ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে আসন ভাগাভাগি নিয়ে শুরুতেই বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ এক মাসের আলোচনার পর জোটের রূপরেখা ও আসন সমঝোতা নিয়ে গতকাল বুধবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কথা থাকলেও শরিক দলগুলোর মধ্যকার মতানৈক্যের কারণে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। ফলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণ প্রথম ধাপেই হোঁচট খেল।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জামায়াত তাদের মিত্র দলগুলোকে আশানুরূপ আসন ছাড়তে রাজি না হওয়ায় জোটে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতো বড় শরিকদের সঙ্গে এখনো সমঝোতা না হওয়াই বড় কারণ। এ ছাড়া কিছু দলের অভ্যন্তরে জোটবিরোধী অবস্থান থাকলেও সেটি বড় কোনো সংকট নয়। মতপার্থক্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১১-দলীয় জোট অটুট থাকবে বলে আশাবাদী জোটের দায়িত্বশীল নেতারা।
জানা গেছে, জোটের আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে গতকাল দুপুরে বৈঠকে বসেন জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল নেতারা। আজ বৃহস্পতিবার একাধিক দলের সঙ্গে বৈঠক করার কথা আছে জামায়াতের। আজ সংবাদ সম্মেলন আনুষ্ঠানিভাবে জোটের নির্বাচনি রূপরেখা ও আসন বণ্টন তুলে ধরা হতে পারে।
জামায়াতের ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও ১১-দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ খবরের কাগজকে বলেন, আসন সমঝোতার আলোচনা এখনো চলমান। শিগগিরই ১১ জোটের আসন সমঝোতার ঘোষণা দেওয়া হবে।
দলীয় সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ইসলামী আন্দোলন প্রথম নির্বাচনে ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি নিয়ে কাজ শুরু করে। অর্থাৎ সমঝোতাকারী দলগুলো একটি আসনে একজন প্রার্থীই দিতে পারবে। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে শুরুতে এই আলোচনায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। ষষ্ঠ দল হিসেবে যোগ দেয় জামায়াতে ইসলামী। এরপর জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) সমঝোতার আলোচনায় যুক্ত হয়। এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিকে যুক্ত করে জামায়াত।
জোটের একাধিক সূত্র জানায়, ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াত ১৮০ থেকে ১৯০টি আসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আর জোটের শরিকদের ইসলামী আন্দোলনকে ৪৫টি, এনসিপিকে ২৫টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫-২০টি আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে। তুলনামূলক ছোট দলগুলোর মধ্যে খেলাফত মজলিসকে ৭-১০টি, এলডিপিকে ৪টি, খেলাফত আন্দোলনকে ৫টি, এবি পার্টিকে ৩টি, জাগপাকে ৩টি, নেজামে ইসলাম পার্টিকে ২টি এবং বিডিপিকে ২টি আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে প্রতিটি দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দু-এক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।
ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন খবরের কাগজকে বলেন, আলোচনা এখনো চলমান। ইসলামী আন্দোলনই প্রথম ‘ওয়ান বক্স’ আলোচনা শুরু করেছিল। জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে ইসলামী আন্দোলন। শিগগিরই ঘোষণা আসতে পারে।
খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক মো. আবদুল জলিল খবরের কাগজকে বলেন, আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। দেশের জাতীয় স্বার্থ ও ইসলামের জন্য ১১-দলীয় জোট অটুট রাখতে হবে। তবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে আসন সমঝোতা হওয়া উচিত। তবে জোটের মধ্যে কোনো ভাঙন হোক, এটি কোনো দলই চায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জানা গেছে, আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই জামায়াত ২৭৬টি এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে আলাদাভাবে মনোনয়ন দাখিল করেছে। তবে ইসলামী আন্দোলনসহ শরিক দলগুলোর বড় নেতাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করা অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আসনে জামায়াত মনোনয়নপত্র দাখিল করেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত জোট না হলে এসব আসন নিয়ে জটিলতায় পড়বে জামায়াত।
চরমোনাই পীরের ফোনে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত
জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় জোটের আসন সমঝোতা বিষয়ে ঘোষিত গতকালের সংবাদ সম্মেলন শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। জোটের একটি সূত্র জানিয়েছে, আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে মতপার্থক্য গতকাল পর্যন্ত ছিল। তবে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলন হলে জোটের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। সে জন্য জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে ফোন করে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার কথা জানান ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম চরমোনাই পীর।
ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে চরমোনাই পীর ইসলামপন্থিদের ‘এক বক্স’ নীতির ঘোষণা করেন। সেই নীতিতে আসন সমঝোতার পারস্পরিক আলোচনা চলমান। দ্রুতই এক বক্স নীতির রূপরেখা ও ধরন পরিষ্কার করা হবে।
উন্মুক্ত আসন রাখতে চান জামায়াত ও মামুনুল হক, রাজি নন চরমোনাই পীর
জামায়াতের সঙ্গে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ও মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে কিছু আসনে কঠিন দর-কষাকষির জন্যই জটিলতা রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনি কৌশলের অংশ হিসেবে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৫টির মতো আসনে ‘ওপেন’ (উন্মুক্ত) রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রস্তাবে মামুনুল হক রাজি হলেও চরমোনাই পীরের আপত্তি রয়েছে। তারা কোনো আসনে উন্মুক্ত প্রার্থী রাখতে রাজি নন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একাধিক নেতা জানান, কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে যে কয়টিতে ছাড় দেওয়া হবে না, সেখানে দল প্রার্থী উন্মুক্ত রাখতে চায়। তবে তা সমঝোতার আলোকেই হবে।
ইসলামী আন্দোলনে দুই গ্রুপ, নতুন জোটের ইঙ্গিত
জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে শুরু থেকেই ইসলামী আন্দোলনের অসন্তোষ প্রকাশ পায়। দলটি শুরু থেকে শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। তবে আলোচনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে আসনের চাহিদা কমিয়েছে। সর্বশেষ তারা ৫০টির নিচে নামতে রাজি নয় বলে জানায়। কিন্তু জামায়াত দলটিকে ৪৫টি আসন ছাড় দিতে চায়। ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাই এটি মানতে নারাজ। জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন পক্ষে দলের বড় একটি অংশ। আরেকটি অংশ ৪৫টি আসন নিয়ে জোটে থাকতে চায়। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ৫টি দলকে নিয়ে নতুন জোট করার পক্ষেও কেউ কেউ।
দলীয় সূত্র বলছে, ইসলামী আন্দোলনের বড় একটি অংশ মনে করছে, আসন সংখ্যা যদি ৪০-এর ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি দলের সাংগঠনিক শক্তির অবমূল্যায়ন হবে। এ ছাড়া ভোটের পর ক্ষমতায় গেলে সরকারপ্রধান কে হবেন, বিরোধী দল হলে সংসদে ইসলামী আন্দোলনের ভূমিকা কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ছাড়া সম্প্রতি তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির দেখা করে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলেছেন। তা নিয়েও দলের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত ‘বড় ভাইসুলভ’ আচরণ করছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে গেলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও জোট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে এসে এই জোট ভাঙতে চায় না দল দুটি।
ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন খবরের কাগজকে বলেন, দলের ভেতরে কোনো গ্রুপ নেই। আসন সমঝোতা প্রশ্নে মতভিন্নতা থাকতে পারে। জোট থেকে কেউ বের হয়ে যাচ্ছে না। শিগগিরই আসন সমঝোতা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্বাচন হবে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। তা-ই না? ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের আগে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। দু–এক দিনের মধ্যেই দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
তিনি বলেন, ‘পাঁচ দলের বাইরেও অনেকেরই সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে।’
জোটে জটিলতার ব্যাখ্যায় গাজী আতাউর রহমান বলেন, নির্বাচনি আসন সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা কাউকে বের করে দেওয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। ইসলামী আন্দোলন জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ইসলামী আন্দোলনকে মেনে নিতে হবে, এই রাজনীতি অতীতেও করেনি।
এক টেবিলে একসঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেনি ১১ দল
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের ডাক দিলেও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। জানা গেছে, গত বছরের ১১ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের দাবিতে একসঙ্গে সমাবেশ করেছিল সমমনা আটটি দল। এরপর থেকেই দলগুলোর ভেতরে আসন সমঝোতার আলোচনা শুরু হয়। ১১ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। কিন্তু দীর্ঘ এক মাস আসন সমঝোতার আলোচনা করলেও তা হয়েছে পৃথকভাবে। এখন পর্যন্ত এক টেবিলে একসঙ্গে বসে চূড়ান্ত আলোচনা করতে পারেনি ১১ দল।