বাংলাদেশে ১৯৭১ শুধু একটি ঐতিহাসিক সাল নয়, কোনো একক ঘটনাপ্রবাহও নয় কিংবা শুধু অতীতের সোনালি স্মৃতিও নয়। এটি এখন রাজনৈতিক অস্ত্র, ক্ষমতার। মুক্তিযুদ্ধ এখানে স্মৃতি নয়, বরং শাসনের হাতিয়ার।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে আবেগ বা নস্টালজিয়ার আলোকে দেখার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ইতিহাসকে পবিত্র করে তোলার প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসকে প্রশ্নাতীত করে দেয়। প্রশ্নাতীত ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সর্বদা ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়ায়, সত্যের পক্ষে নয়। আমরা যদি ইতিহাসকে শুধুই ‘পবিত্র’ বানিয়ে দিই, তবে আমরা ইতিহাসকে হত্যার অংশীদার করে তুলি।
ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য হলো, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামসহ কতিপয় ইসলামি দল ও সংগঠন ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সংগঠন, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় তাদের সহযোগী সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এগুলো ছিল একটি সংগঠিত রাজনৈতিক অবস্থানের ফল। আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এখানে দলগত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন ওঠা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। ব্যক্তি অপরাধীর দায় যেমন আছে, তেমনি রাজনৈতিক সংগঠনের নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়ও অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু এই দোষ শুধু ইসলামি রাজনৈতিক দলের নয়। আমাদের বাংলাভাষী, শিক্ষিত সমাজও ব্যর্থ হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তা যারা পাকিস্তানপন্থি ছিল, তারা প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। তারা প্রশাসনিক বাধা দিয়ে, স্থানীয় জনগণকে বিপন্ন করেছিল। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, জমিদার পাকিস্তানকে অর্থ ও সুবিধা দিয়েছিল। নতুন রাষ্ট্রে তাদের ক্ষমতা বা সম্পদ হারানোর ভয় স্বাধীনতার বিপক্ষে দাঁড়ানোর বড় কারণ। তাদের কাজ আমাদের শেখায় যে, স্বাধীনতার পক্ষে না দাঁড়ানোও একটি অপরাধ। আবার স্বাধীনতার নামে ভিনদেশের স্বার্থ হাসিলে সোচ্চার হওয়াও অপরাধ। এটি কোনো রাজনৈতিক মতামত নয়; এটি মানবিক ও নৈতিক দায়।
তবে ইতিহাসের এই অধ্যায় বোঝার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠনগত সংকটকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে ছিল গভীর ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অসম বণ্টন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র সব সময় পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি বহুজাতিক, বহু ভাষিক জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখার এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেটাই প্রমাণ করেছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক পথচলাও এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে। শুরুতে তার রাজনীতি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণার পথে যায়নি; বরং স্বায়ত্তশাসন, প্রাদেশিক ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিই ছিল তার মূল কৌশল। ছয় দফা কর্মসূচি ছিল সেই দাবিরই রাজনৈতিক রূপ। কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দেওয়া এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা পূর্বপাকিস্তানের জনগণকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প অবশিষ্ট ছিল না।
এই পর্যায়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। উপমহাদেশীয় ভূরাজনীতিতে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাঙনকে ভারত অনুকূল হিসেবে দেখেছিল। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে সামরিক ও বেসামরিক দ্বন্দ্বে এবং ক্রমান্বয়ে যুদ্ধে রূপ দিয়ে অখণ্ড পাকিস্তানকে খণ্ডিতকরণের লক্ষ্যে ভারত মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়, মুক্তিযুদ্ধকে শুধু ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের পর পাক হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে এবং মানুষকে ভয় দেখিয়ে অখণ্ড পাকিস্তান বজায় রাখতে চাইলে ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। সুতরাং যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল পূর্বপাকিস্তানের জনগণের ওপর চালানো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায়।
২৬ মার্চের আগে যারা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিল, তাদের সেই অবস্থান ভুল হলেও তা সব ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। কিন্তু গণহত্যা শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হয়ে নিজ ভূখণ্ডের নিরস্ত্র মানুষ হত্যায় অংশগ্রহণ করা নিঃসন্দেহে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ। সেই মুহূর্তে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর নৈতিক দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গ ত্যাগ করে পূর্বপাকিস্তানের জনগণের আত্মরক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো এবং একই সঙ্গে ভারতীয় আগ্রাসন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তা না করে শেষ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করা ছিল এই দেশের মানুষ ও ভূমির সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।
একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্টভাবে সামনে আসে। রাজাকার বাহিনী পাকিস্তানি রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। আর মুক্তিবাহিনী বিদেশি সহায়তা গ্রহণ করলেও যুদ্ধ করেছিল বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে। এই নৈতিক পার্থক্য না বোঝা গেলে ১৯৭১-এর ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, স্বাধীনতার পর এই ইতিহাসকে যেভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ মানে আর মানুষের রক্ত, ক্ষুধা বা ভাঙা ঘরের গল্প নয়। মুক্তিযুদ্ধ মানে বৈধতার সনদ। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে, সরকার শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু নাগরিক ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধ এখানে জনগণের অধিকারের উৎস নয়; ক্ষমতাসীনদের ঢাল।
আওয়ামী লীগ প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা যুদ্ধ না করলেও যুদ্ধটা আওয়ামী লীগের নামেই হয়েছিল। আওয়ামী লীগসহ ডান ধারার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে জিতেছিল। কিন্তু তারা সেই বিজয়কে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে রূপ দিতে পারেনি বা কার্যকর অর্থে রূপ দেয়নি।
বাম রাজনীতির ব্যর্থতা ভিন্ন প্রকৃতির। তারা শোষণ, শ্রেণি ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির সঠিক ভাষা তৈরি করেছিল, কিন্তু সেই ভাষাকে গণ-আন্দোলনে রূপ দিতে পারেনি। তারা রাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের বিকল্প সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আজ করপোরেট ও আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্বিঘ্নে ক্ষমতার দম্ভে এগিয়ে চলে।
ইসলামি রাজনীতির সংকট সবচেয়ে গভীর। ১৯৭১ সালে তারা রাষ্ট্রকে বাঁচাতে গিয়ে মানুষের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ভুলের দায় তারা আজও স্পষ্টভাবে স্বীকার করেনি। এ থেকে উত্তরণের চেষ্টা করেনি। তাদের কেউ কেউ আবার মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধ বা গণ্ডগোল হিসেবে উল্লেখ করে ১৯৭১ সালের দায় থেকে অব্যাহতি নিতে চায়। তারা ইতিহাসের আসামি না হয়ে নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।
এই তিন ধারার সম্মিলিত ব্যর্থতার ফলেই মুক্তিযুদ্ধ আজ বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসে না, কারণ তাকে ভালোবাসতে বাধ্য করা হয়। যা মনে ধরে না, তা জোর করে মানানো যায় না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন করলে রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্দেহ করলে রাজাকার; এই দ্বৈত ভাষা ইতিহাসকে জীবিত রাখে না, বরং মৃত গ্রন্থে পরিণত করে। ইতিহাস যখন ধর্মে রূপ নেয়, তখন সত্য সবচেয়ে আগে নিহত হয়।
বাংলাদেশের সংকট কোনো একক আদর্শের সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ক্ষমতার সংকট। এখানে রাষ্ট্র মানুষের ওপরে উঠে গেছে, আদর্শ মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেছে, আর ইতিহাসকে পবিত্র করে তোলা হয়েছে যাতে ক্ষমতার হিসাব চাওয়া না যায়।
মুক্তিযুদ্ধ তখনই অর্থবহ হবে যেদিন তা আবার মানুষের গল্প হবে। সাধারণ মানুষের ভয়, সাহস, ক্ষতি আর স্বপ্নের গল্প। ক্ষমতার প্রতীক নয় বা নয় শাসনের।
এই সময়ের চ্যালেঞ্জ হলো ইতিহাসকে পুনরায় মানুষমুখী বানানোর। কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে জনগণের মুক্তি, মানুষের অধিকার এবং ন্যায়ের সঙ্গে সংযুক্ত করব। রাজনৈতিক দলগুলো যদি মুক্তিযুদ্ধকে শুধু নিজেদের ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে মুক্তিযুদ্ধ গুরুত্বহীন হয়ে থাকবে।
অতীতের গণহত্যা ও নির্যাতনের প্রতিফলন আজও দৃশ্যমান। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, অবিচার, দুর্নীতি এবং নাগরিকদের ওপর রাজনৈতিক শক্তির চাপে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার কাছে জনগণ অবহেলিত। শাসকগোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে, কিন্তু জনগণকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
আমরা যদি সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধ চাই, তা হলে আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে, কেন রাজনীতি এখন শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক হবে? কেন ইতিহাস প্রশ্নাতীত হয়ে গেছে? কেন নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসে না? মুক্তিযুদ্ধ তখনই সত্যিকারের অর্থবহ হবে, যখন তা জনগণের মুক্তি, মানুষের অধিকার, ন্যায় ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হবে।
লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট
[email protected]