পর্দা একটি ফরজ বিধান। ইসলামি শরিয়তে নামাজ রোজা হজ জাকাত যেমন ফরজ, তেমনি একটি ফরজ কাজ হলো পর্দা। পর্দা মানে ঢেকে রাখা বা লুকিয়ে রাখার কাপড়। যে কাপড় পরলে সৌন্দর্য দেখা যায় না। পরনের নিত্যব্যবহার্য পোশাকের ওপর আরও একটা পোশাক পরে সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখাকে পর্দা বলে। প্রয়োজনে বাড়ির ভেতরেও এই পোশাক পরে থাকতে হয় নারীকে। যৌথ পরিবারে বসবাস করলে সেখানে দেবর-ভাশুরের সামনে খোলামেলা পোশাকে চলা যায় না। পর্দা রক্ষাকারী ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হয়।
বিশাল বড় অন্যায় অপকর্ম থেকে বেঁচে থাকার জন্য এই ঢিলেঢালা পোশাক হচ্ছে নারীর রক্ষা-কবজ। এই ঢিলেঢালা পোশাকটাকে বলা হয় জিলবাব।
পর্দা করা সহজ, আবার কঠিনও। যারা আল্লাহকে ভয় করে চলে, তাদের জন্য পর্দা করা সহজ। আর যারা আল্লাহর হুকুম-আহকাম মানে না, তাদের জন্য কঠিন। জিলবাব ঢিলেঢালা পোশাক বলতে আমরা বুঝি বোরখাকে। যেটা পরে সাধারণত আমরা বাইরে বের হই। এই বোরখা প্রাপ্তবয়স্ক হলেই পরিধান করতে হবে। ছোটবেলা থেকে মেয়েদের বোরখা পরার অভ্যাস করতে হবে। এই শিক্ষা মা-বাবাকেই দিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করলে ভবিষ্যতে পিতা-মাতাকে পস্তাতে হয় না। মেয়েরাও বোরখায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা বেপর্দা চললে তার শাস্তি ভোগ করতে হবে পিতামাতা, বড়ভাই, স্বামী ও ছেলেকে। অতএব সাবধান। নিজ পরিবারকে পর্দার শিক্ষা দিন। বউ, বোন, মেয়েকে পর্দাশীল হিসেবে তৈরি করুন।
প্রাপ্তবয়স্ক সব নারী-পুরুষের ওপর নামাজের মতোই পর্দা করা ফরজ। পর্দা বলতে আমরা সাধারণত নারীদের পর্দাকেই বুঝি। পুরুষদের পর্দা করা নিয়ে সহজে কেউ মাথা ঘামায় না। অথচ পুরুষদের জন্যও রয়েছে পর্দার বিধান।কোরআনে আল্লাহতায়ালা প্রথমে পুরুষকে দৃষ্টি অবনত রাখতে বলেছেন। তার পর নারীকে পর্দা করতে বলেছেন। (হে নবী!) মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন নিজেদের চোখ নিচু রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য বেশি পবিত্র নিয়ম। তারা যা কিছু করে, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (সুরা নূর )
পুরুষ মানুষের পর্দা হচ্ছে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। আর নারীর পর্দা সমস্ত শরীর। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রাখা। নারীর সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মুখ। মুখ দেখেই মানুষ বুঝতে পারে কোন মেয়ে কতটা সুন্দর; কার চেহারা কেমন? মুখ দেখেই ফেতনার সৃষ্টি হয়। তাই মুখ অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে।কিছু কিছু নারী মনে করে, নিত্যব্যবহার্য পোশাক সালোয়ার-কামিজ ফুলহাতা জামার ওপর শুধু মাথার চুল ঢেকে হিজাব পরিধান করলেই পর্দা হয়ে যাবে। আসলে তা কিন্তু নয়। এভাবে সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে হিজাব পরলে মেয়েদের সৌন্দর্য আরও দ্বিগুণ বেড়ে যায়। পুরুষের চোখে আরও আকর্ষণীয় দেখায়। এটা কোনো পর্দা নয়। কেবলই সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। কেউবা আবার বোরখা পরে মুখ খোলা রেখে হিজাব পরিধান করে। এতেও সৌন্দর্য বেড়ে যায়। মুখটা আরও সুন্দর লাগে দেখতে। এভাবে বাইরে বের হওয়াকে পর্দা বলে না। এভাবে বাইরে বের হলে পরপুরুষের চোখে আরও সুন্দর দেখায়। সাবালিকা মেয়েদের মুখ খোলা রেখে বাইরে বের হওয়া একদম ঠিক নয়। এতে শয়তানের শয়তানি কাজটা আরও সহজ হয়ে যায়।
ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহিলারা হলো পর্দায় থাকার বস্তু। সুতরাং তারা যখন পর্দা উপেক্ষা করে বাইরে আসে, তখন শয়তান তাদের (অন্য পুরুষের চোখে) সুসজ্জিত করে দেখায়। (তিরমিজি শরিফ) পর্দা হচ্ছে সমস্ত শরীর ঢেকে রাখা। কোরআনে বর্ণিত চৌদ্দজন ছাড়া বাকি সবার সামনে নারীর সকল সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখাই হচ্ছে পর্দা। (মুমিনদের অন্যদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে)- তারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।(আল-মুমিনুন,৫)
তা ছাড়া মিহি সুরে ইনিয়ে-বিনিয়ে পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলাও পর্দার খেলাফ। এভাবে কথা বলতে কোরআনপাকে আল্লাহতায়ালা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আমাদের বর্তমান সমাজে পর্দা করে বাইরে বের হওয়া সহজ, কিন্তু বাড়ির ভেতরে পর্দা করা খুব কঠিন। যেখানে দেবর-ভাশুরকে মৃত্যু সমতুল্য মনে করতে বলা হয়েছে, সেখানে দেবরের সঙ্গেই চলে হাসিঠাট্টা, গল্প-গুজব। বর্তমান সমাজে এটা নিতান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার। একটা মেয়ে তার নিজ বাড়িতে পর্দা করে এলেও শ্বশুরবাড়িতে এসে বড় রকমের ধাক্কা খায়। এখানে দেবর-ভাশুর, ননদ-ননাসের জামাই, মামাশ্বশুর ওনারা হচ্ছেন শ্বশুরবাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আত্মীয়।
বাড়ির বউ নববধূ যখন এই আত্মীয়স্বজন থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়, তখনই শুরু হয় পারিবারিক কলহ; ঝগড়াঝাঁটি। বিশেষ করে স্বামী শাশুড়ি যদি ধর্মীয় বিধিনিষেধ সঠিকভাবে না জানেন না মানেন, তা হলেই শুরু হয় বাড়ির বউয়ের জন্য কঠিন অবস্থা। চলে নানা কটুকথা। ওনাদের সামনে খোলামেলা যেতে হবে, আদর-আপ্যায়ন করতে হবে। আর এই কাজগুলো করার দায়িত্ব বাড়ির বউয়ের। শাশুড়ি মনেপ্রাণে চান তার ছেলের বউ তার সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলুক, দেখা করুক খোলামেলাভাবে। এর যে মারাত্মক ক্ষতিকর দিক রয়েছে, সে সম্পর্কে ওনারা পুরাই উদাসীন থাকেন। আমি সবার কথা বলছি না। যারা বোঝেন মেনে চলেন, বাড়ির বউকেও পর্দা করতে সাহায্য করেন- তারা তো আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু যেসব মহিলার স্বামী-শাশুড়ির পর্দা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নাই, তারাই বিপদে পড়েন। আফসোস এমন পরিবারের জন্য। অনেক মেয়ে বাবার বাড়িতে পর্দায় থাকলেও শ্বশুরবাড়িতে এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ধীরে ধীরে পর্দা থেকে সরে আসে। একটা সময় ভুলে যায়, সেও এক সময় পর্দা করত। আল্লাহর হুকুম সঠিকভাবে মেনে চলত। কিন্তু বিপরীতমুখী পরিস্থিতির কারণে অধঃপতনের শিকার হয়। যেটা মারাত্মক অন্যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা হয় পরিস্থিতির শিকার। এর দায়ভার পরিবারকেই নিতে হবে। কঠিন জবাবদিহি করতে হবে কাল হাশরের মাঠে। পর্দা রক্ষা করে চলা শুধু নারীদের দায়িত্ব নয়। পুরুষদের ওপরও রয়েছে কিছু দায়িত্ব।
পুরুষ মানুষ কারও বাড়িতে ঢুকতে চাইলে অবশ্যই অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হবে। প্রথমে সালাম দিতে হবে। সালাম দিয়ে অনুমতি না পেলে প্রয়োজনে তিনবার অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি না পেলে ফিরে আসতে হবে। যত জরুরি কাজই হোক না কেন, অনুমতি ছাড়া কোনো বেগানা নারীর বাড়িতে প্রবেশ করা যাবে না। নারীদের গোপনে দেখার জন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করা যাবে না। লুকিয়ে কারও অন্দরমহলে নজর দেওয়া যাবে না ।আল্লাহতায়ালা কোরআনপাকে ঘোষণা দিয়েছেন, হে ওইসব লোক, যারা ঈমান এনেছো! তোমাদের ঘর ছাড়া অন্যদের ঘরে তাদের অনুমতি ছাড়া এবং তাদেরকে সালাম পাঠানো ছাড়া কখনো ঢুকবে না। এ নিয়ম তোমাদের জন্যই ভালো। আশা করা যায় যে, তোমরা এ বিষয়ে খেয়াল রাখবে। (সুরা নূর-আয়াত-২৪ : ২৭)
প্রচলিত একটা কথা,‘চেনা মানুষের সঙ্গে কিসের পর্দা!’ পর্দার বিষয়ে সঠিকভাবে অনেকেই জানেন না। জানার সুযোগ হয়নি বা চেষ্টা করেননি। এমন নারীদের আরও বিভ্রান্ত করা হয় এসব কথা বলে। এই কথার কোনো ভিত্তি নাই। পর্দার বেলায় চেনা-অচেনা কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে- মাহরাম, নন মাহরাম। চেনা-অচেনা যাই, হোক জেনে রাখা ভালো- খোলামেলাভাবে কাদের সামনে যাওয়া যাবে আর কাদের সামনে যাওয়া যাবে না। সুরা আন-নূরের ৩১নং আয়াতে আল্লাহ বলে দিয়েছেন, ছেলেদের ক্ষেত্রে যারা মাহরাম:
১. মা, ২. মেয়ে, ৩. বোন, ৪. নানি, ৫. দুধ মা, ৬. খালা, ৭. ভাতিজি, ৮. ভাগনি, ৯. ফুফু, ১০. সৎমা, ১১. দাদি, ১২. শাশুড়ি, ১৩. দুধ মেয়ে, ১৪. ছেলের স্ত্রী।
মেয়েদের ক্ষেত্রে যারা মাহরাম:
১. বাবা, ২. ছেলে, ৩. ভাই, ৪. নানা, ৫. দুধ ভাই, ৬. মামা, ৭. ভাতিজা, ৮. ভাগিনা, ৯. চাচা, ১০. দাদা, ১১. শ্বশুর, ১২. সৎ ছেলে, ১৩. দুধ ছেলে, ১৪. মেয়ের জামাই।বাকি আত্মীয়স্বজনের সামনে খোলামেলাভাবে যাওয়া যাবে না।
ইয়া রব্বুল আলামীন আমিসহ আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন। আপনার দেওয়া ফরজ বিধান পর্দা মেনে চলার তৌফিক দান করুন। শয়তানের ফেতনা হতে আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমিন ইয়া রব্বুল আলামিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক