ফিলিস্তিনি হাজার হাজার শিশুর লাশ নিয়ে অসহায় বাবা-মায়ের আর্তনাদের পুনরাবৃত্তি আর কোনো ভূখণ্ডে হোক- এমন নিষ্ঠুর, নির্মম চিত্র আর বিশ্ববাসী দেখতে চায় না। আমরা শান্তিবিহীন বিশ্বে শান্তি চাই, কল্যাণহীন বিশ্বে কল্যাণের বাতাবরণ চাই, অমানবিক বিশ্বে মানবতার জয়গান গাইতে চাই সমস্বরে। এই ধরণী হোক মানস সরোবর।...
গোটা ধরিত্রী অশান্ত। ভেনেজুয়েলা, ইরান, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড, ইউক্রেন, ফিলিস্তিন, মায়ানমার, মায়ানমারের পার্শ্ববর্তী সীমান্ত এলাকা, সিরিয়া, লেবানন, কলম্বিয়া, আফগানিস্তান পাকিস্তান সীমান্তে বয়ে যাচ্ছে অশান্তির দুর্বার বায়ু। শান্তময় পৃথিবী গড়ে ওঠার পরিবর্তে অশান্তির এক মহাপ্রলয়ের আশঙ্কাই যেন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। অমিয়কুমার বাগচীর ‘বিশ্বায়ন ভাবনা-দুর্ভাবনা’ আজ কেমন যেন বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে। শান্তিভাবনা, বিশ্বময় সুন্দর জীবনভাবনার মূলনীতি, ছন্দ, সুর আর যেন কোথাও থেকে ভেসে আসছে না বরং বিশ্বের সব কর্নার থেকেই ভয়ভীতি, জীবনের স্বাভাবিক গতি থামিয়ে দেওয়ার কঠিন শব্দমালাই শুধু ধ্বনিত হচ্ছে না বরং তার বলিষ্ঠ গতিতে বেগবান হচ্ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এ যেন চিরচেনা পৃথিবী নয়! মানস সরোবর ধরিত্রী যেন আবার হিরোশিমায় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে সেই জঘন্যতম নারকীয় পাশবিকতার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। আবার বিশ্বময় শান্তিপ্রিয় মানুষ ওইরকম পাশবিকতার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। তবে মানুষ ওই রকম পাশবিকতার নজির আর দেখতে চায় না। চলমান প্রবন্ধ আমরা ধরে ধরে একটু এলাকাভিত্তিক বিদ্যমান পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি।
ভেনেজুয়েলায় কিছুদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক হামলা করে আসছিল ইউএসএ। হামলার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছিল মাদক মাফিয়াদের ধ্বংস করা। যানবাহনসহ নিহতের সংখ্যাও কম নয় ওইসব হামলায়। সঙ্গে সঙ্গে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্বৈরশাসনের অভিযোগ আনল। অভিযোগ আনা হয়েছিল নির্বাচনে কারচুপি করার। এর মধ্যেই গত ৩ জানুয়ারি দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন বিশেষ কমান্ডো গ্রেপ্তার করে এবং প্রেসিডেন্টের হাতে হাতকড়া, পায়ে ডান্ডাবেড়ি ও তার স্ত্রীর হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় পোস্টও ভাইরাল হলো। বিচার কাজ শুরু করেছে আমেরিকা। তাদের রাখা হয়েছে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে। এ সেন্টারকে বলা হয় ‘পৃথিবীর নরক’ এখানে মূলত কয়েদিরা মানবিকভাবে প্রতিকূল অবস্থায় সময় অতিবাহিত করেন এবং হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসী অবহিত আছেন।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে মাদক বা ভোট কারচুপির অভিযোগ নয়, মূল লক্ষ্য হলো দেশটির তেলসম্পদকে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে আনা। আর সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনি দেশটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠলেও ওই দেশের জনগণ তাদের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতি এখনো আস্থা রেখেছেন। তবে ভেনেজুয়েলা গোপনে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।
ভেনেজুয়েলার সংকট সম্প্রসারিত হয়েছে কিউবায়। মহান নেতা ফিদেল কাস্ট্রো ও তার অন্যতম সহযোগী সর্বকালের স্মরণীয় বিপ্লবী চে গুয়েভারার দেশ কিউবা পড়েছে মহাসংকটে। মার্কিনদের থাবা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য সংঘটিত হয় ১৯৫৩-১৯৫৯ পর্যন্ত কিউবা বিপ্লব। এ ছয় বছরে নিহত হন ২ থেকে ১০ হাজার কিউবান বিপ্লবী। এ দেশটি বহু বছর ধরেই তেলের জন্য ভেনেজুয়েলার ওপর নির্ভরশীল। এ দ্বীপরাষ্ট্রে যে পরিমাণ তেলের ঘাটতি রয়েছে তার প্রায় ৫০ শতাংশ পূরণ করে ভেনেজুয়েলা। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন যে, কিউবায় আর কোনো তেল বা অর্থ যাবে না। আমি ওদের বলছি যে, বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে চুক্তি সেরে ফেল। কিন্তু বাস্তবতা এ কথা বলে যে, কিউবা বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার তেল ও অর্থের ওপর নির্ভরশীল।
আমেরিকা কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেলকে ব্যর্থ শাসক উল্লেখ করে কিউবার সার্বিক অবস্থা ভালো নয় বলে মতামত প্রকাশ করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় কিউবার মানুষকে মুক্তি দিতে হবে; কিউবার মানুষ বর্তমান প্রেসিডেন্টের শাসনামলে দুঃখ-কষ্টে আছে। কারণ ওই দেশের প্রশাসন ভেঙে পড়েছে এবং কিউবাকে বড় ধরনের সংকট এড়াতে স্বল্প সময়ে দ্রুত ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য, পরোক্ষভাবে দীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে কিউবা আমেরিকার হয়রানির শিকার! বর্তমানে দেশটিতে ভয়াবহ জ্বালানিসংকট এবং পুরো দেশ দিনের বড় একটি সময় থাকছে বিদ্যুৎবিহীন। অথচ কিউবা প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২৭ হাজার ব্যারেল তেল পাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, কিউবার জনগণ ও সরকার উল্লেখ্য সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। কঠিন সময় পাড়ি দেওয়ার পথপরিক্রমা বলে দেবে তাদের ক্ষণে ক্ষণে পথচলার ভাবনা ও গতিপথ।
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের দীর্ঘ সময় ধরে আগ্রাসনকালে ইরান বেশ কিছু সময় ধরেই মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কঠিন সময় পার করে আসছে। প্রসঙ্গত, ইরাক ও ন্যাটো বাহিনীর যুদ্ধের কথা মনে পড়ে যায়। মূলত ইরাকে যখন চূড়ান্ত আক্রমণ করা হয় তখন ইরাকের অর্থনীতি মৃত প্রায়। তাই, বাস্তবিক অর্থে ইরাকের ওপর ন্যাটো বাহিনীর আক্রমণ ছিল ইরাক নামক একটি ধ্বংসস্তূপ সম্পন্ন দেশের ওপর আক্রমণ। একইভাবে দীর্ঘ সময় ধরে ইরানকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে রেখে এখন চূড়ান্ত আঘাত হানা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, ইন্টারনেট বন্ধ, বিদ্যুৎ বন্ধ; সব মিলে থমকে দাঁড়ানো দেশটি। সামরিক, বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজারের মতো। সবমিলে ইরানের অবস্থাও ভয়াবহ এবং যা শুধু ইরানকেই টালমাটাল করে না বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ওপরই এর প্রভাব নিশ্চিত হয়ে যায়।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে- ভেনেজুয়েলা, ফিনল্যান্ড ও ইউক্রেন ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের দেশ হলেও কাকতালীয়ভাবে বিশ্বরাজনীতির লাগামহীন জুয়াখেলায় এক অদ্ভুত দোলাচলের মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে। উল্লিখিত দেশগুলোর বিষয়ে পরাশক্তিগুলো যেসব অভিযোগ আনছে; সেসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যেমন দৃশ্যমান মিল তেমনি ওইসব দেশের তেল ও খনিজসম্পদ সরাসরি মালিকানার কথাও বলছে পরাশক্তি। অবশ্য তারা তাদের সামর্থ্য মোতাবেক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। ইরানের রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থরাসহ সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসছে। সরকার বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছে এমনদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসছে দেশটি।
ডেনমার্কের রয়েছে গ্রিনল্যান্ডের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। এমতাবস্থায়, গ্রিনল্যান্ড যদি কোনো সমস্যায় পড়ে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে সমস্যার ভার আপাতত ডেনমার্কের ওপর বর্তায়। গ্রিনল্যান্ডের বিপক্ষে চীনের বিনিয়োগের যে প্রবাহের কথা আমেরিকা বলছে তা ডেনমার্ক প্রত্যাখ্যান করে ওই দেশে তাদের বিনিয়োগের কথা বলছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি তো স্বাভাবিক মাত্রায় আছে বলা যায় না। কারণ, মায়ানমার একটি জাতিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য অমানবিক অন্যায় আচরণ করে ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে দুরবস্থায় থাকা দেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। যদি ১২ লাখ রোহিঙ্গা ধরি তাহলেও রোজ ৩৬ লাখ প্লেটে খাবার সরবরাহ করতে হয় বাংলাদেশকে। আমেরিকা জাতিসংঘের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংস্থা থেকে নিজেদের ইতোমধ্যে গুটিয়ে নিয়েছে। যার ফলে সাহায্য আসার গতি হয়ে যাবে শ্লথ। যা আমাদের নতুন অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করবে স্বাভাবিকভাবেই। পাশাপাশি মায়ানমার সীমান্ত, নাফ নদ, আমাদের পাহাড়ি এলাকা তো মাঝে মাঝে অশান্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অশান্তিসহ প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক যেভাবে মাঝে মাঝে টালমাটাল হয়ে ওঠে তাতে তো শান্তি প্রিয় মানুষ শান্তি নিশ্চয়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম।
ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরের মানুষ তো দুই দেশের রাজনীতির হলি খেলার শিকার বললে খুব বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না। তাই যদি না হতো ১৯৪৭ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৭৮ বছর ওই এলাকার মানুষ এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকত না। এমতাবস্থায় থাকাটাই তো অস্বাভাবিক।
প্রিয় পাঠক, সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, আধিপত্যবাদ সবই তো বিশ্বশান্তির বিনষ্ট করার এক কৌশল। উগ্র জাতীয়তাবাদও এর বাইরে নয়। অনেক কিছু উপেক্ষা না করেই বলা যায় যে, এর মূল কারণ ‘জাতিগত লোভ’ জাতিগুলোর এ লোভচর্চার সীমাহীন ভাবনা যদি সত্যিকারভাবে পরিহার না করে তাহলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার চিন্তা সম্পূর্ণরূপে অমূলক। পরিচ্ছন্নভাবে ভাবতে হবে যে, নিজ দেশ-জাতির সম্পদ বাড়াতে গিয়ে অপর দেশ-জাতি কিংবা জাতিগুলোর সর্বনাশ করা মানবিক চেতনা কিংবা সভ্যতার চেতনার সঙ্গে যায় না, যেতে পারে না। আর এ বিশ্বায়নের যুগে শুধু নিজস্ব স্বার্থভাবনা বিশ্বায়ন ধারণা ভুলিয়ে দেবে- ‘আকাশ আমার ঘরের ঠিকানা, পৃথিবী আমার ঘর’। পৃথিবীর মানুষ সমস্বরে গাইতে শিখবে- ‘আমায় অন্ধ করে দাও, বন্ধ করে দুটি চোখ, আমি দেখিতে পারি না, কেন কাঁদে পৃথিবীর এত লোক।’
ফিলিস্তিনি হাজার হাজার শিশুর লাশ নিয়ে অসহায় বাবা-মায়ের আর্তনাদের পুনরাবৃত্তি আর কোনো ভূখণ্ডে হোক- এমন নিষ্ঠুর, নির্মম চিত্র আর বিশ্ববাসী দেখতে চায় না।
আমরা শান্তিবিহীন বিশ্বে শান্তি চাই, কল্যাণহীন বিশ্বে কল্যাণের বাতাবরণ চাই, অমানবিক বিশ্বে মানবতার জয়গান গাইতে চাই সমস্বরে। এই ধরণী হোক মানস সরোবর।
লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত)
প্রাইম ইউনিভার্সিটি, অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট


