বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসবাদ কেবল একটি নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক জাতীয় চ্যালেঞ্জ, যার ভেতরে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দিকই রয়েছে। স্থায়ী শান্তির জন্য নিরাপত্তা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের আওতায় আনতে হবে।...

বেলুচিস্তান আবারও ভয়াবহ ও সংগঠিত সন্ত্রাসবাদের কবলে পড়েছে। সাম্প্রতিক দিনে কোয়েটা, মস্তুঙ, পাঞ্জগুর, কেচ, কালাতসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত সমন্বিত সন্ত্রাসী হামলাগুলো শুধু প্রদেশ নয়, পাকিস্তানজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী, সংবেদনশীল স্থাপনা এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসবাদের মূল উৎস হলো বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলো, যার মধ্যে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি বেলুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ), বেলুচ ন্যাশনাল আর্মি (বিএনএ) এবং অন্যান্য ছোট গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকেছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধরন, তীব্রতা এবং ভৌগোলিক বিস্তৃতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এসব সংগঠন এখন আর কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা আধুনিক অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ সুবিধাসহ একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
এ হামলাগুলোতে উন্নত অস্ত্র, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং আত্মঘাতী কৌশলের ব্যবহার কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এসব উপাদান ইঙ্গিত দেয় যে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বাইরের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পাচ্ছে। আফগানিস্তানে সক্রিয় ভারত ও ইসরায়েলের নেটওয়ার্কগুলো বেলুচিস্তানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। পাকিস্তানকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যে এসব শক্তি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে আর্থিক, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করছে।
পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের পেছনে আফগানিস্তানের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। আফগান ভূখণ্ড দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে- এটি একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। যদিও আফগান তালেবান সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা সন্ত্রাসীরা বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় অস্থিরতা ছড়াতে সক্ষম। আফগানিস্তানের সঙ্গে বেলুচিস্তানের দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক গুরুত্ব, ইরানের সঙ্গে এর নৈকট্য এবং গওয়াদার বন্দরের মতো কৌশলগত প্রকল্পগুলো অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাব দ্রুত বেলুচিস্তানে অনুভূত হতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত যখন তীব্র হয়, তখন অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো সেই শূন্যতার সুযোগ নেয় এবং বেলুচিস্তানের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের শিকার হয়।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে সন্ত্রাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং প্রকাশ্যে পাকিস্তানের স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব স্বার্থের পার্থক্য প্রায়ই দেখা যায়। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি, তার লক্ষ্য এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের জন্ম দেয়।
সন্ত্রাসবাদের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো বিভিন্ন উগ্রপন্থি সংগঠনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, আফগান তালেবান, আইএসআইএস-খোরাসান, আল-কায়েদা, ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক যোগসাজশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক হামলাগুলো একযোগে একাধিক স্থানে সংঘটিত হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভ্রান্ত ও বিচ্ছিন্ন করা যায়।
এটাও স্বীকার করতে হবে যে, বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসবাদের কারণ কেবল বাহ্যিক নয়। প্রদেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের বৈষম্য বিদ্যমান। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার জনগণ উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এ শূন্যতাকেই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো কাজে লাগিয়ে যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উসকে দেয়।
এ সংকট মোকাবিলায় বেলুচিস্তানের সব রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মতভেদ ভুলে সর্বসম্মত অবস্থানই সন্ত্রাসবাদ পরাজিত করতে পারে। গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সক্রিয় কূটনীতির সমন্বয়ে একটি সামগ্রিক কৌশলই টেকসই শান্তি নিশ্চিত করতে পারে।
সন্ত্রাস দমনে সফল উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। নব্বইয়ের দশকে চীন ও শ্রীলঙ্কা মারাত্মক সন্ত্রাসবাদের সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু আলোচনার পথে না গিয়ে তারা কঠোরভাবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সন্ত্রাসীদের দমন করে। আজ এ দুই দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে এবং উন্নয়নের গতি দ্রুত এগিয়ে চলেছে। পাকিস্তানের জন্যও সিপেক ও তাপি প্রকল্পের সাফল্য নিশ্চিত করতে দেশের মাটি থেকে প্রতিটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নির্মূল করা অপরিহার্য।
বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসবাদ কেবল একটি নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক জাতীয় চ্যালেঞ্জ, যার ভেতরে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দিকই রয়েছে। স্থায়ী শান্তির জন্য নিরাপত্তা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের আওতায় আনতে হবে। জাতি, রাষ্ট্র এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসে, তবে কোনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কই পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করতে পারবে না।
লেখক: সম্পাদক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বুক অ্যাম্বাসাডর


