পবিত্র হজের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ। বিশ্বজগতের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো হাজির মনে এখন মক্কা ছাড়ার বিষাদময় সুর। তবে আল্লাহর ঘর থেকে বিদায় নেওয়ার আগে প্রতিটি হাজিকে এক শেষ ও পরম আবেগঘন কর্তব্যে শামিল হতে হয়, যা না করে মক্কা ত্যাগ করার কোনো অনুমতি ইসলামে নেই। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বেঁধে দেওয়া এই শেষ বিদায়ের নামই হলো ‘বিদায়ী তাওয়াফ’। হজের এই শেষ ওয়াজিব আমলটির নিয়ম ও কিছু অজানা আইনি দিক সম্পর্কে জেনে নিই।
মক্কার বাইরের অঞ্চল থেকে আসা যেকোনো মুসলিমের জন্য হজের সব কাজ শেষ করে স্বদেশ বা মক্কার সীমানা পেরিয়ে চলে যাওয়ার আগে কাবা শরিফকে শেষবারের মতো প্রদক্ষিণ করা ওয়াজিব। হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন তার সর্বশেষ কাজ বায়তুল্লাহর তাওয়াফ না করে মক্কা থেকে চলে না যায়।( মুসলিম, ১৩২৭)
অনেকেই মনে করেন বিদায়ী তাওয়াফের জন্য হয়তো বিশেষ কোনো পোশাক বা ভিন্ন নিয়ম রয়েছে। তবে আসল তথ্য হলো, এটি অন্য যেকোনো সাধারণ তাওয়াফের মতোই সহজ।
এই তাওয়াফের জন্য কোনো ইহরামের কাপড়ের প্রয়োজন নেই, সাধারণ পোশাকেই এটি আদায় করা হয়।
হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে কাবার চারপাশে ৭টি চক্কর দিতে হয়। তবে হজের মূল তাওয়াফের মতো এতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বীরদর্পে হাঁটা (রমল) কিংবা ডান কাঁধ খোলা রাখার (ইজতিবা) কোনো নিয়ম নেই।
বিদায়ী তাওয়াফ শেষ করার পর মাকামে ইবরাহিমের সামনে (সম্ভব না হলে হারামের যেকোনো জায়গায়) দুই রাকায়াত নামাজ পড়তে হয়। মনে রাখবেন, এই তাওয়াফের পর সাফা-মারওয়া পাহাড়ে কোনো দৌড়াদৌড়ি বা ‘সাঈ’ করতে হয় না।
হজের সব কার্যক্রম শেষ করার পর কেউ যদি যেকোনো একটি নফল তাওয়াফও করে থাকেন, তবে সেটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘বিদায়ী তাওয়াফ’ হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। এরপর যদি তিনি মক্কায় আরও কিছুদিন অবস্থানও করেন, তবে চলে আসার সময় আবার তাওয়াফ করা ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব।
কিন্তু কোনো হাজি যদি ভুলবশত বা অবহেলায় এই তাওয়াফ না করেই নিজ দেশে ফিরে যান, তবে তার করণীয় কী? এখানে রয়েছে ইসলামের এক চমৎকার সমাধান, যা অনেকেরই অজানা:
প্রথম: তিনি যদি পরবর্তীতে আবার ওমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কায় যাওয়ার সুযোগ পান, তবে ওমরাহর কাজ শেষ করে এই ছুটে যাওয়া তাওয়াফটি আদায় করে নিতে পারবেন। বিলম্বে করার কারণে কোনো জরিমানা দিতে হবে না।
দ্বিতীয়: যদি পুনরায় মক্কায় যাওয়া সম্ভব না হয়, তবে মক্কার হারাম এলাকার মধ্যে তার পক্ষ থেকে কারো মাধ্যমে একটি ছাগল বা দুম্বা জরিমানা (দম) হিসেবে কোরবানি করে দিতে হবে।
বিদায়ী তাওয়াফ কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আল্লাহর ঘরের প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শেষ নিবেদন। কাবার আঙিনা ছেড়ে যাওয়ার আগে এই শেষ প্রদক্ষিণ হাজিদের হৃদয়কে এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে সিক্ত করে।