বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের মজুত আছে ভেনেজুয়েলায়। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ও অর্থনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে জুয়ান গুইদোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনতে। তবে, সিরিয়া প্রেক্ষাপটকে উদাহরণ হিসাবে ধরে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা এত সহজ হবে না।...
বর্তমান আর্ন্তজাতিক রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ভেনেজুয়েলা সংকট। দক্ষিণ আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশ ভেনেজুয়েলার এ রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হয় ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও পরবর্তীতে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যখন দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো শপথ নিতে যান এসময় বিরোধী দলগুলো নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে এখন। এ মুহূর্তে তাদের মুদ্রাস্ফীতির হার ১৩ হাজার ৮০০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। গত ৩০ বছরের মধ্যে তাদের জ্বালানি তেলের উৎপাদন এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তাদের জিডিপি আরও কমবে বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অনুমান। এমন পরিস্থিতিতে ‘অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের সত্যিকার সমাধানের আশু সম্ভাবনা নেই’, এমন মন্তব্য করেছে ক্যাপিটাল ইকোনমিকস। ঋণের ভারে একেবারে ডুবে যাওয়া ভেনেজুয়েলার জন্য এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, এমনটাই মনে করেন প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা। নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্সি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কূটনৈতিক আর অর্থনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির এ দেশ আরও মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এসবের মধ্যে রাশিয়াসহ অল্প কয়েকটি দেশের শুভেচ্ছা বার্তাও আছে মাদুরোর প্রতি। ভেনেজুয়েলায় গত নির্বাচনে মাদুরোর জয় নিশ্চিত হওয়ার পর গত সোমবার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডাসহ লিমা গ্রুপের ১৪টি দেশ সেখান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), লিমা গ্রুপ ও কানাডা আগেই জানিয়েছিল, তারা ভেনেজুয়েলার এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে না। বিরোধী নেতাদের ধরপাকড় করার পর নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত মাস আগেই এ নির্বাচন হয়েছে। এ ছাড়া জি-২০ ভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশ জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। এতে আমেরিকানদের ওপর ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে ভেনেজুয়েলার ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপরও। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায়, স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত নির্বাচন করতে, সব রাজনৈতিক বন্দিকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তে মুক্তি দিতে, নিপীড়ন বন্ধ করতে এবং ভেনেজুয়েলার জনগণকে অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে আমরা মাদুরো সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ আরিয়াজা এ নিষেধাজ্ঞাকে ‘উন্মত্ততা, বর্বরতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক’ অ্যাখ্যা দেন। মাদুরোর জয়ে অনেক দেশের বিরোধিতার মধ্যেই তাকে স্বাগত জানিয়েছে রাশিয়া, এল সালভাদর, কিউবা ও চীন। বিশেষত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুভেচ্ছা বার্তায় ভেনেজুয়েলার ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিরসনে’ মাদুরোর সাফল্য কামনা করেছেন। আর চীনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার জনমতকে সব পক্ষের শ্রদ্ধা করা উচিত। মাদুরোর প্রতি গুটিকয়েক দেশের সমর্থন রয়েছে বটে, তবে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক দেশের বিশেষত শক্তিশালী অর্থনীতির বেশ কয়েকটি দেশের বিরোধিতা তাকে সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
লুইস ভিনসেন্ট লিওনের মতে, ভেনেজুয়েলার সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আকস্মিক ধসের মুখে পড়ার আশঙ্কা। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ঊর্ধ্বতন বিশ্লেষক ফিল গানসন বলেন, ‘সংকট এতই তীব্র যে এর কারণে ক্ষমতাসীন সরকার-সামরিক মিত্রতার মধ্যে সংঘাত উসকে উঠতে পারে অথবা ব্যাপক মাত্রায় সমাজে ধস নামতে পারে। সংকট দ্রুত সামাল দিতে না পারলে সমাজের সাধারণ ও সামরিক অভিজাত শ্রেণির মধ্যেও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে তার ধারণা। তবে সংকট যতই তীব্র হোক, সামরিক বাহিনীর সমর্থন যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ মাদুরো সরকারের পতন ঘটার সম্ভাবনা নেই এবং সামরিক বাহিনী এ মুহূর্তে মাদুরোর ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেবে না বলে ধারণা করছেন লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মার্কিটের বিশ্লেষক ডিয়েগো ময়া ওকাম্পোস। তা ছাড়া প্রবল খাদ্যসংকটের কারণে চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়েছে ভেনেজুয়েলার মানুষ। ক্ষুধার তাড়নায় অনেকে জড়িয়ে পড়ছে লুটপাট ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে। অনেক আগেই ভেনেজুয়েলান অবজার্ভেটরি ফর সোশ্যাল কনফ্লিক্ট নামক এক সংস্থা দেশটির ২৩টি প্রদেশের ১৯টিতে মোট ১০৭টি লুটপাটের ঘটনা রেকর্ড করেছে। এসব লুটপাটের সময় মানুষ হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। ভেনেজুয়েলায় লুটপাট ও ডাকাতির ঘটনা আগেও ঘটেছে, তবে এখনকার মতো নয়। বর্তমান পরিস্থিতি এভাবে এগিয়ে চললে দেশটির অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়বে দ্রুতই। এ অবস্থার জন্য প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দায়ী করেছেন ডানপন্থি সমর্থকদের, সরকারবিরোধী বিপ্লব ও বিদেশি হস্তক্ষেপকে।
তা ছাড়া ভেনেজুয়েলার মূল্যস্ফীতি বিশ্বে সর্বাধিক। দেশটির অর্থ এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার আগের নোটের চেয়ে ২০০ গুণ বেশি মূল্যমানের অর্থ বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। তবে নতুন নোট বাজারে আসার আগেই পুরোনো ১০০ বলিভার নোট বাতিল করায় সরকারের পরিকল্পনা কার্যত ভেস্তে যেতে বসেছে। লোকজন টাকার অভাবে খাদ্য ও বড়দিনের উপহার কিনতে পারছেন না। আমদানিনির্ভর দেশটিতে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আইএমএফ বলছে, ভেনেজুয়েলায় এবার মূল্যস্ফীতি ৪৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে মাদুরোর জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। সংকটের জন্য তিনি বিরোধীদের দায়ী করেছেন। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কলম্বিয়া ও ব্রাজিল সীমান্ত। এই দুটো দেশ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতেন বহু ভেনেজুয়েলান। সীমান্ত পার হয়ে আসা কার্মেন রদ্রিগুয়েজ বলছিলেন, আমরা কষ্ট পাচ্ছি। আমরা ক্ষুধার্ত। আমাদের ওষুধ নেই। আমাদের কিছু নেই, কিছুই নেই। এখন আবার টাকার সমস্যা। এমনকি আমরা খাবারটুকুও কিনতে পারছি না। বিশ্বের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলা। মাত্র দুই সপ্তাহেই দেশ ছেড়েছে ১০ লাখ মানুষ। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট। এদিকে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা অর্থনৈতিক অভিবাসী ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে আশপাশের দেশগুলো। সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, পাসপোর্টবিহীন কোনো ভেনেজুয়েলানকে ঢুকতে দেয়নি ইকুয়েডর। ব্রাজিলে ভেনেজুয়েলা অভিবাসীদের ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে আগুন দিয়েছে স্থানীয়রা। দরজা বন্ধ করে দিয়েছে কলম্বিয়াও। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের ভুল পদক্ষেপের ফলে মুদ্রার দাম কমে গিয়ে সব ধরনের পণ্যসংকট দেখা দেয় ভেনেজুয়েলায়।
যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি বিভাগের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের মজুত আছে ভেনেজুয়েলায়। পরিমাণের দিক দিয়ে তা ৩,০০,৮৭৮ মিলিয়ন ব্যারেল। মজুতের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সৌদি আরব। জ্বালানি তেলের এই বিশাল মজুতের দিকে অতি আগ্রহের কারণে জুয়ান গুইদোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তা স্পষ্ট। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে একজন স্থায়ী বন্ধুর খোঁজ করছে বহুদিন ধরে। হুগো শ্যাভেজের (মাদুরোর পূর্ববর্তী শাসক) শাসনকালে যা সম্ভবপর হয়নি। শ্যাভেজ ভেনেজুয়েলাকে অর্থনেতিক সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বন্ধুরাষ্ট্র কিউবা, চিন, রাশিয়াকে সস্তায় তেল সরবরাহ করা ছাড়াও নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার সময় থেকে চলে আসা মুদ্রাস্ফীতি, দারিদ্র্য, মাদুরোর শাসনকালে এসে প্রকট আকার ধারণ করে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ও অর্থনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে জুয়ান গুইদোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনতে। তবে, সিরিয়া প্রেক্ষাপটকে উদাহরণ হিসাবে ধরে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা এত সহজ হবে না। কারণ, ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর সরকারকে সে দেশের সেনাবাহিনী ও বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রগুলো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাই ভেনেজুয়েলায় চলমান সংকটকে আগেভাগেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া বিশ্বনেতাদের এখন আশু কর্তব্য।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য
[email protected]

