অপচয়-অপব্যয় ব্যক্তি ও সমষ্টির সামগ্রিক অবয়বে অনির্বচনীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, সময়, সম্পদ ও সুযোগের সুষম ব্যবহারে সাফল্য সুনিশ্চিত হয়। কোরআনে অপচয়-অপব্যয় থেকে দূরে থাকার জন্য বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং যারা মানুষকে দেখানোর জন্য তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না, আর শয়তান কারও সঙ্গী হলে সে সঙ্গী কত মন্দ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৮)
আল্লাহ আরও বলেন, ‘অপচয় করবে না, কারণ আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত: ১৪১)
পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে আদম সন্তান, প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ করো, আর খাও, পান করো কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, আর কৃপণতাও করে না; এ দুইয়ের মধ্যবর্তী পন্থা গ্রহণ করে।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)
অপব্যয়ের ফলে স্বভাবত অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায্য দায় পরিশোধে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়ে থাকে বলেই ব্যয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুষম অবস্থা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্পদ সসীম, চাহিদা অসীম। সসীম সম্পদের সুষম ব্যবহারের দ্বারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাহিদা মেটানো যেখানে জরুরি, সেখানে অপব্যয়ের অবকাশ নেই। ব্যক্তির অর্থনীতিতে অপব্যয় অভাব-অনটনকে আবশ্যক করে তোলে। জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা। অপব্যয়-অপচয়ে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়, বৈষম্য প্রকাশ্য হয়ে ওঠে ভোগ ও বণ্টন প্রক্রিয়ায়।
পানাহারের ক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ক্ষুধা ও প্রয়োজনের চেয়ে অধিক খাদ্য গ্রহণ অনুচিত। ফিকিহবিদরা উদরপূর্তি ও অস্বাভাবিক ভক্ষণ করাকে না জায়েজ লিখেছেন। উমর (রা.) বলেন, ‘বেশি পানাহার থেকে বেঁচে থাক। কারণ অধিক পানাহার দেহকে নষ্ট করে, নানা রোগের জন্ম দেয় এবং কর্মে অলসতা সৃষ্টি করে। পানাহারের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। এটা দৈহিক সুস্থতার পক্ষে উপকারী এবং অপব্যয় থেকে দূরবর্তী।’
কোরআনে তাদের শয়তানের দোসর সাব্যস্ত করা হয়েছে যারা আল্লাহর পথে নিজেরাও ব্যয় করে না এবং অন্যকেও ব্যয় না করার অনুপ্রেরণা জোগায় অথচ তারা অপব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে। যারা একান্তভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ব্যয় না করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে, তাদের আমল আল্লাহর কাছে কবুল হয় না। হাদিসে এমন কাজকে শিরিকি বলেও অভিহিত করা হয়েছে। শাদ্দাদ ইবনে আওস বর্ণিত হাদিসে আছে, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ল, সে শিরিক করল। যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে রোজা রাখল, সে শিরিক করল এবং যে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সদকা করল, সে শিরিক করল।’ (মুসনাদে আহমদ)
লেখক: সরকারের সাবেক সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর