ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডকে রুখে দিল ঘানা বিশ্বকাপে ইরানের সফর নীতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ক্যানভাসে চিরযৌবন নেইমারে ভয় নেই স্কটল্যান্ডের মাঠে হেঁটেই সফল মেসি রোনালদোর রেকর্ডের রাতে পর্তুগালের গোল উৎসব ৪১ বছরেও থামেননি রোনালদো, ভাঙলেন মেসির রেকর্ড পর্তুগিজ কিংবদন্তিতে ছাড়িয়ে শীর্ষে রোনালদো রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত? রেকর্ড তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ট্র্যাজেডি, পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা, রিমান্ডে আইনজীবী বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৮ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, শীর্ষে চীন ও ভারত: বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কড়া বক্তব্য দিলেন এমপি রেহানা রানু টিআর-কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত চলছে: ত্রাণমন্ত্রী এক অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী

সবার মানবাধিকার সুনিশ্চিত হোক

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:০৩ পিএম
সবার মানবাধিকার সুনিশ্চিত হোক
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারসহ ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারের আমলেই যেন দেশে কোনো 'আয়নাঘর'-এর জন্ম না হয়, গুম-খুন, নির্যাতন, হয়রানি তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, তা সুনিশ্চিত করার এখনই উপযুক্ত সময়। আর এসব বিষয় বর্তমান সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই। সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে, কেবলমাত্র মানব পরিবারের সব সদস্যের সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহ এবং সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতিই পারে বিশ্বে শান্তি, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি গড়ে তুলতে; কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়।...

আজ ১০ ডিসেম্বর। বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে: ‘Our Everyday Essentials.’ অর্থাৎ আমাদের প্রতিদিনের জিনিস। প্রতি বছর দিবসটির একটি নির্দিষ্ট থিম এবং উদ্দেশ্য থাকে। ২০২৫ সাল বা চলতি বছর আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু সম্পর্কে, যার লক্ষ্য হলো মানবাধিকার কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ তা দেখানো আর হলোকস্ট স্মরণ হলো বিকল্প থিম। জাতিসংঘের উদ্যোগে ও নির্দেশনায় বিশ্বের সব দেশেই প্রতি বছর দিবসটি ১৯৪৮ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় দিবসটি বাংলাদেশেও পালিত হয়। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির সত্যিকার চিত্র খুবই ভয়াবহ। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৪০ জন; আইনি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর শিকার হয়েছেন ২৮ জন; মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে মারা গেছেন ১৬৫ জন। আর প্রতিবেদনেগুলোতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। সেখানে ২৮১ জন মারা গেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। আর নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়ে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অধিকারের পরিসংখ্যান নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার উচ্চ প্রবণতা নির্দেশ করে, যার মধ্যে ১৪,০৮৩টি ধর্ষণের ঘটনা এবং ৪,৪৮৯টি যৌতুক-সম্পর্কিত সহিংসতার ঘটনা রয়েছে। সর্বোপরি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সাংবাদিকরা উল্লেখযোগ্যভাবে হয়ানির সম্মুখীন হয়েছেন বরাবরের মতোই এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৩৫১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে ১০৯টি শারীরিক আক্রমণও রয়েছে। গত বছর (২০২৪) অধিকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২০০৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত শাসনামলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৯৯ জন। এ সময়ে গুম হন ৬৭৭ জন, কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন ১ হাজার ৪৮ জন। আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের তালিকাসহ ২০২৪ সালের ঘটনা যুক্ত করলে নিহতের সংখ্যা হবে ৩ হাজার। অধিকারের পরিসংখ্যান বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার বছর ২০০৯ সালে হত্যার শিকার হন মোট ১৫৪ জন। এ ছাড়া ২০১০ সালে ১২৭ জন, ২০১১ সালে ৮৪, ২০১২ সালে ৭০ জনকে হত্যা করা হয়। নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৯ জনে। আর নির্বাচনের বছর ২০১৪ সালে ১৭২ জন, ২০১৫ সালে ১৮৬, ২০১৬ সালে ১৭৮, ২০১৭ সালে ১৫৫ জনকে হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছরে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয় ৪৬৬ জনকে। ২০১৯ সালে ৩৯১ জন, ২০২০ সালে ২২৫ জনকে হত্যা করা হয়। ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারির পর তা কমে ১০৭ জন, ২০২২ সালে ৩১ ও ২০২৩ সালে ২৪ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। শুধু অধিকার-এর প্রতিবেদনই নয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমন- ২০২৩ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। মার্কিন ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লেযোগ্য মানবাধিকার-সংক্রান্ত যেসব বিষয় নিয়ে গ্রহণযোগ্য খবর রয়েছে, সেগুলো হলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিধিবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন বা নিষ্ঠুরতা, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা সরকারের তরফে সাজা; কঠোর ও জীবনের জন্য হুমকি এমন কারাগার পরিস্থিতি; নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর সমস্যা, রাজনৈতিক বন্দি বা আটক; ভিনদেশে থাকা নাগরিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন; মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় স্বেচ্ছাচারমূলক বা বেআইনি হস্তক্ষেপ; কারও অপরাধের অভিযোগে তার পরিবারের সদস্যদের সাজা দেওয়া; মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় গুরুতর বাধা সৃষ্টি, যার মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের হুমকি-ভয়ভীতি দেখানো, সাংবাদিকদের অন্যায্যভাবে গ্রেপ্তার বা বিচারের সম্মুখীন করা, বিধিনিষেধ এবং মতপ্রকাশ সীমিত করতে ফৌজদারি মানহানিকর আইনের প্রয়োগ বা প্রয়োগের হুমকি; ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতায় গুরুতর বাধার সৃষ্টি; শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকারে হস্তক্ষেপ। এর মধ্যে রয়েছে সংগঠন, অর্থায়ন বা বেসরকারি ও নাগরিক সংগঠনগুলো পরিচালনায় অতিরিক্ত বিধিনিষেধ সংক্রান্ত আইন; চলাচলের স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা; সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনে জনগণের সুযোগ না থাকা; রাজনীতিতে অংশগ্রহণে গুরুতর ও অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা; সরকারি খাতে গুরুতর দুর্নীতি; দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুতর বিধিনিষেধ বা হয়রানি; লিঙ্গভিত্তিক ব্যাপক সহিংসতা। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, শিশু-বাল্যবিবাহ, জোরপূর্বক বিয়ে এবং এমন সহিংসতার অন্যান্য ধরন; জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা সহিংসতার হুমকিসহ বিভিন্ন অপরাধ; স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন ও কর্মীদের সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ এবং শিশুশ্রমের নিকৃষ্ট ধরনের উপস্থিতি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন- এমন কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শনাক্ত ও শাস্তির ক্ষেত্রে বিগত আওয়ামী সরকার গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নেয়নি। বলা বাহুল্য, তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের সরকারের আমালে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম ঘৃণিত ও জঘন্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘আয়নাঘর’। সাধারণ অর্থে জনগণের কাছে ‘আয়নাঘর’ বলতে আয়নানির্মিত ঘর মনে হলেও আসলে আয়নাঘর কিন্তু আয়নানির্মিত কোনো ঘর নয়। মূলত: আয়নাঘর হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা সংস্থা ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) এবং কাউন্টার-টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) দ্বারা পরিচালিত গোপন আটককেন্দ্র। যা মূলত: এক গোপন বন্দিশালা।

আমাদের দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অহরহই ঘটে থাকলেও অনেক লোকই জানেন না মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার ব্যাপারে কোথায় ও কীভাবে অভিযোগ করতে হবে বা হয়। যেমন: থানা ও আদালতে মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে যেকোনো বয়সের দেশি বা বিদেশি যেকোনো ব্যক্তি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে অথবা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও এখানে অভিযোগ করতে পারেন। কেউ যদি মনে করেন যে, মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে তার জীবন, সমতা ও মর্যাদার যে অধিকার পাওনা আছে তা ক্ষুণ্ন হয়েছে কিংবা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বা কোনো জনসেবক বা কোনো ব্যক্তি কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে বা লঙ্ঘনের প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে বা এসব অধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে অবহেলা করা হয়েছে, তাহলে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করা যায়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তার ও আটকে রক্ষাকবচ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গ্রেপ্তারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেপ্তারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাঁহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তাঁহার দ্বারা আত্মপক্ষ-সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়, ‘গ্রেপ্তারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেপ্তারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে (গ্রেপ্তারের স্থান হইতে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাঁহাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।’ সংবিধান ছাড়ও জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮-এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কা‌উকে নির্যাতন করা যাবে না; কিংবা কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না অথবা কা‌উকে এহেন শাস্তি দেওয়া যাবে না।’ মানবাধিকারের সর্বজনীন ওই ঘোষণাপত্রের ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কাউকেই খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার বা অন্তরিন করা কিংবা নির্বাসন দেওয়া যাবে না’।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারসহ ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারের আমলেই যেন দেশে কোনো ‘আয়নাঘর’-এর জন্ম না হয়, গুম-খুন, নির্যাতন, হয়রানি তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, তা সুনিশ্চিত করার এখনই উপযুক্ত সময়। আর এসব বিষয় বর্তমান সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই। পাশাপাশি আয়নাঘরসহ বিগত বিভিন্ন সময়ে গুম, খুন, নির্য়াতন, হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাও এখন সময়ের দাবি। সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে, কেবলমাত্র মানব পরিবারের সব সদস্যের সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহ এবং সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতিই পারে বিশ্বে শান্তি, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি গড়ে তুলতে; কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
[email protected]

৯১তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার
হরিপদ দত্ত

ব্যক্তিত্বের কারণেই রচনা হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ, ভাষায় গভীর, বুদ্ধিতে সূক্ষ্ম, চিন্তায় পরিচ্ছন্ন, প্রকাশভঙ্গিতে স্নিগ্ধ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক ধারার গদ্যের ভাষাটি তার অর্জিত ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। ২৩ জুন প্রিয় এই ব্যক্তিত্বের ৯১তম জন্মদিনে মর্মান্তিক দেশভাগের হতভাগ্য শিকার আমি। ভিন্দেশের নাগরিক হয়েও স্বদেশ ভুবনের পিছুটান এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়তো হবেও না আমৃত্যু।...

রাজনৈতিক প্রবন্ধ সাহিত্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঠক মননে শ্রেণি-শাসিত সমাজ সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি করা। যে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পাঠক বসবাস করে সেই সমাজ সম্পর্কে এক ধরনের অজ্ঞতা, অস্পষ্টতা বা অমনোযোগিতায় আচ্ছন্ন থাকে তারা। রাজনৈতিক প্রবন্ধ সমাজের গতি-প্রকৃতির স্বরূপটি উদ্ঘাটন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরে এবং সে সম্পর্কে কৌতূহলী পাঠককে তাদের সামাজিক দায়দায়িত্ব বোধের আলোর সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। রাজনীতি অবশ্যই একটি জটিল বিষয়। তাই এ বিষয়টিকে পাঠকের সামনে বিশ্লেষণ করতে গেলে কেবল তত্ত্ব নির্মাণই প্রধান কাজ নয়, লেখকের ভাষা বা গদ্যশৈলীটিও হতে হবে শিল্পগুণে অন্বিত। জটিল শব্দ চয়ন, বাক্য-বিন্যাস কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব দ্বারা বিষয়বস্তুকে দুর্বোধ্য করে তুললে রচনার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। গদ্যের জটিলতার কারণে যদি বিষয়বস্তুর ভেতর পাঠক প্রবেশ করতে না পারল, তবে লেখক নিজের জন্য তো নয়, পাঠকের জন্যও কোনো সুসংবাদ বহন করতে পারেন না।

বাংলাদেশের সাহিত্যে রাজনৈতিক ধারার প্রবন্ধ তথা প্রগতিশীল রাজনৈতিক প্রবন্ধের ইতহাস খুব বেশি পুরাতন নয়। যদিও এর সূত্রপাত অভিভক্ত বাংলায়, তবু নিজস্ব ধারাটি তৈরি হয়েছে পঞ্চাশের দশকের ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে। প্রকৃত অর্থে এর চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছে স্বাধীনতা-উত্তরকালে। কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিচর্চার ধারা থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিচর্চার ধারাটি যে স্বতন্ত্র তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ষাটের দশকের শেষ দিকে। কেননা, পশ্চিমবঙ্গে দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন এবং পূর্ববঙ্গ (বাংলাদেশ) পাকিস্তানি শাসনে থাকার ফলে বাংলার দুটি অংশেরই সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপরীতির পরিবর্তন ঘটে। কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, সাংস্কৃতিক তথা বাংলাভাষার সাহিত্যের বিষয় এবং রূপগত স্বতন্ত্রধারাটিও স্পষ্ট হয়ে পড়ে সে সময়। রাজনৈতিক ধারার প্রবন্ধের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে গোপাল হালদার, বিনয় ঘোষ, আবু সায়ীদ আইয়ুব এবং আরও অনেকে বিষয়-ভাবনা এবং রূপান্তরীতির বিবর্তন ঘটিয়েছেন। কিন্তু বাঙালি জাতির আলাদা রাষ্ট্রের দীর্ঘ জন্মযন্ত্রণা এবং জন্মের ধারাবাহিক কম্পন-প্রকম্পনের মধ্যদিয়েই নতুন অভিযাত্রার স্বতন্ত্র রূপ রাজনৈতিক ধারাটি প্রবন্ধ সাহিত্যে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যায় ড. আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, সরদার ফজলুল করীম, দেবেন শিকদার, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে ফরহাদ মজহার, আহমদ ছফা এবং আরও অনেককে। আমার লেখার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ধারার লেখালেখির বিষয় ভাবনা নয়, রূপরীতি তথা গদ্য স্টাইলটি।

সমাজবাদী দর্শনের আলোকে প্রবন্ধ রচনা অত্যন্ত জটিল সাহিত্যকর্ম। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের জটিল প্রক্রিয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে আগে শনাক্ত করতে হয়, তার পর শুরু নিজের লেখাটি। কাজটি অনেকটা নিষ্কাম সাধনার মতো। কাজ করা কিন্তু ভোগের তৃষ্ণাকে দমন করা। খ্যাতির মোহ সেখানে অদৃশ্য। কেননা সমাজবাদী রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নিজের জন্য বা আত্মরতির জন্য সাহিত্য রচনা করেন না, উদ্দেশ্যটা হচ্ছে সমাজ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানেন তার লেখালেখির উদ্দেশ্য পাঠকের স্নায়ুতে মাদক রস কিংবা আমোদ-প্রমোদ রস প্রবেশ করানো নয়, পাঠকের চিন্তার অনুশীলন দ্বারা সামাজিক সত্যের সামনে দাঁড় করানো। একটু মনোযোগ দিয়ে পাঠক যদি তার রচনা পাঠক করেন তবেই লেখকের শিল্প কৌশলটি ধরতে পারবেন। দ্বন্দ্বমূলক, বস্তুমূলক বস্তুবাদের সূত্র-উপসূত্র এবং অনুগামী সূত্রগুলোকে তিনি প্রথমেই ছড়িয়ে দেন চলমান সমাজ জীবন ও রাজনীতিতে। তার পর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সমাজস্থিত শ্রেণিগুলোর আচরণ ও গতি-প্রকৃতি। নিরীক্ষণ বা পর্যবেক্ষণের পর বিশ্লেষণের কাজে হাত দেন তিনি। এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তির কাজকর্ম ও জীবনকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বমূলক কৌশলে এবং শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করে। ‘তাজউদ্দীন আহমদের অবস্থান’, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা’, ‘শেখ মুজিবের অঙ্গীকার’, ‘বিদ্যাসাগরের কাজ’ ‘আমার পিতার মুখ’ ইত্যাদি প্রবন্ধ তার দৃষ্টান্ত।

যেকোনো লেখাই (প্রবন্ধ) যখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখতে বসেন তখন তার গদ্য রূপটি হয়ে ওঠে একের ভেতর বহুর রূপ। কখনো গল্পের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় কিংবা কখনো কবিতার শব্দ ও ছন্দের অনিবার্য বিন্যাসে সমাজের স্বপ্ন ও আগামী কল্পনার রূপকে নিজের করে নিয়ে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। তার রচনায় ‘উত্তম পুরুষ’ রীতিতে বলা গদ্য এবং ‘সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ’ থেকে বলা গদ্যগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, গদ্যরীতিটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যই উপযুক্ত। তাই মনোযোগী এবং কৌতূহলী পাঠক ভুলে যান তিনি গদ্য কবিতা নাকি গল্প নয় তো প্রবন্ধ পাঠ করছেন। প্রবন্ধের গঠনরীতিটি যে মন্ময় বা তন্ময় উপবিভাগ রয়েছে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্যের ভেতর তা মিলেমিশে একাকার হয়ে সম্পূর্ণ আলাদা রীতিতে পরিণত হয়। সেই গদ্যরীতিটিই তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর। তার এই গদ্যশৈলীর পেছনে কাজ করে নিজস্ব গভীর শ্রেণিজ্ঞান বা শ্রেণি চেতনা। সেই জ্ঞানে ঋদ্ধ বলেই তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে ওঠে আসা পাঠক শ্রেণি এবং সাধারণ মানুষের বোধ বা অনুভবের ভাষাকে বুঝতে পারেন।

আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো বাংলাদেশ তো বটেই, পশ্চিম বাংলায়ও বহু পাঠক আছেন যারা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক দর্শনে আগ্রহী এবং তার গদ্যের মুগ্ধ পাঠক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত খ্যাতিমান অধ্যাপক অমলেন্দু দের মন্তব্য হচ্ছে, ‘দ্যাখো, মি. চৌধুরীর গদ্য বলার ঢংটি কিন্তু চমৎকার। রাজনীতির শুকনো কথাগুলোকে তিনি কী করে যেন খাঁটি শিল্প বানিয়ে ফেলেন। আজকাল অমনটা কলকাতায়ও খুব একটা দেখা যায় না।’

শিল্পচর্চার বিষয়টিতে অন্য অনেকের সঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রয়েছে পার্থক্য। তিনি প্রতিনিয়ত যে চর্চা করেন তার প্রমাণ তার ক্রমবিকাশমান গদ্যশৈলী। তার প্রবন্ধের গদ্যশৈলী কবিতার মতো অলংকার বহুল। চিন্তার সঙ্গে যুক্তি এবং সূক্ষ্ম অনুভবের সঙ্গে যুক্ত করে কৌতুক। ‘দুই বাঙালির লাহোর যাত্রা’ প্রবন্ধে পাকিস্তান প্রস্তাবের বিষয়টি লেখক এভাবে বর্ণনা করছেন, ‘হক সাহেবের প্রস্তাবটি তার নিজের ছিল না। ধারণা নয়, ভাষাও নয়, সবই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর। মঞ্চে ওঠার আগে প্রস্তাবটি হক সাহেব দেখেনওনি, তিনি তৈরি প্রস্তাব পড়ে দিয়েছিলেন শুধু। বলা তাই সম্ভব যে তিনি এটি উপস্থাপন করেননি, তাকে দিয়ে উত্থাপন করিয়ে দেওয়া হয়েছে, কণ্ঠ তার স্বর অন্যের।’ (নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ: পৃ. ৪৪) এই গদ্য পাঠকচিত্তে যেমনি কৌতূহল সৃষ্টি করে তেমনি করে কৌতুক। অন্যদিকে ‘কণ্ঠ এবং স্বর’ শব্দ দুটি গভীর ব্যঞ্জনা কবিতার মতো হয়ে ওঠে। লেখক গদ্যের শরীরের চিত্রকল্পের আবহ নির্মাণ করে কাব্যের কৌতুক রস পরিবেশনের ভেতর দিয়ে তীব্র শ্লেষ সৃষ্টিতেও দক্ষ। যেমন, ‘মুসলমান সমাজে মাকড়সার জাল বোনা অনেকটাই চলল; শাস্ত্র নিয়ে তর্ক হলো। পুঁথিসাহিত্যের চর্চা হলো। কিন্তু বুর্জোয়া বিকাশের উদার আলো তেমন দেখা গেল না।’ (বেকনের মৌমাছিরা: নির্বাচিত প্রবন্ধ: পৃ. ১৬২)।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঘটনা বা তার কার্যকারণের ওপর আলোকসম্পাৎ করে পাঠককে নিজের বোধের অংশীদার করে নেন। যেমন, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের কথা তিনি এভাবে বাণীবন্ধন করেন, ‘আমি উৎপাটিত নই, আমি বেড়ে উঠব বৃক্ষের মতো, শেকড় প্রোথিত থাকবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভূমিতে, আকাঙ্ক্ষা ছিল এটাও।’ (বায়ান্নর আন্দোলন: নিঃরাজনৈতিক পৃ. ৪১)। গদ্যের এই বাণীভঙ্গিটি আবেগাত্মক অথচ প্রত্যয়দৃঢ় বাণীর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে। পাঠকের স্বপ্ন ও উত্তেজনা সত্তার সঙ্গে একাকার হয়ে যায় এ কারণে যে, বিষয়বস্তুর সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিত্বও মিশে একাকার হয়েছে। রচনার সঙ্গে লেখক ব্যক্তিত্বের মেলবন্ধনের বিষয়টি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতিটি প্রবন্ধে ছড়িয়ে আছে। ‘লেনিন কেন জরুরি’ প্রবন্ধে তাকে পাওয়া যায় কী অসীম বিশ্বাসে দৃঢ়। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় লেখক চিত্তে ক্ষোভ-দুঃখ সৃষ্টি হয় কিন্তু আপন বিশ্বাসকে, ব্যক্তিত্বকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেন না তিনি। তিনি লিখলেন, ‘যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে ততদিন তিনি থাকবেন। মূর্তি ভাঙলেও তিনি অমর হয়ে রইবেন।... পৃথিবী যদি শোষণশূন্য হয় কখনো, লেনিন তখনো থাকবেন। তখন থাকবেন ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে।’ (নির্বাচিত প্রবন্ধ: পৃ. ২৭৬)। বাক্যটিতে বা অনুচ্ছেদটিতে কোথাও আবেগের উচ্ছ্বাস নেই, নাটকীয় বাণীবিন্যাসও নেই, রোমান্টিক অলীক স্বপ্নও নেই। আছে বিশ্ববাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে দূরদর্শী মানুষের চূড়ান্ত ব্যক্তিত্বের হিসাব। এই ব্যক্তিত্বই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দাঁড় করিয়ে দেয় তার শিল্প মানসে। তাই তার গদ্য হয়ে ওঠে জনগণের শিল্প সম্পত্তি।

রচনার স্টাইল রচয়িতার মানস ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। সেই ব্যক্তিত্বের কারণেই রচনা হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ, ভাষায় গভীর, বুদ্ধিতে সূক্ষ্ম, চিন্তায় পরিচ্ছন্ন, প্রকাশভঙ্গিতে স্নিগ্ধ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক ধারার গদ্যের ভাষাটি তার অর্জিত ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। ২৩ জুন প্রিয় এই ব্যক্তিত্বের ৯১তম জন্মদিনে মর্মান্তিক দেশভাগের হতভাগ্য শিকার আমি। ভিন্দেশের নাগরিক হয়েও স্বদেশ ভুবনের পিছুটান এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়তো হবেও না আমৃত্যু। শ্রদ্ধেয় স্যারকে জন্মদিনে জানাই অফুরান শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

অস্তিত্ব সংকটে মমতার তৃণমূল

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
অস্তিত্ব সংকটে মমতার তৃণমূল
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

কলকাতার পরিস্থিতি যদি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তাহলে দিল্লি আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি। বিধানসভায় ফাটল তৃণমূলকে চাপে ফেলেছে। কিন্তু লোকসভার ভাঙন আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক প্রভুত্বের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলার ক্ষমতায় থাকা। আর দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে বড় সংসদীয় দল ধরে রাখা। এই দুটির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়েছে।...

ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সদ্য পরাজিত শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত বিলুপ্ত হওয়ার পথে। শুধু তাই নয়, একথা এখনই স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া যায় যে, ওই দলটির মাথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে পরাজয় কোনো নতুন বিষয় নয়। ভোটে হারার পর কোনো কোনো দল আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। কোনো কোনো দলকে বছরের পর বছর কাটাতে হয় বিরোধী পক্ষে। তার পর ফিরে আসে ক্ষমতায়। কোনো কোনো দল আবার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। পরিণতি যাই হোক না কেন, রাজনৈতিক দলকে আসল পরীক্ষার মুখে গড়তে হয় নির্বাচনে পরাজয়ের পর।

কিন্তু তৃণমূল দলের অবস্থা হলো–এক বিধায়ক প্রকাশ্যে দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাকে সমর্থন করছেন অন্য নির্বাচিত বিধায়করা। পরিষদীয় দলের মতো সংসদীয় দলেও চওড়া হচ্ছে ভাঙন। দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে অধিকাংশ বিধায়ক এনডিএ সরকারকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দলের প্রবীণ নেতারা শীর্ষ নেতাদের একাধিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন প্রকাশ্যে। এমন কিছু যে হতে পারে তা কয়েক বছর আগে ছিল কল্পনারও অতীত। শুধু কয়েক বছর আগে কেন, এই ২০২৬ সালের প্রথম দিকেও এরকম কোনো সম্ভাবনাকে বাস্তবোচিত বলে মনে করা ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আজ তৃণমলের কাছে এসবই ঘোর বাস্তব, চূড়ান্ত সত্যি।

আর তাই বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিরাট জয় পশ্চিম বাংলার রাজনীতির সব থেকে বড় খবর নয়। বরং ১৫ বছর ধরে বাংলার শাসনব্যবস্থা যে দলের হাতে ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ বিবাদই জায়গা করে নিয়েছে শিরোনামে। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় বিরোধী থাকার পর একদা ক্ষমতায় আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই প্রথম অস্তিত্বের সংকটে পড়তে হচ্ছে। আবারও ক্ষমতায় ফেরার প্রশ্ন তো কোনো ছাড়–ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় তার দল টিকে থাকবে কি না সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নির্বাচন-পরবর্তী বিধানসভার ট্রেজারি বেঞ্চ বা শাসকপক্ষের তরফ থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খবরটি আসেনি। এসেছে ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূলের তরফ থেকে। উলুবেড়িয়া পূর্ব আসনের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে যেভাবে একদল তৃণমূল বিধায়ক বিদ্রোহ করেছেন তা কয়েক মাস আগেও ছিল কল্পনার অতীত। তাকে বরখাস্ত করেছে তৃণমূল। কিন্তু বিধানসভার খাতাকলমে এখন তিনিই তৃণমূলের নেতা। এখান থেকেই বোঝা যায়, এখন তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি ঠিক কতটা খারাপ।

কলকাতার পরিস্থিতি যদি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তাহলে দিল্লি আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি। বিধানসভায় ফাটল তৃণমূলকে চাপে ফেলেছে। কিন্তু লোকসভার ভাঙন আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক প্রভুত্বের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলার ক্ষমতায় থাকা। আর দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে বড় সংসদীয় দল ধরে রাখা। এই দুটির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়েছে।

তৃণমূলের অসন্তোষের অন্যতম বড় দিক একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। তা হলো গত কয়েক বছরের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নেতৃত্বের মডেল। সেসব অভিযোগ এখন খুবই চেনাজানা। পরামর্শদাতা সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীকরণ, দলের ভেতরে বিতর্কের অবকাশ কমে যাওয়া এবং নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে নীতি-নির্ধারকদের দূরত্ব–এ ধরনের নানা অভিযোগ এখন একত্রিত হয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা সেটা আর বিবেচ্য নয়। যা বিবেচ্য তা হলো সবাই এখন প্রকাশ্যেই এ ধরনের কথা বলছেন। এ পরিস্থিতিতে মমতার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার গোটা রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে সংকট এসেছে। প্রতিবার তিনি নিজেই তার ত্রাতার ভূমিকা নিয়েছেন। তার সুনামের নেপথ্যে আছে তার রাজনৈতিক প্রতিরোধ। তাকে এভাবেই দেখতে প্রস্তুত সমর্থকরা। তাই নির্বাচনের পর থেকে মমতার নীরব অবস্থান তার সমর্থকদের কাছে শুধু অচেনাই নয়, উদ্বেগেরও কারণ বটে। তৃণমূলের সংকটের কারণ শুধু একটা নির্বাচনে পরাজয় নয়। বরং ক্ষমতা ছাড়া দলটির অস্তিত্ব থাকে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

ষোলোআনা বেআব্রু হয়েছে দলবদলের রাজনীতির কদর্য রূপ। তৃণমূলের ২০ জন সাংসদের সর্বশেষ পদক্ষেপ–এনসিপিআইয়ের মতো অজ্ঞাতনামা একটি দলে প্রত্যেকের যোগদান। দলবদল করলে মুখে অন্তত নতুন দলের আদর্শ সম্পর্কে কিছু কথা থাকত। কিন্তু যে দলটাই অস্তিত্বহীন, সে সম্পর্কে কী-ই বা বলতে পারেন বেপথুরা। কোনো এককালে দলটির রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের খাতায়। তার পশ্চিমবঙ্গে না আছে কোনো সংগঠন, না কর্মতৎপরতা। এরা একসময় ত্রিপুরায় কয়েকটি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল বলে জানা গেছে। সেখানেও না মিটিং, না মিছিল–কেবল খাতাকলমে নামটা ছিল। সেই দলে যোগ দিতে হলো তৃণমূলের তথাকথিত বিদ্রোহী সাংসদদের। উদ্দেশ্য আসলে একটাই–কী করে সাংসদ পদ বাঁচিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া যায়। বিজেপিতে যোগ দেওয়াটা যখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে তখন এ রাস্তায় যাওয়ার বুদ্ধিই দেওয়া হয়েছে। 
 
এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী আছে? বিজেপির পক্ষ থেকে তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, হয় দল বদলাও, নয়তো জেলে যাও। কাজেই এভাবে নিজেদের সাংসদ পদ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ওই সাংসদরা। তবে শেষ রক্ষা হবে কি? ওয়াকিবহাল মহল কিন্তু বলছে, আলাদা দলে যোগ দিয়েও নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই।

এদিকে চলতি সপ্তাহেই সম্প্রতি আগ্নেয়াস্থ এবং বুলেটের স্তূপ উদ্ধার হয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার সন্দেশখালী ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাসন্তীতে। এর আগে ধৃত এক তৃণমূল নেতার ভাই এবং ঘনিষ্ঠদের জেরা করে যে তথ্য মেলে, তার ভিত্তিতে রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স স্থানীয় একটি পুকুরে তল্লাশি অভিযান চালায়। সেখান থেকেই এবার প্রচুর অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং কার্তুজ উদ্ধার করেছেন তদন্তকারীরা। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএর আধিকারিকরা মনে করছেন, এই অনুশস্ত্র উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের জিহাদিদের কাছে চালান করা হতো। গোটা ব্যাপারটাই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যবস্থাপনায় হতো সে ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার। তৃণমূল সরকারের প্রশাসন সবটাই জানত, কিন্তু তাদের চোখ বন্ধ করে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ মহল থেকে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে
গোলাম মোহাম্মদ কাদের

দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।...

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার প্রারম্ভে এ বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক বাজেট কী তা পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে। তবে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বলতে উনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সামাজিক সুরক্ষা জালের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছেন। তা ছাড়া সব শ্রেণির মানুষের জন্য মোটামুটি যে যা চেয়েছে তা দেওয়ার অঙ্গীকার বাজেটভুক্ত করেছেন। সে হিসেবে বাজেটটি নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন ও জনতুষ্টিমূলক বা সবাইকে খুশি করার বাজেট বলা যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা। যার মোট পরিচালন ব্যয় ৬,২১,৯২৫ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থ সংগ্রহ কীভাবে হবে: রাজস্ব আহরণ ৬,৯৫,০০০ টাকা, অনুদান ৬,১৫০ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ১,০৯,৮৫০ টাকা, অভ্যন্তরীণ ঋণ ১,২৭,০০০ টাকা। মোট অর্থ সংগ্রহ ৯,৩৮,০০০ টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেটের অগ্রাধিকার বলতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কার, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; করব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা। সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ, মধ্যবিত্ত ও নতুন করদাতাদের জন্য কর কাঠামোয় কিছু সংস্কারের সম্ভাবনা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার ৬৮,৩০,০২৪ কোটি টাকা।

নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে অনেক পণ্যের আমদানি শুল্কে রেয়াত দেওয়া হয়েছে। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে বাজেট প্রস্তাবনায় নানা ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর সবকিছুই করা হয়েছে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য। এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে যে আয়ের ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে, তা খুবই অনিশ্চিত।

পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী, রাজস্ব আহরণের ধারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিম্নমুখী। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫-২৬-এর এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে আয় হয়েছে ৩,২৬,৯২৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে একই হারে আয় হলে বছর শেষে আয় হতে পারে প্রায় ৩,৯২,৩১৪ কোটি টাকা বা এর চেয়ে অল্প কমবেশি।

করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে টিআইএন, বিআইএন, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রকে সমন্বিত ডেটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদেরও করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ফলে আগামী অর্থবছরেই বড় ধরনের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি পাওয়া সহজ হবে না।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। গণমাধ্যমে ৮ জুন ২০২৬, টিআইবির একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতে খুনের সংখ্যা ৬০৫, অপহরণ ১৯৬ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচলে ভয় পায়। কারণ যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা বিরাজমান। এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ জনগণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিকতা থাকছে না।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এরই মধ্যে ৪০০টির মতো মিল-কারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে বেশির ভাগই গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিল, যার অধিকাংশই শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ২৯.০১.২৬)। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কারখানা বন্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। প্রবাসী আয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী। নতুন মিল-কারখানা স্থাপন শূন্যের কোঠায়। মূল্যস্ফীতি বেশি এবং এটা ঊর্ধ্বগামী। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, মে ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২। সার্বিক পরিস্থিতির ফলে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ; আইএমএফ বলছে, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ; এডিবি বলছে, ৪ দশমিক শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। (সূত্র ১২ জুন ২০২৬, খবরের কাগজ)

অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য ওপরে বর্ণিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের সমর্থক বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার বহাল না করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।

আওয়ামী লীগের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার আইনিভাবে হরণ করা হলে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা জেল, জুলুম এবং নির্যাতন-নিপিড়নের মাধ্যমে দমন করে রাখা হলে এই বিরাট জনগোষ্ঠী সব সময় তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করবে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

তা ছাড়া, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্থাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না করা হয়, সে ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগ। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বিক নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি।

ধারণা করি, বর্তমান সরকার আর একটি বিষয় তেমনভাবে বিবেচনায় আনেনি। ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও সারের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তা ছাড়া সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ দিয়েও অনেক সময় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা করছে। কেউ কেউ এটা ২ শতাংশ পর্যন্ত কমবে বলে প্রাক্কলন করেছে। এক কথায় বিশ্ব আজ অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে বলা যায়। জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। দেশে জ্বালানি সরবরাহ সহজলভ্য করতে গেলে ভর্তুকিমূল্যে বিক্রয় করতে হবে। সে অর্থ বরাদ্দ বাজেটে আছে বলে মনে হলো না। তেল এবং গ্যাস সঠিক মূল্যে বিক্রয় করতে গেলে সাধারণ জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হবে। কৃষকদের যদি ভর্তুকিমূল্যে এবং সময়মতো সার সরবরাহ করা না হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। সে ক্ষেত্রে আশঙ্কা আছে বড় ধরনের খাদ্যসংকট তৈরির। সে বিষয়টিও বাজেটে আলোকপাত করা হয়নি।

প্রাক্কলিত পরিচালন ব্যয় প্রস্তাবিত বাজেটে দেখানো হয়েছে ৬,২১,৯২৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এ খরচ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ সম্পূর্ণ ব্যবহার করার পরও অতিরিক্ত ২,২৯,৬১১ কোটি টাকা ঘাটতি হবে। অর্থাৎ সরকার পরিচালনার জন্য রাজস্ব আহরণের পরও দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে ২,২৯,৬১১ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ফলে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হবে। সে বিচারে এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলা যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে যে, বাস্তবায়নের ব্যত্যয়গুলো পরে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করার আশঙ্কা থাকবে।

আমরা মনে করি, দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি

সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?
ড. নাহিদ ফেরদৌসি

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।...

পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ সামাজিকভাবে বসবাস করে আসছি। যদিও এই বসবাসের অভ্যাস একদিনে করে গড়ে ওঠেনি। আদিম যুগে নানারকম বিপদ থেকে বাঁচার জন্য দলবদ্ধভাবে বসবাস করার এক অদৃশ্য তাগিদ মানুষের কাছে অনুভূত হয়। শিকার বা শিকারির হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা একসঙ্গে বসবাস করার যে মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কালক্রমে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে সমাজ তথা সামাজিকভাবে বসবাস করার চিন্তাভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নয়, তারও আগে এই সমাজ তথা সামাজিকতার অবদান ছিল। এমনকি আজকের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে এই রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে মতবাদ রয়েছে তা হলো–সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এই মতবাদের জ্ঞানপ্রতিমরা হলেন–থমাস হবস, জন লক এবং জঁ-জ্যাক রুশোদের লেখনীতেও সমাজের গুরুত্ব ও এই সমাজের গুরুত্ব থেকেই যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে তা স্পষ্ট। সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্র হলো সমাজের বৃহত্তর পরিধি। এই পরিধিকে আমরা যত্ন করেই আগলে রাখছি সভ্যতার শুরু থেকেই। আবার, এই যত্নের কারিগররা তথা মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় যে, তারা একসঙ্গে আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহটি তাদের কাছে বসবাসযোগ্য।

সামাজিক অস্থিরতা মূলত শুরু হয় সামাজিক চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে। মানুষ যখন একাকী বসবাস করত, তখন তারা বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। তাই তারা একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করল। এই একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কোন্দলে। ফলস্বরূপ একে অপরকে হত্যা করতে লাগল। মানুষ নিজেদের সামান্য লাভ ও স্বার্থের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্বিচারে আঘাত হানতে শুরু করল। বনভূমি উজাড় করা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী-খাল দখল ও দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার ক্রমে পরিবেশের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্ব এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি।

বর্তমান যুগে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের লোভনির্ভর কর্মকাণ্ড। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় মানুষ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, বনভূমি ধ্বংস করছে, জীববৈচিত্র্যকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। এমতাবস্থায়, আমাদের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরাই চুক্তিতে আবদ্ধ হই। এই চুক্তি একে অপরের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে। আজকের যে সামাজিক অস্থিরতা দেখি তা মূলত আমাদের সমাজে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে যে চুক্তিটি আছে, তা ভঙ্গের কারণেই। যেহেতু রাষ্ট্র সমাজের এক বৃহত্তর পরিসর, তাই এই সামাজিক অস্থিরতা থেকেই রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসীমা হলো সমগ্র পৃথিবী। তাইতো আমরা দেখতে পাই, ১৯১৪ সালের ২৮ জুনের একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যার ফলাফল হিসেবে পৃথিবী দেখেছিল এক কালো অধ্যায়। চার বছর ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছিল ২০ মিলিয়নের মতো তাজা প্রাণ। যাদের মৃত্যু কেড়ে নিয়েছিল আরও ৬০ মিলিয়ন মানুষের জীবনের আনন্দ। তারা বেঁচে ছিল শুধু বেঁচে থাকার জন্য। শুধু এই একটি উদাহরণ নয়, সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়েও যে বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ও যত রকমের আইন ও চুক্তি আছে সেগুলোকে ভেঙে দেয় তা হলো–মানবতার হত্যা। একটি মাত্র হত্যাকাণ্ডই খুব বাজেভাবে বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন ও পৃথিবীর রূপ। তাহলে এই মানুষ হত্যাই যেহেতু সব সমস্যার মূলে রয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অন্যতম উপায় যেহেতু বিপক্ষ দলের বা মতের মানুষকে হত্যা করা। যার ফলাফল হিসেবে আমরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের সম্মুখীন হই। তাই এই মানব হত্যাকেই বন্ধ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো–এই গর্হিত অপরাধকে কীভাবে দমন করা যায়? কীভাবে মানবজাতিকে বোঝানো যায়, ‘পৃথিবীতে সব মানুষেরই সমান অধিকার আছে বেঁচে থাকার, কারও কোনো অধিকার নেই এই বেঁচে থাকার অধিকারকে খর্ব করার।

মানুষ যখন অন্য মানুষকে হত্যা করে, তখন তার নিজের বিবেক বোধ ও মানবতাবোধকে বিসর্জন দিয়েই এই অপরাধ করে। যদিও আত্মরক্ষা বা নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অধিকার দেয় এই অপরাধের জন্য। কিন্তু তাও সেটি অপরাধ হিসেবেই থাকে, আইনের কাছে হোক বা নিজের বিবেকের কাছেই হোক। তাহলে এই অপরাধকে দমন করার ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক অনুশাসন জোরদার করতে হবে। আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন অথবা নাস্তিকতা চর্চা করলেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে কিন্তু আপনি মুক্ত নন। ইসলাম ধর্মে যেমন বলা হয়েছে একজন মানুষকে হত্যা করার যে অপরাধ তা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার অপরাধের নামান্তর। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম ও মতে নরহত্যা জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, একটি অপরাধ ঢাকার জন্য ভিক্টিম যাতে আইনের আশ্রয় নিতে না পারে, তার জন্য ভিক্টিমকেই হত্যা করা হয়। প্রথম অপরাধটিও করা হয় নৈতিক অনুশাসন ভেঙে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও নৈতিক মূল্যবোধ না থাকাটাই মানুষকে অপরাধ করার জন্য প্রলুব্ধ করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সব বিভাগের জন্য ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ নামে একটি আবশ্যিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবকল্যাণের জন্য এসব জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তারা শিখবে কীভাবে নীতি ও নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা যায়। একই সঙ্গে তারা এমন শিক্ষা লাভ করবে, যা তাদের অনৈতিক, অন্যায় ও মানবকল্যাণবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সব বিভাগের পাঠ্যক্রমে নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক একটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করার পরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করে, আর কর্মক্ষেত্রেই নীতি-নৈতিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে তোলা যায় যে অন্যের ক্ষতি করে, সমাজের ক্ষতি করে কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে অর্জিত সুখ ও সাফল্য প্রকৃতপক্ষে ক্ষণস্থায়ী, তবে তারা সহজেই বুঝতে পারবে যে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের চোখের পানির কারণ হওয়া কখনোই প্রকৃত সাফল্য নয়। এই উপলব্ধি তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখবে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অন্তত নৈতিকতার একটি প্রাথমিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীরা আজীবন এই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, আজকে যারা অপরাধ করছে, তারা যেহেতু শিশু নয়। তাই এই অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য সমাজের সব স্তরে ‘নৈতিক গণশিক্ষা কার্যক্রম’ পরিচালিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ধর্মকে শ্রদ্ধা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মের মৌলিক বিষয়াবলিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, ঠিক তেমনিভাবে নৈতিক মূল্যবোধকে প্রচার করতে হবে।

অন্যদিকে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রতিটি অপরাধীর ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা হতে পারে। যদিও আমাদের পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি হিসেবে দুটি উপায়ের কথা উল্লেখ আছে, একটি হলো–মৃত্যুদণ্ড, অন্যটি হলো–যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। হত্যার শাস্তি প্রয়োগ করলেই হবে না। এই শাস্তির কথা প্রচার করতে হবে। যাতে অপরাধী মন হত্যা বা এই রকম অপরাধ করার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

কে কাকে শক্তি জোগায় বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়
আনু মুহাম্মদ

দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে।...

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কর্মসূচির নামে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের পরিচালিত সন্ত্রাস, দখল, যুদ্ধ, গণহত্যা ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাশের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে ‘বডি কাউন্ট: ক্যাজুয়ালটি ফিগারস আফটার টেন ইয়ারস অব দ্য ওয়ার অন টেরর’ শিরোনামে যৌথভাবে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে জার্মান, কানাডিয়ান ও মার্কিন তিনটি সংগঠন। এগুলো হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার’, ‘ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘ফিজিশিয়ানস ফর গ্লোবাল সারভাইভাল’।

এ রিপোর্টে ২০০৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষা থেকে দেখানো হয়েছে–এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ইরাকে, দুই লাখের বেশি আফগানিস্তানে। মার্কিন ড্রোন ও অন্যান্য আক্রমণে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে শুধু পাকিস্তানেই। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এখনো আন্তর্জাতিক সব রীতিনীতি, প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে প্যালেস্টাইনে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলের অবিরাম গণহত্যা অব্যাহত আছে।

২০০১-এর আগে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় আল-কায়েদা বা তালেবান ধারার কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল না। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এ অঞ্চলকে চেনা-অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। একপর্যায়ে এ অঞ্চলে বিরাট জৌলুস নিয়ে আবির্ভূত হয় আইসিস। যারা তাদের ভাষায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বা ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নতুন শত শত গাড়ি, বার্ষিক ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট এবং প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে তারা যেন আচমকা হাজির হয়। তারা ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করে। তবে কখনোই ইসরায়েলে হামলা করেনি। তারা আরও বিভিন্ন দেশে একের পর এক মুসলমানসহ ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী মানুষদের আক্রমণ করতে থাকে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করে বীরত্ব দেখাতে থাকে। হঠাৎ  করে এরকম একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয় বিজয়ের কয়েক বছর আগে আফগানিস্তানে তালেবানদের আচমকা আবির্ভাব এবং দ্রুত আফগানিস্তান দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ছিন্নভিন্ন হওয়ার ফলে এ দেশগুলোর মানুষকে নারকীয় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ইউরোপে অভিবাসনে বিশাল স্রোত এরই ফল। অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী তিন পক্ষ–সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের কাছে ইরাকের সাদ্দামের আসল অপরাধ স্বৈরশাসন ছিল না, ছিল তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ এবং সামরিক শক্তি হিসেবে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কর্তৃত্ব অস্বীকারের ক্ষমতা। লিবিয়ার গাদ্দাফিরও একই অপরাধ ছিল। সৌদি রাজতন্ত্র বরাবরই তাদের ওপর গোস্বা ছিল। গাদ্দাফি জীবনের শেষপর্যায়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ‘নয়া উদারতাবাদী’ বলে কথিত পুঁজিপন্থি কিছু সংস্কারের পথে গেলেও তার বড় অপরাধ ছিল সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণাত্মক কথাবার্তা। ২০১১ সালে গাদ্দাফি সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য ন্যাটো বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভাড়াটিয়া উগ্রপন্থিদের জড়ো করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ও সৌদি আরবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

এদের কাছে সিরিয়ার আসাদ সরকারেরও অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ সৌদি আরব-ইসরায়েল অক্ষের বিরোধিতা। সিরিয়ার আসাদ সরকার উচ্ছেদের জন্য সে কারণে বিভিন্ন ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পশ্চিমা শক্তি ও সৌদি-কাতার-জর্ডান রাজতন্ত্র। ইসরায়েলকে শক্তি জোগানো এবং ইরানকে কাবু করাও এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র জোগানের ওপর ভর করেই এসব উগ্রপন্থি গোষ্ঠী শক্তিপ্রাপ্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ফ্রান্স ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাইডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তখন এক বক্তৃতায় মুখ ফসকে আইসিসের পেছনে তাদের ও মিত্র দেশগুলোর শত হাজার কোটি ডলারসহ নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলে ফেলেন। পরে মিত্রদের ক্ষোভের মুখে আবার মাফও চেয়েছেন। কিন্তু সত্য ঢাকা পড়েনি।

ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক তারিক আলী তথ্য যুক্তি দিয়ে সঠিকভাবেই দেখান যে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় মৌলবাদ, সব মৌলবাদের জন্মদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর গত প্রায় ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথাগত বিচারে ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’র অনেক দিকই চিহ্নিত করা যায়। যেমন–অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে, সড়ক পথের বিস্তার ঘটেছে অনেক, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বহুতল ভবন বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়, আমদানি-রপ্তানি দুটোই বেড়েছে, রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গার্মেন্টস বড় সাফল্য তৈরি করেছে, প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল মজুত তৈরি করেছে, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক তৎপরতায় ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও মডেল অনেক বিস্তৃত হয়েছে, নগরায়ণ বেড়েছে, মোবাইল ইন্টারনেট শহর-গ্রামে যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে পেশাগত ও অর্থনৈতিক নতুন নতুন সুযোগ বেড়েছে, জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে অনেক; যদিও মানুষের যথেষ্ট এবং নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান হয়নি। মানুষের সচলতা বেড়েছে।

এ সমৃদ্ধির গতি ও ধরনের কারণে প্রত্যক্ষ সুফলভোগী হয়েছে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। এর সামাজিক ও পরিবেশগত খেসারতও বেশি। নদীনালা, খালবিল, বন শিকার হয়েছে দখল ও বিপর্যয়ের। বৈষম্য বেড়েছে। এ সময়কালেই দেশে একটি অতি-ধনিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘কালো টাকা’ নামে পরিচিত চোরাই টাকার মালিকদের বিত্ত এবং দাপট বেড়েছে বহু গুণ। ঢাকা শহরে এখন একই সঙ্গে বিত্তের জৌলুস এবং দারিদ্র্যের নারকীয়তা দুটোই পাশাপাশি অবস্থান করে। চোরাই কোটিপতির সংখ্যা যখন বেড়েছে তখন মাথাগণনায় দারিদ্র্যের প্রচলিত সংজ্ঞা বা কোনোভাবে টিকে থাকার আয়সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা চার কোটির বেশি। যদি দারিদ্র্যসীমায় শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন যুক্ত করা হয় তাহলে দেখা যাবে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই অমানবিক জীবনে আটকে আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যতসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত। এদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। দেশে তাদের কর্মসংস্থান নেই। বিদেশেও তাদের জীবন ও জীবিকা চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। অন্যদিকে এদেরই পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিট্যান্স এখন বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশে সার্ভিস সেক্টরের দ্রুত বিকাশ হলেও তা কর্মসংস্থানকে খুবই অস্থায়ী, নাজুক ও নিম্ন আয়ের ফাঁদে আটকে রেখেছে।

কয়েক দশকে নারীর দৃশ্যমান সচলতা স্পষ্টতই অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি ঘরে-বাইরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। তার বিরুদ্ধে ছোটবড় প্রতিরোধও তৈরি হচ্ছে। গার্মেন্টস এ বর্তমানে শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই নারী। শহর ও গ্রামে সরাসরি মজুরিশ্রমিক হিসেবে নারীর উপস্থিতি এখন তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরও উপার্জনমুখী কাজে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। গ্রাম-শহরে জমি, কাজ ও আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের শিশু ও নারীর অবস্থা তুলনায় আরও বেশি নাজুক। জালিয়াতি প্রতারণা এবং নিপীড়নের মাধ্যমে যৌনবাণিজ্যে শিশু কিশোরী ও তরুণীদের ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত করা, নারী ও শিশু পাচারের সুযোগ এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে।

গত কয়েক দশকে একদিকে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর জৌলুস, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিভীষিকা, একদিকে সম্ভাবনার বিকাশ, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি দখলদারদের দাপটে জননিরাপত্তার বিপর্যয় একটি নির্মম বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশকে নিক্ষেপ করেছে। দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে। তাদের বর্ম হিসেবেই ধর্ম ও ধর্মপন্থি গোষ্ঠী ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিযোগিতাও এ সময়ে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। 

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক