আজকের বিশ্বে যখন ঘৃণা, বৈষম্য এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ক্রমশ বেড়েই চলেছে, তখন সহনশীল বা Tolerance শুধু নৈতিক গুণ নয়, বরং একটি বাঁচার কৌশলও হয়ে উঠেছে। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো (জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা) যে সহনশীলতার নীতিমালা বা Declaration of Principles on Tolerance গ্রহণ করেছিল, তা ছিল মানবতার প্রতি এক গভীর আহ্বান। এই ঘোষণার মূল বক্তব্য ছিল, মানুষকে তার ভিন্নতা, বিশ্বাস, ভাষা, সংস্কৃতি বা জীবনধারার কারণে বিচ্ছিন্ন বা ছোট করা উচিত নয়, বরং তাকে সম্মান এবং মূল্যায়ন করতে হবে। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৬ নভেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, বরং মানবসমাজে সহনশীলতার চর্চাকে উৎসাহিত করার প্রতীক।
সহনশীলতা মানে শুধুই অন্যকে ক্ষমা বা অগোচরে থাকা নয়। এটি একটি ইতিবাচক মনোভাব; যেখানে অন্যের অধিকার, মতামত এবং জীবনযাত্রার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা হয়। ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়েছে, সহনশীলতা কখনো উদারতা বা উদাসীনতার সমতুল্য নয়, বরং এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যম। সহনশীলতা ছাড়া মিশ্র সমাজ, বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায় বা বহুসংস্কৃতিক সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এই দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দেশটি ইতিহাসে নানা জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনের জায়গা। প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতা, হিন্দু রাজ্য, মুসলিম সুলতানাত, ঔপনিবেশিক শাসন- সব মিলিয়ে একটি বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পটভূমি তৈরি করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির মূল সুর হলো মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সহনশীলতা। লালন ফকিরের কাব্যিক ভাবধারায় দেখা যায়, ‘মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় ধর্ম’। এই দর্শন আজও আমাদের সামাজিক চেতনায় বিরাজমান, তবে বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই এর সঙ্গে মিল পাই না।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের নীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা (ধর্মীয় স্বাধীনতা), গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই নীতির মূল ভিত্তি ছিল সহনশীলতা। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক বিভাজন, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সামাজিক বৈষম্য এই চেতনা ক্ষয় করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং ঘৃণা ছড়ানো- এসব সহনশীলতার অভাবের প্রতিফলন।
সহনশীলতা মানে কারও সঙ্গে অন্ধভাবে একমত হওয়া নয়। বরং এটি অন্যের মতামত, বিশ্বাস বা অবস্থানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। এটি গণতন্ত্রের প্রাণ। যখন মানুষ অন্যকে শত্রু হিসেবে না দেখে তার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, তখনই সত্যিকারের সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। আজকের বাংলাদেশে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সামাজিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘Tolerance recognizes the universal human rights and fundamental freedoms of others।’ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়- সহনশীলতা মানে হলো অন্যের সর্বজনীন মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া। অন্য কথায়, যখন আমরা অন্যের অধিকারকে গ্রহণ করি, তখন সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা হয়। সহনশীলতা ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।
বিশ্বের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায়, সহনশীলতার অভাবে কত ভয়ংকর ফল হতে পারে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিপীড়ন, মায়ানমারের সামরিক শাসনের অধীনে হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ মানবিকতার ভিত্তিতে শরণার্থী গ্রহণ করেছে। এটি সহনশীলতার এক বাস্তব উদাহরণ, যেখানে মানুষকে তার ভিন্নতা সত্ত্বেও আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ও সামাজিক মিলনের জন্য শুধু আশ্রয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, শিক্ষা এবং সামাজিক সংহতি।
শিক্ষার ভূমিকা সহনশীলতা বিকাশে অপরিসীম। শিশুরা যখন ছোটবেলা থেকেই ভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে, তখন ভবিষ্যতের সমাজে ঘৃণার জায়গা কমে আসে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো এই লক্ষ্য অর্জনে কিছুটা পিছিয়ে আছে। নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ব, মানবাধিকার এবং বহু সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত। বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমতকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিখবে- বিতর্ক মানেই শত্রুতা নয়, বরং এটি শেখার এবং বোঝার একটি মাধ্যম।
ডিজিটাল যুগে সহনশীলতার চর্চা আরও জটিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ করা সহজ হলেও, ঘৃণা ছড়ানোও সমানভাবে সহজ। অন্যের ধর্ম, ভাষা বা রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য, গুজব বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা সমাজকে বিভক্ত করছে। অনলাইনে সহনশীলতা মানে সেন্সরশিপ নয়, বরং অন্যের মর্যাদা রক্ষা করে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করা। এজন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা, নৈতিক দায়িত্ব এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সহনশীলতা আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক ন্যায্যতা। যখন সমাজে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বেশি থাকে, তখন অসহিষ্ণুতা বেড়ে যায়। মানুষ তার ক্ষোভ ও হতাশাকে অন্য গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণায় প্রকাশ করে। তাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে প্রত্যেকে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পায়। বাংলাদেশে দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, বরং সহনশীলতা বৃদ্ধিরও বিষয়।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহনশীলতা প্রতিষ্ঠায় অন্যতম মুখ্য ভূমিকা রাখে। ইতিহাসে যেসব নেতা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তারা সমাজে স্থিতিশীলতা ও মানবিক সহাবস্থানের পথ সুগম করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানীর মতো নেতাদের রাজনীতি ছিল মানবিক সংহতি ও মিলনের রাজনীতি। তাদের ভাষণগুলো ঘৃণার পরিবর্তে মিলনের আহ্বান জাগিয়েছে। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে বাঙালি, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবাই সমান মর্যাদায় বাঁচবে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সেই চেতনা কিছুটা দুর্বল হলেও, পুনরুদ্ধার জরুরি, নাহলে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রক্ষা কঠিন হবে।
সহনশীলতা শুধু রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কৃতি। এটি পরিবার থেকে শুরু হয়। শিশুদের মধ্যে ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জাগানো, পরিবারে এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার মাধ্যমে এই চেতনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিনের জীবনে আমরা যদি সহনশীল আচরণ করি- পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় বা অনলাইনে- বৃহত্তর সমাজে শান্তি, মিলন এবং মানবিকতার চেতনা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। সামাজিক সহনশীলতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হবে না। বৈচিত্র্যময় সমাজে টিকে থাকতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে, সহনশীলতা দুর্বলতা নয়, বরং এটি শক্তি। এটি এমন এক নৈতিক সাহস, যা অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং আমাদের মানবিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
ইউনেস্কোর ১৯৯৫ সালের ঘোষণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের বৈচিত্র্যই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারার মানুষের মধ্যে পার্থক্যকে আমরা যদি বোঝার এবং গ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তবে সমাজে শান্তি, সমঝোতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে। সহনশীলতা কেবল অন্যের মতামত মানা নয়, বরং তার অবস্থান বুঝতে চাওয়া, তার অধিকারকে সম্মান করা এবং পারস্পরিক মর্যাদা রক্ষা করা। এটি প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং সামাজিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। একজন মানুষ যখন সহনশীলতার মূল্যবোধ অনুসরণ করে, তখন সমাজে সংঘর্ষ কমে যায়, মানবিক সম্পর্ক শক্তিশালী হয় এবং বৈচিত্র্যময় সমাজে টিকে থাকা সহজ হয়। সত্যিকার অর্থে, মানবতার টিকে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি হলো এই সহনশীলতা, যা ঘৃণা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সুরক্ষা।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
.jpg)
