মানুষের বস্তুগত সম্পদ যেমন মালিক ছাড়া অন্য কেউ প্রকৃত মালিকের অনুমতি সম্মতি বা মূল্য পরিশোধ ব্যতিরেকে ভোগ বা ব্যবহার করতে পারে না, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ক্ষেত্রেও সে বিধান সমভাবেই প্রযোজ্য। মূলকথা হচ্ছে 'কপিরাইট' সংস্কৃতিধর্মী সৃজনশীল কর্মের প্রকৃত স্বত্বাধিকারী বা বৈধ আইনানুগ স্বার্থাদি দেখভাল করার বিশ্ব স্বীকৃত উপায়।...
মানুষের সমাজ-সভ্যতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক কাঠামো নির্মাণে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অবদান অসীম ও অনস্বীকার্য। বস্তুত ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের আগে এ বিষয়টির ধারণা ততটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি, যদিও গভীরভাবে অনুধাবন করলে প্রতীয়মান হয় যে, মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে বর্ণিত সম্পদ নীরবে-নিভৃতে রেখে গেছে প্রগাঢ় ভূমিকা ও অবদান। অনেকটা যেন প্রাণিজগতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অক্সিজেন বা বাতাসের মতো। বাতাস ছাড়া যেমন প্রাণী বাঁচে না, অথচ আমরা ভুলেও উপলব্ধি করি না বাতাসের অস্তিত্ব ঠিক তেমনি প্রাত্যহিক জীবনাচরণ সভ্য ও স্বাভাবিক গতিময় করতে প্রতিদিনের প্রাত্যহিক সব কর্মের প্রতি মুহূর্তে দ্বারস্থ হই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের।
দুই. বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ প্রধানত দুই প্রকারের- ক. শিল্পজাত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ, যেমন-বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা পেটেন্ট, ডিজাইন, ট্রেডমার্কস, সার্ভিস মার্কস, ভৌগোলিক লক্ষণ ইত্যাদি এবং খ. সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা কপিরাইট যা অন্তর্গত হচ্ছে সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, স্থাপত্য নকশা, নৃত্যের করিওগ্রাফি, সফটওয়্যার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, ইলেকট্রনিক ডেটাবেইজ, সার্কিট ইত্যাদি।
তিন. মানুষের মনের আবেগ-অনুভূতির মতো নান্দনিক বোধের শৈল্পিক অভিব্যক্তি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। সাহিত্যকর্ম 'সরাসরি মানুষের মনে ও হৃদয়ে আবেদন সৃষ্টি করে। তাই এই পরিভাষা দিয়ে সাহিত্যের সব রূপ, যেমন-উপন্যাস, কবিতা, হস্তলেখ এবং সেই সঙ্গে কোনো কর্মের অভিব্যক্তির দৃশ্যমান ও শ্রুতিরূপ যেমন-চিত্রকর্ম, সংগীত ও চলচ্চিত্র এবং জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলকেও বোঝানো হয়ে থাকে। মানুষের চিন্তা অথবা অনুভূতির সৃজনশীল প্রকাশকেও সাংস্কৃতিক কর্ম বলা হয়। এ ধরনের অভিব্যক্তি অন্যান্য মানুষের চিন্তাভাবনা ও আবেগকে প্রভাবিত করে।
চার. মানুষের বস্তুগত সম্পদ যেমন মালিক ছাড়া অন্য কেউ প্রকৃত মালিকের অনুমতি সম্মতি বা মূল্য পরিশোধ ব্যতিরেকে ভোগ বা ব্যবহার করতে পারে না, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ক্ষেত্রেও সে বিধান সমভাবেই প্রযোজ্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে বস্তুগত সম্পদ রক্ষায় সারা পৃথিবীর মানুষ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন যতটা সচেতন ও তৎপর, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে তারা যেন ঠিক বিপরীত; বিশেষ করে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশসমূহে!
মূলকথা হচ্ছে 'কপিরাইট' সংস্কৃতিধর্মী সৃজনশীল কর্মের প্রকৃত স্বত্বাধিকারী বা বৈধ আইনানুগ স্বার্থাদি দেখভাল করার বিশ্ব স্বীকৃত উপায়। কপিরাইট ধারণা উদ্ভবের সঙ্গে ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপে মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার এবং পরবর্তী সময়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শব্দযন্ত্র বা ফনোগ্রাম আবিষ্কারের বিষয়টি নিবিড়ভাবে যুক্ত। মানুষের চাহিদা সংস্কৃতিধর্মী পণ্যের বিপুল উৎপাদন ও বিতরণের কর্মযজ্ঞের ফলে 'কপিরাইট'কে আইনানুগ ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রথম নিয়ে আসে ব্রিটিশরা। আমাদের দেশেও কপিরাইট আইন প্রথম বলবৎ হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। একাধিকবার পরিবর্তিত হতে হতে সর্বশেষ ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে বলবৎ হয়েছে কপিরাইট আইন-২০২৩'। এই আইনের বিধানাবলি কীভাবে আমাদের সৃজনকর্মের স্রষ্টা এবং প্রকাশকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করছে, তা-ই আমাদের আজকের মূল প্রতিপাদ্য।
পাঁচ. পৃথিবীর সব সভ্য উন্নত দেশের কপিরাইট আইনের মতোই আমাদের নতুন আইনেও একজন স্রষ্টার অর্থনৈতিক ও নৈতিক অধিকারের মেয়াদ নিশ্চিত করা হয়েছে-পঞ্চম অধ্যায়ের ধারা ২২ থেকে ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে। সৃজনশীল মানুষের কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে নতুন নতুন কর্ম সৃষ্টি করা। স্রষ্টাকে যদি স্বয়ং ভোক্তা পর্যায়ে তার কর্ম পৌঁছানোর দায়িত্ব বহন করতে হয়, তাহলে তার সাধনা বারংবার বাধাগ্রস্ত বা হোঁচট খেতে বাধ্য। আর সে জন্যই পৃথিবীব্যাপী স্রষ্টার পাণ্ডুলিপি/ প্রাথমিক সৃষ্টিকে বোদ্ধা ভোক্তার আস্বাদন উপযোগী করে বাজারজাতকরণের দায়িত্ব পালন করতে হয় 'প্রকাশক'/ 'প্রযোজক' সমাজকে। প্রকাশকরা প্রায়শই অর্থ লগ্নী করে পালন করেন গুরু দায়িত্ব। অনেকটা যেন পালন করেন 'দুগ্ধমাতার' ভূমিকা। রচয়িতা, লেখক, প্রণেতা, সম্পাদক বা স্রষ্টার পাণ্ডুলিপি যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রকাশরা উৎপাদনের নানা স্তর অতিক্রম করে ভোক্তা পাঠকের হাতে তুলে দেন স্রষ্টার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানতুল্য সৃষ্টি সম্ভার। নিঃসন্দেহে বলা যায়- লেখক এবং প্রকাশক মূলত মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। এই যে, পরস্পর নির্ভরশীল দুটি সমাজ, তাদের কর্মকাণ্ড সব সময় খুব স্বচ্ছ, স্বাভাবিক ও গতিময় হয়ে ওঠে না, সংশ্লিষ্টজনদের দায়-দায়িত্ববোধের অস্বচ্ছতার কারণে। ফলে, প্রায়শই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের গুঞ্জন শোনা যায়! এ ধরনের অস্বচ্ছ পরিবেশ থেকে পরিত্রাণের উপায় বাতলে দিয়েছে ২০২৩-এর কপিরাইট আইন। এ আইনের চতুর্থ অধ্যায়ের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে 'কপিরাইটের স্বত্ব এবং মালিকদের অধিকার' বর্ণনা করা হয়েছে। 'স্বত্ব নিয়োগ' প্রাপ্ত না হয়ে অথবা 'লাইসেন্স' প্রাপ্ত না হয়ে কোনো স্রষ্টার সৃষ্টি ব্যক্তিগত ব্যবহার ছাড়া বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা কপিরাইট আইনের দৃষ্টিতে 'পাইরেসি' হিসেবে গণ্য হয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বর্তমান বাংলাদেশে প্রকাশক কর্তৃক লেখক বঞ্চনার (চুক্তিনাম সম্পাদন না করা এবং রয়্যালটি প্রদান না করা) নানা কথা বিভিন্ন সময় চাউর হতে শোনা যায়। বিপরীতে অনেক সময় প্রকাশকরাও যে লেখক কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত হন না এমনটি নয়। নানা কারণে লেখক প্রকাশককে না জানিয়ে প্রকাশকের অজ্ঞাতে বাজার চলতি বই অন্য কোনো পদ্ধতিতে প্রকাশ ও বাজারজাতকরণের কথা শোনা যায়। এ বিষয়ে কপিরাইট আইনের সপ্তম অধ্যায়ের ধারা ৩২ এবং পঞ্চদশ অধ্যায়ের ধারা ৭৪ এ প্রকাশকদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, 'কপিরাইটের অধিকার লঙ্ঘনজনিত অপরাধ অ-আমলযোগ্য, আপসযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে' মর্মে ধারা ১১১-তে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রণীত সর্বশেষ কপিরাইট আইনে লেখক-প্রকাশকদের স্বার্থ সুরক্ষার সমাধান দেওয়ার জন্য 'কপিরাইট বোর্ড'কে দেওয়া হয়েছে প্রভূত ক্ষমতা। ১২০ নম্বর অনুচ্ছেদে বিধান রাখা হয়েছে টাস্কফোর্স গঠনের। তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়ার জন্য ১১৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে মোবাইল কোর্ট কর্তৃক বিচারের বিষয়ে। আমাদের প্রগাঢ় বিশ্বাস ২০২৩-এর এই আইনটি অতীতের অনেক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে যথেষ্ট পরিমাণে সময় উপযোগী আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে, এই আইনের আলোকে লাভবান হতে হলে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের অধিক পরিমাণে মনোযোগী ও সচেতন হতে হবে। পৃথিবীব্যাপী লেখকরা যে পদ্ধতি অবলম্বন করে লাভবান হন আমাদেরও সেদিকে দৃষ্টি ফেরাতে হবে। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, লেখক-প্রকাশকদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য সরকারি উদ্যোগের সহযোগিতায় নানা দেশে কাজ করে CMO (Collective Management Organization)। পাইরেসিসহ সব স্বার্থবিরোধী বেআইনি কার্যক্রম দেশে-বিদেশে প্রতিহত করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। অথচ আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত 'রিপ্রোগ্রাফিক রাইট' প্রতিষ্ঠার জন্য ওই জাতীয় CMO না থাকায় দেশের সরকারি/বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিদিন টনকে টন কাগজ মুদ্রিত হচ্ছে আমাদের মেধাবী বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সৃষ্টি ও সরবরাহকারী লেখক/প্রকাশককে বঞ্চিত করে। ছয়. আজ ২৩ এপ্রিল ২০২৬ WIPO-এর উদ্যোগে এবারও দুনিয়াজুড়ে পালিত হচ্ছে 'World Book and Copyright Day'। এ বছর WIPO দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে "The Role Of Literature In Achieving UN Sustainable Development Goals (Sdgs), Particularly Quality Education And Gender Equality.' উল্লেখ্য, এ বছর ইউনেসকো মরক্কোর রাবাতকে World Book Capital for ২০২৬ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
পৃথিবীর স্থায়ী উন্নতি ও স্থিতিশীলতার জন্য সাহিত্য সৃষ্টি তথা পুস্তক প্রকাশনা ও নিরন্তর পাঠের যে কী অপরিরসীম গুরুত্ব তা একবিংশ শতাব্দীর এ যুদ্ধক্ষুব্ধ সময়ে এসেও পৃথিবীর কিছু চিন্তাশীল মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন মর্মে আমরা বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে বিশ্বাস করি- লেখক ও প্রকাশকের যৌথ যাত্রায় সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা আগামী দিনগুলোতে অধিকতর ধৈর্যশীলতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে বহুবর্ণিল সৃজনশীলকর্ম সৃষ্টি ও উৎপাদনে ব্রতী হয়ে বিনির্মাণ করব জ্ঞানভিত্তিক উন্নত সমাজ ও স্বদেশ। এ বিষয়ে প্রত্যাশা করছি সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতা।
লেখক: সদস্য, কপিরাইট বোর্ড

