আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকার মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি ১৪ বছর ধরে ছিল তালাবদ্ধ। সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। গ্রেপ্তার-আতঙ্কে নেতা-কর্মীরা ওই কার্যালয়ের ধারেকাছে যাওয়ারও সাহস পেতেন না। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেই কার্যালয়টিই এখন নেতা-কর্মীদের পদচারণে গম গম করছে।
কয়েক দিন ধরে ওই কার্যালয়ে গিয়ে বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের আনাগোনা দেখা গেছে। এ ছাড়া দলীয় কর্মসূচির দিনে নেতা-কর্মীদের ভিড় লেগেই থাকে।
একই চিত্র পুরানা পল্টনে অবস্থিত জামায়াতে ইসলামী মহানগর দক্ষিণের কার্যালয়ে। ৪৮/১-এ পুরানা পল্টনের এই কার্যালয়টিও গত ১৪ বছর ছিল তালাবদ্ধ। গোয়েন্দা সংস্থার সার্বক্ষণিক নজরদারিতে ছিল এ কার্যালয়টি। কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতা-কর্মী এলেই তাদের গ্রেপ্তার করা হতো। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন আর কোনো বাধা নেই। নেতা-কর্মীর ভিড়ে জমজমাট থাকছে এখন এই কার্যালয়।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমের মতে, ‘ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে আওয়ামী লীগের আজকের এই পরিণতি হতো না। তাদের বোঝা উচিত ছিল যে অত্যাচার-নির্যাতন করে কোনো আদর্শকে ধ্বংস করা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘তালাবদ্ধ করে জামায়াতের অফিসে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর রহমতে জনতার রোষে সেই বাঁধ ছুটে যাওয়ায় আমরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিএনপির অন্যতম মিত্র জামায়াতের কেন্দ্রীয় এবং মহানগর দুই কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল পুলিশ। এরপর ১৪ বছর ধরে কার্যালয়টি বন্ধ ছিল। এই দুই কার্যালয় ছাড়াও গত ১৪ বছর ধরে সারা দেশে জামায়াতের কার্যালয়গুলো তালাবদ্ধ ছিল। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেন আদালত। পরে ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ১ জুন দলটির নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার জন্য আপিলের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের দিনেও জামায়াতের সব কার্যালয় বন্ধ ছিল। এর মধ্যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৫ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। সেদিনও কার্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেননি দলটির নেতা-কর্মীরা। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপির সঙ্গে জামায়াতও বর্জন করে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে দলটি প্রকাশ্য কোনো কর্মসূচিই পালন করতে পারেনি। আত্মগোপনে থেকেই কর্মসূচি পালন করতে হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচি নিয়ে মিডিয়া কাভারেজ দেওয়ার সাহস বেশির ভাগ গণমাধ্যমেরই ছিল না। হাতে গোনো দু-একটি পত্রিকার ভেতরের পাতায় দলটির খবর কালেভদ্রে ছাপা হতো।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, বিএনপি যখনই বড় কোনো সমাবেশ বা কর্মসূচির ডাক দিয়েছে, ঠিক তখনই জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদেরও পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ কারণে দলটির নেতা-কর্মীদের ভেতর সব সময়ই ছিল অজানা ভয় ও আতঙ্ক। অনেকের বাড়িঘরে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি পুলিশি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর সারা দেশে জামায়াতের কার্যালয়ের চিত্র বদলে গেছে।
রাজধানীর মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেট পার হয়ে একটু সামনে গেলেই ব্যাপারী গলি। ওই গলিতে ঢুকেই হাতের বামে হোল্ডিং নং-৫০৫, চারতলাবিশিষ্ট ভবন। ৫ আগস্টের পর ভবনটি মেরামত করা হয়েছে। মূল গেট এবং দেওয়ালে লেগেছে নতুন রং। ভবনটি সংস্কার করে পুরোনো রূপে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। নিচতলায় ঢুকতেই অভ্যর্থনা কক্ষ, তার পাশেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সেলের রুম। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বসার কক্ষ। এ ছাড়া দোতলায় একটি সেমিনার কক্ষ রয়েছে। এখানে বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত ও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে মিটিং করে দলটি। পাশাপাশি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের মিটিং হয়। তৃতীয় তলায় জামায়াতের নায়েবে আমির, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলদের জন্য কক্ষ রয়েছে। চতুর্থ তলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের বসার কক্ষ। এ ছাড়া ৬০-৭০ জনের মিটিং করার জন্য একটি মিলনায়তন রয়েছে।
কার্যালয়ে ঢুকে অভ্যর্থনাকারীর কাছে দলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলীয় কার্যক্রম এখন পুরোদমে চলছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলের অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা কর্মসূচি না থাকলেও নিয়মিত আসছেন।
ভবনটির সামনে ডেইরি মিল্ক অ্যান্ড মিল্ক প্রোডাক্টস দোকানের স্বত্বাধিকারী স্বপন জানান, তিনি গত এক যুগে এখানে কাউকে আসতে দেখেননি। তবে গত ৫ আগস্টের পর লোকজনের আসা-যাওয়া বেড়েছে। সন্ধ্যার পর লোকসমাগম বেশি হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের খবরের কাগজকে বলেন, ‘মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয় নেতা-কর্মীদের আগ্রহের জায়গা ছিল। কিন্তু গত ১৪ বছর আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের কার্যালয়ে যাওয়ার সুযোগটুকুও দেয়নি। কোথাও আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে দেয়নি। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দায়িত্বশীল নেতাদের পাশাপাশি কার্যালয়ে সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মীরা আসছেন। কার্যালয়টি মেরামত করতেও প্রায় তিন মাস সময় লেগেছে। এখন দলীয় ইনডোর মিটিং ও মতবিনিময় সবই এখানেই করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত জামায়াতের কার্যালয়ে এসে জামায়াতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় এখন কার্যালয়ে হয়।’
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের খবরের কাগজকে বলেন, ‘১৪ বছর ধরে তালাবদ্ধ থাকা কার্যালয়টি পুরোপুরিভাবে চালু করেছি। আমাদের নেতা-কর্মীরা আসা-যাওয়া করছেন। আমিরে জামায়াত, নায়েবে আমিরসহ সবার জন্য আলাদা আলাদা অফিস রয়েছে এবং আমরা নিয়মিত বসছি। এখন সবাই নরমালি অফিস করছি, আমরা সবকিছু ওভারকাম করার চেষ্টা করছি। ভয়ডরহীনভাবেই নেতা-কর্মীরা কার্যালয়ে আসছেন, তারা সবাই উৎফুল্ল।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২০ হাজারের বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে। এতে আসামির সংখ্যা ছয় থেকে সাত লাখ। এসব মামলা প্রত্যাহারে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে আমরা সহযোগিতা করছি। অনেকগুলো মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার হয়েছে, অনেকগুলো মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।’