ঢাকা ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু ব্রাজিলের স্বপ্নের জাদুকর মুসিয়ালা পথপ্রদর্শক বাকুনা ভিনিসিয়ুসের গোলে সমতায় ফিরল ব্রাজিল পরাশক্তি জার্মানির সামনে পুঁচকে কুরাসাও ডার্কহর্স জাপান, সতর্ক নেদারল্যান্ডস ব্রাজিলের শুরুর একাদশে চমক অতিরিক্ত সময়ের গোলে সুইসদের রুখে দিয়ে কাতারের বাজিমাত ৯২ বছর ধরে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে হারেনি ব্রাজিল নেইমারকে ছাড়াই নামছে ব্রাজিল, ভাঙছে ৪০ বছরের ঐতিহ্য পেনাল্টিতে এমবোলোর গোল, এগিয়ে সুইজারল্যান্ড ফিটনেস প্রশ্নে রোনালদো, ‘আমাকে খেলতে দেখেননি?’ ‘জাপানি মেসি’র সঙ্গী উয়েদা এমবাপ্পের সমালোচনা ‘অতিরিক্ত ও অন্যায়’ দেড় দশকের জ্বালানিনীতি ছিল আমদানিনির্ভর: তথ্যমন্ত্রী ইরানের অনুশীলন মাঠের পাশে মরদেহ উদ্ধার ওয়ানডে সিরিজ বাংলাদেশ ইমার্জিংদের ঝিলিকের মৃত্যুর রহস্যে নতুন মোড়, গ্রেপ্তার স্বামী রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ মার্তিনেজকে ঘিরে নতুন শঙ্কা শাহবাগে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বিক্ষোভ নাটোরে ৭০ দরিদ্র রোগীর বিনামূল্যে ছানি অপারেশন চাকরি মেলায় সাড়া, রাজশাহীতে ৫০ শতাংশ প্রার্থীর তাৎক্ষণিক নিয়োগ ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন মাইকেল অলিভার ‘ফেনীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় ওছমান হারুন মাহমুদ দুলাল’ পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রিন ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মিসরকে কেন জার্সি পরিবর্তন করতে বলল ফিফা?
Nagad desktop

কেন রজব মাসটি এত মহিমান্বিত

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:০০ পিএম
আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:০৯ পিএম
কেন  রজব মাসটি এত মহিমান্বিত
ছবি: সংগৃহীত

আরবি বর্ষপঞ্জিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানিত একটি মাসের নাম রজব। আরবি বর্ষপরিক্রমার সপ্তম মাস এটি। রজব শব্দের অর্থ সম্মান করা। ইবনু ফারিস (রহ.)-এ মাসকে রজব নামে নামকরণের কারণ উল্লেখ করে বলেন, কারণ আরবের লোকরা এ মাসকে অনেক বেশি সম্মান করত, অবশ্য পরবর্তী সময়ে শরিয়তেও সে সম্মান বহাল রাখা হয়। (মাকাইসুল লুগাহ, পৃ. ২৪৯৫) এ মাসকে মুজার গোত্রের দিকে সম্পৃক্ত করে রজাবু মুজার নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। কারণ মুজার গোত্র অন্যান্য সম্মানিত মাসের চেয়েও এ মাসকে বেশি সম্মান করত। (ফাতহুল বারী ১/১৩২)

রজব মাস সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত: পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই সময়ের হিসাব ঠিক রাখার জন্য আল্লাহতায়ালা ১২টি মাস নির্ধারণ করে রেখেছেন। তন্মধ্যে চারটি মাসকে হারাম বা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে আল্লাহর কিতাবে তথা লাওহে মাহফুজে মাসের সংখ্যা ১২টিসেই দিন থেকে, যে দিন আল্লাহতায়ালা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ। এটাই সহজ-সরল দ্বীন এর দাবি। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর ব্যাপারে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না এবং তোমরা সবাই মিলে মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই করো, যেমন তারা সবাই মিলে তোমাদের সঙ্গে লড়াই করে। বিশ্বাস রেখো নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)

নবিজি (সা.) সম্মানিত চার মাস নির্ণয় করে বলেন, আল্লাহ যে দিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সে দিন হতে সময় যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেভাবে আবর্তিত হচ্ছে। ১২ মাসে এক বছর। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। জুল-কাদাহ, জুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। তিনটি মাস পরস্পর রয়েছে। আর একটি মাস হলো রজব-ই-মুজারা, যা জুমাদা ও শাবান মাসের মাঝে অবস্থিত। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩১৯৭)

মাসগুলো সম্মানিত হওয়ার কারণ ও হেকমত: ইমাম আবুবকর জাসসাস (রহ.) বলেন, এই চারটি মাসকে সম্মানিত ঘোষণা করার দুটি কারণ রয়েছে। ১. এ মাসে যুদ্ধবিগ্রহ হারাম, যা আরবের মুশরিকরাও মেনে চলত। আল্লাহতায়ালা বলেন, লোকে আপনাকে মর্যাদাপূর্ণ মাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? আপনি বলে দিন, তাতে যুদ্ধ করা মহাপাপ। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৭) ২. অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে গুনাহর পরিণতি অতি ভয়াবহ আর ইবাদতের প্রতিদান বড়। (আহকামুল কুরআন, পৃ. ৩/১৪৩)

আল্লামা ইবনে কাছির (রহ.) নির্দিষ্ট এই চার মাসকে সম্মানিত ঘোষণা করার হেকমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, জুল-কাদাহ, জুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম এই তিন মাসকে হজ পালনের সুবিধার্থে হারাম করা হয়েছে। যেন হজের মাসের আগে ও পরে সবাই নিরাপত্তার সঙ্গে মক্কা নগরীতে আগমন এবং সেখান থেকে প্রস্থান করতে পারে। আর রজব মাসকে হারাম করা হয়েছে উমরা পালনের সুবিধার্থে। (তাফসিরে ইবনে কাছির, পৃ. ৪/১৪৮)

রজব মাসের ইবাদত ও সালাফের গুরুত্বারোপ: সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রজব মাসের ফজিলত প্রমাণিত। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এ মাসে স্বতন্ত্র কোনো ইবাদত নেই। বরং অন্যান্য মাসের মতো ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকবে। গুরুত্বের সঙ্গে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল ইবাদতগুলো আদায় করবে। জিকির, তাসবিহ, তাহলিল ও কোরআন তেলাওয়াতে সময় অতিবাহিত করবে। রজব মাসের অভ্যাস রমজান মাসে আমলের উন্নতির জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

রজব মাসে যদিও সুনির্দিষ্ট ইবাদত প্রমাণিত নেই তথাপি সময়টা আমাদের জন্য বরকতময়। তাই গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। রজব মাসের ব্যাপারে সালাফের আমল ও উক্তিগুলো সামনে থাকলে আমাদের জন্য তা অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

ক. ইবাদতের বীজ বপনের মাস: রজব মাস হলো ইবাদতের বীজ বপনের মাস। ইমাম ইবনে রজব (রহ.) বলেন, এ মাস বরকত ও কল্যাণময় মাসগুলোর মূল ও চাবিকাঠি। ইমাম আবুবকর বলখি (রহ.) বলেন, রজব হলো বীজ বপনের মাস। শাবান হলো পানি সিঞ্চনের (পরিচর্যার) মাস‌। আর রমজান হলো ফসল কেটে ঘরে তোলার মাস। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ১২১)

খ. এ মাসের ইবাদত অন্যান্য মাসের সহযোগী: সম্মানিত মাসগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এ সময় ইবাদতে মশগুল থাকলে অন্য মাসে ইবাদতে কাটানো সহজ হয়‌। আবার এ সময়গুলোয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে অন্য মাসে গুনাহ থেকে বাঁচা সহজ হয়। (মাআরিফুল কুরআন, পৃ. ৪/৩৭২)

গ. রমজান মাসের প্রস্তুতি: রজব মাসের এক মাস পর রমজান মাস। তাই বিশেষভাবে এ মাস থেকেই রমজানের প্রস্তুতি শুরু করা। যেন রমজান আসলে বিভিন্ন ব্যস্ততা চেপে না বসে। একইভাবে ইবাদত বন্দেগির সঙ্গে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলা, যেন রমজানে ইবাদতে লিপ্ত হতে অলসতা তৈরি না হয়। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ১২১)

রজব মাসের করণীয় কিছু আমলও রয়েছে, যদিও রজব মাসের সুনির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই, তবুও এ মাসের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা অনেক। তাই অন্যান্য মাসের ইবাদতগুলোই আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে সম্পাদন করার চেষ্টা করা। নিচে উল্লেখযোগ্য কিছু আমলের কথা তুলে ধরা হলো-

নেক আমলের প্রতি মনোযোগী হওয়া: রজব মাসসহ অন্যান্য হারাম মাসে ইবাদত ও নেক আমলের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা এ সময় প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বৃদ্ধি পায়। ইমাম ইবনে কাছির (রহ.) বলেন, আল্লাহতায়ালা হারাম মাসে গুনাহকে বড় করে দেখেন। আবার নেক আমলের সওয়াব ও প্রতিদানও বেশি করে দেন। (তাফসিরে ইবনে কাছির, পৃ. ৪/১৩০)

গুনাহ করে নিজের ওপর জুলুম না করা: গুনাহ করা সব সময়ই হারাম ও নিষিদ্ধ। তবে সম্মানিত মাসগুলোয় তা আরও কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর ব্যাপারে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)

আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে জারির তাবারি (রহ.) লেখেন, তোমরা নিজেদের ওপর জুলুম করো না এ কথার অর্থ হলো, তোমরা এ সময় আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না। আল্লাহর নিষিদ্ধ কোনো কাজকে হালাল করো না। অন্যথায় তোমরা আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তির সম্মুখীন হবে। (তাফসিরে তাবারি, পৃ. ১৪/২৩৭)

রমজান লাভের জন্য দোয়া জারি রাখা: রজব মাস পর্যন্ত মহান আল্লাহ যেহেতু আমাদের হায়াত দান করেছেন তাই এখন বেশি বেশি দোয়া করা, যেন আল্লাহ আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। রমজানের খায়ের, বরকত ও কল্যাণ দিয়ে আমাদের সিক্ত করেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রজব মাস এলে নবিজি (সা.) বলতেন, আল্লাহুম্মা বারিক-লা-না ফি রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাললিগ না রামাদান। অর্থ- হে আল্লাহ! রজব ও শাবানে আমাদের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজানে পৌঁছে দিন। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ)

বেশি বেশি রোজা রাখা: রজব মাসে দিন তারিখ নির্ধারণ করা ব্যতীত বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। নবিজি (সা.) রজব মাসে অনেক সময় রোজা রাখতেন।

উমরা পালন করা: হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-সহ অনেক সাহাবায়ে কেরাম এ মাসে উমরা পালন করতেন। তাই সম্ভব হলে এই আমলটি করা।

আল্লাহতায়ালা আমাদের রজব মাসের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা ধারণ করে সময়গুলো কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

 

 লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া মেহেরপুর

ঘটনা যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায়

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম
যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায়
ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা ইসলামের অন্যতম মূল ভিত্তি। পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা—ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিত মানুষের সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে। কিন্তু মানুষ যখন চরম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে এই ঐশী বিধানকে অমান্য করে, তখনই নেমে আসে বিপর্যয়। সুরা আল-কালামে বর্ণিত ‘বাগানওয়ালাদের’ ঐতিহাসিক ঘটনাটি তেমনই এক চিরন্তন শিক্ষার স্মারক।

ইয়েমেনের সানা নগরীর কাছে এক আল্লাহভীরু ব্যক্তির একটি বিশাল ফলের বাগান ছিল। তিনি নিয়মিত বাগানের আয়ের একটি বড় অংশ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলেরা সেই বাগানের মালিক হয়। কিন্তু পিতার উদারতা ও মানবিক মূল্যবোধ ছেলেদের স্পর্শ করেনি। বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে তারা চরম কৃপণ ও অদহংকারী হয়ে ওঠে।

একদিন ভাইয়েরা মিলে এক গোপন বৈঠক করল। লোভের বশবর্তী হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল—পিতার মতো তারা আর গরিবদের একটি কণাও দেবে না। এক ভাই বাধা দিতে চাইলেও বাকিরা তা শুনল না। তারা পরিকল্পনা করল, ভোরের আলো ফোটার আগেই বাগানের সব ফসল কেটে ঘরে তুলে ফেলবে, যাতে কোনো অভাবী মানুষ টের পেয়ে কিছু চেয়ে না বসে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষরাতে তারা বাগানের দিকে রওনা হলো। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল! তাদের অবাধ্যতা ও কৃপণতার শাস্তিস্বরূপ রাতের অন্ধকারে আল্লাহর নির্দেশে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে গেছে। পুরো বাগানটি আগুনে পুড়ে কালো ছাই হয়ে পড়ে আছে। যে সম্পদ নিয়ে তারা অহংকার করেছিল, নিমেষেই তা ধ্বংস হয়ে গেল।

সর্বস্ব হারিয়ে ভাইদের ভুল ভাঙল। তারা বুঝতে পারল, সম্পদ একা ভোগ করার জিনিস নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার। তারা নিজেদের অন্যায়ের জন্য আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করল। আল্লাহ অত্যন্ত দয়াময়; তিনি তাদের ক্ষমা করলেন এবং পরবর্তী সময়ে বাগানটিকে আবার সুমিষ্ট ফলে ভরিয়ে দিলেন।

এই ঘটনা আমাদের শেখায়, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত পেয়ে যারা অহংকার করে এবং গরিবের হক নষ্ট করে, তাদের পতন অনিবার্য। অসহায়দের ভালোবাসা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দরিদ্র মুমিনরা ধনীদের চেয়ে পাঁচ শ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাই সম্পদ জমিয়ে রাখা নয়, বরং তা বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত বরকত।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি?

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি?
ছবি: সংগৃহীত

রক্তের নদী, জ্বলন্ত তন্দুর আর সোনা-রুপার শহর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চোখে দেখা পরকালের সেই শিহরিত করা দৃশ্যপট আজ আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে? রাসুল (সা.) প্রায়ই সাহাবিদের জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি? কিন্তু এক সকালে তিনি নিজেই শোনালেন এক অভূতপূর্ব সফরের কথা। জিবরাঈল ও মিকাঈল (আ.)-এর সঙ্গে রাতের আঁধারে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন এক ভিন্ন জগতে, যেখানে উন্মোচিত হয়েছিল মানুষের ইহকালীন পাপ ও পুণ্যের পরকালীন প্রতিচ্ছবি।

সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত গভীর সেই সফরের দৃশ্যগুলো আমাদের চেনা পৃথিবীর চেনা অপরাধেরই এক ভয়ঙ্কর রূপক:
আল্লাহর রাসুল (সা.) দেখলেন, এক ব্যক্তি কাত হয়ে শুয়ে আছে আর ভারী পাথর দিয়ে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছে। অপরাধ? সে কোরআন শিখেও তা আমল করেনি এবং ফরজ নামাজ ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকত।

অপর এক ব্যক্তির চোয়াল, নাক ও চোখ লোহার আঁকড়া দিয়ে টেনে মাথার পেছন পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল। আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, এই শাস্তি ছিল ঠিক সেই মিথ্যুকদের জন্য, যাদের মিথ্যা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ত।
একটি সংকীর্ণ মুখের জ্বলন্ত তন্দুর চুলার ভেতর উলঙ্গ নারী-পুরুষের আর্তনাদ দেখালেন ফেরেশতাদ্বয়। তারা হলো দুনিয়ার ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল।

রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে থাকা এক ব্যক্তির মুখে তীরের লোক ক্রমাগত পাথর ছুড়ে মারছিল। সে ছিল দুনিয়ার সুদখোর।
এই ভয়ঙ্কর শাস্তির খণ্ডচিত্র পার হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) পৌঁছালেন এক শান্তিময় সবুজ বাগানে। সেখানে দীর্ঘকায় নবি ইব্রাহিম (আ.)-এর চারপাশে খেলা করছিল নিষ্পাপ শিশুরা, যাদের মধ্যে মুশরিকদের সন্তানরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সফরের শেষ প্রান্তে সোনা ও রুপার ইটের তৈরি এক অপরূপ শহরে অর্ধেক সুন্দর আর অর্ধেক কুৎসিত দেহের কিছু মানুষকে ধপধপে সাদা নদীতে ডুব দিয়ে পূর্ণ সুন্দর হতে দেখা গেল–যারা দুনিয়ায় ভালো-মন্দ আমল মিশ্রিত করেছিল এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। জিবরাঈল ও মিকাঈল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য নির্ধারিত জান্নাতি প্রাসাদটি দেখিয়ে বললেন, দুনিয়ার অবশিষ্ট আয়ু পূর্ণ হলেই আপনি এখানে প্রবেশ করবেন।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, পরকালের শাস্তি কোনো রূপকথা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন কর্মেরই অবিকল প্রতিফলন। আমাদের একটি ক্লিক বা অসচেতন ঘুমও পরকালের চিরস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক  

যে অঙ্গের কারণে মানুষ জান্নাত অথবা জাহান্নামে যাবে

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
যে অঙ্গের কারণে মানুষ জান্নাত অথবা জাহান্নামে যাবে
ছবি: খবরের কাগজ

মানুষের শরীরের মাত্র দুটি ছোট অঙ্গ কীভাবে তার অনন্তকালের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে? আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, মানুষের মুখ ও লজ্জাস্থানই তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ শিখরে ওড়াতে পারে, আবার নিক্ষেপ করতে পারে জাহান্নামের অতল গহ্বরে। বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, সাইবার বুলিং ও সামাজিক অশান্তির মূল উৎসগুলোর দিকে তাকালে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ১৪শ বছর আগের সতর্কবার্তা আমাদের এক নতুন ভাবনার খোরাক দেয়।

কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে, আর কোন জিনিসই বা টেনে নিয়ে যাবে জাহান্নামে? সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক অনন্য হাদিসে এর জবাব দিয়েছেন বিশ্বনবি। তিনি বলেন, মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে, আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র। আর মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে, মুখ ও লজ্জাস্থান (মিশকাত, হা/৪৬২১)।

জিহ্বা দিয়ে মানুষ যেমন সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা ছড়াতে পারে, তেমনি লজ্জাস্থানের অপব্যবহার সমাজে অশ্লীলতা ও লাঞ্ছনার জন্ম দেয়।
মুক্তির এক অভিনব ও সহজ চুক্তি রয়েছে ইসলামে। সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার কাছে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তু (জিহ্বা) এবং তার দু’পায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর (লজ্জাস্থান) জিম্মাদার হবে (হেফাজত করবে), তবে আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব (বুখারি, মিশকাত হা/৪৬০১)।

আজকের যুগে মানুষের সামনে এক রূপ আর পেছনে অন্য রূপ ধারণ করা এক মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হবে ‘দ্বিমুখী’ মানুষ, যে একেক দলের কাছে একেক রূপ নিয়ে হাজির হয় (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৮২২)। গিবত, তোহমত ও চোগলখুরির মতো কবীরা গুনাহ মানুষকে অজান্তেই ধ্বংসের মুখোমুখি করে। এ কারণেই হুঁশিয়ারি এসেছে, চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত হা/৪৬১২)।

আমরা প্রতিদিন বহু কথা হেলায়-ফেলায় বলে যাই। অথচ আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত অন্য এক হাদিস অনুযায়ী, মানুষ কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কথা বলে যার গুরুত্ব সে নিজেও জানে না, কিন্তু আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। পক্ষান্তরে, মানুষ অসতর্কভাবে আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কথা বলে ফেলে, যা তাকে জাহান্নামের এত গভীরে নিক্ষেপ করে, যার পরিধি পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের সমান (বুখারি, মিশকাত হা/৪৮১৩)।
মুখের লাগাম টেনে ধরা এবং নিজের চরিত্রকে কলঙ্কমুক্ত রাখাই হলো সফলতার মূল চাবিকাঠি। ক্ষণিকের অসতর্কতা যেন আমাদের চিরস্থায়ী আফসোসের কারণ না হয়।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক   

শামায়েল কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.)-এর চুল মোবারক?

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:২৯ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:৩১ এএম
কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.)-এর চুল মোবারক?
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক ফ্যাশনের যুগে আমরা অনেকেই জানি না চুল রাখার ব্যাপারে নবিজি (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট সুন্নাহ ও এর বিবর্তন কেমন ছিল! রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র অবয়বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর পরিপাটি কেশবিন্যাস। তিনি সর্বদা চুল পরিষ্কার ও সুবিন্যস্ত রাখতেন। সাহাবিদের বর্ণনা থেকে তাঁর চুলের দৈর্ঘ্য, ধরন এবং তা আঁচড়ানোর চমৎকার পদ্ধতি জানা যায়।

নবিজি (সা.)-এর চুল একদম সোজা বা অতিরিক্ত কোঁকড়ানো ছিল না। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস (রা.)-কে তাঁর চুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি অত্যধিক কোঁকড়ানো কিংবা একেবারে সোজা কেশবিশিষ্ট ছিলেন না। তাঁর কেশ উভয় কানের লতি পর্যন্ত শোভা পেত।’ (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১, সহিহ মুসলিম: ৬২১৩)

অবস্থাভেদে তাঁর চুল কখনো কাঁধের কাছাকাছি আবার কখনো কানের লতি পর্যন্ত দীর্ঘ হতো। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) একত্রে একই পাত্রের পানি দ্বারা গোসল করতাম। আর তাঁর চুল কানের লতি এবং মধ্যবর্তী স্থান বরাবর লম্বা ছিল।’ (মিশকাত: ৪৪৬০, শারহুস-সুন্নাহ: ৩১৩৭)

হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবিজি (সা.) ছিলেন মধ্যমাকৃতির দেহবিশিষ্ট এবং তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান ছিল প্রশস্ত, যেখানে কানের লতি পর্যন্ত ঝুলন্ত চুলগুলো এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করত। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১, সহিহ মুসলিম: ৬২১০)

নবিজি (সা.) কীভাবে চুল আঁচড়াতেন, তার মাঝেও একটি সুন্দর ইতিহাস রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, মক্কার প্রাথমিক জীবনে রাসুল (সা.) তাঁর চুল সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখতেন, অর্থাৎ কোনো সিঁথি করতেন না। সে সময় মক্কার মুশরিকরা মাথায় সিঁথি করত, আর আহলে কিতাবরা (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) চুল ঝুলিয়ে রাখত। ওহি না আসা পর্যন্ত রাসুল (সা.) আহলে কিতাবদের অনুসরণ পছন্দ করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি চুলে নিয়মিত সিঁথি করা শুরু করেন এবং এটিই তাঁর স্থায়ী সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫৮, নাসাঈ: ৫২৩৮)


নবিজি (সা.)-এর চুল রাখার আরেকটি বিশেষ রূপের কথা জানা যায় মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে। হজরত উম্মে হানি বিনতে আবু তালিব (রা.) বলেন, ‘একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি চুলের বেণি নিয়ে মক্কায় আগমন করেছিলেন।’ (আবু দাউদ: ৪১৯৩, ইবনে মাজাহ: ৩৬৩১)

মুহাদ্দিসিনদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বেণি বা ঝুঁটি নারীদের মতো ছিল না। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে চুল যেন ধুলোবালিতে এলোমেলো না হয়ে যায়, সেজন্য পুরুষালি গাম্ভীর্য বজায় রেখে চুলগুলোকে চারটি ভাগে সুন্দর ও পরিপাটি করে গুটিয়ে রাখা হয়েছিল। এটি পুরুষদের জন্য নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন নয়, বরং চুলের বিশেষ যত্নের একটি রূপ ছিল।রাসুল (সা.)-এর সুবিন্যস্ত চুলের এই বিবরণ আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের বাহ্যিক অবয়ব সর্বদা পরিচ্ছন্ন, মার্জিত ও সুন্দর হওয়া কতটা জরুরি।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

আধুনিক বাজেট বনাম ইসলামের বায়তুল মাল

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
আধুনিক বাজেট বনাম ইসলামের বায়তুল মাল
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় বাজেটের মূল চালিকাশক্তি হলো একটি নিখুঁত আয়-ব্যয়ের হিসাব। তাত্ত্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

তবে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বাজেট অনেক সময়ই সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত করের জালে আটকে ফেলে এবং গুটিকয়েক পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়।

ঠিক এই সংকটকালেই এক কালোত্তীর্ণ ও মানবিক সমাধান নিয়ে হাজির হয় ইসলামের অর্থনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ‘বায়তুল মাল’ (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)। যার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি আমানতদারিতা এবং নিরেট মানবকল্যাণ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল—রাষ্ট্রীয় বাজেটে ঘাটতি থাকলেও সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষ কখনো অনাহারে থাকত না, কারণ তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ছিল সবসময় সুনিশ্চিত।

বর্তমান বিশ্বের কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোর বাজেট সাধারণত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেয়। তবে বাস্তব চিত্র হলো, এই প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।

সম্পদের এই কৃত্রিম ও অন্যায্য কেন্দ্রীকরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার শুধু বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।(সুরা হাশর, আয়াত: ৭)

ইসলামি অর্থনীতির এই কালজয়ী দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বায়তুল মাল। আধুনিক ব্যবস্থার মতো সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট বা পরোক্ষ করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে ইসলাম ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘জাকাত’ ও ‘উশর’ (ফসলের ওপর ধার্য অংশ) আদায়ের বিধান করেছে। এর ফলে সম্পদ সমাজের উচ্চস্তর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিম্নস্তরের দিকে প্রবাহিত হয়।

ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণযুগ, বিশেষ করে খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে বায়তুল মাল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশৃঙ্খল রূপ লাভ করে। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর বিখ্যাত ‘কিতাবুল খারাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বায়তুল মালের মূল আয়ের উৎস ছিল—জাকাত, উশর, খুমুস (খনিজ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), খারাজ (ভূমি রাজস্ব) এবং জিজিয়া কর।

এখানে লক্ষণীয় যে, জাকাত থেকে অর্জিত অর্থ সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয় হতো। এটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বা প্রশাসনিক খরচে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ ছিল না।

আজকের দিনে রাষ্ট্রগুলোকে ‘বাজেট ঘাটতি’ মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ায়। বিপরীতে, বায়তুল মাল ব্যবস্থায় জাকাত ও সদকা ফান্ড সবসময় সংরক্ষিত থাকত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার জন্য। ফলে মূল বাজেটে ঘাটতি থাকলেও দরিদ্র মানুষ কখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো না।

প্রখ্যাত ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি তাঁর ‘রোল অব দ্য স্টেট ইন দ্য ইকোনমি: অ্যান ইসলামিক পারসপেক্টিভ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ইসলামে জনগণের ওপর কর বা রাজস্ব চাপানো তখনই বৈধ, যখন তা সরাসরি জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয় এবং বায়তুল মালের স্বাভাবিক উৎসগুলো অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এর বাইরে জনগণের ওপর কোনো ধরনের জুলুমমূলক কর চাপানোর সুযোগ ইসলামে নেই।

রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল। তিনিই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় খাতা তৈরি করেন, যা ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত বাজেট ও বণ্টন নীতিমালা।

এই ব্যবস্থার আওতায় মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি নবজাতক শিশুদের জন্যও বায়তুল মাল থেকে বিশেষ অনুদান বরাদ্দ ছিল (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ইবনে জারির তাবারি)।

খলিফা ওমরের (রা.) মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় প্রখ্যাত আলেম আবু উবায়েদ আল-কাসিম ইবনে সালামের গ্রন্থে। সিরিয়া সফরকালে এক বৃদ্ধ অমুসলিম (ইহুদি) নাগরিককে ভিক্ষা করতে দেখে খলিফা আফসোস করে বলেছিলেন, আমরা তোমার যৌবনে তোমার কাছ থেকে জিজিয়া নিলাম, আর এখন বৃদ্ধ বয়সে তোমাকে এভাবে ফেলে রাখলাম! এটা কখনোই হতে পারে না।

তিনি তৎক্ষণাৎ বায়তুল মালের কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যেন সেই বৃদ্ধ এবং তাঁর মতো সমস্ত অক্ষম ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।

বর্তমান যুগে বাজেট পাস হওয়ার পর আমলাতান্ত্রিক বিলাসিতা, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এবং তথাকথিত ‘ভিআইপি সংস্কৃতির’ পেছনে জনগণের ট্যাক্সের বিশাল অর্থ অপচয় হতে দেখা যায়। কিন্তু ইসলামি দর্শনে বায়তুল মালের প্রতিটি পয়সা হলো জনগণের পবিত্র আমানত, যার সুনিপুণ হিসাব শাসককে পরকালে আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।

চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) পারস্যের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবিহির কাছে লেখা এক চিঠিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ খরচের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। ‘নাহজুল বালাগাহ’গ্রন্থে সংকলিত সেই চিঠিতে তিনি লেখেন, আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি যদি জানতে পারি যে তুমি মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বায়তুল মাল) থেকে ছোট বা বড় কোনো অংশ নিজের স্বার্থে আত্মসাৎ করেছ, তবে তোমার বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেব যা তোমাকে নিঃস্ব, কলঙ্কিত এবং ভারী বোঝার নিচে পিষ্ট করে ছাড়বে।

ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম ওমর চাপরা তাঁর ‘ইসলাম অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইসলামি রাষ্ট্রে বাজেট প্রণয়নের মূল ভিত্তিই হলো ‘আদল’ (ইনসাফ) ও ‘ইহসান’ (দয়া)। এখানে শাসক সম্পদের মালিক নন, বরং তিনি জনগণের পক্ষে একজন ট্রাস্টি বা জিম্মাদার মাত্র।

বর্তমান উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধ এবং অনুৎপাদনশীল খাতে। এই চক্রাকার সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সামষ্টিক বাজেটের দর্শনে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

ইসলামের বায়তুল মাল ব্যবস্থা আমাদের দেখায় কীভাবে জাকাত এবং ওয়াক্ফ (জনকল্যাণে উৎসর্গীকৃত সম্পদ) ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে জাতীয় বাজেটের পরিপূরক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম কবির হাসান তাঁর ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স: প্রিন্সিপালস অ্যান্ড প্র্যাকটিস’গ্রন্থে মত প্রকাশ করেছেন যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি তাদের মোট জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ জাকাত ও ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে কাজে লাগাতে পারে, তবে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর থেকে সামাজিক নিরাপত্তার বিশাল চাপ অনেকটাই কমে যাবে।

ইসলামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বায়তুল মাল ব্যবস্থা মূলত সুশাসন, মানবিকতা ও সামাজিক আস্থার এক অপূর্ব ভারসাম্যপূর্ণ পথ প্রদর্শন করে। বাজেট কখনো ধনীদের আরও ধনী করার আইনি দলিল হওয়া উচিত নয়। বরং একটি আদর্শ বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া।

লেখক:  প্রিন্সিপাল, মাদরাসা ফাতেমাতুজ জাহরা (রা.), মুহাম্মদপুর, ঢাকা।