ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সরকারি সিদ্ধান্তে নতুন করে পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে তফসিলের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সরকার থেকে নির্দেশ পেলে তা ঘোষণা করা হবে। বাংলাদেশে এর আগে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে তিনটিই ছিল রাজনৈতিক বৈধতা বা শাসনব্যবস্থা নিয়ে। এবারের গণভোটের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন- জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জনমত যাচাই করা হবে হ্যাঁ অথবা না ভোটের মাধ্যমে। আর এই প্রথম কোনো সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যা বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে নজিরবিহীন। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব দিয়েছে কীভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। একই দিনে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এদিকে আইন না এলে ইসি পুরো প্রস্তুতি শুরু করতে পারছে না। প্রস্তুতি শুরু না হলে একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনও কঠিন হয়ে পড়বে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে অনেকের কাছে বিষয়টি অস্পষ্ট ও বোঝার ঘাটতি থাকতে পারে। সে হিসেবে গণভোটের বিষয়ে গণসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বয়োবৃদ্ধ ও স্বল্প শিক্ষিত ভোটারদের ক্ষেত্রে গণভোটের ব্যালট বুঝতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির শেষ ধাপে গণভোট একসঙ্গে করার সিদ্ধান্ত এসেছে। ফলে এ পর্যায়ে কমিশনকে পুরো পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে। ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুটি বড় নির্বাচন একসঙ্গে করা চ্যালেঞ্জিং, তবে দলে আলোচনা করে মোটামুটি সব বিষয় গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করায় উপায় খুঁজে বের করাই এখন মূল লক্ষ্য। আইন ও বিধিমালা ঠিক করে তফসিল ঘোষণা করা ইসির নীতি বিষয়। সংসদ ও গণভোটের ব্যালট গণনায় আলাদা দুই সেট লোকবল না হলে গণনার সময়সীমা দীর্ঘ হবে। ফলে রাতভর গণনা বা পরদিন পর্যন্ত কাজ চালাতে হতে পারে। দুটি নির্বাচনের ব্যালট পেপার আলাদা রঙে ছাপাতে হবে। একই সঙ্গে দুটি বিষয় জড়িত। এ কারণেই সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট একসঙ্গে রাখতে হলে রং আলাদা করা বাধ্যতামূলক। সংসদ নির্বাচনে প্রতীক নিয়ে প্রার্থীদের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা থাকবে আর গণভোট নিয়ে গ্রামগঞ্জে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জনসচেতনতা বাড়াতে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় ৩০ সেকেন্ড থেকে সর্বোচ্চ এক মিনিটের টেলিভিশন কমার্শিয়াল বা টিভিসি বা প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও জনবহুল স্থানে প্রজেক্টরের মাধ্যমে এসব টিভিসি ও প্রামাণ্য চিত্র প্রচারের ব্যবস্থা করবে তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। আশা করছি উভয় মন্ত্রণালয় সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে। ইসির একাধিক কর্মকর্তার মতে, গুজব, অপপ্রচার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনি পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠতে পারে। বিশেষ করে সহিংসতা সৃষ্টি এমনকি ভোট প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কাউন্টার ন্যারেটিভ সচেতনতামূলক প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত তথ্যমতে, এবার দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার। এর সঙ্গে যুক্ত হবেন প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী ভোটার। বর্তমান নির্বাচনের প্রস্তাবিত বাজেট ২ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। আলাদা দিনে গণভোট হলে অতিরিক্ত ব্যয় হতো প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে একদিনের ব্যয় হতে পারে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ভোট কক্ষ বাড়ানো, অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো অতিরিক্ত ব্যালট বাক্স বা ভিন্ন রঙের ব্যালট ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়াতে নির্বাচনি ব্যয় বাড়াতে হবে।
দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভোট আয়োজন হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। এ ছাড়া নতুন যুক্ত হয়েছে গণভোটের বিষয়টি। সব মিলিয়ে পুরো নির্বাচন কমিশনের দিকে এখন দেশবাসীর নজর রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন জানান, অধ্যাদেশ জারি হলে কমিশন গণভোটের প্রক্রিয়া, বাক্সের সংখ্যা ও ভোটগ্রহণের অন্যান্য বিষয় নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে কাজ শুরু করবে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট এক্ষেত্রে কমিশন মনে করে অধ্যাদেশ জারি হলে তারপর তারা নিজেদের করণীয় ঠিক করবে।
এ ছাড়া প্রবাসী ভোটারদের জন্য এবারই প্রথম চালু হচ্ছে পোস্টাল ভোট। নির্বাচন কমিশন ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের উদ্বোধন করেছে গত মঙ্গলবার। সিইসি এটিকে হাইব্রিড মডেল বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটি হলো আইটি সাপোর্টেড ডাকযোগে ভোটের ব্যবস্থা। প্রবাসীদের অ্যাপভিত্তিক নিবন্ধন গত ১৮ নভেম্বর থেকে চালু হয়েছে। তাদের কাছে সংসদের পাশাপাশি গণভোটের ব্যালটসহ দুটি খাম পাঠাতে হবে। এতে ডাক খরচ প্রস্তুতিমূলক সময় যাচাই-বাছাই সবই বাড়বে। এবারে নির্বাচনে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গুজব, অপপ্রচার ও অপতথ্য। এআই নির্বাচনকে আরও চ্যালেঞ্জের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তাই ভোটার ও ভোট প্রার্থী সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
গণভোটকে চ্যালেঞ্জ মনে করছেন রাজনীতিবিদরা, এমনকি সাধারণ মানুষও। গণভোটে হ্যা এবং না প্রশ্ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে মনে করছেন অনেকেই। এ ছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে অনেক। গণভোট ইস্যুতে কীভাবে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায় বা সচেতন করা যায় সে ব্যাপারে রাজনৈতিক দল ও কমিশনকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রস্তুতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচারই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে গণভোট এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সংস্কার নিয়ে দেশে এক সময় বিপুল জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। আস্তে আস্তে সেটি নির্বাচন ও গণভোট ইস্যুতে খানিকটা ভাটা পড়ে যায়। তবে যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণ সোচ্চার হয়েছিল সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে সরকার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে সেই প্রত্যাশা রাখি।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ
বেগম রোকেয়া পদক ২০২১ প্রাপ্ত (পল্লি উন্নয়ন)
এবং স্থানীয় সরকার গবেষক


