুষের মধ্যে পার্থক্যকে আমরা যদি বোঝার এবং গ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তবে সমাজে শান্তি, সমঝোতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে। সহনশীলতা কেবল অন্যের মতামত মানা নয়, বরং তার অবস্থান বুঝতে চাওয়া, তার অধিকারকে সম্মান করা এবং পারস্পরিক মর্যাদা রক্ষা করা। এটি প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং সামাজিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। একজন মানুষ যখন সহনশীলতার মূল্যবোধ অনুসরণ করে, তখন সমাজে সংঘর্ষ কমে যায়, মানবিক সম্পর্ক শক্তিশালী হয় এবং বৈচিত্র্যময় সমাজে টিকে থাকা সহজ হয়। সত্যিকার অর্থে, মানবতার টিকে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি হলো এই সহনশীলতা, যা ঘৃণা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সুরক্ষা।

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার
ড. মো. আব্দুর রউফ

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ- নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না।...

বাংলাদেশের রাজস্বব্যবস্থা সংকটাপন্ন বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। কর-জিডিপি অনুপাত এখন ৬.৬, যা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। আমাদের আশপাশের দেশেও তা ১৫, ১৬, ১৮, উন্নত দেশে ২৫ থেকে ৩০-এর কাছাকাছি। তাহলে সংকটাপন্ন বলাই যায়। মনে প্রশ্ন জাগে–কেন এমন হলো? সাদা চোখে দেখি কারণ, খুব সহজ। তা হলো, এ যাবৎ রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিক ছিল না। পদক্ষেপ সঠিক হলে ফলাফল ভালো হতো। রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রশ্ন এলেই কতকগুলো গৎবাঁধা কথা বলা হয়। সেগুলো হলো, কর অব্যাহতি কমাতে হবে, করের ভিত্তি বাড়াতে হবে, একক ভ্যাট হার চালু করতে হবে, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়াতে হবে ইত্যাদি। সম্প্রতি একটা কথা খুব জোরেশোরে বলা হচ্ছে। তা হলো, কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে। এটা শুধু বলা হচ্ছে তা নয়, বরং এটা করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছে।

আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। সব বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয় না, কখনো জাল ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয়, আবার কখনো চালানপত্র জারি করা হলেও একাধিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয় ইত্যাদি। এরূপ নানাভাবে বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। কোন প্রতিষ্ঠানের সঠিক বিক্রির পরিমাণ কত এ তথ্য এনবিআর তথা সরকারের কাছে নেই। এই হলো রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান সহজ; তা হলো, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করা। এই মূল কাজটাই এ যাবৎ করা হয়নি। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার প্রতিনিধি বা আমাদের দেশের বক্তারা ইনভয়েস অটোমেশন নিয়ে কোনো কথা বলেন না। কর অব্যাহতি কমিয়ে লাভ কী যদি বিক্রির চালানপত্র জারি করা নিশ্চিত করা না যায়। বিক্রির চালানপত্র জারি নিশ্চিত না করে করের ভিত্তি বাড়িয়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। একক ভ্যাট হার চালু করা, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়ানো, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়ানো সব বিষয়ে একই কথা। বিক্রির সঠিক তথ্য পেতে এসব পদক্ষেপ তেমন সহায়তা করে না। বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে কোনো সংস্কার কাজে আসবে না। রাজস্ব ব্যবস্থায় সব সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করা, যেন প্রকৃত টার্নওভারের ওপর করারোপ করা যায়।

কর-নীতি ও বাস্তবায়ন কেন আলাদা করতে হবে?: এবার কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার প্রসঙ্গে আসি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে–এ কথা প্রথম বলেছে দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা। তার পর আমাদের দেশের কিছু অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সিভিল সোসাইটি লিডার, নীতি-নির্ধারক অর্থাৎ যারা পাবলিকলি কথাবার্তা বলেন তারা এ কথা বলে যাচ্ছেন এবং একটা গোলাকার আঁধারে একটা আয়তাকার বস্তু প্রবেশ করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা কোনোদিন সফল হবে না বা ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসেবে এটা জুড়ে দিয়েছে। এখন এটা টক অব দ্য টাউন হয়ে গেছে। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন এভাবে টক অব দ্য টাউন হয় না। কারণ, মনস্তাত্বিকভাবে আমরা বিদেশিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দিই। চিন্তাচেতনায় আমরা নিজেদের দেউলিয়া মনে করি। নিজেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস নেই। কিন্তু আইএমএফে যারা চাকরি করেন, তারাও বিভিন্ন দেশ থেকে আসেন। কখনো স্বল্পমেয়াদে চাকরি নিয়ে আসেন। কখনো অতি স্বল্পমেয়াদে কনসালট্যান্সি নিয়ে আসেন। আইএমএফের কিছু নিজস্ব ভাষা রয়েছে, তারা সেগুলো বলতে থাকেন। সব দেশে গিয়ে তারা একই কথা বলেন। এমন কথার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের ঘর তছনছ করে ফেলছি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার যৌক্তিকতা নিয়ে মূলত দুটি কথা বলা হয়। এক হলো, একই প্রতিষ্ঠান নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কাজ করলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দুই হলো কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা থাকা হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। আজ আমরা আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা নিয়ে আলোচনা করব।

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, চিরন্তন নয়: আন্তর্জাতিক বলতে আমরা মূলত বুঝি এমন কোনো বিষয় যা একাধিক বা অনেক দেশের মধ্যে বিরাজমান। অর্থাৎ এক জাতির সীমা অতিক্রম করে অনেক জাতির কাছে পৌঁছে যাওয়াকে আন্তর্জাতিক বলা হয়। সাধারণত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে প্রচলিত কোনো বিষয়কে আমরা আন্তর্জাতিক বলে বিবেচনা করে থাকি। উল্লেখ্য, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি সেটা কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক ছিল না। কিছুদিন আগে হয়তো সেটা কোনো জাতীয় বিষয় ছিল। তারও আগে হয়তো কোনো জাতীয় বিষয়ও ছিল না। হয়তো একাডেমিক আলোচনার বিষয় ছিল। আবার, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি কিছুদিন পর সেটা হয়তো আর আন্তর্জাতিক থাকবে না। হয়তো সে বিষয়ের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। তাহলে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয় এবং কোনো শাশ্বত, চিরন্তন ধারণা নয়, যা নির্বিচারে অনুসরণযোগ্য। আজ যদি নতুন কিছু বলা হয় সেটাও কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারে। তাই, আমাদের উচিত হবে আইডিয়ার মেরিট বিবেচনা করা। কোনো কিছু আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা হিসেবে প্রচলিত হয়েছে বলে সেটাকেই গ্রহণ করতে হবে–অন্য কোনো নতুন চিন্তা করা যাবে না, এমনটা উত্তম নয়, কল্যাণকরও নয়। আজ থেকে ৮০ বছর আগে ভ্যাটের অস্তিত্ব ছিল না। হয়তো ৪০ বছর পরে ভ্যাটের অস্তিত্ব থাকবে না। নতুন কোনো করব্যবস্থা আসবে। তাই, নতুন কোনো বিষয়ের আবির্ভাব হলে নিজস্ব পরিবেশে তার মেরিট যাচাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা সুবিবেচনাসম্মত।

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা উত্তম নয়: উত্তম কথাটাও আপেক্ষিক। এক দেশে যা উত্তম, এমন হতে পারে যে, অন্য দেশে তা পরিত্যাজ্য। আমেরিকা, ইউরোপে হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। কিন্তু আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে এগুলো নিন্দনীয়, পরিত্যাজ্য। তাই, অন্য পরিবেশের যেকোনা ধারণা উত্তম বলে অনুকরণ করা সমীচীন নয়। উত্তম হলো নিজের পরিবেশের জন্য উপযোগী হয় এমন আইডিয়া নিজে উদ্ভাবন করা। অন্যের উদ্ভাবিত আইডিয়া যাচাইবাছাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা। তাহলে দাঁড়ালো এই যে, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, উত্তম নয় এবং শাশ্বত, চিরন্তন বিষয় নয়। নিজস্ব পরিবেশ ও বাস্তবতা অনুধাবন না করে নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুকরণ করা সুবিবেচনাসম্মত নয়, কল্যাণকর নয়।

রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা: আমেরিকা, ইউরোপের রাজস্ব ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা আমাদের দেশের জন্য কোনো উত্তম পদক্ষেপ নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সব পরামর্শ আমাদের জন্য উত্তম নয়–সব পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে তা কাম্য নয়। রাজস্ব ব্যবস্থায় আমেরিকা, ইউরোপের আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে সমাজব্যবস্থায় হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো কেন নিয়ে আসা হচ্ছে না? কারণ, এ দেশের সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওইসব আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা একেবারেই বেমানান। এই পরিবেশে খাপ খাওয়ানো যাবে না। ব্যাপক জনগোষ্ঠী তা মেনে নেবে না। তাই, রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে অবশ্যই স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। এখানেই ভুল হয়েছে। ফলে অনেক ঘটনা, দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে।

আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা যা বলে, অন্যরা সেটাই বলতে থাকেন। আবারও যদি এই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে আরও অনেক দিন এই জাতিকে ভুগতে হতে পারে। তাই, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার নির্বিচার অনুকরণ নয়, রাজস্ব ব্যবস্থায় নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা নয়, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কাজ জোরোশোরে শুরু করুন। রাজস্বব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটে যাবে।

লেখক: সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম এবং ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট

জনআকাঙ্ক্ষার বাজেট এবং নানামুখী চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
জনআকাঙ্ক্ষার বাজেট এবং নানামুখী চ্যালেঞ্জ
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে জনআকাঙ্ক্ষা অনেক। বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। প্রতিটি মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা।...

চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠিত হয়। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের শাসনের বিরুদ্ধেও এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে বিএনপির নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেটিই ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করেছে। তার ওপর দাঁড়িয়েই সংগঠিত হয়েছে ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। বিগত সরকার দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। মনে রাখা দরকার, সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া এই রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।

দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। বিগত সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করেছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে মূলত লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মৌল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ অবস্থার পুনরুদ্ধারই শুধু নয়, একে উত্তরণ ও সমৃদ্ধ পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ২০২৬-২৭ জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আয়-ব্যয়ের হিসাবনিকাশ নয়, বরং দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়নের পথ-নকশার অংশ হিসেবে বাজেট সামনে আসা। বিগত সরকারের শাসনামলে অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষুদ্র দলীয় ও গোষ্ঠীগত দুরভিসন্ধিই ছিল প্রধান প্রবণতা। একদিকে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হস্তগত হয়েছে এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান নির্ধারণ হয়েছে। বাজেটে উল্লেখ আছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার কথাও রয়েছে। বাজেটে সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবমুখী দক্ষতানির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানবসম্পদে পরিণত করার কথা উল্লেখ আছে। এমনকি মৌলিক অধিকার হিসেবে সবার জন্য মানসম্পন্ন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছর বাজেটে পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা হবে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা কথাও রয়েছে। উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলার প্রতিও জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত বিবেচনার পাশাপাশি, নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা হবে। টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দেখতে হলে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

দেশে সামষ্টিক অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্রে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৬.৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পতিত সরকারের সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৪.২২ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশে ২০০৫-০৬ সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১.৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। সম্পদের অসম বণ্টনব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত নিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে; এখনো তা ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

দেশের বর্তমান বাস্তবতা পর্যালোচনায় দেখা যায় বিগত সরকারের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতি এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে আমরা বিশ্বাস করি যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক নীতি, কার্যকর সংস্কার ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করবে। একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সৃজনশীলতা, শ্রম, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল সক্ষমতার ওপর। সে কারণে, বর্তমান সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করবে। ফলে, উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। বাজেটে উল্লেখ আছে, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত হবে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২.৭ শতাংশে উন্নীত হবে এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমের প্রথম ধাপ এক বছর মেয়াদি। দ্বিতীয় ধাপ, অর্থনীতির উত্তরণ এক থেকে তিন বছর মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তৃতীয় ধাপ, সমৃদ্ধ অর্থনীতি পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করেছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ এবং বিগত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাত ও তৃণমূলের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অগ্রাধিকার রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬.১৩ শতাংশ।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে জনআকাঙ্ক্ষা অনেক। বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। প্রতিটি মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটা কীভাবে সফল করা হবে এখন তা দেখার বিষয়। প্রথম বাজেটে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করবে–নতুন সরকারের কাছে এটাই চাওয়া।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা 
ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

শিশুর জন্য বাজেট, দেশের জন্য বিনিয়োগ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
শিশুর জন্য বাজেট, দেশের জন্য বিনিয়োগ
দীপু মাহমুদ

শিশুদের জন্য বরাদ্দ কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দয়া নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতাও নয়। এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। আর যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগের গুরুত্ব বোঝে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আসন্ন বাজেটের আলোচনায় তাই শিশুদের আর প্রান্তে রাখা যাবে না। কারণ যাদের হাতে আগামী বাংলাদেশের দায়িত্ব থাকবে, তাদের জন্য বরাদ্দই আদতে ভবিষ্যতের জন্য বরাদ্দ।...

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে কৃষক আছেন, ব্যবসায়ী আছেন, শিল্পোদ্যোক্তা আছেন, সরকারি চাকরিজীবী আছেন, পেনশনভোগী আছেন। বাজেট ঘোষণার আগে তাদের সংগঠনগুলো দাবি জানায়, সংবাদ সম্মেলন করে, স্মারকলিপি দেয়, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে। বাজেট-পরবর্তী আলোচনাতেও তাদের লাভক্ষতি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ হয়। কিন্তু একটি বড় জনগোষ্ঠী আছে, যারা এসব আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। তারা দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। তারা ভোট দেয় না, কর দেয় না, সংগঠিত চাপ তৈরি করতে পারে না। তাই রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলেও তাদের জন্য আলাদা চেয়ার থাকে না। তারা বাংলাদেশের শিশু।

কথাটি কঠোর শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো বাজেট কেবল অর্থনৈতিক দলিল নয়, এটা রাজনৈতিক দলিলও। রাষ্ট্র কাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কাদের প্রয়োজনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে এবং ভবিষ্যৎকে কীভাবে কল্পনা করছে–তার প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশের শিশুদের অবস্থান এক ধরনের বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। কারণ যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করার কথা, তারা প্রায়ই সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।

এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ–এই বাক্যটি আমরা এত বেশি শুনেছি যে অনেক সময় এর গভীরতা অনুভব করি না। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এর অর্থ অত্যন্ত বাস্তব। আজ যে শিশু জন্ম নিচ্ছে, সে ২০ বছর পরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে, ২৫ বছর পরে কর দেবে, ৩০ বছর পরে অর্থনীতির উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হবে। অর্থাৎ একটি দেশের আগামী তিন-চার দশকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ভর করছে আজকের শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও সুরক্ষার ওপর। বিশ্বব্যাপী মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার প্রায় সবই একটি বিষয়ে একমত–শৈশবে বিনিয়োগের চেয়ে বেশি মুনাফা আর কোনো সামাজিক বিনিয়োগে পাওয়া যায় না। একজন শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা, তাকে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলও। যে রাষ্ট্র এ কথা বুঝতে পারে, সে রাষ্ট্র উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত করে। যে রাষ্ট্র এটা উপেক্ষা করে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত দুর্বল করে।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিশু উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পেয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, মেয়েদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এসব অর্জনের আড়ালে এখনো বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অপুষ্টি, শিক্ষার মানের সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, প্রতিবন্ধী শিশুদের বঞ্চনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত–এসব সমস্যা এখনো লাখো শিশুর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে রাখছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশুদের জন্য ব্যয়কে আমরা প্রায়ই খরচ হিসেবে দেখি, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। একটি সেতু নির্মাণের বরাদ্দ সহজেই দৃশ্যমান হয়। একটি উড়ালসড়ক চোখে পড়ে। কিন্তু একজন শিশুর পুষ্টি উন্নত হওয়া বা শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। ফলে রাজনৈতিকভাবেও এসব খাত অনেক সময় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না। অথচ দীর্ঘমেয়াদে একটি সেতুর চেয়েও মূল্যবান হতে পারে একটি সুস্থ, দক্ষ ও শিক্ষিত প্রজন্ম।

বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি। এই সুযোগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আগামী প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার বিকল্প নেই। কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় না, তার ভিত্তি গড়ে ওঠে জন্মের পর থেকেই। জীবনের প্রথম এক হাজার দিন, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেখার পরিবেশ–এসবই পরবর্তী জীবনের সক্ষমতা নির্ধারণ করে।

একজন অপুষ্ট শিশুর শেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। একজন শিক্ষাবঞ্চিত শিশু পরবর্তী সময়ে দক্ষ কর্মী হয়ে উঠতে পারে না। একজন সুরক্ষাহীন শিশু সহিংসতা, শোষণ বা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে পারে। অর্থাৎ শিশুদের প্রতি অবহেলা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির ওপরই বোঝা হয়ে ফিরে আসে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও শিশুদের কথা নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করে শিশুরাই। একটি বন্যা শুধু ফসল নষ্ট করে না, শিশুর স্কুল বন্ধ করে দেয়, অপুষ্টি বাড়ায়, রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে এবং অনেক পরিবারকে এমন সংকটে ফেলে, যেখানে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনায় তাই শিশুবান্ধব বিনিয়োগকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। মূল্যস্ফীতির সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। আর সেই পরিবারের শিশুরাই প্রথমে পুষ্টিকর খাবার হারায়, শিক্ষার সুযোগ হারায়, স্বাস্থ্যসেবার বাইরে চলে যায়। তাই শিশুকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে কেবল কল্যাণমূলক প্রকল্প হিসেবে নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো জবাবদিহি। শিশুদের জন্য কত টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে। বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, কর্মসূচিগুলো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে কি না এবং কোন খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে–এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। শিশুবান্ধব বাজেটের অর্থ কেবল বেশি বরাদ্দ নয় বরং আরও কার্যকর, আরও লক্ষ্যভিত্তিক এবং আরও জবাবদিহিমূলক ব্যয়।

এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব আছে। কারণ শিশু নিয়ে প্রশ্ন কেবল নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্থানীয় সরকারের বিষয়, পরিবেশ নীতির বিষয় এবং সর্বোপরি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের বিষয়। শিশুদের প্রান্তিক কোনো ইস্যু হিসেবে দেখার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

জাতীয় বাজেট শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক দলিলও বটে। এই দলিল বলে দেয় রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ভাবছে। একটি সমাজ তার সবচেয়ে শক্তিশালী নাগরিকদের জন্য কত ব্যয় করছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের জন্য কী করছে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো সেই উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী।

বাংলাদেশ যখন উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে শিশুদের স্থান দিতে হবে। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশ কোনো সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না, কোনো ভবনের ওপরও নয়। আগামী দিনের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে থাকবে আজকের শিশুদের কাঁধে। সে কারণেই শিশুদের জন্য বরাদ্দ কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দয়া নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতাও নয়। এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। আর যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগের গুরুত্ব বোঝে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

আসন্ন বাজেটের আলোচনায় তাই শিশুদের আর প্রান্তে রাখা যাবে না। কারণ যাদের হাতে আগামী বাংলাদেশের দায়িত্ব থাকবে, তাদের জন্য বরাদ্দই আদতে ভবিষ্যতের জন্য বরাদ্দ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পুনর্বিন্যাস জরুরি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম
মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পুনর্বিন্যাস জরুরি
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

মানবসম্পদ উন্নয়নের দুটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য। একটি অপরটির পরিপূরক এবং দুটোই সত্যিকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দ্রুত আধুনিকীকরণ, উন্নত প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকতর পেশাদারত্ব, নৈতিকতা এবং বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।...

উন্নয়ন বলতে প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাইরে মানুষের সব পার্থিব এবং অপার্থিব চাহিদা পূরণও বোঝায়। অতএব, এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে এবং তার দরকার আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৭০ সালের শেষের দিকে মানুষের কতগুলো মৌলিক চাহিদা নির্ধারণ করেছে। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য; সেটা আরও সম্প্রসারিত হয়ে এখন মৌলিক চাহিদা বলতে আমরা খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য; সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বাতাস এবং সার্বিকভাবে সুস্থ পরিবেশ। সার্বিক উন্নয়নের জন্য শুধু ব্যক্তিগত প্রয়াসই যথেষ্ট নয়, সরকারের বিভিন্ন সহায়তা ও কার্যক্রম অত্যাবশ্যক।  এ যাবৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে যেভাবে শিক্ষাকে মূল্যায়ন করা হয়, জনগণের স্বাস্থ্য এবং সঠিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। উন্নয়নের সূচকে স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশক যা-ই থাকুক, কোভিড-১৯ এর পর আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি সার্বিক উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন কতটা দরকার। এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি ঠিক না থাকে, সামগ্রিক উন্নয়ন তখন ব্যাহত হয়ে যায়। এর আরেকটা প্রভাব রয়েছে, যা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সেটা হলো, স্বাস্থ্য খারাপ হলে মানুষের উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। সুতরাং দুই দিক দিয়েই স্বাস্থ্য মূল্যবান।

মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়, গবেষণা হয়। প্রায়ই শিক্ষার গুণগত মান, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, শিক্ষার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হয়। যখন মানবসম্পদের প্রসঙ্গ আসে, তখন মানবপুঁজি (হিউম্যান ক্যাপিটাল) বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে সমস্যাটি চোখে পড়ার মতো, তা হলো স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়। অর্থাৎ এটা রাষ্ট্রের বিশেষ কর্তব্য। পৃথিবীর সব দেশেই এ বাধ্যবাধকতা থাকে; কিন্তু বাধ্যবাধকতা থাকার পরও এ বিষয়টিকে আমরা বাস্তবে বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারিনি।

এজন্য আমাদের প্রথম কাজ হলো পাবলিক হেলথ সিস্টেমটিকে উন্নত ও সহজলভ্য করা। অথচ আস্তে আস্তে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভূমিকা হ্রাস পাচ্ছে এবং বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দেশে স্বাস্থ্য খাতের আরেকটা সমস্যা হলো আমাদের ভালো ওয়ার্ক ফোর্স নেই। ডাক্তার, নার্স, হেলথ টেকনিশিয়ান, প্যারামেডিকস অনেক কম। ফার্মাসিস্টদের ভূমিকাও দেখা যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডাক্তারদের মূল ভূমিকা হচ্ছে, প্রথমে রোগ ডায়াগনোসিস করা এবং প্রতিরোধ ও নিরাময়ের জন্য নির্দেশনা ব্যবস্থা নেওয়া। বাকি আনুষঙ্গিক কাজগুলো হলো সহযোগী বা পরিপূরক কাজ। সেসব দেশে অপারেশন করার পর সার্জনরা চলে যান। পরে প্যারামেডিকস ও নার্সরাই তার কেয়ার নেন। কিন্তু আমাদের এখানে, বিশেষ করে আমাদের চিকিৎসকের অনুপাত অনুযায়ী স্বাস্থ্য সহযোগীর সংখ্যা খুব কম। স্থানীয় পর্যায়ে আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন (রেভল্যুশন) করিনি। স্বাস্থ্য খাতটা একেবারেই কেন্দ্রীভূত। সবকিছু কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সিভিল সার্জন দায়িত্ব পালন করেন। সিভিল সার্জনের তেমন কোনো ভূমিকা নেই, শুধু প্রশাসনিক ব্যাপার ছাড়া। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য খাত বিকেন্দ্রীকরণ না হলে, একেবারে ইউনিয়ন পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত উন্নতি হবে না। শ্রমের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ এর গভীরে অনেকেই যায় না। মনে রাখা দরকার, মানবপুঁজির দুটি দিক রয়েছে- এক. শিক্ষাপুঁজি এবং দুই. স্বাস্থ্যপুঁজি। তাই মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, যা আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা প্রভাব ফেলে; কিন্তু উন্নয়ন ইস্যুতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ভূমিকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুটিই সমানভাবে ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর যেসব দেশে উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে এশিয়ার চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এসব দেশে দেখা যায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটি খাতেই তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

মূল সমস্যাটি হলো দুর্নীতি। এ খাতে দুর্নীতিটা বেশি হচ্ছে। যখন কোনো কিছুর কেন্দ্রীকরণ হয়; তখন নানা রকম কেনাকাটা হয়। অনেক সময় যে জিনিসটা যে জায়গায় দরকার সেটাও ঠিকমতো হয় না। বরগুনার একটি উপজেলায় যে জিনিসটার দরকার, দিনাজপুরের একটি উপজেলায় একই জিনিস না-ও লাগতে পারে; কিন্তু এখানে ঢালাওভাবে কেনাকাটা করা হয়। ফলে অনেক সময় কেনা জিনিস পড়ে থাকে। এ কেন্দ্রীকরণের সুযোগেই স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অপচয় বেশি হয়। দ্রুত কোভিড মহামারি থেকে উত্তরণের পথে অবশ্যই উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি সবার নজর দিতে হবে। বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় হলো স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক সম্পদ। 

আমাদের আরেকটা সমস্যা হলো দুর্বল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা। এ সমস্যাটা আমরা এবার খুব বেশি টের পাচ্ছি। করোনা মহামারিতে দেখা গেল, সরকারি সংস্থা থেকে দেওয়া তথ্য অনেক সময় অসম্পূর্ণ। তথ্যগুলো আপডেটও থাকে না। যারা ব্রিফ করেন, তারাও ততটা আপডেট থাকেন না। এ ছাড়া এখানে তথ্য সংগ্রহ থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় স্বাস্থ্য তথ্যের ওপর মানুষের আস্থাও কম। আমাদের দরকার যথাযথ ও সুষ্ঠু তথ্য ব্যবস্থা এবং ধারাবাহিকতা। মানে, আপনি ছয় মাস পর একটা তথ্য দিলেন, ওটাও অসম্পূর্ণ, অতএব সেটা দিয়ে তেমন কাজ হবে না।

সব সমস্যার কারণগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আমরা কিন্তু মুখে মুখে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করি। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, পাবলিক-প্রাইভেট স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সুষ্ঠু মনিটরিং নেই। স্বাস্থ্য সমস্যা ও চিকিৎসার ব্যয়কে আমরা অর্থনীতিতে বলি ইনকাম ইরোডিং ফ্যাক্টর (আয়বিনাশী কারণ), যা দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে এটা মারাত্মক হয়ে উঠেছে। মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চমধ্যবিত্ত যে কেউ যদি একটা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে অর্থকষ্টে ঘটিবাটি, বাড়িঘর বেচে দেওয়ার ফাঁদে পড়ে যায়।

আমরা যদি স্বাস্থ্য খাত ঠিক না করি, তাহলে অর্থনীতি ও সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য খাত ঠিক করতে হলে, বিশেষ করে সাতটা জিনিসের ওপর জোর দিতে হবে। একটা হলো স্বাস্থ্যসেবার ডেলিভারি সিস্টেম বা স্বাস্থ্যসেবা যথাযথভাবে উন্নত করা। দ্বিতীয়ত, সঠিক লোকবল বা জানাশোনা লোক নিয়োগ। এ ছাড়া তথ্য ব্যবস্থাপনাকে যথাযথভাবে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ইকুইটেবল অ্যাকসেস ধনী-গরিবনির্বিশেষে চিকিৎসার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশেও বড়লোকরা বেশি চিকিৎসা পায়, তাদের জন্য কেবিন রিজার্ভ রাখা, আইসিইউ রিজার্ভ রাখা, তাদের আলাদা হাসপাতালে নেওয়া এগুলো দুঃখজনক। আবার তারা বিদেশেও চলে যায়। এগুলো দূর করতে হবে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন তথা বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, সুষ্ঠু স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ষষ্ঠত, স্বাস্থ্য খাতে গুড লিডারশিপ নিয়ে আসতে হবে। 

মানবসম্পদ উন্নয়নের দুটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য। একটি অপরটির পরিপূরক এবং দুটোই সত্যিকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দ্রুত আধুনিকীকরণ, উন্নত প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকতর পেশাদারত্ব, নৈতিকতা এবং বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে দুর্নীতি করলে অতি দ্রুত, দৃশ্যমান এবং শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এ সাতটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। এগুলো করতে পারলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশে সর্বজনীন আর্থ-সামাজিক উন্নতি হবে এবং আমাদের দেশ দ্রুত সামনে এগিয়ে যাবে।

লেখক: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা
ড. লিপন মুস্তাফিজ

এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি সংকেত। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।...

দেশের একটি স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত বহন করছে। এটা একটা দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। যদিও আমরা জানি যে আমাদের দেশের নতুন সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তবুও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছানো শুধু একটি পরিসংখ্যানগত তথ্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে। ফলে মূল্যস্ফীতির সামান্য বৃদ্ধি হলেও তাদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

এর আগে আমাদের সবার জানা দরকার মূল্যস্ফীতি বলতে আমরা কী বুঝি? সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে মাঝে মাঝে বিপাকে পড়েন। মূল্যস্ফীতি বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তরের বৃদ্ধি। যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, তখন মানুষের হাতে থাকা অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা ক্রয় করা সম্ভব হয়। এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি মানে হলো, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়পড়তা পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে মানুষের আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে জীবনযাত্রার মান ধীরে ধীরে নেমে আসে। এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যের ওপর। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। কিছুদিন আগে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এক লাফে সবকিছুর দাম বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কোনো খবর চাপা থাকে না। ফলে গ্রামগঞ্জেও এর প্রভাব পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় আগের দামে কেনা পণ্যের দাম হুট করেই বেড়ে যায়। আবার কোনো কোনো স্থান ভেদে একই পণ্য কমবেশি দামে বিক্রি করে। দুই দিন আগে আমি ইস্কাটনে একটা নরমাল হোটেলে মোগলাই অর্ডার করি, যার দাম ছিল ৯০ টাকা। ঠিক একদিন পরে বারডেম হাসপাতালে রোগী দেখার জন্য গিয়ে সেখানে ছাদের ওপরের রেস্টুরেন্টে মোগলাই খেলাম ১২০ টাকা দিয়ে। একই জিনিস স্থানভেদে আমাকে ৩০ টাকা বেশি খেতে হলো। এই চাপ বা অতিরিক্ত খরচ আমি না হয় সামাল দিলাম কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ কী করবে। তাদের কি মোগলাই খেতে ইচ্ছে করবে না? তারা কি মাসে একবার গোশত খাবে না? নেবে না ইলিশের সুবাস? বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য খাদ্যব্যয়ের চাপ অসহনীয় হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার তাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইদানীং পে-স্কেলের কথা শোনা যায় পত্রপত্রিকার মাধ্যমে। তখন যদি বেতন বৃদ্ধি পায় তাহলে আরেক দফায় পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে বৈ কমবে না। আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে। সুতরাং বাজেট ঘোষণার পরে আবারও পণ্যের দাম বাড়বেই। তখন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কী করবে? কীভাবে জীবন ধারণ করবে।

গ্রামাঞ্চল থেকে শহর–সব জায়গাতেই এ প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একজন নিম্ন আয়ের শ্রমিকের উদাহরণ ধরা যেতে পারে। আগে যে আয় দিয়ে একটি পরিবার মাসের পুরো সময় স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারত, এখন সেই একই আয় দিয়ে মাসের মাঝামাঝি সময়েই টান পড়ছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে কম দামে নিম্নমানের খাদ্য কিনছে বা ঋণের ওপর নির্ভর করছে। এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং লাখো মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য খাতেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব স্পষ্ট। বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় সবকিছুই ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এর ফলে মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি একটি বড় কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গম এবং ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। যখন টাকার মান কমে যায়, তখন একই পণ্য আমদানি করতে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ হিসেবে পড়ে। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, মজুতদারি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন যে বইয়ের শেখা থিওরির সঙ্গে মেলাতে পারি না। এই উচ্চমূল্যস্ফীতি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন বাজারে চাহিদা হ্রাস পায়। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের পণ্যের বিক্রি কমে যায়। অন্যদিকে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও চাপে পড়ে, যা বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও মূল্যস্ফীতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশই বর্তমানে উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে। তবে উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই সুরক্ষাব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় প্রভাবটা বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়। ফলে পণ্যের দাম বাড়লে তারা অন্য প্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমাতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা চিকিৎসা বা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ব্যয় কমিয়ে দেয়। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং দারিদ্র্যের চক্র আরও গভীর হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে যাতে কোনো ধরনের মজুতদারি বা কৃত্রিমসংকট সৃষ্টি না হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে আমদানি সহজ করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুদ্রানীতি কঠোর করা, সুদের হার সমন্বয় এবং বাজারে অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপ গ্রহণের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেন ব্যাহত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণই এখানে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি সংকেত। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। সরকার, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ সবাই যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তাহলে মূল্যস্ফীতির এই চাপ কমিয়ে একটি স্থিতিশীল, সহনশীল এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট